কম সময়েও অনেক ভালো জায়গা ঘোরা যায়, জানাচ্ছেন ডঃ গৌতম সরকার, ছোট ভ্রমণ ভালো ভ্রমণ: পর্ব-৩

কম সময়েও অনেক ভালো জায়গা ঘোরা যায়, জানাচ্ছেন ডঃ গৌতম সরকার, ছোট ভ্রমণ ভালো ভ্রমণ: পর্ব-৩
12 Sep 2021, 11:19 AM

ছোট ভ্রমণ ভালো ভ্রমণ: পর্ব-৩

 

 

ড. গৌতম সরকার

 

 

আমরা যারা ঘুরতে ভালবাসি, ঘুরতে যাই, তাদের একটা বাৎসরিক ট্রাভেল সিডিউল খুব জরুরি৷ জানি সবসময় আগে থেকে সব কিছু সঠিক ভাবে প্ল্যান করা সম্ভব নয়, কিন্তু একটা টেন্টেটিভ প্ল্যান তো করা যায়! এতে সুবিধে যেটা সেটা হল এই ডেটসগুলো আপনার মাথার মধ্যে সেঁধিয়ে যাবে আর আপনি একটা বাড়তি তাগিদ অনুভব করবেন এই ট্যুরগুলো সাকসেসফুল করার ব্যাপারে৷ তাই বছরের শুরুতেই গোটা পরিবার-বন্ধুবান্ধব মিলে একটা ক্যালেন্ডার নিয়ে বসে পড়ুন৷ ধরুন আপনি চাইছেন বছরে অন্তত একটা বড় আর দুয়েকটা ছোটো ভ্রমণ করতে, সেক্ষেত্রে দেখুন বাচ্চাদের পরীক্ষা কবে শেষ হচ্ছে -ওই সময় আপনার বা আপনার গিন্নির অফিসের ছুটি নেওয়ার কতটা সুবিধা আছে, ইত্যাদি৷ সুতরাং আপনার অফিস, স্ত্রীর অফিস/ সংসার, বাচ্চাদের স্কুল/ পরীক্ষা/ টিউশন, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে আপনাকে বড় ট্যুরটা ঠিক করতে হবে৷ কারণ বেড়াতে হবে পুরো মুক্তমনে, ওই সময় অফিসের বস, বাড়ির কাজের লোক বা ছেলেমেয়ের ক্লাসটিচার কোনোভাবেই যেন আপনাদের আনন্দধারায় ছোবল মারতে না পারে সেটা দেখা অত্যন্ত জরুরী৷ ছুটির অভাবে বা পরিবারের সবাইয়ের নিজ নিজ রুটিনের সাথে অসমঞ্জসতার কারণে অনেকেই আমরা দূর্গা পূজোর সময়টাই বড় ট্যুরের জন্য বরাদ্দ করি৷ পঞ্চমীর দিন বেরিয়ে পড়ি, তারপর হয়তো কোনো নির্জন পাহাড়ি স্টেশনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী কাটাই, অনেকক্ষেত্রে সেই সব জায়গার শত কিলোমিটারের মধ্যেও পূজোর ঢাক, ঢোল, কাঁসর -ঘণ্টার আওয়াজ পৌঁছয়না৷ তবুও নিরুপায় হয়ে ওই সময়ই বেরোতে হয়৷ অনেকে অবিশ্যি পূজোর সময় কোলকাতার ভিড়-ভাট্টা, হৈ-হুল্লোড় থেকে পালিয়ে বাঁচেন; কিন্তু তাদেরও নীল সমুদ্র, ধূসর দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়, সবুজ ঘন জঙ্গল বা আদিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির সামনে দাঁড়িয়ে কোলকাতার পূজো বা নিজের পাড়ার দূর্গা প্রতিমার মুখটা ক্ষণিকের জন্য মনে পরে মনটা একটু উদাস হয়ে যায়৷ যাই হোক কি আর করা !

     

আবার ফিরে আসি ক্যালেন্ডারে, এবার মন দিয়ে দেখুন আপনি ঠিক আরও দুয়েকটা সময় খুঁজে পাবেন যখন সরকারি ছুটি, তার সাথে শনি-রবি আর দুয়েকটা সিএল মিলমিশে চার-পাঁচ দিনের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে৷ ওই সময়গুলোয় বেরিয়ে পড়ুন ছোটো ট্যুরে৷ বড় ট্যুরে আসল ব্যাপারটা হল গন্তব্য৷ সেটা সবাই মিলে ঠিক করার পর অবশ্যই চার মাস আগে ট্রেনের টিকিট কেটে নিন, আর যারা আকাশপথে ভ্রমণে উত্সাহী তারা তো যত আগে টিকিট কাটবেন ততই লাভবান হবেন৷ অনেকক্ষেত্রে ঠিক সময়মতো কাটতে পারলে আপনি ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর ভাড়ার টাকায় প্লেনের টিকিট পেয়ে যাবেন৷ তারপর ধীরে সুস্থে হোটেলের খোঁজখবর আর বুকিং সারা হয়ে গেলে দেখবেন মনের মধ্যে টুং টাং সুরে সেতার-সরোদ বেজে চলেছে৷ দিন যত এগিয়ে আসবে তত দেখবেন বেহালার সুরের এক মন ভালো করা মূর্ছনা আপনাকে ভালোলাগা আর ভালোবাসার মোমে গলিয়ে দিচ্ছে, পরিবার-পরিজন সবাইকে বেশি বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে৷ বেঁচে থাকাটা ভীষণ অর্থবহ মনে হবে৷ এটাই ভ্রমণের সার্থকতা, মাদকতা, জলুষ৷

       

আপনি কিন্তু ছোটো ভ্রমণগুলোকে মোটেই 'দুধেভাতে' ধরবেন না৷ বহু কষ্টে পাওয়া এই অবসরটা পরিবারের সবাই মিলে কতটা উপভোগ্য করে তুলতে পারেন সে ব্যাপারে অবশ্যই যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে বেরিয়ে পড়ুন৷ ভ্রমন আমাদের একঘেয়ে দৈনন্দিনতায় মুক্ত অক্সিজেনের যোগান দেয়৷ তাই আমাদের জীবনে আর পাঁচটা জিনিসের মতো এটাও খুব জরুরী৷ এখানে চারটে কাছাকাছি ভ্রমণের সুলুকসন্ধান দিলাম, আশাকরি ভালো লাগবে৷

 

Difficult roads often lead to beautiful destinations – Zig Ziglar

 

১. লাটপাঞ্চ: শিলিগুড়ি থেকে সেবক হয়ে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে কালিঝোরা, ওখান থেকে বাঁদিকের মোরামের রাস্তা ধরে তের কিলোমিটারের মত এগিয়ে গেলে পৌঁছে যাবেন মহানন্দা অভয়ারন্যের একদম মাথায় অবস্থিত, লাটপাঞ্চর গ্রামে৷ পক্ষী প্রেমিকদের স্বর্গোদ্যান বলা চলে৷    অনেক রকমের পাখির দেখা মেলে লাটপাঞ্চরে - রেড হেডেড ট্রোগোন, স্কারলেট মিনিভেট, গ্রে বুশচ্যাট, দূর্লভ প্রজাতির রুফাস নেকড হর্নবিল, ইত্যাদি৷ এছাড়া প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায় - মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল এবং স্যালামান্ডার৷ এখানে প্রকৃতি তার নিজের মতো সেজেছে, একজন প্রকৃতিপ্রেমিক হিসেবে আপনার জায়গাটা ভালো লাগবেই লাগবে৷ তবে ৪৫০০ ফিট উচ্চতার লাটপাঞ্চরে শীতকালে যাওয়াটাই বেশি ভালো৷ 

 

কি দেখবেন:

 

ক) পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে, পাইন, ধুপি আরও অনেক পাহাড়ি গাছের সাথে আলাপচারিতা সারতে সারতে এগিয়ে চলুন তিন কিলোমিটার দূরে সানরাইজ পয়েন্ট - যেখান থেকে সকালের আনকোরা অচেনা আলোয় দেখুন মাথার ওপরে কাঞ্চনজঙ্ঘার ধবল বিস্তার আর নীচে অপরূপা তিস্তা যেন সবুজ আঁচল বিছিয়েছে গৈরিক প্রেক্ষাপটে৷

খ) ছোটো ট্রেকে ঘুরে আসা যায় - মানা হিলসের চূড়া, লাটকোঠি বা নামথিং পোখরি৷

থাকবেন: হর্নবিল নেস্ট হোম স্টে: ০৮৯২৬০-১৫৪৭৭/০৯৪৭৫৯-৫৯৯৭৪

 

 I am not the same, having seen the moon shine on the other side of the world--- Mary Anne Radmacher.

 

২. রেশিখোলা: এখানে পৌঁছতে গেলে কালিম্পং হয়ে আসতে হবে, কালিম্পং থেকে রাস্তা গেছে আলগাড়া, আলগাড়া পেরিয়ে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়েছে৷ একটা গেছে লাভার দিকে আরেকটা রেশি নদীকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চলতে ঢুকে গেছে পূর্ব সিকিমে৷ সবুজ চঞ্চল এই কিশোরী রেশি নদীর পারেই পশ্চিমবঙ্গের শেষ গ্রাম রেশি৷ পাহাড়ি ভাষায় 'খোলা' শব্দের অর্থ ছোটো নদী৷ এই শান্ত, সুন্দর, সমাহিত পাহাড়ি গ্রাম জঙ্গম জীবন থেকে পালিয়ে দুয়েকদিনের অবকাশ যাপনের আদর্শ ঠিকানা৷ নেচার ক্যাম্পে বসে বসেই দেখা মিলবে নানা প্রজাতির ফুল আর পাখি৷

কি দেখবেন:

 

ক) প্রকৃতি-প্রকৃতি-আর প্রকৃতি;

খ) পূর্ব সিকিমের আরিতার (লামপাখরি) লেক;

গ) সিল্করুটের যাবতীয় দ্রষ্টব্যসমূহ৷

থাকবেন: রেশি রিভার রিট্রিট: ৮১৪৫৫-৮৪২৮৬; ৯৪৩৪৮-৬০৬০৪

রেশি নেচার ক্যাম্প: ৯৮৩৬৯-৫৫১৮৬; ৯৮৩০৪-৯৩৩৬২; ৯৮৩০৯-৪৭৩৫২; ৯৮৩০৭-৮৮৪০৩

 

Travelling- it leaves you speechless, then turns you into a storyteller -- Ibn Battuta.

 

৩. কালিজ ভ্যালি: পাখি দেখার আরেক স্বর্গরাজ্য, পর্যটন মানচিত্রে বেশ নতুন সংযোজন হলেও ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তায় আকাশেছোঁয়া৷

   এখানে পৌঁছতে আপনাকে ধরতে হবে দার্জিলিং যাবার রাস্তা; টুং, সোনাদা পেরিয়ে টয়ট্রেনের রাস্তা ছুঁয়ে পথ চলে গেছে সবুজ সুন্দর পাহাড়ি গাঁও রংবুল৷ সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন এক চা বাগানের অন্দরে৷ পাহাড়ের অন্য ঢালে চোখে পড়বে ছবির মতো সাজানো কতকগুলো কটেজ - ওটাই কালিজ ভ্যালি৷

ওখানে পৌঁছবার পরপরই আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে একাধিক পাখির কলকাকলি - কোকিল, হোয়াইট ক্যাপড ওয়াটার রেডস্টার্ট, এছাড়া আছে সিবিয়া, হোয়াইট ব্রাওড শ্রাইক ব্যবলার, গ্রেট বার্বেট, ড্রঙ্গো, বুলবুলি, কালিজ ফেজান্ট ইত্যাদ৷

দেখে নিন: রেনবো ফলস - টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে অনেকটা হাঁটতে হয়৷ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে পায়ে পায়ে আধ ঘন্টা-চল্লিশ মিনিটে পৌঁছে যাবেন কাঙ্খিত জায়গায়, যেখান থেকে দেখতে পাবেন দুটি পৃথক ধারায় প্রায় ৮০ ফিট ওপর থেকে প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাহাড়ি জলধারা৷ নিচে তৈরি হয়েছে এক জলাধার আর সেই জলাধারে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি হচ্ছে এক রামধনু৷ এর থেকেই নাম হয়েছে রেনবো ফলস৷

থাকবেন: রেনবো ভ্যালি রিসর্ট – ৯৮৩২৬-১৬৯৭০/ ৯০০৭০-০৯০৬১

 

We travel, some of us forever, to seek other places, other lives, other souls --Anais Nin.

৪. লামাহাটা: পর্যটন মানচিত্রে একদম নবীন সদস্য লামাহাটা শিলিগুড়ি থেকে ৭২ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত, দার্জিলিং থেকে দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার৷ একটি আধা প্রাকৃতিক আধা কৃত্রিম পার্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লামাহাটা ইকো ভিলেজ৷ এখানে একটাই সমস্যা মূল রাস্তা ছাড়া আর কোনো অ্যাপ্রোচ রোড না থাকার কারণে আপনি নিজের মতো করে ঘুরে বেড়াতে পারবেন না; আর মূলরাস্তার শিলিগুড়ির সাথে যোগসূত্র থাকার কারণে মুহুর্মুহু প্রচন্ড গতিতে দুদিক থেকেই গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তায় বেরিয়ে আপনাকে খুব সচেতন থাকতে হবে৷

     

গাড়ির আওয়াজ বাদ দিলে গোটা লামাহাটা জুড়ে অপার শান্তি বিরাজ করে৷ আকাশছোঁয়া দেওদার, পাইন, ধুপিবন জুড়ে সারাটা দিন সূর্যদেব আলোছায়ার খেলা খেলে চলে৷ আর মেঘমুক্ত আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার রজতকান্তি উপস্হিতি আপনাকে মুগ্ধ করবে I

দেখবেন: ক) মূল দ্রষ্টব্য লামাহাটা ইকো পার্ক; টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে কয়েক ঘন্টা আনন্দ সময় কেটে যাবে, খুব যত্নে সাজানো এই পার্ক৷ চতুর্দিকে ফুলের সমারোহ, বসার সুন্দর ব্যবস্থা, ওয়াচটাওয়ার আছে একটা - সেখান থেকে পাখির চোখে পার্কের বেশ কিছুটা অংশ আর লামাহাটা গ্রামটি দেখে নেওয়া যায়৷ কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে চড়াই পথে জঙ্গল ভেঙ্গে এগিয়ে চলুন পাহাড়ের  ওপরে, একদম ওপরে আছে একটি ছোটো লেক, চলার পথে বিশ্রাম নেবার জন্যে বাঁশের আর কাঠের বেঞ্চি তৈরি করা আছে৷ হালকা চড়াই, ধীরে ধীরে পৌঁছে যাবেন৷ ওপরে উঠে পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্ত দেখতে ভালো লাগবে৷ লেকের জল শেষ সূর্যের অস্তাভা সিঁদুর রঙে রেঙে দিন শেষের বার্তা ঘোষণা করবে- অন্ধকার ঘন হবার আগেই ধীরে ধীরে নেমে আসুন৷

খ) এখান থেকে ঘুরে নিতে পারেন তিনচুলে, চাকদার দ্রষ্টব্য জায়গাগুলো;

গ) একটা মনাস্ট্রি আছে, লামাহাটা থেকে একটু দূরে I

থাকবেন: ক) এভারেষ্ট হাট হোম স্টে: ৯৪৩৪৮-৬৫৬১১/৯৮৩০১-৫২১৬৯

খ) লামাহাটা লজ: ৯৮৩২৫-২০১৬৫; ৯৪৩৪১-৩০৭০৪; ৯৮৩২০-৩৩৪৪৪

গ) মাউণ্টেন ভিউ হোমস্টে: ৯৬৭৪৯-৭৩৯৭৭; ৯৭৪৮৩-৯৭৭৭৭; ৮৭৭৭৮-০৮০৯৫

 

For my part, I travel not to go anywhere, but to go; I travel for travel’s sake. The great affair is to move - Robert Louis Stevenson.

 

লামাহাটা ব্যতীত অন্য ছবিগুলি সংগৃহীত৷

ads

Mailing List