যৌনতার নিশি সুর / গল্প

যৌনতার নিশি সুর / গল্প
19 Jun 2022, 01:00 PM

যৌনতার নিশি সুর

 

সুমন ঘোষ

 

‘লেটস গো।’

কাঁধে ক্যামেরাটা ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর সুখময় বোস। সবে তখন চায়ের কাপে বড় জোর খান দুয়েক চুমুক মেরেছে প্রবাল। তবু কাপটা ঠক করে রেখে উঠে দাঁড়ালো বাধ্য ছাত্র। সেদিকে দৃষ্টি গেল না প্রফেসর বোসের। আসলে মনটা তখন উড়ুউড়ু। যাকে বলে জংলি।

 

না, এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। মন উড়লে সব দিনই এমন স্বভাব তাঁর। সব কিছুই নিমেষে ভুলে যান। টি টেবিলে রাখা খবরের কাগজগুলো থেকে আজই তো তিনটে ধর্ষণের খবর। তখনও ছ’পাতা শেষ হয়নি। বাকি পাতাগুলো শেষ করলে সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে? এক অদ্ভূত জগৎ। দু’টি নাকি খিদে। একটি পেটের। আর একটি যৌনতার।

যৌনপল্লিতে কে কার ঘরে ডাকবে রাস্তা থেকে লড়াই শুরু হয়। প্রেম ঘিরেও দ্বিকোন, ত্রিকোণ আরও কত কিছু। কত অঘটন।

এই তো সেদিনের ঘটনা। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের সুন্দরী সঞ্চয়িতা চাঁদপানা মুখের সমীরণের প্রেমে পড়ল। ক’দিন রবীন্দ্রনাথ। সমীরণ বহে...। বইতে বইতে চারচাকার থেকেও বেশি দামের মোটরবাইকে চড়ে হাওয়া। তারপর সঞ্চয়িতার আর খোঁজ মেলেনি। মেলেনি একটা ছেঁড়া পাতাও। থানায় একটা রিপোর্ট হয়েছিল। কয়েক লক্ষ টাকার বাইকটা মিলেছিল। টুকরো টুকরো। দুর্ঘটনায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল নাকি কারাও ভেঙেছিল, এখনও অজানা।

 

ভাবতে ভাবতে হনহনিয়ে বাড়ি থেকে সোজা লিফটের সামনে। পেছনে প্রবাল। তারপর হুস করে নিচে। তারপর গাড়ি স্টার্ট করতেই ছাত্র গাড়িতে উঠে বসল। এগিয়ে চলেছেন প্রফেসর বোস। পথই ছাত্রকে বুঝিয়ে দিলেন, শব্দটাই আসল। খেয়াল রেখো। কোনও শব্দ করা যাবে না। অথচ, সব শব্দ শুনতে হবে। শুধু কান খুলে নয়, মাথা খুলে।

শব্দ শুনতে হবে মাথা খুলে! মুচকি হাসলো ছাত্র।

না, স্যারকে বিরক্ত নয়। এখন গভীররাত। জঙ্গল লাগোয়া গ্রামে গাড়িটা রেখে এবার হাঁটার পালা। দু’চারটে জমি পেরোলেই জঙ্গল।

যতটা সম্ভব শুকনো পাতা এড়িয়ে সাবধানে পা ফেলে জঙ্গলের মধ্যে হাঁটছে দু’জনে। চলার শব্দও কেউ টের পায় না। ঝিঁঝিঁর ডাক, শুকনো পাতার ওপর পা ফেলার ঝুপ শব্দ। পাতা পড়ার ঝুপঝাপ বা কোনও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর চলে যাওয়া খড়খড় আওয়াজ। প্রকৃতির নিয়মেই।

 

হঠাৎ হঠাৎ থমকে দাঁড়াচ্ছেন প্রফেসর বোস। চোখ ঘুরছে লাটাইয়ের মতো। গাছের ডালে-পাতায়, পাতায়। কান খাড়া। না, সেই শব্দটার এখনও কো‌নও হদিশ নেই।

 

যে শব্দ দিয়েই বুঝতে হবে ঠিকানা। ঠিক বাসা নয়। কলোনী বলা ভালো। যেখানে অনেকের বাস। কলোনী থেকেই আসবে নিশি ডাক। এক নয়, একাধিক। অথচ, কী অদ্ভূত মিল। সবার ডাকের মধ্যেই করুণ, প্রগাঢ় আর্তি। সে আর্তি ভালোবাসার। যৌন মিলনের তীব্র আকাঙ্খার।

 

এ দেশে মেয়েরা এমন নাকি? অল্পবয়সী ছাত্র প্রশ্ন করে বসে।

প্রফেসর বোস ঠোঁটকাটা সন্দেহ নেই। কিন্তু শব্দ ব্যবহারে রুচিশীল। একটু সময় নিয়ে বললেন, তোমার কিন্তু ভুল হচ্ছে চিত্রকর।

ওটা প্রবালের পদবী। প্রবাল চিত্রকর। মেধাবী ছাত্র। থার্ড ইয়ার। বাবার ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু শুধু অর্থ রোজগার তার কাম্য, এখনও এ নেশা চাপেনি। কিছু করতে চায়। স্যারকে দেখে সেই ইচ্ছায় ছেদ তো পড়েইনি উল্টে বেড়েছে।

আত্মীয় পরিজন, বন্ধুবান্ধবরা এটাকে পাগলামিই বলে। বাবা গম্ভীর। কম কথা বলেন। কিন্তু কাজে নিরুৎসাহিত করেছেন এমন নয়। তবে একটা কথা মাঝে মধ্যেই মনে করিয়ে দেন, বাবা একটা কথা ভুলে যেও না। অর্থেরও কিন্তু প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণও দিতেন বড্ড কড়া। বলতেন, যে মধুসূদন টাকার নোটে সিগারেট খাওয়ার সাহস দেখাতেন, তাঁকেও কিন্তু টাকার জ‌ন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছিল। এটা ভুললে চলবে না, লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা। সোহাগ না করলে থাকে না।

 

না, এসব আর ভাববে না এখন। আজ যে ভীষণ বড় অ্যাডভেঞ্চার। খানিক বইয়ের পাতায় পড়া। খানিকটা স্যারের কাছে শোনা। গভীর রাতে নিজের দু’চোখ দিয়ে সেটাই দেখবে আজ। এ নাকি অদ্ভূত মিলন!

তাঁদের কাছে এটা চ্যালেঞ্জও বটে। এই ছবি প্রকাশ করতেই হবে। প্রকৃত চিত্রটা তুলে ধরতে হবে। যাতে সহজে ছাত্র-ছাত্রী-গবেষক সকলেই নিজের চোখে দেখতে পান। গাছের উপরেও উদ্দাম যৌনমিলন হতে পারে! সে মিলন আবার ভালোবাসার। অথচ, সেখানেও রয়েছে এক কঠিন লড়াই! পরবর্তী প্রজন্মকে রেখে যাওয়ার। অথচ, সে সংসারে গভীর রাতের অভিধানেও ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি তো দূর অস্ত, ইভটিজিংও নেই। অবাক লাগার বিষয় বৈকি। কিন্তু মুখের কথা কেউ মানবে কেন? প্রমাণ চাই, প্রমাণ।

আবার একটু থমকে দাঁড়ালেন প্রফেসর বোস। কান খাড়া। কিছুক্ষণপর ছাত্রের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, না, এটা নয়। এখনও নিশি ডাক আসেনি! তাহলে কী আজও বিফল মনোরথ হয়েই ফিরতে হবে চিত্রকর!

এর আগেও একাধিকবার এই অভিযানে গিয়েছেন। কিছু দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য মেলেনি তা নয়। কিন্তু তাতে আগ্রহ আরও বেড়েছে বৈ কমেনি।

এমন সময় ভরসা জোগালো ছাত্র। স্যার আর একটু দেখা যাক। এদিক সেদিক না ঘুরে বরং এক জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালে হয় না?

ছাত্রের কথাটা মনে ধরল প্রফেসর বোসের। একটা ঝোপের পাশে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। কান দু’টো খাড়া রেখে সেখানেই দাঁড়ালেন। মস্তিষ্ক দিয়ে মেপে নিতে চাইলেন গভীর রাতের জঙ্গলের চেহারাটা।

ভয় ভয় করেনি তা নয়। জঙ্গলে বিষধর সাপের আনাগোনা। দলমার দামালরাও এখন নিজেদের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে এই জঙ্গলকে। বন শুয়োরও আছে। বলা তো যায় না, রাতে কোত্থেকে কে এসে হাজির হয়। হাতির চেহারা ভারী হলেও চলার শব্দ সহজে কানে ঢোকে না। ফলে কখন যে চোখের সামনে বা চোখ ফেরালেই পিছনে মূর্তিমান গজরাজের দেখা মিলবে কে বলতে পারে। গাঢ় অন্ধকারে দৃশ্যমানতাও তো বড্ড কম।

ভাবনার সঙ্গে দুশ্চিন্তা বাড়ে। আরও একবার ভালো করে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেন প্রফেসর বোস। ঠিক এমন সময়ই কানে আসে, টেঁ-টেঁ-টেঁ।

চেঁ-চেঁ-চেঁ। সিঁসিঁসিঁ।

আঁডিঁআঁডিঁআঁডিঁ। টিঁইঁটিঁইঁটিঁইঁ।

হ্যাঁ, এটাই। এটাই তো। এই শব্দটার জন্যই তো এত ঝুঁকি নিয়ে রাতের জঙ্গলে আসা। বিশ্বজয়ের আনন্দ প্রফেসর বোসের মুখে। তড়িৎ গতিতে ছাত্রকে বললেন, স্টেডি। ক্যামেরাটা দ্রুত রেডি করো। যতটা সম্ভব ম্যাক্সিমাম ছবি তুলতে হবে। পরে এডিট করে নেব।

 

ট্রাইপডে ক্যামেরাটা আগে থেকেই বসানো ছিল। ক্যামেরাটা ঠিক আছে কিনা দেখার জন্য লেন্সে চোখ রাখতেই হাসি উধাও।

ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো সন্তর্পণে বললেন, স্যার, গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে কিছুই যে দেখা যাচ্ছে না! চারদিক কালো আর কালো।

প্রফেসর পড়াশোনা ও গবেষণায় দক্ষ হলেও ক্যামেরা সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে দক্ষ ছিলেন না। ফলে নাইট ভিশন ক্যামেরা বা অন্যান্য সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তার কথা একটি বারের জন্যও মাথায় আসেনি। তাহলে উপায়?

 

প্রফেসর বোস একটু ভাবলেন। তারপর ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেললেন। এছাড়া উপায়ই বা কী? ঠোঁট নাড়ার শব্দের মতো কিছু একটা বললেন। বাতাস সেই হতাশার সুর ঠেলে নিয়ে গেল ছাত্রের কানে। ছাত্র তখন অতি সামান্য আলো ফেলেছে। খোঁজার চেষ্টা করছে পুরুষের বাসা।

যতটুকু আলো না ফেললেই নয়, সেটুকুই দিও। বেশি আলো যদি বিরক্তির কারণ হয়। কারণ, এ তো প্রকৃতির নয়, এ যে কৃত্রিম। প্রকৃতির সব প্রাণীই কিন্তু বুঝে নেবে। তাহলে কিন্তু সব শেষ। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, আমরা ওদের রতিক্রিয়া সম্বন্ধে যা জানি তা অতি নগন্য। ফলে ওরা কিসে বিরক্ত হয়, সে ধারণাও নেই। জঙ্গলের শব্দ, চাঁদের আলো ওদের গা সওয়া। কিন্তু কৃত্রিম আলো, মানুষের কথা বলার শব্দ কী ওরা মেনে নেবে?

একটানা কথাগুলো বলে থামলেন প্রফেসর বোস। চিন্তাটা কিছুতেই কমছে না। আবার আলো না ফেললেও বিপদ। কোনও ছবিই তো দেখা যাবে না। শুধু নিকষ কালো আর কালো। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আপন মনেই বলে উঠলেন, তীরে এসে তরী ডুববে না তো?

তবু এগিয়ে চলেছে‌ন। মনে সাহস জোগাচ্ছে অবশ্য পুরনো কিছু ঘটনা। যেবার নতুন মাকড়সার সন্ধান মিলল। ২০ কোটি বছর আগে জন্মানো কোনও মাকড়সা যে তিনি আবার আবিষ্কার করতে পারবেন, এটা কখনও ভেবেছিলেন! যখন বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করছেড় আর নানা সময়ে নানা মত দিচ্ছেন, তখন কী কম টেনশনে থাকতে হয়েছিল। যখন কোনও বিশেষজ্ঞ গম্ভীরভাবে সুর টেনে বলেছিলেন, কিছু ক্ষেত্রে নতুন মনে হলেও কিছুক্ষেত্রে তা কিন্তু মনে হচ্ছে না। আরও দেখতে হবে। আবার কোনও বিশেষজ্ঞ তো সহজ ভাষাতেই প্রথম দিকে বলেছিলেন, না, না। নতুনত্বের কিছু দেখছি না। এমন মাকড়সা রাস্তাঘাটে অনেক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা যতদিন চলেছে ততদিন সে কী মানসিক যন্ত্রণা। অবশেষে প্রমাণ তো হল, নতুন আবিষ্কার! নিজের শহরের নামে তার নামকরণও করেছেন প্রফেসর বোস নিজেই। বিশ্বের কাছে সেই কাজ স্বীকৃতি পেয়েছে।

শুধু তাই কেন? মাকড়সার যৌনলীলা দেখার জন্যও তো কম খাটতে হয়নি। মাঠে, ঘাটে, জঙ্গলে ঘুরে খুঁজে বের করতে হয়ে মাকড়সার বাসা। মাটির গর্তে সে বাসা খোঁজা তো চাট্টিখানির কথা না। গর্তের ওপর কিভাবে মাটির দরজা বানায় তা দেখতে হয়েছে। দরজা বন্ধ আছে মানেই গর্তে রয়েছে নারী মাকড়সা। দ্রুত গতিতে দরজা খুলে ঢুকে পড়বে পুরুষ। তারপর সেখানে রেখে দিয়ে আসবে স্পার্ম। এটাই তাদের যৌনমিলন। পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীতে প্রকৃতির কোলে নিয়ে আসার কৌশল।

এসব কাজ করতে গিয়ে কম টানাপোড়েন তো হয়নি রে বাবা। এলাম আর জয় করলাম, এই ধরণের কাজে অন্তত এমনটা হয় না। একি সিনেমার হিরো-হিরোইন নাকি। হাত নেড়ে মুহুর্তে সবার মন জয় করে বেরিয়ে যাওয়া। পাখির ক্ষেত্রেও কী কম ঝক্কি পোয়াতে হয়েছে নাকি? আড়বাড়ির জঙ্গলে যেবার নতুন পাখির খোঁজ মিলল। তা ক্যামেরা বন্দি করতে কম ঝক্কি পোয়াতে হয়নি।

মনে জোর পান প্রফেসর বোস। জিদ চাপে। আরও একটি বিষয় তার মনকে নাড়া দেয়। কলেজের শিক্ষকদের মধ্যেও যে গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেটি কি‌ন্তু অতি সুক্ষ্ম। সরু সূতোর মতো হলেও অদৃশ্য নয়। মনের কোণে উঁকি মারলেই বোঝা যায়। শহরের নামী কলেজের এক শ্রেণির শিক্ষকরা একটু বাঁকা চোখে তাকান বৈকি গ্রামের কলেজের শিক্ষকদের দিকে। যেন গ্রামের কলেজ বলে তাঁকে কলেজ সার্ভিস পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জন করতে হয়নি। তাছাড়া সবাই যদি শহরের কলেজেই পড়াবেন তাহলে গ্রামের কলেজে কারা পড়াবেন। সরকার যে গ্রামে এত কলেজ তৈরি করছে গ্রামের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য, শিক্ষক না থাকলে উচ্চশিক্ষা মিলবে কী করে? শিক্ষক তো শিক্ষকই। গ্রাম, শহর বলে আলাদা কিছু হয় নাকি? এই বিভেদটাও ঘোচাতে হবে। বোঝাতে হবে, আসলে ইচ্ছেটাই বড় কথা। এখন তো সারা বিশ্বই হাতের মুঠোয়। শিক্ষাক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমা বলে বস্তুটাই উধাও হতে বসেছে। অথচ, শহর গ্রামের দ্বন্দ্ব যেন কিছুতেই ঘুচতেই চায় না।

 

মনের মধ্যে একটা তীব্র যন্ত্রণা। ইচ্ছে পূরণ না হওয়ার ছটফটানি। দূর থেকে যে কেউ প্রফেসর বোসের এই ছটফটানি দেখলে অবাকই হতেন। এক লহমায় ভেবে বসতেন, ছাত্র-শিক্ষক কী পড়াশোনা ছেড়ে পর্ণ ছবি বানানোর জন্য গভীর রাতে জঙ্গলে অভিযান শুরু করলেন ‌নাকি? যৌনতাতেই তো মানুষের বেশি আগ্রহ। এখন তো আবার প্রাণীদের সঙ্গেও কিছু কিছু ছেলে-মেয়ে সেক্স করে। তার মধ্যে সুখ মেলে নাকি টাকা, কে জানে? নাকি পুরোটাই বিকৃত, তা বলবে কে? এরাও তেমনই রাতের ঘুম নষ্ট করে বিকৃত মানসিকতার সুখলাভে মেতে উঠেছেন নাকি? এমনটা কারও মনে হতেই পারে।

রাতে যদি জঙ্গলে বনকর্মীদের হাতে পড়তে হয়, তাহলে কী হবে কে জানে? তারা যে এমন একটি কাজে এসেছে তা কী সহজে বিশ্বাস করানো যাবে? যদি ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। কাঠ চুরির দায়ে পুলিশে দেয়। চোর-ডাকাতের ভয়ও তো রয়েছে। যদি এসে ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে পালায়!

আবার এক নতুন চিন্তা ভর করে বসল মাথায়। কত যে বিপদ। হায় কপাল। মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসলেন প্রফেসর বোস। হয়তো এসব অঘটনের জন্যই আগে সফলতা মেলেনি। এমন অঘটন ঘটেনি ঠিকই, কিন্তু কাজটাও তো হয়নি।

এমন ঘটনা যে আগে ঘটেনি তা তো নয় রে বাবা। একবার এক ছাত্রকে খড়্গপুরের দিকে পাখির ছবি তুলতে গিয়ে সে কী বিড়ম্বনা। আকাশে পাখির সঙ্গে যখন তাঁদেরও মন উড়ছে, ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ কোত্থেকে জনা ছয়েক লোক এসে ঘিরে ধরেই পরপর প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে গেল, কোত্থেকে এসেছেন? কিসের ছবি তুলছেন? ক্যামেরাটা দিন।  

প্রশ্নবাণে তো ভ্যাবাচাকা খাওয়ার জোগাড়। প্রথমটা কী বলবেন ভেবেই কূল পাচ্ছিলেন প্রফেসর বোস। যখন একজন জোর করে ক্যামেরাটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তখনই রুখে দাঁড়ান তিনি। জোরের সঙ্গে বলেন, এমন করছেন কেন? আমরা তো পাখির ছবি তুলতে এসেছি। এই সব এলাকায় কোন কোন পাখি দেখা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছি।

কিন্তু এ কথায় চিঁড়ে ভিজবে কেন? অবশেষে শিক্ষকতার পরিচয়পত্র পর্যন্ত দেখাতে হয়েছিল। দেখাতে হল ক্যামেরাতে ধরা প্রতিটি ছবি।

শেষে অবশ্য বিশ্বাস করেছিলেন লোকগুলো। ছবি ডিলিট না করেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গে একটা কথাও জানিয়েছিলেন, ওই ছবি যেন সংবাদ মাধ্যমে না দেন।

প্রফেসর বোস তখনও বুঝে উঠতে পারেননি বিষয়টা কী? সেই লোকগুলোই খোলসা করেছিল। বলেছিল, দেখুন, আমাদেরও তো সংসার আছে। এখান থেকে মোরাম তুলে বেচে কিছু রোজগার করি। সে টাকায় সংসার চলে, ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করে। তাও সব টাকা কী আমরা পাই নাকি? ঝুঁকি নিয়ে খাটি আমরা। বদনাম আমাদের হয়। কিন্তু বড় অংশের টাকাটা চলে যায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে। পুলিশ, প্রশাসনের কর্তাদের কাছে। তবু খবরের কাগজে ছবি বেরোলেই ধরপাকড় শুরু হয়। হৈচৈ হলে জেলে যেতে হয় আমাদেরই।

তখন পুরো বিষয়টি মাথায় ঢুকেছিল প্রফেসর বোসের।

ভাবতে ভাবতে লকডাউনের সময়ের কথাটাও মনে পড়ে গেল। তাঁরই টিমের আর এক ছাত্র জঙ্গলে পাখির ছবি তুলতে গিয়েছিল। সেখানেও হঠাৎ একদল ঘিরে ধরে। ছাত্রটি যে আসলে ‘বার্ড ওয়াচার’ হিসেবে কাজ করছে তা বিশ্বাস করাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তবে ছাড় পেয়েছিল ছাত্রটি। পরে অনুসন্ধান চালিয়ে বুঝেছিল, আসলে লকডাউনের সুনসান জঙ্গলে কাঠচুরির সুবর্ণ সূযোগ কাজে লাগিয়ে জঙ্গল ধ্বংস করছিল একদল। তারাই কাঠ চুরির ছবি তুলছে ভেবে বার্ড ওয়াচার ছাত্রকে আটকে রেখেছিল। যাতে কাঠ চুরির বিষয়টি ফাঁস না হয়।

এক্ষেত্রে আবার কী ঘটবে কে জানে বাবা? সেই দু’টি ঘটনা ঘটেছিল দিনের আলোয়। সূর্যকে সাক্ষী রেখে সাধারণত খুব খারাপ কাজ সহজে কেউ করতে পারে না। তাই বোঝানোর সূযোগ ছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারেই তো যত বেশি অঘটন ঘটে।

ভয় চেপে বসছে। তবু মাথায় হাত দিয়ে চুলে বিলি কাটতে কাটতে নিজেকে শান্ত করলেন প্রফেসর বোস।

মনকে বোঝালেন, যে যা ভাবে ভাবুক। বনকর্মীরা হোক বা অন্য কেউ, আগে তো আসুক। তারপর বোঝা যাবে।

নিজেকে নিজেই নির্দেশ দিলেন, ডোন্ট ওরি। গো অ্যাহেড। জো হোগা দিখা জায়েগা।

 

এই জিদ আছে বলেই তো স্ত্রী ঝর্ণাকে বাড়িতে একা ফেলে রাতে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। ঝর্ণার মনেও একদিন খটকা লেগেছিল।

দেশি লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা ছাড়িয়ে এখন বিদেশিদের সঙ্গেও ওঠাবসা। তারপর থেকেই তো মনের ভেতর যত রকমের ঘুণপোকাগুলে বেশি করে নড়ছে। তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে খটাখটি লাগেনি তা নয়। এক এক সময় ঝর্ণা এমন চটেছে, শান্ত করাও কঠিন হয়নি তা নয়। টানা তিনদিন নানা আছিলায় ভালো করে কথা পর্যন্ত বলেনি। বাগে আনতে কম বেগ পেতে হয়নি।

 

আজও একা একা বিছানায় শুয়ে নানা কথা ভাবছে ঝর্ণা। স্বামী রাতে বেরিয়ে গেলে কোনও বঙ্গনারী কতটা হতাশ হতে পারে, দুশ্চিন্তায় কাঠ হয়ে বিছানায় মিশে যায়, তা জানার জন্য পুরনো ইতিহাস না ঘাঁটলেও চলে। উল্টোটাও নেই তা নয়। সীতাকেও তো অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

 

বউয়ের বিষয়টি কিন্তু প্রফেসর বোসেরও অজানা নয়। সেও কাজের মাঝেই ভেবে চলেছে, এবার কী ও ঘুমোলো। না ঘুমোলেই ভয়। রাতভর দুশ্চিন্তা করবে।

হ্যাঁ, ঝর্ণা ঘুমোতে চেয়েছিল, এটা ঠিক। সবে তন্দ্রা এসেছে, তখনই মেয়েটা হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই কঁকিয়ে উঠল। অমনি ঘুমটা ভেঙে গেল ঝর্ণার। আর ঘুম আসেনি। না, ফোন করারও জো নেই। তাহলেই তো শব্দ হবে। কাজের ব্যাঘাত ঘটবে।

 

টেঁটেঁটেঁ।

চেঁ-চেঁ-চেঁ।

সিঁসিঁসিঁ।

আঁডিঁআঁডিঁআঁডিঁ।

টিঁইঁটিঁইঁটিঁইঁ।

এখন আর ঝর্ণার কথা ভাবার সময় নেই প্রফেসর বোসের। নিমেষে সব চিন্তা উধাও। এই শব্দটা যে এখন স্ত্রীর থেকেও বেশি পছন্দের। যার জন্য এত ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা। ছাত্রকে মুখে আঙুল দিয়ে ঈশারা করলেন প্রফেসর বোস, স্পিকটি নট।

এবার বুঝি সে আসবে। ধরা তাকে পড়তেই হবে। আহা, সার্থক রাতজাগা। কত রাত এমন জেগেছে। কত স্বপ্ন দেখেছে। চাক্ষুস করবে ওদের যৌন মিলন। না, আশা পূরণ হয়নি। এবার তো শুধু দেখা নয়, ক্যামেরাবন্দিও করবে। একদম ক্যামেরা নিয়ে তৈরি।

ছাত্র একটু হাল্কা সুরে ফাজলামির ঢঙে অস্ফুটে বলল, স্যার ও তো গাছের ডালে! টারজান নাকি?

স্যার গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, এটাই ওদের পদ্ধতি। পুরুষরা ওখানে বসেই ডাক ছাড়ে। যে ডাক শুনে নারীর বসে থাকার জো নেই। যৌবন জ্বালায় কাতর হয়ে ওঠে। জল, জঙ্গল, মাঠ- যেখানেই থাকুক না কেন পড়িমরি করে দৌড়ে আসবে পুরুষের ডাকে সাড়া দিয়ে। তার আগে সাজুগুজুও করবে। তারপর ধীরে ধীরে গাছে উঠবে। নিজেই নির্বাচন করবে গাছের পাতা। পছন্দের পাতায় উষ্ণ বিছানা পাতবে। তারপর ডেকে নেবে পুরুষসঙ্গীকে।

লেন্সে চোখ ছাত্রের। মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে দেখে নিচ্ছেন প্রফেসর বোসও।

টেঁটেঁটেঁ।

চেঁ-চেঁ-চেঁ।

সিঁসিঁসিঁ।

আঁডিঁআঁডিঁআঁডিঁ।

টিঁইঁটিঁইঁটিঁইঁ।

গলা ফুলিয়ে আওয়াজ দিচ্ছে সকলে। শব্দ তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হচ্ছে। যেন মাঠ, ঘাট জঙ্গল ছাড়িয়ে দূরে আরও বহুদূরে যাবে।

একটি গাছেই থাকে এই সব পুরুষ ব্যাঙ। একাধিক ডালে বসে। এগুলিকে ব্যাঙেদের কলোনীও বলা যেতে পারে। যে কলোনীতে থাকা ১০-১২টি পুরুষ বুঝে গিয়েছে এবার নারী তাদের ডাকা সাড়া দিয়ে আসবে।

মাটিতে থাকা নারী তখন সাজগোজে ব্যস্ত। গাছের নীচে থাকা জলে নেমেছে। সারা শরীরের মধ্যে জল ঢুকিয়ে নিজের চেহারাকে নধর, হৃষ্টপুষ্ট করছে। এটাই ওদের রীতি। সেই কাজ শেষ হলে উঠবে গাছের ডালে। গাছের ডালে উঠে পছন্দের পাতা খুঁজলো। সেই পাতাটিই হবে যৌনলীলার গরম বিছানা।

এবার উন্মুখ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে প্রফেসর বোস। হুঁশ ফিরল ছাত্রের প্রশ্নে। স্যার, গাছের বিভিন্ন ডালে তো ১০-১২টি ব্যাঙ দেখছি। সঙ্গম কী তাহলে সবার সঙ্গেই হবে?

প্রফেসর বোস বলে চললেন, না। একজনের সঙ্গেই হবে সঙ্গম। কোন পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলন হবে তা নির্বাচন করবে নারী। সেই মতো ঈশারা করবে। তখন পুরুষ হাজির হবে তার কাছে।

কিন্তু কিভাবে পুরুষ নির্বাচন করবে? এখানে তো অনেক পুরুষ। প্রফেসর বোস বললেন, সম্ভবত যে পুরুষ সব থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে ডাক দেয়, তাকেই নির্বাচন করে থাকে নারী। তাই প্রতিযোগিতার ঢঙে এত তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে সকলে। তারপর প্রায় দু’ থেকে তিন ঘন্টা ধরে চলে তীব্র যৌন মিলন। যতক্ষণ না দু’জনেই পূর্ণ তৃপ্তি পাচ্ছে ও নতুন প্রজন্মকে রেখে যেতে পারছে, ততক্ষণ থামবে না। 

লেন্সে চোখ রেখে স্যার বললেন, আলোটা আর একটু বাড়াও তো। দেখা যাক, ওদের অসুবিধে হচ্ছে কিনা। অসুবিধে হলে না হয় কমিয়ে দেওয়া যাবে।

ছাত্র আলোটা একটু বাড়ালো। আলোতে দেখা গেল, প্রবল আবেগে অন্য ডাল থেকে নারীর কাছে লাফিয়ে আসছে এক পুরুষ। পাতলা ডাল। অথচ তীব্র উত্তেজনা। এই বুঝি ভেঙে না পড়ে।

না, ভাঙেনি। পুরুষ উষ্ণ বিছানায় পৌঁছতেই আদরে জড়িয়ে চুমুতে ভরিয়ে তুলল নারী। অদ্ভূত উত্তেজনায় দু’জনের চারটে পা যুদ্ধক্ষেত্রের তরবারির মতো সোঁ সোঁ করে এগিয়ে চলেছে। যেন প্রলয় ঘটবে এখুনি। সঙ্গমের চোটে গাছের ডালটা পর্যন্ত দুলে উঠছে। যতক্ষণ না দু’জনে পূর্ণতা পেল কেউ কাউকেই ছাড়ল না। যে পূর্ণতা শেষ হল এক লালা নিঃসরণে। যা ফোমের আকার নিল। ২৪ ঘন্টায় সেই ফোমই হলুদ আকার নিয়ে নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি করল। এ দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

সমস্ত দৃশ্য ক্যামেরাবন্দির পর তৃপ্তির হাসি প্রফেসর বোসের চোখে মুখে। ছাত্রকে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, কী দেখলে?

লজ্জায়, মরমে মরছে ছাত্র। কী উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না। স্যারের সঙ্গে কী সঙ্গম, যৌনতা নিয়ে আলোচনা করা যায় নাকি?

স্যারই বললেন, তুমি খারাপ ভাবছো কেন? আমাদের কাজে আমরা সফল। তা সন্দেহ নেই। কিন্তু যে দৃশ্যটা আমরা ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করিনি, বা চেষ্টা করলেও উপায় ছিল না, সেটা কী কম গুরুত্বপূর্ণ?

এবার ভ্যাবাচাকা খেল ছাত্র। সেটা আবার কী?

প্রফেসর বোস নিজেই শুরু করলেন, যে দৃশ্যটা অধরা থেকে গেল, তা সত্যিই কী মর্মস্পর্শী, হৃদয় বিদারক। আবার কৃষ্টি, সংস্কৃতির চুড়ান্ত উদাহরণও বটে।

চিত্রকরের বিস্ময় যেন বেড়েই চলেছে, স্যার কী বোঝাতে চাইছেন?

স্যারের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

প্রফেসর বোস ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, যে ১১টি ব্যাঙ যৌন মিলনের সূযোগ পেল না, তারা কিন্তু কেউ তেড়ে আসেনি। নারীকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। এমনকী, ন্যুনতম বিরক্তিও লক্ষ্য করা যায়নি। বরং দেখা গিয়েছে, ওরা এই দৃশ্য উপভোগ করেছে নতুন প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়ার বাসনায়।

হ্যাঁ, ক্যামেরাতে এই দৃশ্য দেখেছিলেন স্ত্রী ঝর্ণাও। গল্পটাও শুনেছিলেন। শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে ভাবছিলেন, যৌনতার নিশি সুরও এত মনোরম হতে পারে।

তারপরই প্রফেসর বোসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দেন, ব্যাঙ জগতে এত শৃঙ্খলা! অথচ আমরা পরিবারের সঙ্গে রাস্তায় বেরোলেও কত চোখ কতরকম ভাবে তাকায়। সেখানে এতগুলো পুরুষের সামনে….আমাদের সমাজ কবে শিখবে?

উত্তরের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করেনি। আপন মনে প্রশ্নটা করেই, একটু চা করে নিয়ে আসি, বলে রান্নাঘরের এগিয়ে যায় ঝর্ণা।

…..

ads

Mailing List