সরস্বতী মহাভাগে: বাংলার পূজা ঘনত্বের সিংহভাগই যে তাঁর দখলে

সরস্বতী মহাভাগে: বাংলার পূজা ঘনত্বের সিংহভাগই যে তাঁর দখলে
17 Feb 2021, 09:30 PM

সরস্বতী মহাভাগে: বাংলার পূজা ঘনত্বের সিংহভাগই যে তাঁর দখলে

 

সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

 

পাঠক, দয়া করে হোঁচট খাবেন না। শুরুতেই পূজা ঘনত্ব বলে একটা ভারী শব্দবন্ধ ব্যবহার করে ফেলেছি। আসলে এর মানে বোঝাতে চেয়েছি, কোনও অঞ্চলে মোট যত পুজো হয়, তাকে যদি সেই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়, তাহলে যা পাওয়া যাবে, সেটি হল পূজা ঘনত্ব।

 

বাস্তবে এমন কোনও সমীক্ষা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তবে যদি হয়ে থাকে দেখা যাবে, দেবী সরস্বতী সেই সমীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। সরস্বতী এমনই এক দেবী, যাঁকে খুব অল্প আয়োজনে বারোয়ারী মন্ডপে অর্চনা করা যায়। আবার এর সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে তাঁর পুজো তো আছেই। তবে প্রাথমিকভাবে এটি বোধ হয়, নাগরিক ও মফস্বলী বৃত্তান্ত। কিন্তু লেখাপড়ার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলেও তার বিস্তার ঘটেছে সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হল, কেনই বা সরস্বতীর এ হেন জনপ্রিয়তা? কবে থেকেই বা তার আরাধনা শুরু হল? কোনও মন্দির, থান বা স্থায়ী প্রতিমা না থাকা সত্ত্বেও তাঁর স্থান এত পাকা হল কিভাবে?

মনে পড়ে ছোটবেলায় আমরা নিজেরাই সরস্বতী পূজা করতাম। পাড়াতে। বাড়িতে তো পুজো হতোই। কিন্তু পাড়ার পুজোটা স্পেশাল। কতই বা বয়স তখন আমাদের। এই বারো, তেরো বছর। দোকানে ছাপানো বিল কিনতে পাওয়া যেত। সেটা দিয়ে এক টাকা, দু’টাকা, খুব বেশি হলে পাঁচ টাকা চাঁদা উঠত। তারও অনেক হ্যাপা ছিল। কোনও কোনও অনুদান দাতা শর্ত দিতেন, নামের বানান ভুল হলে চাঁদা মিলবে না। আমাদের বাচ্চা ছেলে দেখে হয়তো মজা করেই তা করতেন, কিন্তু সেটাও ছিল আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ। প্যান্ডেলটাও আমরা নিজেরা বানাতাম। কাপড়, মার্বেল পেপার – এসব দিয়ে। কেবল ঠাকুরটা কিনে আনা হত। এইভাবে চাঁদা তোলা, বাজার করা, প্যান্ডেল করা – সবকিছুর মধ্যে একটা তুমুল উত্তেজনা। অপরিসীম দায়িত্ববোধের দ্বারা সদা ব্যস্ত হয়ে ওঠা, সরস্বতী পুজোকে বড় আপন করে তুলত। তাছাড়া এই পুজোর ব্যাপারটাতেও একটা আপাত সরলতা ছিল। বামুন ঠাকুরকে টানাটানি করে নিয়ে এসে চট করে পুজোটা সেরে নেওয়া। তারপর দিনভর এদিক-সেদিক ছোটা, স্কুলে যাওয়া, মেয়েদের স্কুলেও অবারিত দ্বার!

আসলে সরস্বতী পুজো খুব ছোটদের, আর একটু বড়, তার চেয়ে যারা বড়, এই ধরা যাক কিশোর, তাদের পুরুষ হওয়ার, যুবক হওয়ার ক্ষণ যেন। বাচ্চাদের হাতে খড়ি দিয়ে পড়াশোনার জগতে প্রবেশ। বড় হওয়ার পালা শুরু। আর প্রেম প্রস্তাবে সম্মতি আদায় হয়ে গেলে কিশোরটি কি গার্হস্থ কল্পনায় রঙিন হয়ে ওঠে না! রঙিন বলতেই রঙের কথা চলে এলো। সরস্বতী মানেই বাসন্তী রঙের ছড়াছড়ি। ঋতুর নামেও সেই রঙ মিশে আছে। পোশাকে, পলাশে সেই রঙ ছড়িয়ে পড়ে। এ এক প্রাচুর্য উচ্ছ্বলতা আর যৌবনের রঙ! প্রকৃতি আর মানুষের নিবিড় একাত্মতার কারণেই বোধ হয় সরস্বতীকে বাঙালি এত আদর করে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে।  যদিও সরস্বতী পুজোর বাড়বাড়ন্তের সেটাই একমাত্র কারণ নয়।

 

আদিতে বৈদিক যুগে সরস্বতী ছিলেন নদীর দেবী- প্রকৃতির দ্যোতক। ঋগ্বেদে তাঁকে প্রবল ও বিপুল শক্তির অধিকারিণী বলা হয়েছে। তাঁর ঢেউ পাহাড় ভেঙে ফেলতে পারে। অনিঃশেষ স্বর্গীয় মহাসমুদ্রের তিনি উৎসরূপিণী। তিনি পবিত্র করেন ধরিত্রীকে। উর্বরতা প্রদানকারিণী হিসেবেও তাঁকে স্তুতি করা হয়েছে। এই বেদে তাঁকে সুমিষ্ট সঙ্গীতের চালিকা শক্তি, মহান চিন্তা ও পবিত্র ভাবনার উদ্রেককারিণীও বলা হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্যে, পরবর্তীকালে তাঁর বিদ্যার দেবী হিসেবে কীর্তিত হওয়ার পূর্বানুভাস বলা যেতে পারে এটিকে। এক সময় তিনি আর এক বৈদিক দেবী বাক-এর সঙ্গে একীভূত হয়েছেন। বৈদিক সাহিত্যের এক স্থানে রোগ উপশমের অধিষ্ঠাত্রী রূপে তাঁর পরিচয় মিলেছে। ফলত, জ্ঞানের আধার হিসেবে তাঁর চিহ্নিত হওয়ার লক্ষণ এটি।

 

সৃষ্টি এবং উর্বরতার সঙ্গেও সরস্বতীর যোগ রয়েছে। সরস্বতীর জন্ম কাহিনীর মধ্যেও এর প্রতিফলন লক্ষ করি। যদিও তাঁর জন্মের একাধিক উপাখ্যান রয়েছে। একটিতে বলা হচ্ছে, ব্রহ্মা নারী ও পুরুষ দুই ভাগে ভাগ হলে, তার স্ত্রী অংশ থেকে জন্ম হচ্ছে সরস্বতীর। এই সরস্বতী ও ব্রহ্মার সন্তান হলেন মনু, যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আর একটি কাহিনীতে শ্রীকৃষ্ণের পাঁচটি শক্তির একটির জিহ্বাগ্রে জন্ম নিচ্ছেন দেবী সরস্বতী। এখানে শ্রীকৃষ্ণ পুরুষ শক্তি আর তাঁর প্রকৃতি অংশ থেকে দেবীর জন্ম। এই সরস্বতীর পরনে হলুদ শাড়ি, হাতে বীণা। সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে নদীর দেবী ক্রমশ রূপান্তরিত হচ্ছেন সুকুমার বৃত্তি, কলাবিদ্যার দেবী হিসেবে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবীকে বলা হয়েছে বেদগর্ভা, সর্ববিদ্যাস্বরূপিণী, সর্বশাস্ত্রবাসিনী, গ্রন্থকারিণী। এই পুরাণ সঙ্কলিত হচ্ছে প্রথম সহস্রাব্দের শেষ থেকে।

এটি বর্তমানে যে রূপে পাওয়া যাচ্ছে, তা মুখ্যত ১৫০০-১৬০০ শতকে বাংলা -সহ পূর্ব ভারতে সঙ্কলিত তথা প্রচলিত ছিল। সুতরাং বলা যায়, এই সময়ে দেবী সরস্বতী বিদ্যার দেবী হিসেবে এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছেন। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বারোয়ারি তথা গৃহস্থের ঘরে ঘরে দেবী সরস্বতীর যে পূজা, বঙ্গদেশে তার প্রসার উনিশশো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। এর সঙ্গে বাংলায় শিক্ষা প্রসার, পশ্চিমী শিক্ষার উন্মেষ, যা বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম ভরকেন্দ্র হিসেবে বিদ্যাচর্চা নির্ভর অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠা দেয়।  সেই একই ভাবনার প্রেক্ষিত দেবী সরস্বতীর পূজাচার বিস্তার ঘটাতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।

 

বসন্ত ঋতুকে ঋতুরাজ বলা হয়েছে। দেশজ সংস্কৃতিতে এই কাল, উৎসবের এক প্রশস্ত সময়। পূর্ব ভারতে তথা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে মাঘের প্রথম দিনটি আখান দিন- বছরের শুরু। অতীতে হয়তো তাই ছিল, যা গ্রামীণ উৎসব চক্রে পরিধৃত হয়ে আছে। বসন্তের মহা আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবগুলির নান্দীমুখও যেন মাঘের শুক্লা পঞ্চমীর সরস্বতী পুজো। এই বসন্তেই পূর্ব ভারতের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে হয় বাহা বা সাহরুল পরব। হয় হিন্দুদের হোলি। এই জন্য সরস্বতী পুজোর ক্ষেত্রে এই কালটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে হয়। তাছাড়া বিদ্যার দেবী সরস্বতী কেবল হিন্দু ধর্মে নয়, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও মর্যাদা পেয়েছেন। এমনকী, সুফিরাও দেবীকে মান্যতা দিয়েছেন। তাই নানা উপাদান, ভাবনা, এই দেবীকে কেবলমাত্র একটি ধর্মের আচার-সংস্কারের গন্ডিতে বেঁধে না রেখে, একটি সাংস্কৃতিক পরিকল্প নির্মাণে সাহায্য করেছে। এখানে শাস্ত্র, পুরাণ, লোকজ সংস্কৃতি মিলে মিশে গিয়েছে।

 

লোকজ সংস্কৃতির প্রসঙ্গে এসে যায়, সরস্বতী পুজোকে ঘিরে একটি সংস্কারের কথা। আমাদের বলা হত, সরস্বতী পুজো না হলে কুল খাওয়া যাবে না। এ নিয়ে শাস্ত্রে বা মন্ত্রে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। মন্ত্রে বই, দোয়াত, কলম ইত্যাদি দেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু কুল বা পলাশ ফুল নিয়ে কোনও উল্লেখ দেখি না। এর উৎস লৌকিক সংস্কারে নিহিত। হতে পারে, এই বসন্ত কালে ইটোকুমার নামে এক লোক দেবতার ব্রত প্রচলিত ছিল। এই পুজোয় কুল গাছের পাতা আবশ্যক ছিল। কুল খাওয়া সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ইটোকুমার ব্রতের কোনও যোগসূত্র থাকতে পারে।

কুল খাওয়া নিষেধাজ্ঞার আরও একটি কাহিনী আছে।  বদ্রীনাথে ব্যসদেব কুল উৎসর্গ করে দেবী সরস্বতীর অর্চনা করেছিলেন।  বস্তুত, বদ্রী শব্দটির অর্থই হল কুল।  

 

বর্তমানে সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে, একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। শুধু পড়ুয়ারাই নয়, যাঁদের সঙ্গে পড়াশোনার খুব একটা সম্পর্ক নেই, এমন ছেলেমেয়েরাও সরস্বতী পুজোয় বেজায় ধুমধাম করে থাকেন। বিপুল শব্দে মাইক বাজিয়ে তুমুল নাচগান, জগঝম্প শোভাযাত্রা – এসবও সরস্বতী পুজোর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে। আসলে সরস্বতী কোমল স্বভাবের দেবী। টুকটাক ত্রুটি বিচ্যুতি তিনি মানিয়ে নেন। তাই তাঁর পুজো আয়োজনে খুব কসরৎ কিছু নেই, ভয়েরও কিছু ব্যাপার নেই। তাই দেবীকে সামনে রেখে ভরপুর আনন্দের বহু আয়োজন শাখা প্রশাখা মেলে। ধর্ম থেকে রূপ নেয় উৎসব। মনে করা হচ্ছে, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, পাড়া সংস্কৃতির ক্রমক্ষীয়মান দশা হয়তো সরস্বতীর এহেন অবস্থাকে সঙ্কুচিত করবে আগামী দিনে। সত্যিই কী তাই। মানুষের ইতিহাস ক্রমরূপান্তরকামী।  

 

লেখক – সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Mailing List