সবুজের নতুন সূর্য / গল্প

সবুজের নতুন সূর্য / গল্প
04 Oct 2020, 02:01 PM

সবুজের নতুন সূর্য

সুমন ঘোষ

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই তৈরি। এত সকালে কবে ঘুম থেকে উঠেছিল মনে নেই সবুজের। তবু যে কেন এক অদ্ভুত টান তাকে যেন জোর করে ঘুম থেকে তুলে দিল।

সবুজ তো নিজেই অবাক। জানালাটা একটু খুলে বহুতল এড়িয়ে কাঁচিমারা আকাশের দিকে তাকানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল, ওয়াও। ওয়ান্ডারফুল। সকালের রহস্য। আহা রোমাঞ্চকর। আমি সকালের সঙ্গেই থাকতে চাই।  

কলকাতা, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর তো ছার। হুঁ, কথায় লন্ডন, সুইৎজারল্যান্ডও যেন এখন পাশের বাড়ি। মাল্টি ন্যাশনাল সংস্থায় কাজ করে। অনেক রাত পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ করতে হয়। মাথার মধ্যে দিনরাত ঘুরঘুর করে ব্যবসা। না, নিজের নয়, মালিকের ব্যবসা বাড়ানো। তবে তো নিজের মাইনে বাড়বে। কাজ পাকতে পাকতে ঝুনো হবে। নাহলে করোনার যা পরিস্থিতি, জীবন্ত মানুষকেও যে মরে ফেলছে। খাব কী? অনেক পরের কথা। নতুন ভাবনা দূরের কথা, বর্তমান ভাবতেও ভয় করে। এখন ধীরে ধীরে মানুষ হয়তো অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যদিও ইচ্ছে মতো ঘোরার ক্ষেত্রে শহরে কিছু মানুষ এখন নিয়ম নীতি মানে। মানে তাই বা বলি কী করে। চা, পানের দোকান, রকের আড্ডা, এসব তো চলছেই। তবু বাড়ি ফিরতে রাত হল সবুজের। তাই ভেবেছিল, হয়তো সকালে উঠতে পারবে না। কিন্তু কোনও এক অজানা আলো ভোর হওয়ার আগেই চোখের ওপর পড়ল। সূর্যের থেকেও তার তেজ ভয়ঙ্কর। দুম করে বিছানা থেকে উড়ে পড়ল সবুজ।

 তারপরই জানাল খুলে সকালের অন্যরূপ দর্শন। কিন্তু তাতেও বাধা। বেরুতে হবে তো। হঠাৎ জানালা বন্ধ করে, আধো আকাশের মায়া ছেড়ে সোজা বাথরুমে। চোখ, মুখ ধূয়ে সোজা কিচেনে। চা বানিয়ে তাতে চুমুক দিতে দিতেই গোটা দুই টি শার্ট, প্যান্ট, ট্রাউজার ‌নিয়ে ব্যাগ গোছানো। এতো বিদেশ নয়। দেশ। তাই ব্যাগ গোছানোর আহামরি কোনও ভাব নেই। তারপর ঘরে তালা মেরে সোজা গাড়িতে। শহরের কংক্রিট ছাড়িয়ে, পরমাণু আকাশকে টাটা করে বেরিয়ে পড়ল জাতীয় সড়ক ধরে। মাঝে মাঝেই দীর্ঘ সবুজ মাঠ। তার ফাঁকে ফাঁকে কিছু গঞ্জ। দোকানপাট। এক সময় মোরাম রাস্তার ধূলো উড়িয়ে, ধানের খেত পেরিয়ে গ্রামে। সে ঘরে এখনও খড়ের ছাউনি। কিছুটা যে অ্যাসবেসটস পড়েনি তা নয়। তবে তার বেশি কিছু না। তা করতেও চায়নি সবুজ। কারণ, পুরনো স্বপ্নকে ধূলিস্যাৎ করার এতটুকু ইচ্ছে নাই তার। হঠাৎ দেশ বিদেশে উড়ে যাওয়া, সমুদ্র তটে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে নিশ্চয় মাদকতা আছে। কিন্তু হাঁস চরে বেড়ানো, ছাগলের উঁহু ডাক, গামছা পরে লাঙল কাঁধে যাওয়ার বাস্তবতা অনেক বেশি কাছের। তাই যখন জ্যাঠ্যা, কাকারা বলে, এই তুই ঘরটা পাকা করছিস না কেন? ওপাড়ার নন্দ জ্যাঠা, বামুনদিঘীর বঙ্কু জেলেও এখন পাকা ঘর করেছে।

তখন কেবল হাসে সে। এটাই তো চাই। সবাই ভালো থাকুক। বড় হোক। কিন্তু শুধু কী পাকা ঘর করলেই বড় হওয়া যায়? সত্যিই পোক্ত হয় সব কিছু। এ প্রশ্নটা তার মনের মধ্যেও জাগেল। কিন্তু প্রশ্ন করতে সাহস করে না। কারণ, তাতে বড়রা যদি দুঃখ পান। তা নীরবে মেনে নেয় সবুজ।

বাড়ি ফিরেই আর কোনও দিকে তাকানো নয়। বাড়ি ফিরেই প্যান্ট জামা ছেড়ে ট্রাউজার আর চি শার্ট পরে তৈরি। এবার বেরিয়ে যাবে। দেখেই মা চিৎকার করে ওঠে, তুই কী এতটুকুও বদলাবি না? চা টা তো খেয়ে যা।

অমনি এক চুমুকে চা খেয়ে সোজা দালান বাইরে, পুকুরের পাশ দিয়ে, পাট খেত ছেড়ে নদীর ধারে। আহা, নদী যে তার ভীষণ প্রিয়। নদীর ছলাৎ ছলাৎ দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে। আর যখন সূর্য অস্ত যায়, শেষবারের মতো নদীর জলে আয়নার মতো দেখা দেয়, সে রূপ দেখে নদীর জলে নামতে ইচ্ছে করে। যেন স্বর্গের ভাবনার থেকেও বেশি কিছু। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন দু’হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দেয়। সূর্যাস্তের শব্দের মতো কানে কিছু একটা বাজে, কিন্তু তা বোঝার সাধ্য তার নেই। তারপরেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে চোখ ছেড়ে দে দৌড়। পেছন ফিরে তাকানো আগেই অনেকটা চলে গিয়েছে। প্রাণপনে দৌড়ে তাকে ধরার চেষ্টা করে। কিছুটা গিয়ে হাত বাড়ায়। ধরতে গিয়েও ধৱতে পারে না। হাত বাড়িয়ে ধরার সময় শুধু ডান হাতের আঙুলগুলো তার পিঠ ছুঁতে গিয়ে কোমর স্পর্শ করেই ফিরে আসে। টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবুজ।

নীল ওড়না উড়িয়ে অষ্টাদশী উত্তরা দৌড়েই চলে। তার ভাঁজে ভাঁজে ঝড়ের ব্যাকুলতা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, উত্তরপ্রদেশে কী ঘটেছে শুনেছো। টিভিতে দেখছিলাম।

লোভাতুর সবুজ সজীব ঘ্রাণ ভুলে পোড়া গন্ধ নাকে আসে সবুজের। আর কিছু ভাবতে চায় না। সূর্যের চলে যাওয়ার সাথে সাথে দুই পারের আগলে রাখা জলটা হঠাৎ কেমন অন্ধকারে ম্নান হয়ে যায়। যা দেখা যায় না। শুধু তার কলতান শোনা যায়। আজ, সেই কলতান, উত্তরপ্রদেশে কী ঘটেছে শুনেছো। টিভিতে দেখছিলাম।

সবুজ দ্রুত ঘরে ফেরে। আজ আর পাড়া প্রতিবেশী কারও সঙ্গে কথা বলেনি। সোজা ঢুকে যায় শোবার ঘরে। খাবার জন্য মা ডেকেও সাড়া পায়নি। জীবনে আজ প্রথম সবুজ সারা রাত জেগে কাটাল। নতুন সূর্য দেখবে বলে।

     

Mailing List