সন্তু / গল্প

সন্তু / গল্প
10 Jul 2022, 12:30 PM

সন্তু / গল্প

 

সুমন ঘোষ

 

বিড়ির সীমান্ত পার করে কেশেই চলেছে রবিকাকা।

সীমান্ত বলতে সূতোটা। না, এখানে কাঁটাতার নেই। বিএসএফ নেই। চোখে দূরবীন রেখে নজরদারি নেই। তাই সীমান্তের ওপারে যাওয়ার বাধাও নেই। তারপর রাজার স্টাইলে পোঁদিটা ছুড়ে ফেললো। কিন্তু কাশির রেস কমল না।

কামারের হাপর টানার শব্দের মতো বুকে সাঁই সাঁই। তার মাঝেই ভেসে এলো কথাগুলো, তুই যে আস্ত গ্রাম বললি, এখনও কী আস্ত গ্রাম আছে?

আবার ..খক খঅক..খঅঅক..

পাশ থেকে ছুটে গেল বছর বিয়াল্লিশের সমীর। বুকে হাত বুলিয়ে জলের মগটা কাছে ধরল। আদুরে ধমক দিয়ে বলল, তোমায় বলেছি না, বিড়িটা একটু কমাও। বুড়ো বয়সে কাশতে গিয়েই মরবে তুমি। এত যখন কাশছো তখন আবার তর্ক করছো কেন। এখুনি কী কথা না বললেই নয়? কথা বলতে বলতেই উত্তেজিত হবে, তারপর প্রতিদিন এক কান্ড। আগে জল খাও। ঠান্ডা হও। তারপর বোলো।

বুড়ো আরও খান কয়েক কেশে দু’ঢোঁক জল খেয়ে বিষ্ণু মন্দিরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। পাশের গলির রাস্তার দিকটাও দেখে নিল। না, নতুন ছেলে ছোকরারা আশপাশে কেউ নেই। ওরা যে এখন আবার পার্টিটার্টি করে। নেতা হয়েছে। আশ্বস্ত হয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল, এখনও এটা একটা আস্ত গ্রাম বললি কেন?

পঞ্চানন পাতর একটু গলা চড়িয়েই বলল, কেন গ্রাম বলব না? সেটাতো আগে বলো? চাষবাস ছাড়া এখানে আছে কী? চাষ কী আর শহরে হয়?

রবিকাকা, মানে রবিলোচন ঘোষ। পুরনো দিনের আইএ পাশ। এখন সারা শরীর জুড়ে ক্ষেত আর ক্ষেত। সেখানে ধান, আলু, পালং, লঙ্কা, বেগুন ছাড়া কোনও অক্ষর কেউ দেখেনি কখনও। সাক্ষরতা অভিযানের সময় ছবির মতো সই করতে শেখা মানুষগুলোর কাছে তাই তাঁর আলাদা কদর নেই রবির।

রবিকাকা তবু বলতে ছাড়েন না। ফের শুরু করলেন, গ্রাম কাকে বলে রে? ধনঞ্জয়, রোবে, শামু, পাগলা চন্দু, টাঁকলা নাকু - মাটির বাড়ি বলতে তো এই ক’জনের। বাকি তো সবার ঘরই পাকা হয়ে গেল। গ্রামের ভেতর দিয়েও এখন পাকা রাস্তা। সাঁ সাঁ গাড়ি ছুটছে। বাস ধরার জন্য আর কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয় না। সবার ঘরে শৌচাগার। গ্রামেই তো চার-পাঁচটা চা পানের দোকানও.....

 

পাকা রাস্তা, পাকা ঘর মানেই শহর? রবিকাকার কথা শেষ হওয়ার আগেই কলতলায় বাসন ধূতে যাওয়ার পথে কথাটা ছুড়ে দিয়ে গেলেন রামচাঁদের বিধবা বউ বিমলা।

না, উত্তর শোনার মতো ফুরসৎ তাঁর নেই। এখনও ছোট বৌমার ছোট ছেলেটা ঘরে ফেরেনি। আসার পর কী অশান্তি বাধায় কে জানে। এ তো নিত্য ঘটনা। সে আসার আগেই বাসনকোসন ধূয়ে ফিরতে হবে। আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে ভাত বেড়ে দিতে হয়। না হলেই কুরুক্ষেত্র। যেন অফিস থেকে ফিরেছেন বাবু।

এই রামচাঁদ বনিকরাই এই এলাকার দশ বিশটা গ্রামের মধ্যে একমাত্র ব্যবসায়ী ছিল। ঘরের নীচের অংশটা ছিল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। দু’খানা সাইকেল, একটা পালকি ছিল। ঠাকুর, পুকুর কী ছিল না! বাড়িতে নারায়ণ পর্যন্ত ছিল। নিত্যসেবা হত। জগদ্ধাত্রী পুজোও হত ধুমধাম করে। আশপাশের ৫-৭টা গ্রামের বেশিরভাগ মানুষকে একদিন ভুরিভোজ খাওয়াতো। জমিও ছিল বিঘে চল্লিশেক। তিন ফসলী সোনার জমি। গাঁয়ের বেশিরভাগ মানুষ ওদের ঘরেই মজুর খেটেই সংসার চালাতো।

বিমলার কথায় রামচাঁদ বনিকদের পুরনো কথা মনে পড়ে গেল রবিকাকার। বলতে শুরু করলেন, বিমলা বৌদিকে আগে কখনও কাজ করতে হত না। সব কাজ করত চাকর-বাকররাই। আমরা তো ওদের ঘরেই মজুর খাটতাম। তখন মাথায় করে, ছালায় করে ধান বইতে হত। গরুর গাড়ি ছিল বটে, কিন্তু সবদিকে তো গাড়ি যাওয়ার রাস্তা ছিল না। হেঁটে-সাইকেলে যেতাম মাইলের পর মাইল। তেষ্টা পেলে পুকুরের জল খেয়ে তেষ্টা মেটাতাম। কিংবা ভরা গ্রীষ্মে যখন নদীও শুকিয়ে যেত তখম বালি খুঁড়ে গর্ত করতাম। সে গর্তে জল জল জমতো একটু একটু করে। আঁচলা ভরে জল তুলে তেষ্টা মেটাতে হত। আর এখন? ধান লাগানো থেকে ঝাড়া – সব মেশিনে। আলুর জমি তৈরি থেকে আলু তোলা- সবই মেশিনে! বড় বড় লরি ঢুকে যাচ্ছে। একদিনে কয়েকশ বিঘের মাঠ ফাঁকা। সোজা আলু চলে যাচ্ছে হিমঘরে! তখন গরুর গাড়িতে বস্তা ১৫-২০, মানে বড়জোর ১০ কুইন্টাল আলু বিক্রি করতে দুপুর গড়িয়ে রাত হত। দু’পয়সার মুড়ি আর ঝালবড়া খেতে খেতে যখন ঘরে ফিরতাম তখন গোটা গ্রাম ঘুমিয়ে। গরুর গাড়ির নীচে লন্ঠনের আলো জ্বেলে ফিরতে হত।

তারপরই নিজেই মুচকি হাঁসলেন। যেন মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়লো একঝলক তাজা বাতাস। সে বাতাসে ভেসে এলো, প্রথমবার আলু বিক্রি করার পর বাড়ির সবার জন্য জিলিপিও কিনতে আনতাম শালপাতার খালায়। তা দেখে সবার কী কাড়াকাড়ি। আর এখন দু’পা গেলে ধাবা। কত রকমের খাবার। মুখে বললি কী বললি না, সঙ্গে সঙ্গে বানিয়ে দিচ্ছে! চাইলেই এসে যাচ্ছে দেশি বিদেশি-মদ! চা-পানের দোকানেও তো লুকিয়ে মদ বিক্রি হচ্ছে রে এখন। কে না জানে! এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল রবিকাকা।

সঙ্গে সঙ্গে যতীন বলে উঠল, রবিদা, তোমার সেই কথাটা মনে আছে? মদের কথা বললে বলেই মনে পড়ল।

রবিকাকা জিগ্যেস করল, কোন কথাটা রে?

ওই যে গো, যেবার আমার ঘর ছাওয়া হল। আগের বর্ষায় সব খড় পচে গেল। ছাউনি দিয়ে হড়হড় জল গলে। হাঁড়ি-কলসী পেতেও জল থামাতে পারিনি। তুমিই তো খড় ধার দিয়েছিলে। তারপর মহাদেবকাকাকে জোর করে ধরে এনে ঘর ছাওয়ালাম।

মহাদেব কাকা কী শর্ত দিয়েছিল মনে আছে?

যতীনের প্রশ্নে রবিকাকা মাথা চুলকোতে শুরু করল রবিকাকা, উঁহু, মনে তো পড়ছে না।

আরে বাবা, এত বড় কথাটা ভুলে গেলে। মহাদেবকাকার শর্ত ছিল না, টাকা তো দিতেই হবে। কিন্তু ভাইপো মদও খাওয়াতে হবে।

বাধ্য হয়ে রাজি হলাম। ঘর ছাইতে ছাইতে সন্ধে নামলো। টাকা দিতেই লন্ঠন হাতে মহাদেবকা বেরোলো মদ আনতে। সন্ধে থেকে মাঝরাত গড়িয়ে ভোর। মহাদেবকাকার দেখা নাই। আমি পঞ্চাখুড়ো, বিশুদা – তিনজনে ঠাই দাঁড়িয়ে। মহাদেবকাকা এলে মদ খাবো। সে আর ফেরে না। ভাবলাম হয়তো মাল খেয়ে টাল্লা হয়ে কোথাও ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা বোকার মতো রাত জাগছি। পরদিন ভোর হওয়ার মুখে মহাদেবকা যখন ফিরল পঞ্চাখুড়ো তো এই মারতে যায়, সেই মারতে যায়। আমরা যাহোক করে জাপটে ধরে আটকালাম। তারপর মহাদেবকাকা যে গল্প শোনালো সাতসকালে তাতেই নেশা হয়ে গেল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়বে না আবার। সে গল্প কী কেউ ভোলে কখনও। রবিকাকার তীব্র হাসিতে রাতের ঘন অ‌ন্ধকারও যেন হাসিতে লুটিয়ে পড়ল। এ গল্প রবিকাকার পরের প্রজন্মদের জানা নেই। তাই তারা চেপে ধরলো, পুরো গল্পটা বলো, বলতেই হবে।

রবিকাকা বপলো থাক না, আজ কেন? অন্যদিন বলি?

কিন্তু সবাই নাছোড়বান্দা। অগত্যা শুরু করলেন রবিকাকা, মহাদেবকা আজ বেঁচে নেই।

বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। খুব সাহসী ছিল রে লোকটা। বিরাট লম্বা, মানে দীর্ঘদেহী মানুষ। একটা পা যদি এখানে পড়ত তো আর একটা পা ওই সেখানে। সেদিন প্রথমে পাইকপাড়া গিয়েছিল। পাইকভাটিতে মদ না পেয়ে অর্জুনগড়। সেখানেও মদ শেষ দেখে ফেরার পথে নদী পেরিয়ে গেল কেল্লাপুর। তারা তখন মাঝরাতে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। ডাকাহাঁকা করতেই লোকে ‘চোর চোর’ বলে তেড়ে এলো। মহাদেবকা এক দৌড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে নদী পেরিয়ে একেবারে এপারে এসে থেমেছিল।

কতটা রাস্তা গিয়েছিল মহাদেবকা। সেই হিসেব কষতে লাগলো সমীর। হ্যাঁ, তা কম করেও ৩৫-৪০ কিলোমিটার তো বটেই। আবার হাসিতে ফেটে পড়ল সকলে। একটু মদের জন্য রাতভর ৩৫-৪০ কিলোমিটার হেঁটে যেতে পারে একজন! একথা এখন কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে কার সাধ্য!

রবিকাকা এবার গম্ভীর হয়ে বলল, তবে আর বলছি কী? এখন দু’পা বাড়ালেই দিশি-বিদেশি মদ! তাও আবার খাট পেতে বসে। রাস্তা দিয়ে ছেলে মেয়েরা যেতে যেতেও দেখতে পাবে, কাকা-জ্যাঠারা মদ খাচ্ছে!

 

ধমকে উঠ‌ল তরুণ। না, বয়সে নয়, নামে। তোমার এই যত বাজে কথা। তুমি তো চুটা খেতে। এখন বিড়ি খাও। কেউ কিছু বলেছে। তোমরা না সময়ের এগিয়ে চলাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারো না। তুমিও তো গাঁয়ে মদ তৈরি করতে। মনে নেই।

কাশি কিছুটা কমেছে। রবিকাকা বুকে একটু হাত বুলিয়ে বলল, বছরে একটা পুজো। আনন্দ করব না। তাই মদ তৈরি করতুম রে। মা কালী কে দিতুম। বন্ধুরা খেতুম। আত্মীয়-কুটুমদেরও খাওয়াতে হত। সেটাও করতুম গাঁয়ের বাইরে। ঝোপের আড়ালে।

তরুন আরও উত্তেজিত। এখনও তো চোলাইয়ের রমরমা। মজুর করলে আগে মাইনের সঙ্গে সকালে মুড়ি আর দুপুরে ভাত খাওয়াতে হত। এখন তাতে কোনও মজুর যাবে। আগে বলবে, মদ দেবে তো? তুমিও তো তাতেই রাজি হও।

তরুনকে সমর্থন জানালো সমীর। সন্ধের পর কতগুলো জায়গায় মদের আসর বসে জানো? পিড়িপুকুরের ঝোপের ভেতরটা দেখোনি? সন্ধে হলেই ছায়ারা মতো কারা কারা ঢোকে আর বেরোয়। রাত ৮টার পর তো খুল্লমখুল্লা। ওদিকে এখন ঘরের মেয়েরাও যেতে ভয় পায়, জানো?

তীর্থঙ্কর এতক্ষন চুপ করে সব শুনছিল। ওর স্বভাবই কম কথা বলা। আসলে একটু তোৎলায়। তাই ইচ্ছে থাকলেও সব বলতে পারে না। কিন্তু আজ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করল। সব মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ব-ব-বণিকদের ছেলেটার কাজ.. মা-মা-মানি কী করে?

ওপাড়ার দিলীপ আজ শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। পাশের গ্রামেই শ্বশুরবাড়ি। তাই আজ আসরে পৌঁছতে একটু দেরি। সোজা শ্বশুর বাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার আগে হাজির হল আড্ডায়। তীর্থঙ্কর উত্তেজিত দেখে সে অবাক। তাই বসার আগেই প্রশ্নটা করে বসল, কেন? সে আবার কী করল?

তারাপদ বলল, প্রতিদিন মদ খেয়ে বৌ পেটায়, কে না জানে? সেদিন তো বিনা পয়সায় পাওয়া রেশনের চালগুলোও চন্দনের দোকানে বেচে দিল। এক্কেবারে জলের দরে। চারজনের কার্ড। ২০ টাকা পেতেই খুশি। শুধু দু’গ্লাসের জন্য। এদিকে ঘরে বৌ-বাচ্চাটা কী খাবে সেদিকে হুঁশ নেই।

এই জ‌ন্যেই তো ভাইকে সেলুনে বসতে দিইনি। হয় নিজে চুল ছাঁটি নাহলে দোকানে চাবি দিয়ে দিই।

কী কথা থেকে কী কথায় এলিরে গোপাল? তোদের আবার কী হল?

চঞ্চলের কথায় গোপাল বলল, তুমি কী কিছুই জানো না। কী আর বলব বলো? একটু রোজগার বাড়লেই, ভাইয়ের নেশাটা বাড়ে। যদি কোনও কারণে শ’খানেক রোজগার করে বসে, তিনদিন তাকে কেউ দেখতে পাবে না। ঝোপের ভেতরে ঢুকবে আর গিলবে।  ঘরে ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়বে। ভাত, মুড়ি কিচ্ছুটি খাবে না। চেহারা দেখেছো? এক্সরে করতে হলে সূর্যের উল্টো দিকে দাঁড় করালেই হল। ডাক্তার সব বুঝে যাবে।

মাথা চুলকোতে চুলকোতে আবার বললো. শোনো, তোমাদের এখানে তো নেতাও আছো। প্লাস্টিক ব্যাগ দেখলে জরিমানা করতে বলেছে সরকার। তা সে মাংস আনো বা পটল তোলো। তাহলে মদ কী করে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরা হচ্ছে?

এবার দিলীপ বলল, গোপাল তুই থাম। ওই যে বণিকদের কথা বলছিলি, ওটা কী রে?

 

গোপাল একটু ইতস্তত করে শুরু করল। মনে মনে ভাবলো, কথাটা বলে ভুল করেছি নাকি? এরা এখনও কথাটা শোনেনি? নাকি আমার মুখ দিয়ে বলিয়ে নিতে চাইছে। আমি সবাইকে বলেছি জানলে তো আবার অশান্তি।

সমীর আবার বলল, কী রে গোপাল, বণিকদের সন্তুর কথাটা বললি না যে? সে তো বউকে প্রতিদিন মারধর করতো। রেশনের চাল তুলেই কালুর দোকানে বেচে দিত। আটার প্যাকেটটা বেচেও মাল খেয়েছে বলে শুনেছি। আবার নতুন কী বলবি?

তখন পাশের গ্রামের ডোম পাড়ার হারু পিড়িপুকুর থেকে ঘরে ফিরছিল। কথাটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়ালো। এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কখনও দাঁড়ায়নি। মানে সাহস পায়নি। আজ কথাটা শুনে মনে একটু সাহস পেল। ভদ্র পাড়ার একজনের কুকর্ম নিয়ে আল‌োচনা তো।

সবার দিকে তাকিয়ে হা হা হা করে হাসতে লাগলো। তোমরা এটা শোনোনি?  আমার ভাই তেমুই তো ধরল। ক্যানেলের পাড়ে গরু চরাচ্ছিল। তখন চাচা সাইকেল নিয়ে ওদিকে যাচ্ছে। সন্তু ক্যানেলের পোলে বসে ছিল। চাচা যেতেই বলল, তাড়াহুড়ো করো। ওজোন করার তরই দিল না। চাচা যত বলছে, ওজোন দেখ। ও বলছে, ঠিক আছে। দাও শ‘খানেক টাকা। তাতেই হবে। শেষে চাচা ৫৫ টাকায় রাজি হল। টাকা নিয়ে নিমেষে টর্ণেডোর মতো পিড়ি পুকুরে উড়ে গেল সন্তু।

সে পালানোর পরেই তেমু এসে চাচাকে ধরে, দেখি কী কিনেছো?

চাচা বস্তা খুলতেই তেমু অবাক। এ তো ঘন্টা, ঝাঁঝর, কুশি-কাঁসি। বিষ্ণু ও জগদ্ধাত্রীর বাসনকোসন!

তেমু ছোটজাতের ছেলে। পড়াশোনাও করেনি। কিন্তু বাবার কাছ থেকে বণিকদের গল্প শুনেছিল। ঘরে ঠাকুর আছে। অনেক বড়ো ঘর ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এখন সব মাটিতে মিশেছে। ছিটেবেড়ার ঘরে থাকে।

তাই বলে ঠাকুরের বাসন-কোসন বেচে দেবে!

চাচাকে থামালো, তুমি দাঁড়াও। ওদের ঘরে খবর পাঠায়। যদি তোমায় টাকা ফেরৎ দিয়ে এগুলো নিয়ে যায়।

ঘরে খবর পাঠিয়েছিল তেমু। চাচাও প্রায় ঘন্টা তিনেক বসেছিল। বিষয়টি শুধু ঠাকুরের বাসনকোসন না। এখন হিন্দু মুসলমান মানে যে বড় চর্চা। কিনেছে যে চাচা। কী করতে কী হয় কে জানে? তাই চাচা এক পাও নড়েনি। কিন্তু সন্তুর ঘরে খবর দিলেও কেউ আসেনি। আসবেই বা কে? ক’টাকা নিয়েছে তা তো কারও জানা নেই। সে টাকা দিয়ে জিনিস ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে কী করে? সে সম্বলও তো নেই। আর এ  সময় সন্তু কে খুঁজেও লাভ নেই তাও সবার জানা। কারণ, ততক্ষণে পলিথিনের প্যাকাটে থাকা তরলের মতোই টাকাগুলো ঢুকে গেছে সন্তুর পেটে।

 

বিষ্ণু কিভাবে খাবে, জগদ্ধাত্রীর কী হবে, এসব ভাবার সময় নেই। তার চোখে পৃথিবী এখন টলছে। যেন এখুনি ধ্বংস হবে। এসব রেখেই কী লাভ।

পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করে। একটা বিড়ি জ্বালিয়ে সুখটান দিতে দিতে ঘরের পথে পা বাড়ায় আর পাঁচটা দিনের মতোই।

রবিকাকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কেন বারবার ধাবার কথা বলছি বুঝতে পারলি। চোলাইয়েই ঠাকুর রক্ষে পাচ্ছে না। শত শত বছরের পুরনো বাসনকোসন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে চাচার কাছে। এবার আরও কত কী ঘটবে কে জানে...

.............

 

 

Mailing List