যৌনতা ও কিছু জিজ্ঞাসা, পার্থ-অর্পিতা এবং সেক্স টয়

যৌনতা ও কিছু জিজ্ঞাসা,  পার্থ-অর্পিতা এবং সেক্স টয়
31 Aug 2022, 02:26 PM

যৌনতা ও কিছু জিজ্ঞাসা,  পার্থ-অর্পিতা এবং সেক্স টয়

 

ড. গৌতম সরকার

 

     

বাঙালি চিরকালই হুজুগের জাত, আর সেই হুজুগ প্রবাহ যদি হয় নদীর স্রোতের ন্যায় তাহলে তো কথাই নেই। বাংলায় এই মুহূর্তে চলছে ইডি কর্তৃক মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক রাঘববোয়ালদের ধরপাকড় পর্ব আর সাথে তাল মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের বন্যা। পার্থ ধরা পড়লো, সাথে কান টানলে মাথার মত অর্পিতা এল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের রসায়ন। কোটি কোটি টাকার তল্লাশি মিললো অর্পিতার একাধিক ফ্ল্যাটের বেডরুম থেকে বাথরুমে। বাঙালির সকাল শুরু হল গরম গরম চায়ের সাথে বাংলা সংবাদপত্রের নিত্য নতুন যোগদানে। আজকাল সেভাবে পাড়ার রক কিংবা চায়ের দোকানের সাবেক আড্ডা চোখে পড়েনা, তবে রাস্তা-ঘাট-দোকান-বাজার-অফিস-আদালত, বিশেষ করে ফেসবুক, স্কুপবুক, ইনস্টাগ্রাম, ট্যুইটার কটাদিন খবরে খবরে সরগরম হয়ে উঠল। তারপর এই ফ্ল্যাটে টাকা, ওই অ্যাকাউন্টে টাকা, জমিতে টাকা, গয়নায় টাকা খবরগুলো যেইমাত্র হুজুগে বাঙালির কাছে একঘেয়ে হতে শুরু করেছে কি করেনি তখনই অর্পিতার ফ্ল্যাট থেকে বেরোলো একটা নয়, দু দুটো সেক্স টয়, ব্যাস সেই খবরে তামাম বাঙালিও ফ্ল্যাট হয়ে গেল।

     

চর্চায় নয়া খোরাক পেয়ে বঙ্গবাসীর কাছে কোটি কোটি কালো টাকা অবান্তর হয়ে গেল। দুর্নীতি-টুর্নীতি সব অতীত, আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে মিয়া-বিবির যৌনজীবন। এরপর সারা মিডিয়া জুড়ে ট্রোল-মিমের বন্যা শুরু হল। এতদিন ধরে তৈরি করা সম্পর্কের রসায়নে হঠাৎ করে আকর্ষণীয় বাঁক উপস্থিত হল, তাহলে কি পার্থ-অর্পিতার যৌন জীবন স্বাভাবিক ছিলো না? তা নাহলে এই দ্রব্যদ্বয়ের আকস্মিক উপস্থিতি কেন! কেউ কেউ আবার চটুল রসিকতার ঘেরাটোপে পুরুষ সঙ্গীর 'অক্ষমতার' প্রসঙ্গ টেনে মূল আলোচনার নয়া দিশা দান করার কৃতিত্ব অর্জন করে ফেলল। এখন প্রশ্ন হল, চোর হোক ডাকাত, শয়তান, খুনি, রেপিস্ট যেই হোক না কেন কোনও মানুষের ব্যক্তিগত যৌনজীবন নিয়ে এইধরনের অনুপ্রবেশ কি আদৌ শোভনীয়? এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জেন্ডার স্টাডিজের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, "আমরা অর্পিতা-পার্থর সম্পর্কের কোনও হালহকিকত না জেনেই নিজের মত করে ধারণা করে ফেলছি। আমরা এখনও জানি না তাঁরা পরস্পরের যৌন সঙ্গী ছিলেন কিনা।"

     

বস্তুদুটি যেহেতু অর্পিতার ফ্ল্যাটে পাওয়া গেছে তাই আলোচনার গতি অন্যমাত্রা পেয়েছে। মনোচিকিৎসকদের মতে একই ধরণের বস্তু পুরুষ সঙ্গীর ঘর থেকে পাওয়া গেলে বঙ্গসমাজে এতটা উত্তেজনা সৃষ্টি হতো না। কারণ, যতই যা বলি না কেন পুরুষতন্ত্রের পোশাকটা আমরা পুরোপুরি পরিত্যাগ করে উঠতে পারিনি। তাই সহজেই যে সমীকরণটা মিলিয়ে দেওয়া হয় সেটি হল সমাজে নারী যৌনসুখের জন্য পুরোপুরি পুরুষের উপর নির্ভরশীল। তাই একজন নারী সেক্সটয় ব্যবহার করলে সেটা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপে বিদ্ধ করা দোষের কিছু নয়। এতে করে যে একজন মানুষের সম্ভ্রমে আঘাত করা হচ্ছে সেদিকে কারুর ভ্রূক্ষেপ নেই। মেয়েরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবে এটা মেনে নিতে আধুনিক শিক্ষিত প্রযুক্তিনির্ভর মানুষেরও বড়ই অনীহা। তাঁদের যৌনজীবনও পুরুষরাই নিয়ন্ত্রণ করবে, এটাই হক কথা, অন্যথা হলেই 'সব রসাতলে গেল' বলে চিৎকার, চেঁচামেচি, ভর্ৎসনা, আর সাথে হাঁসি-ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু হয়ে যাবে।

    

সুস্থ জীবনযাপনের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো স্বাস্থ্যকর যৌনজীবনও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যৌন চাহিদা অতি স্বাভাবিক এবং সার্বজনীন। কেউ এটাকে অস্বীকার করতে পারেনা। সেই চাহিদা কেউ কিভাবে মেটাবে সেটি তাঁর একেবারে নিজস্ব সিদ্ধান্ত৷ আইন এবং সামাজিক শর্ত মেনে যৌনজীবন যাপন ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। সেখানে অন্যের শয়নকক্ষের মধ্যে কি ঘটছে সেটাকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, মিমরচনা বেআইনি এবং মানসিক বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়।

    

মনোবিদ এবং মনোচিকিৎসকদের মত হল, যৌনজীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অনেকে সেক্সটয় ব্যবহার করেন, আইনের চোখে এটা অপরাধ নয়। এটা যদি অপরাধ হয় তাহলে হস্তমৈথুনও অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত। বেশ কয়েকদিন ধরে এই অবান্তর বিষয়টি নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে, যেটার সাথে দুষ্কর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। রাজ্যের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করে যে বিশাল অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে, এই ধরণের বালখিল্যতা সেই অপরাধের বোঝাকে  হালকা করে দেয় এটা বাঙালিকে বুঝতে হবে।

   

আইন হয়ত আইনের পথে চলছে, আর কোনও হুজুগই চিরন্তন নয়। কোনওদিন আবার নতুন কিছু ঘটবে, তখন হুজুগের প্রতিমুখ বদলে যাবে। ভয় হয়, কিছুদিন পর পাহাড়সম অপরাধটিই গৌণ হয়ে পড়বে। তখন অপরাধীরা কোনও এক যাদুক্ষমতাবলে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসে আবার ছড়ি ঘোরাতে শুরু করবে। ছাপোষা বাঙালির অভিজ্ঞতা তো সেই কথাই বলে। আর একটা কথা ইডি, মিডিয়া, প্রশাসন কোনও মহল থেকেই যে প্রশ্নটা উঠে আসে নি, যেটি অতিঅবশ্যই উঠে আসা উচিত ছিল, পার্থ-অর্পিতাকে যদি দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাহলে যেসব চাকরিপ্রার্থী ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছে বা পেতে চেয়েছিল, মহামান্য আদালতে তাদের অপরাধেরও যেন সঠিক বিচার হয়।

                              ……………xxxxx…………….

 

লেখক: ড. গৌতম সরকার। আ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, অর্থনীতি, যোগমায়া দেবী কলেজ, কলকাতা

Mailing List