চোখে জোছনা / অণুগল্প

চোখে জোছনা / অণুগল্প
16 Aug 2020, 10:59 AM

চোখে জোছনা

বিমল মণ্ডল

 

ভাঙা মাটির দেওয়াল। খোলা আকাশের নীচে ৩২ বছরের মহিলাটি গালে হাত দিয়ে বসে আছে। গতরাতের ঝড়ে ঝুপড়িটা উড়ে গেছে। সকাল থেকে বৃষ্টি। থাকার জায়গা নেই। ১২/১৩ বছরের মেয়েটি কাঁদছে মায়ের কাছে বসে।

মহিলার স্বামী দীপক বাবু পেশায় রাজমিস্ত্রী। বছরের প্রায়ই দিনই উড়িষ্যা, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদে কাজে চলে যায়। সংসারে স্ত্রী আর একটা মেয়ে। অভাবের সংসার মোটামুটি টেনেটুনে চলে। দীপকের স্ত্রী দুটো গরু, কয়েকটি মুরগী পালন করে কোনও মতে সংসারটাকে দাঁড় করিয়েছে।

হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা হওয়ায় দীপক হায়দ্রাবাদে আটকে। কাজ বন্ধ। হাতে টাকা নেই দীপকের। খুব অসুবিধার মধ্যে দীপক দিন কাটায়। স্ত্রী ও মেয়ের সাথে ফোনে কথা হয়। স্ত্রী অভয় দেয়,

- সংসারের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না এখন। আমি যেমন-তেমন চালিয়ে নিতে পারব। তুমি সাবধানে থেকো।

দীপক স্ত্রী কথা শোনার সময় দু’চোখ দিয়ে জল গড়ায়। স্ত্রীকে বলে -

- আর কতদিন এমন ভাবে এখানে থাকি বলো। তোমাদের এতদিন ছেড়ে তো এভাবে থাকি না। তাই মনমেজাজ ভালো নেই।

ফোনে কেমন যেন দু'জনের কথা হতে থাকে। যেন সদ্য পরিচিত কারও সঙ্গে প্রেমালাপ চলছে। দীপকের স্ত্রী হঠাৎ লজ্জা পেয়ে যায়। বলে -

- থাক এসব কথা। এখন ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে এসো দেখি।

 

ফোনের ওপার থেকে দীপক বলে, আমফান আসবে শুনেছো? বড়ো ঝড়। সাবধানে থেকো।

দীপকের স্ত্রী এই কথা শুনে হুহু করে কাঁদতে থাকে। ফোন কেটে যায়। দীপকের মেয়েটি ছুটে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে বলে -

- বাবা কবে আসবে মা?

মেয়ের কথায় উত্তর না। এড়িয়ে গিয়ে বলে -

-চল মা তোকে খেতে দিই।

ভাত বাড়তে বাড়তে বাইরে মাইকে ঘোষণা, আমফান ঝড় আসছে। সবাই সাবধানে থাকুন। বাড়ির বাইরে বেরোবেন না। মা-মেয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে মুরগীগুলো ঘরের মধ্যে রেখে গরুগুলোকে ছেড়ে দেয়। সন্ধে নামার আগেই ঝড়ের তাণ্ডব বাড়তে থাকে। কোনও রকমে মা মেয়ে পাশের একটা পাকা বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

গাছগুলো সব মড়মড় করে ভেঙে রাস্তায় পড়তে থাকে। উল্টে পড়ে বাতিস্তম্ভ। চাআরদিক অন্ধকার। অনেকের মতো দীপকেরও একটা গরু গাছ চাপা পড়ে। বাঁচানো যায়নি। দীপকের স্ত্রী কাঁদতে থাকে। গরুটির পেটে যে বাচ্চা ছিল। ঝড় বাড়তে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় মাটির বাড়িগুলো হুড়মুড়িয়ে ভাঙতে থাকে। ছাউনি উড়ে গিয়ে কোথায় যে পড়েছে কে খোঁজ নেবে এখন। আগে তো প্রাণ। গভীর রাত। ঝড় থামনেই চায় না। ঝড় যখন থামল, ততক্ষণে সব শ্মশানপুরী।

ভোর হয়। দীপকের স্ত্রী বাড়ির মধ্যে দেখে- খড়ের চাল উড়ে গেছে। মোরগগুলো নীরবে শেষ বারের মতো ঘুমোচ্ছে। গরুটিও একইভাবে শুয়ে। দীপকের স্ত্রী একরাশ চোখে জোছনা নিয়ে উন্মুক্ত বোবামুখে নিথর দেহে আকাশের দিকে তাকিয়ে...

Mailing List