রক ব্রেকার/ গল্প / শেষ পর্ব

রক ব্রেকার/ গল্প / শেষ পর্ব
19 Sep 2021, 11:12 AM

রক ব্রেকার

সুদীপ সরকার

 

সিঙ্গুর আন্দোলনের এক পিঠ যদি হয় অনিচ্ছুক চাষিদের ভূমি রক্ষার লড়াই, অন্য পিঠে তাহলে থাকবে দশ বছর পর সেই জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইচ্ছুক অনিচ্ছুক চাষি নির্বিশেষে সবাইকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কর্মসূত্রে তার সাক্ষী ছিলাম আমি। চুঁচুড়া মহকুমার মহকুমা শাসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম ২০১৬ সালে। যখন সিঙ্গুরে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল জেলা প্রশাসন। টানা কয়েক মাসের বিরাট কর্মযজ্ঞের ইতিহাস কোথাও লেখা থাকবে কিনা জানি না। নিজের চোখে দেখা এবং অনুভূত ঘটনা প্রবাহের একটা ছোট বিবরণ এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। খাসেরভেড়ি, বেড়াবেড়ি, গোপালনগর মৌজা গুলিতে তখন চরমতম প্রশাসনিক ব্যস্ততা। যা লিখলাম সবটাই সত্যি। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কিছু থেকে গেল। উল্লেখ করা হল না অনেক ঘটনার কথা। বাকি থেকে গেল অনেকের অবদানের কথাও, যাঁরা দিন রাত এক করে একটা প্রায়- অসম্ভব একটা কাজকে সম্ভব করে তুলেছিলেন তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে। এই ভূমিকাটুকু থাকলে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটানো আরও সহজ হবে। তাই ভূমিকার অবতারণা। তিন পর্বে লেখাটি দেওয়া হল। আজ শেষর্ব

 

এবারের পুজার দিন গুলো অন্য রকম ভাবে কেটে গেল, কখন পাড়ার সবাই মিলে দল বেঁধে পুস্পাঞ্জলী দিল। কখন সন্ধি পুজো হল আর কখন নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে গেল, এ সব কিছু থেকে আমরা অনেক দুরেই থেকে গেলাম। মিহির বা রায়াদির দুঃখ আরও একটু বেশি। দুজনেই পুজোর ছুটিতে বাইরে যাবার টিকিট কেটে রেখেছিল। হোটেল বা গাড়ির অগ্রিমের টাকা গুলো গেছে। এ দুঃখ বুঝি ভোলার নয়। তবে কাজের জন্যে, সরকারি আদেশ পালনের জন্যে, হাসি মুখে মেনে নিয়েছে এই ছুটি বাতিলের নির্দেশ। রায়া দি একটা ট্র্যাক্টরের ওপরে, চালকের পাশে বসে চাষ করছিল। গোপালননগর এর জমি গুলো আগে চাষ যোগ্য করে ফেরানো হবে। কর্মতৎপরতা তাই তুঙ্গে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আসবেন জমি বণ্টনে। রায়া দি, চয়ন, ঈশা এরা গোপালনগর এ অবস্থিত ছয় থেকে দশ নম্বর জোনের দায়িত্বে রয়েছে। জমি সমতলীকরণ করতেই ট্র্যাক্টরে চাষ করা হচ্ছে। কিছু উৎসাহী মানুষ ভিড় করে আছেন চার পাশে। এদের অনেকেরই জমি আছে এই মৌজায়। বেশ কিছু বাঁধ তৈরি করে ফেলা হয়েছে এরই মধ্যে। গ্রাম ছেড়ে, রাঙা মাটির পথ ধরে অনেক মেয়ে-বউয়েরা দল বেঁধে প্রজেক্ট এরিয়ার ভিতর চলে আসছেন। অবাক চোখে দেখছেন বিশাল বিশাল যন্ত্র গুলো কি অবলীলায় ভোল বদলে ফেলছে চারপাশের।

 

“এই মেয়েটা, কি নাম রে তোর?” রোগা, ফরসা মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম।

“মিতালি” রিনরিনে গলায় জবাব দিল রোগা মেয়েটা।

 “কোন ক্লাসে পড়িস তুই? একটা ছড়া বলতো শুনি। তোদের কতটা জমি আছে এখানে?” 

মিতালি বলল, “আমি তো পড়তাম, এখন আর স্কুলে যাই না। ক্লাস থ্রিতে পড়তাম, হঠাৎ বাবা ইঁট ভাটায় কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো, আমাদের জমি তো চলে গেছে, তাই বাবা ভাটায় কাজে যেত, এখন মা সেলাই করে, আমিও করি। স্কুলে যাই না। বাবা বলেছে, জমি ফিরে পেলেই আবার আমি স্কুলে যাব।“

“মিতালি, তুই খুব ভাল রে! জমি তোর বাবা খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে। তুই কিন্তু স্কুলে যাবি ঠিক। পড়াশোনা না করলে খুব বকবো। আমি কিন্তু খবর নেব।” ছোট্ট মিতালির গাল টিপে বললাম। আরও এক বার মনে হোল, জমিই মানুষের অস্তিত্ব, বেচে থাকার অবলম্বন। চাষির জমি তার নিজের সন্তান এর মতোই, যেন নাড়ীর টানে বাধা। কত মিতালি যে ছড়িয়ে আছে সিঙ্গুরের এই গ্রাম গুলোতে।

 

চিন্তার সুতো কেটে যায় সাইরেনের আওয়াজে, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আসছেন। বড় কনভয় থেকে একে একে নেমে এলেন ডিএম, এডিএম সাহেবরা, সঙ্গে কৃষি দফতর, পিডব্লিউডি আরও সমস্ত দফতরের আধিকারিকরা।  ভূমি সংস্কার দফতরের হিসেব, ২০০ একর জমি বণ্টন করা এখনই সম্ভব। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। বাকি প্লট গুলোর জরিপও শেষ পর্যায়ে। সমস্যা শুধু দু-একটা বড় শেড নিয়েই। রক ব্রেকার গুলো প্রবল বেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঘাত করেও তাদের ভিত নড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। আমরা জানি সমস্ত মৌজা গুলি চাষ যোগ্য না করে, পুরনো অবস্থায় না ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত আমাদের কাজ চলবে।

 

মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই চাকরির শুরুর দিন গুলোর কথা। প্রবেশনে থাকাকালীন শালবনি তে প্রায় মাস খানেকের সেটেলমেন্ট ট্রেনিং এর সময় এই ভাবেই মাঠে মাঠে ঘুরে শিখেছিলাম জরিপের কাজ, ম্যাপ তৈরি করা, আরও কত কি। মনে পড়ে, কিছু মহিলা অফিসারের সেই প্রথম সাইকেল চালাতে শেখার কথা। সারা সকাল কাজের পর কোনও গাছের ছায়ায় বসে একসাথে ব্রেকফাস্ট। তারপর হস্টেলে ফিরে স্নান সেরে লাঞ্চ আর তারপর ক্লাসরুমেই ভাতঘুম। স্যার এর চোখ এড়িয়ে বেঞ্চে ঢোলা। সেই সব দিন যেন আবার ফিরে এসেছে অন্য রকম ভাবে।

মন্ত্রী চলে গেলেন কনভয় নিয়ে। লাঞ্চ এর সময় হয়ে এল। এখুনি ধুলো উড়িয়ে আসবে বিডিও সিঙ্গুরের গাড়ি। খাবার নিয়ে। গাছ তলায় বসে মহা ভোজ সারব আমরা। সবাই এক সাথে।     

 

এভাবেই দ্রুত চলছিল কাজ। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে চাষিদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ। আজ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আসছেন সিঙ্গুরে। জমি বণ্টন করবেন কৃষকদের, শস্য বীজ ছড়াবেন নিজের হাতে। ইট কাঠের স্তুপ সরিয়ে যে জমি চাষের উপযোগী করে তোলা হোল, তা অচিরেই ভরে উঠবে সবুজ ফসলে। চাষি তার নিজের অধিকারে, নিজ ভুমিতে সোনার ফসল ফলাবে। কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস নতুন করে রচিত হবে। আগামী প্রজন্ম কুর্নিশ জানাবে এই লড়াইকে। সমৃদ্ধ হবে ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে। গোপালনগর এলাকায় আজ সাজসাজ রব। সেখানেই দেখলাম আমাদের পরিচিত সুবোধ বাবুকে। একটি গাছ তলায় বসে আছেন, অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে খানিকটা দূরে। ঠিক দুপুর দুটো বেজে পাঁচ মিনিটে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এলেন গোপালনগরে। ঘুরে দেখলেন চারপাশ, ভূমি রক্ষা সমিতির কিছু লড়াকু মানুষ যেন আজ নতুন উদ্দমে মাঠে নেমেছেন। হাজার হোক, এই আন্দোলনের শেষ প্রান্তে এসে যে জিৎ হাসিল হোল, তা তো ওদের হার না মানা লড়াই এর স্বীকৃতিই বটে। আন্দাজ করতে পারি, সুবোধ বাবুরা আজ নিদারুণ আনন্দে ভাসছেন। নিজের জমি ফিরে পাওয়া না মর্যাদার লড়াই জিতে নেওয়া, কোনটা যে বেশি খুশির তা হয়ত সিঙ্গুরের মানুষই জানেন।

“একটু খিচুড়ি খাবেন নাকি? মাকে ভোগ দিয়েছিলাম।” জিজ্ঞেস করলেন পুরোহিত মশাই। একে খিচুড়ি তায় মায়ের ভোগ, সাগ্রহে সম্মত হলাম। “নিন, সেবা করুন।” ঠাকুর মশাই একটা কলাপাতায় করে খিচুড়ি দিলেন। মিহির খেতে চাইল না, একটু বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠেছে আজকাল। বললাম, “আজই তো আমাদের শেষ দিন এখানে, একটু খেয়েই নে না, আর তো এই শ্মশান মন্দিরে আসতে হবে না রোজ রোজ।” মিহির নিমরাজি হোল, কলাপাতায় খিচুড়ি নিল অল্প। ততক্ষণে ক্যম্পে দিতি, নীল রাও চলে এসেছে, সবাই খেল খিচুরি। আজ সবাই বেশ ফুরফুরে, টানা দের মাসের লড়াই, অসম এবং কঠিন, মানুষ আর যন্ত্র, কংক্রিট আর বালি, লোহার শেড আর জলাভুমি, আগাছা আর বিষধর সাপ। অনেক প্রতিকুলতা আর সরকারি নির্দেশ, অদম্য জেদ আর টার্গেট, এই সবের মধ্যেই আমরা আমাদের কাজটুকু শেষ করতে পেরেছি। প্রাণহীন দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে থাকে শুধু রক ব্রেকার গুলো। কিছুদিন পর আবার অন্য কোথাও কঠিন প্রস্ত্রর ভেঙ্গে নতুন আবাদ তৈরি করতে লেগে পরবে প্রবল উদ্দমে। আজ যেন একটু মন খারাপও লাগছে, কাল থেকে আবার অফিসের চৌহদ্দিতে বাধা গতে কাজ। অথচ, যেদিন প্রথম এসেছিলাম, কতই না খারাপ লেগেছিল, মনের কোনে ঘনীভূত হয়েছিল কত ক্ষোভ, সঞ্চারিত হয়েছিল অভিমান, পুজার ছুটি নষ্ট হওয়ার দুঃখ, ঝামেলার কাজ করতে হবে বলে দুশ্চিন্তা, আরও কত কি। আজ কিন্তু সেসব একেবারে উধাও, এই লড়াইয়ের ময়দান যেন অনেক সমৃদ্ধ করেছে আমাকে। জানলাম, শিখলাম অনেক কিছু। দেখলাম কত মানুষ, অবহিত হলাম তাদের জীবন জীবিকা নিয়ে, এই বা কম কি!

ঠাকুর মশাই কে জিজ্ঞেস করলাম সুবোধ বাবুর ব্যাপারে। ঠাকুর মশাই বললেন, “সুবোধ বাবুর সংসারের অশান্তি চরম আকার নিয়েছে। ছেলেরা ভিন্ন হয়ে গেছে, টাকা নিয়ে বিবাদ, বুড়োবুড়ি একা হোল এতদিন পর। যখন জমি ছিল না, তখন এক জ্বালা, জমি এলো, টাকা এলো, সংসার ভাঙল, এই বোধহয় বিধির লিখন। কাল এসেছিল সুবোধ, সারা রাত মন্দিরে শুয়ে কাটিয়েছে। সকালে চলে গেল, বলল উকিল ধরতে যাবে।”

খারাপ লাগল, যখন সিঙ্গুরের মানুষ উৎসব করছেন, সুবোধ বাবুর মতন কেউ কেউ হয়ত নতুন লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, যে লড়াইটা নিজের সাথে, নিজের রক্তের সাথে, যে লড়াই মানুষের ভিতরটা ছিড়েখুড়ে দেয়, যে লড়াই লড়তে গেলে বাঁচা দায়, মরা কঠিন। এই বোধহয় জীবন, সিঙ্গুর থেকে অনেক কিছু নিয়ে ফিরছি যা থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে। পিছনে পড়ে থাকল ঠাকুর মশাই, তাঁর মন্দির আর কিছু পরিশ্রান্ত রক ব্রেকার।   

  .....................................................................

অলঙ্করণ- দেবার্ঘ্য ঘোষ 

 (শেষ)                            

ads

Mailing List