অন্ধকারে আলো

অন্ধকারে আলো
21 Jun 2020, 10:47 AM

অন্ধকারে আলো

রবীন বসু

       

পাঁচদিন পর দেবী আজ জল ও মৃত্তিকায় শরীর ভেজালেন। অর্থাৎ নিরঞ্জন। এখন আর বিসর্জনে যেতে পারেন না তিনি। কোমরে হাঁটুতে ব্যথা। ছেলেমেয়েরা এই শহরে থাকলেও আলাদা ফ্ল্যাট। সুমিত্রাদেবী শ্বশুর মশাইয়ের করা পুরনো বাড়ি আগলে বসে আছেন। সাবেকি পারিবারিক পুজোর কটাদিন ছেলেমেয়েদের আসতে বলেন। তারা বলে, "এইসব পুজোটুজো এবার বন্ধ করো মা। শুধু শুধু খরচা।"

--"খরচ তো আমি তোমাদের কাছে থেকে নিই না।"

--"সেটা ঠিক। কিন্তু এই পুজোর ফ্যাচাঙে আমাদের বেড়াতে যাওয়া হয় না।"

মুখের ভাষা কি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সব ছেলে মেয়েরা প্রতি বছর থাকে না। নানা অজুহাতে এক বা একাধিক অনুপস্থিত থাকে। ব্যতিক্রম এ বছর। সবাই এসেছে।

একটু আগে ওদের ফেরার শব্দ পেয়েছেন তিনি।

দরজায় ঠক ঠক।

--"মা, আসব?" বড়ছেলে সৌমেনের গলা।

--"হ্যাঁ, এসো।"

শুধু বড় ছেলে না আরও দুই ছেলে, দুই মেয়ে ঘরে ঢুকল।

--"কী ব্যাপার! সবাই দল বেঁধে। কিছু বলবে?"

এবার মেজো ছেলে উদয়ন কথা বলল। --"তুমি কী ভাবলে, মা? বাড়ি প্রোমোটিংয়ের ব্যাপারে।"

--"না, প্রোমোটিং হবে না। আমি যতদিন বেঁচে আছি।"

ছোটছেলে শুভঙ্কর এগিয়ে এল। হাতে টাইপকরা কোর্ট পেপার। মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "তাহলে এই কাগজগুলোতে সই করে দাও।"

--"কিসের কাগজ?" সুমিত্রাদেবী জানতে চাইলেন।

--"ওই যে, বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি তোমার নামে ট্রান্সফার করা হয়নি। তাই মিউটেশনের জন্য কর্পোরেশনে জমা করতে হবে।"

সুমিত্রাদেবী চশমা খুঁজলেন, হাতের কাছে পেলেন না। ক'দিন পুজোর খাটাখটনিতে ঘাড় ও মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। কাগজগুলো চোখের সামনে তুলে ধরলেন। ঝাপসা। ছোট ছেলে পেন গুঁজে দিল মায়ের হাতে।

--"এই নাও, এই জায়গা গুলোতেও সই করো।"

পেন ধরা হাত কাঁপছে। অকস্মাৎ ছন্দপতন।

--"না ঠাম্মি, তুমি সই করবে না।" একছুটে  ঘরে ঢুকল বারো বছরের তুতুল। সৌমেনের একমাত্র ছেলে। ঠাম্মির হাত থেকে পেন কেড়ে নিল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "জানো ঠাম্মি, বাবা কাকাই পিসিরা সব প্ল্যান করেছে, মিথ্যে বলে তোমার থেকে বাড়ি লিখে নেবে। তারপর তোমাকে ওল্ডেজ হোমে রেখে আসবে।"

সুমিত্রাদেবী হতবাক। নিজের ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকান। আর একবার নাতির মুখের দিকে। অবিশ্বাসের ঘোর অন্ধকারেও একটু আশার আলো দেখতে পেলেন।

Mailing List