বাঙালির হাওয়া বদলের শিমুলতলা যেন মিনি সিমলা, পাহাড়-জলপ্রপাত সব হাজির

বাঙালির হাওয়া বদলের শিমুলতলা যেন মিনি সিমলা, পাহাড়-জলপ্রপাত সব হাজির
22 Sep 2022, 10:00 AM

বাঙালির হাওয়া বদলের শিমুলতলা যেন মিনি সিমলা, পাহাড়-জলপ্রপাত সব হাজির

 

ড. সুবীর মন্ডল

 

কাছেপিঠে বেড়ানোর প্রসঙ্গ উঠলেই এখন ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপ কিম্বা অন্তর্জাল এর সৌজন্যে একটা মাউস ক্লিক করলেই হাজারটা অপশন হাজির। আমার অবশ্য বেশ কয়েকবার ঘোরা জায়গা ঝাড়খণ্ডের আশপাশের বহু এলাকা, ঝাড়খণ্ড আর উড়িষ্যা আমার অত্যন্ত প্রিয়। সময়ের হাত ধরেই বারবার চলে আসি এখানকার প্রান্তভূমির সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঝাড়খণ্ডের মনোমুগ্ধকর মন্দির দর্শন করার পর চললাম শিমুলতলার আর মধুপুরে। এখানকার সোনালী ইতিহাস খোঁজার জন্য মন কেমন করত। তাই চলে এলাম  শিমুলতলার জনজীবনের প্রাণের মানুষ জনের সঙ্গে পরিচয় করতে।

বাঙালির পশ্চিম বলতে মূলত বোঝানো হতো, বর্তমান ঝাড়খণ্ডের মধুপুর, দেওঘর, গিরিডি, শিমুলতলা, জসিদি, মুঙ্গের, ভাগলপুর, দুমকা, রাঁচি, হাজারিবাগ প্রভৃতি জায়গাকে। একটা সময় বাঙালিরা হাওয়া বদলের জন্য প্রায়শই পশ্চিমে যেত চিকিৎসকদের পরামর্শে। শরীরে রোগ বাসা বাঁধলেই পশ্চিমে যেতে হবে হাওয়া বদলের জন্য, এমনটা মোটেও নয়। যন্ত্র সভ্যতার জাঁতাকলে ঘষা খেতে খেতে হাঁপিয়ে ওঠার ঠিক আগে নিজেকে সতেজ আর প্রাণবন্ত করে তোলার সবথেকে সেরা উপায় ব্যাগপত্তর গুটিয়ে বেরিয়ে পড়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বনফুল- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ, সুনির্মল বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, নলিনিরঞ্জন সরকার প্রমুখরা জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন এইসব এলাকায়।

পরবর্তীকালে সত্যজিত রায়-র ‘মহাপুরুষ’ কিম্বা তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’, ‘ভালবাসা ভালবাসা’ প্রভৃতি সিনেমার শুটিং হয়েছে শিমুলতলার বিভিন্ন এলাকায়। একসময় অসংখ্য বাঙালি পুজো বা শীতের ছুটিতে ভিড় জমাতো এই তথাকথিত ‘বাঙালির পশ্চিমে’ ।  এখন পুজোর সময়ে দুলক্ষ মানুষ আসে বললেন রিসর্টের মালিক। এক সময় অনেকেই আবার বাড়িও বানিয়ে রেখেছিলেন ইচ্ছামত ছুটি কাটাতে আসার জন্য। মধুপুরের বাহান্ন বিঘা এলাকার লীলাকমল গেস্ট হাউস। এই অঞ্চলটি মূলত বাঙালি পাড়া। একটা সময় মধুপুরে চাকরি করা রেলকর্মীরা এখানে বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন স্টেশনের আশেপাশে। আর পয়সাওয়ালা জমিদার শ্রেণীর লোকজনও বিশাল বিশাল বাংলো বাড়ি বানিয়ে রেখেছিলেন ছুটি কাটানোর জন্য, কখনও বা বাইজি নিয়ে এসে নাচগান এর আসর বসানোর জন্য । এখনও শুধুই সব অতীতের কথকতা। প্রথম দিন  মধুবন, তোপচাঁচি, গিরিডি ঘুরে রাতে দেওঘরের ভারত সেবাশ্রম সংঘে ছিলাম। পরিকল্পনা ছিল  এখান থেকেই শিমুলতলা ঘুরব।

গতকাল দেওঘরের বৈদ্যনাথ ধাম ও সৎসঙ্গ দর্শন করে চললাম  শিমুলতলার অতীত ইতিহাস অন্বেষণে। ঝাড়খণ্ডের মনোমুগ্ধকর মন্দির ও  রাস্তার দুপাশের কাশফুলের  মনোমুগ্ধকর দৃশ্য বহুদিন মনের মণিকোঠায় অমলিন  হয়ে থাকবে  হয়ত। ঝাড়খণ্ডের ৩৬ শতাংশ বনভূমি। সেই কারণেই সবুজের সমারোহ।

  শিমুলতলার যাওয়ার পথেই দেখলাম হলদী ফলস বা স্থানীয়দের ভাষায় ঝাজোয়া ফলস। খুব সুন্দর। পাহাড়ী হলদী নদী, বন জঙ্গল পাহাড় ভেদ করে বয়ে চলেছে। শুনলাম এক সময়ের মাওবাদীদের আঁতুড়ঘর ছিল। ঝাড়খণ্ডের স্বপ্নের মসৃণ পথ অতিক্রম করে আমরা চলেছি বিহারের সীমান্তে। একটু দূরে ভাগলপুর, সুলতান গঞ্জ।বিভিন্ন জনপদগুলি অতিক্রম করলাম। বিহারের গ্রামীণ জীবনের কোলাহলমুক্ত পরিবেশ বেশ ভালোই লাগল। দুই রাজ্যের রাস্তার গুণগত মান অত্যন্ত ভাল। কোথাও পুলিশের হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়নি।দেওঘর থেকে শিমুলতলার দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। অবশেষে একঘন্টার মধ্যেই পৌঁছলাম বহুদিনের স্বপ্নের শিমুলতলায়। এ-এক অন্যভুবন। পুজোর চারদিন এক লক্ষের বেশী বাঙালির স্বপ্ন পূরণের আদর্শ ঠিখানা। সেই অর্থে শিমুলতলার আধুনিকতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি। সবুজ জঙ্গলের বুক জুড়েই বাঙালীর এক সময়ের ভগ্ন বাংলোবাড়ি বাড়ি গুলি মাথাতুলে দাঁড়িয়ে প্রহরীর মত।  

আমাদের গন্তব্যস্হল শিমুলতলার রেল স্টেশন। স্টেশনের বাঁ দিকে বুকে চললাম জলপ্রপাত ধারার ও লাট্টু পাহাড়ের দিকে। লাট্টু পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র দু কিমি আর ধারার জলপ্রপাতের দূরত্ব মাত্র বার কিলোমিটার। পথে পড়ল অসংখ্য বাগান বাড়ি। এক সময়ে বাঙালি কলোনি ছিল, তার নিদর্শন পেলাম। ইতিমধ্যেই খুব ক্ষিদে পেল। ঘড়ি জানান দিচ্ছে দুপুর একটা। গাড়ি নিয়ে অন্যা রিসোর্টের অন্দরমহলে প্রবেশ করলাম অসাধারণ একটি রিসোর্ট। কুড়ি বিঘে আম বাগানের উপর নির্মিত অসাধারণ আধুনিক নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার এই রিসোর্ট। ম্যানেজার বললেন, এই জায়গাটির মালিক ছিলেন এক বাঙালি। বর্তমানে এলাকার এক খৃষ্টান এই রিসোর্টের  মালিক। আম বাগানকে ডাইনিং হিসাবে ব্যবহার করার আয়োজন দেখলাম। সমস্ত বাগান জুড়েই সবুজের সমুদ্র। এই রকম পরিবেশে রাজকীয় খাওয়ার আয়োজন কোন দিন ভোলার নয়। ভেজ/নজভেজের থালা আকর্ষণীয়। দুপুরের খাবার পর্ব সারলাম অনেটাই রাজার মতোই। এখানকার গ্রামীণ প্রকৃতি এক কথায় অতুলনীয়।এখানকার গ্রামীণ মানুষ আর সবুজ প্রকৃতির অযাচিত উষ্ণ ভালোবাসা বড় প্রাপ্তি। স্বাস্থ্যকর মনোরম আবহাওয়ার স্বাদ পেলাম কদিন। যা খেয়েছি তা মুহুর্তের মধ্যেই হজম হয়েছে। আমার ৫৫ বয়সেও এত পরিমাণ খেলাম, তা বিস্ময়কর। পেটের কোন গোলমাল হয়নি। ঘুরেছি ৯০০কিলোমিটার। জল তুলনাহীন। বিভিন্ন বিখ্যাত বাঙালির   জনপ্রিয় বাংলো বাড়ি ও বাগান গুলি  দেখতে শুরু করলাম। শুধুই মুগ্ধতার আবেশ। অতীত ইতিহাসের নীরব রহস্য রোমাঞ্চকর সাক্ষী আজকের শিমুলতলা।

  এরপর আমরা রামকৃষ্ণ-সারদা মঠ, লাট্টু পাহাড় আর রাজবাড়ী দেখে যখন শিমুলতলা পৌছলাম, ততক্ষনে সূর্য হেলে এসেছে, প্রায় বিকেল হওয়ার পথে। চারপাশের মাঠ ঘাট পাহাড়ে পড়েছে শরতের বিকেলের মিঠে রোদের প্রলেপ। আহা, বড় ভাল জায়গা। "টিলা টিলা পাহাড়, আর ভিলা ভিলা শিমূলতলা"- কৈশোর থেকে এই প্রবাদ শুনে আসছি। এইবার নিজের চোখেই দেখলাম। এখানে সময় যেন থমকে রয়েছে আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বে, সেই ইংরেজ আমলে। চারপাশ ফাঁকা, দূরে রুক্ষ অনুচ্চ টিলা, মাঝে মাঝে সবুজের হাতছানি আর কিছুদূর হেঁটে গেলেই একটা করে সেকালের জমিদারদের কুঠিবাড়ী। কোনটার বয়স একশো, দেড়শো বা দুশো। আমরা এরকমই একটা কুঠিতে উঠেছিলাম অন্যা, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ অনন্য। সংস্কার করে বর্তমানে এটি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। আশে পাশের মানুষ জনের সাথে কথা বলে জানলাম যে একসময় এই গোটা শিমূলতলার প্রায় সমস্ত জমিই ছিল বাঙালী দের হাতে। নয় নয় করে ছিল অন্তত সাড়ে পাঁচশো কুঠি। কিন্তু আজ আর সেই দিন নেই। বাঙালি আর আসে না শিমূলতলায় সেভাবে। কুঠিবাড়ী গুলির অধিকাংশই হয় ভেঙে পড়েছে নয় বিক্রি হয়ে গেছে। আজকের এই ভাঙাচোরা বাড়ীগুলির ধ্বংসাবশেষ বহন করছে আমাদের বাঙালী জাতির এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। খাবার দাবারের মধ্যে বলতেই হয় সন্ধের ক্যাম্প ফায়ারের চিকেন রোস্ট আর রাতে আমাদের পাচকের হাতে রাঁধা গরম গরম বন মুরগীর ঝোল ভাতের কথা। সে এক অসাধারণ স্বাদ। এছাড়াও কুঠির কেয়ার টেকার কে একটু ঘুষ-ঘাশ দিয়ে মিলে যেতে পারে স্থানীয় আদিবাসীদের বানানো মহুয়া।

শিমূলতলায় একরাত থেকে পরদিন সকালে  আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল বাঙালী চেঞ্জার বাবুদের আদি পীঠস্থান মধুপুর। আমরা উঠলাম বাহান্ন বিঘা অঞ্চলে মুকুল বোসের 'লীলা কমল' গেস্ট হাউসে। লোকজনের মুখে শুনেছিলাম সেকালে নাকি বাহান্ন বিঘা অঞ্চলটি এতই সুন্দর ছিল যে একে বলা হত - "ভারতের হল্যান্ড"। কিন্তু বর্তমানে দেখলাম নগর সভ্যতার অভিশাপে গাছপালা অধিকাংশই কাটা পড়েছে। রকমারী বাহারী ফুল আর গোলাপ বাগান গুলিও সেভাবে নেই আর। দৃষ্টিসীমাকে দূরে প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দিচ্ছে ইতি উতি গজিয়ে ওঠা নতুন বাড়ী-ঘরদোর। সব মিলিয়ে মধুপুরের সেই চার্মটা কোথাও যেন মিসিং। তবে ওল্ড মধুপুর শহরটা পায়ে হেঁটে বা টোটোয় চেপে ঘুরতে এখনো ভালই লাগল। রাস্তার ধারে পর পর দেখতে পাওয়া যায় পুরোনো কুঠিবাড়ী গুলি। এর মধ্যে কিছু ভেঙে পড়ছে আবার কিছু এখনো বাসযোগ্য রয়েছে। কুঠি সোনার বাংলা, জাহাজ বাড়ী, শেঠদের কুঠি, হরেন মুখোপাধ্যায়ের বাড়ী স্বস্তিকা, লাল কুঠি ও সংলগ্ন মন্দির এবং মধুপুর চার্চ ঘুরে দেখা যেতে পারে। এছাড়াও দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো পাথরোল কালীবাড়ি। বাজারের মধ্যে হঠাৎ দেখলাম সিমেন্টে বাঁধানো এক বিরাট পাতকুয়ো। নাম ডালমিয়া কূপ। এলাকার মানুষের কাছে জানা গেল এর জল নাকি হজমের জন্য এতই ভাল ছিল যে এককালে বড় বড় জালায় ভরে জনতা এক্সপ্রেসে চাপিয়ে কোলকাতায় সেই জল সরবরাহ করা হত। এখন আর সেই দিন নেই, ডালমিয়া কূপের জল এখন আর কোলকাতায় আসেনা। কোলকাতায় এখন প্যাকেজড্ ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের রমরমা। পাথরোলের কাছে, সন্ধেবেলা লালু যাদবের চায়ের দোকানে এক অসাধারন পোড়া দুধের চা খেলাম। অদ্ভুত ভাল তার স্বাদ। শুনলাম সারা রাত ধরে মাটির হাঁড়িতে জ্বাল দেওয়া হয় খাঁটি গরুর দুধ, আর সেই ঘন দুধের চা খেতে ভিড় জমাতেন এক সময়ের স্থানীয় রেলের বাবু থেকে শুরু করে ডাক্তার, বদ্যি, স্কুল মাস্টার, ব্যাবসায়ী, মোটর মেকানিক, কলের মিস্ত্রি সবাই। স্থানীয় মানুষজনের সাথে কথা বলছিলাম। প্রচুর বাঙালী আজও এখানে থাকে। এদের পূর্বপুরুষরা মূলত রেলের চাকরির সুবাদে মধুপুরে এসেছিলেন এবং অনেকেই আর ফিরে যাননি। সকলের কথাতেই পেলাম এক অভিমানী সুর, বাঙালী আজ পশ্চিম থেকে মুখ ফিরিয়েছে, 'চেঞ্জার বাবু' রা এখন 'Changed', আর আসেন না সে রকম কেউ।

ভোর রাতে  শিমুলতলায়  ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। কান পাতলে শোনা যায় ট্রেনের লম্বা ভোঁ। সক্কাল সক্কাল বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে, চায়ের দোকানে আড্ডা জমাতেন এক সময়ের জনৈক বোস, রায়, মুখোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় বা চক্রবর্তী বাবুরা। খোঁজ নেন নতুন পোস্টিং পাওয়া বাঙালী স্টেশান মাস্টারটি বিবাহিত না অবিবাহিত। সময় বয়ে চলে, শিমুলতলা আর মধুপুর দাঁড়িয়ে থাকে শিমুলতলার আর মধুপুরেই।

লেখক: শিক্ষক

Mailing List