রক ব্রেকার / গল্প/ দ্বিতীয় পর্ব

রক ব্রেকার / গল্প/ দ্বিতীয় পর্ব
12 Sep 2021, 11:10 AM

রক ব্রেকার

 

সুদীপ সরকার

 

সিঙ্গুর আন্দোলনের এক পিঠ যদি হয় অনিচ্ছুক চাষিদের ভূমি রক্ষার লড়াই, অন্য পিঠে তাহলে থাকবে দশ বছর পর সেই জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইচ্ছুক অনিচ্ছুক চাষি নির্বিশেষে সবাইকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কর্মসূত্রে তার সাক্ষী ছিলাম আমি। চুঁচুড়া মহকুমার মহকুমা শাসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম ২০১৬ সালে। যখন সিঙ্গুরে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল জেলা প্রশাসন। টানা কয়েক মাসের বিরাট কর্মযজ্ঞের ইতিহাস কোথাও লেখা থাকবে কিনা জানি না। নিজের চোখে দেখা এবং অনুভূত ঘটনা প্রবাহের একটা ছোট বিবরণ এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। খাসেরভেড়ি, বেড়াবেড়ি, গোপালনগর মৌজা গুলিতে তখন চরমতম প্রশাসনিক ব্যস্ততা। যা লিখলাম সবটাই সত্যি। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কিছু থেকে গেল। উল্লেখ করা হল না অনেক ঘটনার কথা। বাকি থেকে গেল অনেকের অবদানের কথাও, যাঁরা দিন রাত এক করে একটা প্রায়- অসম্ভব একটা কাজকে সম্ভব করে তুলেছিলেন তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে। এই ভূমিকাটুকু থাকলে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটানো আরও সহজ হবে। তাই ভূমিকার অবতারণা। তিন পর্বে লেখাটি দেওয়া হল। আজ

 

দ্বিতীয় পর্ব

 

“সেই দিন টার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমরা পালা করে বসতাম ধর্না মঞ্চে। গ্রামের মানুষরা পণ করেছিলাম, জান দেব, তবু জমি দেবো না। বাপ ঠাকুরদার জমি কি এমনি এমনি কারো হাতে তুলে দেওয়া যায়? জমি যে আমাদের অস্তিত্ব, রুজি, ভরসা। প্রতিদিনের মতোই ধর্না মঞ্চের দিকে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম কিছু লোক হৈ হৈ করে ছুটে যাচ্ছে বাজেমিলিয়ার দিকে, একটি মেয়ের লাশ পড়ে আছে মাঠের মাঝে। সেই সব দিন গুলো আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তারপর তো কত আন্দোলন, কত অঙ্গিকার, লড়াই, মিডিয়ার ঝলকানি, বাকিটা ইতিহাস।” একনাগাড়ে বলে থামলেন সুবোধ সাহা। আজই আলাপ হল সুবোধ বাবুর সাথে, আমাদের ক্যাম্প অফিসে। সমাজের অনেক বিভাজনের মতোই, সিঙ্গুরের মানুষও দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত, ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক। সুবোধ বাবু অনিচ্ছুক জমিদাতা। মহামান্য আদালতের নির্দেশে জমি ফেরানোর কাজ শুরু হতেই এই মানুষগুলো আবার বাঁচার শক্তি ফিরে পেয়েছেন যেন।

“এবার চেক নিলেন তো? কত পেলেন?”, জিগ্যেস করলাম।

মুচকি হাসলেন সুবোধ বাবু, “চেক তো নেবই, এতো আন্দোলন, এতো লড়াই, এ তো আমাদের নৈতিক জয়। জান এর থেকে মান বড়। এই চেক তো শুধু টাকা নয়, স্বীকৃতিও বটে।”

“আর টাকা? কত পেলেন?” মিহির প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

“তা প্রায় লাখ পাঁচেক ধরুন।” হাসলেন সুবোধ বাবু।

“দারুণ ব্যাপার তো, কি করবেন এতো টাকা? মানে হঠাৎ এতো গুলো টাকা তো, তাই জিগ্যেস করছিলাম” বলেই ফেললাম।   

“স্যার, একটা কথা আছে জানেন তো; অর্থই অনর্থের কারণ। এত দিন এক রকম চলে যাচ্ছিল, এবার তো এই টাকার ভাগ নিয়ে অশান্তি শুরু হল বলে। তিন ছেলে, সবাই চাইছে টাকার ভাগ। কি করব জানি না। গিন্নির সাথে আলোচনা করতে হবে, দেখি শেষ পর্যন্ত কি হয়। সমস্যার কি আর শেষ আছে স্যার! কি বলব; বাঁচা দায়, মরা কঠিন।” সুবোধ বাবু হাই তুললেন।

ফোন টা বেজে উঠল, বিডিও সিঙ্গুরের গলায় প্রত্যয়, “স্যার, আজ কিন্তু দশমীর স্পেশাল মেনু, আপনাদের লাঞ্চ কি ওখানেই পাঠাব?”   

“আরেব্বাস, সেই ভাল, আমরা এখানেই খাবো, পাঠিয়ে দাও”, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললাম। মিহির কে বললাম আমাদের টিমের অফিসারদের ডেকে নিতে।. খাবার আসতে প্রায় আধ ঘণ্টা লেগে গেল। মূল প্রশাসনিক ভবন থেকে বেড়াবেড়ির এই প্রান্তটি প্রায় ২ কিমি দূরে। সেখানে তল্পিতল্পা নিয়ে ঘাঁটি গেঁড়েছেন খোদ জেলাশাসক মহাশয়। পুরো প্রজেক্ট এলাকার কর্মকাণ্ড সেখান থেকেই পরিচালনা করছেন তিনি। একটি অনুসারি কোম্পানির ছেড়ে যাওয়া দোতলা বাড়ির সবটা জুড়ে অস্থায়ী প্রশাসনিক ভবন। মেক শিফট অফিসে সারাদিন মানুষের ভিড় লেগে আছে, মিটিং চলছে একের পর এক। বিডিও সিঙ্গুর ছেলেটি অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ভালো। এতো চাপের মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব কাজ সামলাচ্ছে। কালী মন্দিরের সামনে খাওয়া নিষেধ, তাই গাড়িতে বসেই আমরা স্পেশাল মধ্যাহ্ন ভোজ সারলাম। স্বভাব সিদ্ধ কিছু আড্ডা হল, তারপর আবার কাজ। মিহির আর আমি আবার বেরোলাম মাঠে। এডিএম সাহেব আসার আগে সব রিপোর্ট রেডি রাখতে হবে।  

 

একদম সকাল দশটা পাঁচে মিটিং শুরু হল। ডিএম সাহেব আলোচনা শুরু করলেন। PWD, HRBC, KMDA, কোলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সব কর্তা ব্যক্তিরাই হাজির। মিনিট কয়েকের মধ্যেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী চলে এলেন। কি দুরূহ কাজ যে করতে হচ্ছে, সেটাই বোঝাতে লাগলেন সকলে। জানা গেল যে, আর দিন দশেকের মধ্যেই সমস্ত কাজ শেষ করতে হবে। বিশাল বিশাল শেড ভেঙে ফেলার কাজটা যে খুব সহজে হবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে। বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। দিন রাত এক করে চলছে শেড ভাঙার কাজ। তবুও কাজ কবে শেষ করা যাবে, সে ব্যপারে সবাই সন্দিহান। আমরা আমাদের ওপর ন্যাস্ত কাজের অগ্রগতির ব্যাপারে রিপোর্ট করলাম। জানা গেল, আরও কিছু বাঁধ তৈরি করতে হবে জমির ওপর, ঠিক যেমন আগে ছিল। শেড ভাঙার পর যে সমস্ত রাবিশ বেরোবে, তা দিয়েই তৈরি হবে বাঁধ।

 

তিন নম্বর জোনের এক প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে একটি বাঁধ যাবে আড়াআড়ি, চার এবং পাঁচ নম্বর জোনের ওপর দিয়ে। মিটিং শেষে ফিরে এলাম আমাদের শ্মশান লাগোয়া ক্যাম্পে। বিকেল বেলায় মন্দিরের পুরোহিত মশায় আমাদের প্রসাদ দিলেন। শশা, কলা, পেয়ারা, শাঁকালু, সঙ্গে গুজিয়া। এই কদিনেই মানুষটি আমাদের বেশ কাছের হয়ে উঠেছেন। কখনও নাম জানার দরকার হয়নি, পুরোহিত মশাই আমাদের কাছে মহারাজ বটে। মায়ের পুজোর ফাঁকে, প্রসাদ বিতরণের সাথে সাথে চলে নানা গল্প, কবে থেকে মহারাজ এই জনমানবহীন শ্মশানে ডেরা বেঁধেছেন, তাঁর বাড়িতে কে আছেন, একা একা ভয় করে কিনা, এই সব। শুনে অবাক হয়ে যাই, পুরোহিত এখানে ভালোবেসেই আছে, একাকী এই শ্মশানের নিস্তব্ধতা কে সঙ্গী করে, নিজেকে ঈশ্বর চিন্তায় নিয়োজিত রেখে, বছরের পর বছর। সন্ধ্যা নামে নিজের নিয়মে, মন্দিরে জ্বলে ওঠে প্রদীপ, বটের ঝুরি বেয়ে নেমে আসে রাত্রির নিস্তব্ধতা। শ্মশানের ধারের মজে যাওয়া জলাশয় থেকে, শান বাঁধানো চিতা থেকে অনেকটা জমাট বাঁধা হাহাকার যেন সমস্ত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, গা ছমছম করে ওঠে। মা বলেন, তুলা রাশি জাত মানুষদের নাকি মন খুব হালকা হয়। তাই হবে হয়তো, নাহলে এসব মনে হবে কেন! আমরা ক্যাম্প ছেড়ে উঠে পড়লাম। এবার অনেকটা রাত পর্যন্ত নোঙ্গর ফেলব পাঁচ নম্বর জোনে। এক্সপ্রেসওয়ের পাশে। সব যন্ত্র এখন এখানে কাজ করবে। দানবের মতো সাফ করবে পাহাড় প্রমান রাবিশ কিম্বা বালির ঢিবি। মুহূর্তে ভর্তি হতে থাকবে ছোট বড় জলাশয়। ওদিকে রক ব্রেকার গুলো বড় বড় শেড ভাঙার কাজে লেগে আছে, কান সওয়া হয়ে গেছে তাদের গোঙানির নিরন্তর শব্দ।

(চলবে..)

অলঙ্করণ: দেবার্ঘ ঘোষ

ads

Mailing List