ঋষি রাজনারায়ণ বসুর চেয়ারে বসেছিলেন, তাই আজীবন মর্যাদা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মৃত্যুহীন প্রাণঃ শিক্ষাব্রতী হরিপদ মন্ডল

ঋষি রাজনারায়ণ বসুর চেয়ারে বসেছিলেন, তাই আজীবন মর্যাদা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মৃত্যুহীন প্রাণঃ শিক্ষাব্রতী হরিপদ মন্ডল
14 Jun 2021, 06:55 PM

ঋষি রাজনারায়ণ বসুর চেয়ারে বসেছিলেন, তাই আজীবন মর্যাদা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মৃত্যুহীন প্রাণঃ শিক্ষাব্রতী হরিপদ মন্ডল

 

ডঃ বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

 

বাংলার সু-সন্তান, মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র, অনন্যনিষ্ঠ শিক্ষাব্রতী, তন্মনস্ক ইতিহাস অনুসন্ধানী, স্থিরব্রত সংস্কৃতিপ্রেমী ও অভিনিবিষ্ট সমাজকল্যাণব্রতী হরিপদ মন্ডল ১৩জুন, ২০২১ বিকেল ৪.৪৫ মিনিট সময়ে ইহলোক ত্যাগ করে অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ মেদিনীপুর তথা বাংলার শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের তদাত্মক মানুষ। অনাদ্যন্ত শূন্যতা এমন গুণীজনের প্রয়াণে।

 

অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার খেজুরি থানার জাহানাবাদ গ্রামে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন হরিপদ মন্ডল। পিতা শিবপ্রসাদ মন্ডল ও মাতা নীরদা দেবী। জাহানাবাদ উচ্চ-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ প্রাথমিক শিক্ষা, অজয়া মধ্য ইংরাজি বিদ্যালয় থেকে (১৯৩৯-১৯৪০) সরকারি বৃত্তি লাভ, মেট্রিকুলেশন কলাগেছিয়া জগদীশ বিদ্যাপীঠ (পূর্বতন জাতীয় বিদ্যালয়) থেকে (১৯৪১-১৯৪৫)। মহাবিদ্যালয় শিক্ষা কলকাতার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজ থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. ১৯৬৪ সালে, ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.টি. ১৯৫৩ সালে ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সাহিত্য-ভারতী’ উপাধি লাভ ১৯৫৫ সালে। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় তাঁর দক্ষতা ও পারদর্শিতা অনুপম। শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে ১) অজয়া অন্নদা বিদ্যামন্দির (১৯৫১-১৯৫৫), ২) তালতলা হাইস্কুল, কলকাতা (১৯৫৬-৫৭), ৩) মেচেদা গোপালগঞ্জ প্রিয়নাথ বাণীভবন (১৯৫৭-১৯৫৮) ৪) দেড়িয়াচক শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামঠ (১৯৫৮-৬৪) এইসকল বিদ্যালয়গুলিতে।

লেখকের সঙ্গে হরিপদ মন্ডল

১৯৬৫ সালে প্রধান শিক্ষকতার নিয়োগ পত্র পেয়ে যোগদান করেন পাঁশকুড়া ব্রাডলির্বাট হাই স্কুলে ও মাত্র এক বছর এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করার পর আহ্বান আসে মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। উনবিংশ শতকে বাংলায় নবজাগরণে, বাংলার যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসামান্য ভূমিকা ছিল ১৮৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুল সেগুলির মধ্যে অন্যতম। নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজনারায়ণ বসু, মেদিনীপুরের গৌরবী-সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুরোধে ১৮৫১ সালে এই কলেজিয়েট স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেন ও ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত ওইপদে আসীন ছিলেন। ঋষি রাজনারায়ণ বসুর যোগ্য উত্তরসূরী হরিপদ মন্ডল ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কলেজিয়েট স্কুলে দক্ষতার সঙ্গে ও কৃতকৃত্যতায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হরিপদ মন্ডল

হরিপদ মন্ডল ‘মেদিনীপুর কলেজয়েট স্কুলের ইতিকথা’ শিরোনামে একটি পুস্তক রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। এই পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩ সালের ১৫ আগস্ট। এই গ্রন্থে তিনি যে বিষয়গুলো অবতারণা করেছেনঃ ১) রাজনারায়ণ বসুকে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা চিঠি, ২) মেদিনীপুর জেলার প্রথম স্নাতক মধুসূদন রায়, ৩) ম্যাজিস্ট্রেট সূর্যকুমার অগস্তি, ৪) দেশসেবক মহেন্দ্রনাথ মাইতি, ৫) স্যার আব্দুল্লা সোহারাওয়ার্দি, ৬) র‍্যাঙ্গলার বীরেন্দ্রনাথ, ৭) অস্ত্রগুরু হেমচন্দ্র কানুনগো, ৮) অগ্নিশিশু ক্ষুদিরাম, ৯) ফাঁসির সত্যেন, ১০) নীলকন্ঠ মজুমদার, ১১) বিচারপতি আবদার রহিম ১২) সাতকড়িপতি রায় ১৩) জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু ১৪) প্যারীলাল ঘোষ।

 

‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ মেদিনীপুর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন আমৃত্যু। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, মেদিনীপুর শাখার প্রথম সভাপতি মেদিনীপুরের বিপ্লবী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর মেদিনীপুর টাউন স্কুলের প্রথিতযশা প্রধান শিক্ষক পুণ্যশ্লোক ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, মেদিনীপুর শাখার বার্ষিক অধিবেশন ও সাহিত্য সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে হরিপদ মন্ডল অন্যতম। ১৩৯১ বঙ্গাব্দে মেদিনীপুর শহরের ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির’-এ আয়োজিত বার্ষিক অধিবেশনে হরিপদ মন্ডল অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন। ১৯৬৭ সালের ৫ মার্চ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ তাঁর ডায়েরির পাতা থেকে মেদিনীপুর শাখা পরিষদের কার্যাবলীর বহু বিবরণ পাওয়া গেছে, যা সাহিত্য ও গবেষণামূলক ষান্মাসিক অমিত্রাক্ষর অষ্টম সংখ্যায় সম্পাদক অচিন্ত মারিক লিপিবদ্ধ করেছেন।

একটি অনুষ্ঠানে হরিপদ মন্ডল

হরিপদ মন্ডল ৯৭ বছর বেঁচে ছিলেন ও শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর লেখনী সচল ছিল। প্রকৃত অর্থেই তিনি একজন অক্ষর-কর্মী তাঁর তন্নিষ্ঠ গবেষণার ফসল উপনিবদ্ধ ও অক্ষরবদ্ধ হয়েছে তাঁর লেখা তিরিশটির বেশি গ্রন্থে। তাঁর লেখা কয়েকটি গ্রন্থের শিরোনাম উল্লেখ করছিঃ

 

1)       ঋষি রাজনারায়ণ

2)       আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল

3)       ছোটদের শ্রী অরবিন্দ

4)       মেদিনীপুর ও বঙ্কিমচন্দ্র

5)       মেদিনীপুরে গান্ধীজি

6)       মেদিনীপুরে রবীন্দ্রনাথ

7)        রাজনারায়ণ বসু

8)        রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে

9)        সংসার প্রেমে সারদা-রামকৃষ্ণ

10)       প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্য

11)       মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের ইতিকথা

12)       শহীদ ক্ষুদিরাম, কানাই ও সত্যেন

13)       মেদিনীপুরে সুভাষচন্দ্র

14)       শহীদ ক্ষুদিরাম

15)       সুপ্তিভঙ্গ (কবিতা)

16)       স্বামী অমলানন্দ

17)       Vivekananda Speaks

18)       Sri Aurovinda

19)       Rishi Rajnarayan

20)   Acharya Bajendranath Seal

21)      Our Education and its Reforms (Edited)

22)      Saheed Khudiram & Other Martyrs

23)   বিদ্যাসাগর-জননী ভগবতী দেবী

 

বহু সংগঠন ও সংস্থা তাঁর অভিভাবকত্বে পরিচালিত হয়েছে। ‘মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা’, ‘বিদ্যাসাগর স্মরণ সমিতি’, ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন পর্ষদ’, ‘শহীদ প্রশস্তি সমিতি’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন আমৃত্যু।

 

শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ও ইতিহাস গবেষণায় তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন জেলায় ও রাজ্যে। বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত এই প্রবুদ্ধ ও প্রজ্ঞাবান পুরুষ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি-পুরস্কার’-এ পুরস্কৃত করেছেন। সুগভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি আজীবন জ্ঞান-তপস্বী এই অলোকসামান্য মানুষটিকে।

 

লেখক - প্রধান শিক্ষক এবং রবীন্দ্র গবেষক

Mailing List