রক ব্রেকার / গল্প - প্রথম পর্ব

রক ব্রেকার / গল্প - প্রথম পর্ব
05 Sep 2021, 10:57 AM

রক ব্রেকার

সুদীপ সরকার

 

সিঙ্গুর আন্দোলনের এক পিঠ যদি হয় অনিচ্ছুক চাষিদের ভূমি রক্ষার লড়াই, অন্য পিঠে তাহলে থাকবে দশ বছর পর সেই জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইচ্ছুক অনিচ্ছুক চাষি নির্বিশেষে সবাইকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কর্মসূত্রে তার সাক্ষী ছিলাম আমি। চুঁচুড়া মহকুমার মহকুমা শাসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম ২০১৬ সালে। যখন সিঙ্গুরে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল জেলা প্রশাসন। টানা কয়েক মাসের বিরাট কর্মযজ্ঞের ইতিহাস কোথাও লেখা থাকবে কিনা জানি না। নিজের চোখে দেখা এবং অনুভূত ঘটনা প্রবাহের একটা ছোট বিবরণ এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। খাসেরভেড়ি, বেড়াবেড়ি, গোপালনগর মৌজা গুলিতে তখন চরমতম প্রশাসনিক ব্যস্ততা। যা লিখলাম সবটাই সত্যি। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কিছু থেকে গেল। উল্লেখ করা হল না অনেক ঘটনার কথা। বাকি থেকে গেল অনেকের অবদানের কথাও, যাঁরা দিন রাত এক করে একটা প্রায়- অসম্ভব একটা কাজকে সম্ভব করে তুলেছিলেন তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে। এই ভূমিকাটুকু থাকলে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটানো আরও সহজ হবে। তাই ভূমিকার অবতারণা। তিন পর্বে লেখাটি দেওয়া হল। আজ

 

প্রথম পর্ব

 

দূরে কোথাও ঢাক বাজছে, বোধ হয় আরতি হচ্ছে, নয়তো সন্ধি পুজো। একটা দমকা হাওয়া যেন একমুঠো শিউলির গন্ধ উড়িয়ে নিয়ে এলো। নীরার কথা মনে পড়ল, মেয়ে দুটোকে নিয়ে হয়তো টিভিতে ঠাকুর দেখছে। একটানা রক ব্রেকারের ঘটোর ঘটোর আওয়াজে ঝিমুনি চলে আসছে। মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠল,  নীরার গলার ঝাঁজে ঝিমুনি কেটে গেল। “ব্যাপার টা কি? অষ্টমীর দিন আর কতসময় থাকবে ওখানে? আমার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, বাচ্চা দুটোর তো ঠাকুর দেখতে ইচ্ছে করে নাকি!!”

 

“এই তো আর ঘণ্টা খানেক, তারপর বেরোব, আসলে আমি বেরিয়ে গেলে ব্যাটারা সব পালাবে, just keep cool, সত্যেরে লও সহজে”।

অব্যক্ত আক্রোশে লাইনটা কেটে দিল নীরা। রক ব্রেকারটা একইরকম আক্রোশে ঘটোর ঘটোর করে চলেছে। সব কিছু যেন আজ রাতের মধ্যেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকের আওয়াজ এখনও আসছে। সিঙ্গুরে এবার ধুমধাম করে পুজো হচ্ছে। দশটা বছর শুধু নিরাশা আর অনেক না পাওয়া ছিল নিত্য সঙ্গী। মাটি তো আসলে মা-টি, জমি যাদের অস্তিত্ব, তাদের থেকে তা কেড়ে নিলে পড়ে থাকে শুধুই শূন্যতা। এত দিনের আন্দলোন সিঙ্গুর এর মানুষ কে আবার মর্যাদার লড়াইটা জিতিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, এবার আমাকে বেরোতে হবে, রাত প্রায় সাড়ে আটটা। আর ভালো লাগছে না। বাংলো তে ফিরে একটু জিরোতে হবে। নীরার সাথে সম্মুখ সমর অপেক্ষা করছে জানি। কাল আবার সকাল সকাল বেরোতে হবে, ডেস্টিনেশন সিঙ্গুর।         

 

এই প্রথম বার পুজোর সময় বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। মা কে বলতে খুব খারাপ লাগছিল। বছরের এই সময়টাতেই সবার সাথে দেখা হয়। দিদি এসেছে ভিলাই থেকে। কলকাতার বাড়ি জমজমাট। চুঁচুঁড়া থেকে যেতে পারব না, এটা ভাবতেই খারাপ লাগছে। এদিকে, নীরা আর দুই কন্যা, ওরাও মুখ ব্যাজার করে কাটালো পূজোটা। ঠিক সকাল সাড়ে ছটার দিকে পৌঁছে গেলাম আমাদের জোনে। আমাদের জোন মানে, এক থেকে পাঁচ নম্বর এলাকা। সমস্ত ইঁট-পাথর-বালি আর কংক্রিটের ইমারতি জিনিস সরিয়ে ফেলে, বিস্তীর্ণ এলাকা চাষ যোগ্য করে ফিরিয়ে দিতে হবে মানুষকে। আমাদের ক্যাম্প করা হয়েছে একদম শেষ প্রান্তে। শ্মশানের গায়ে, ছোট্ট মন্দিরের পাশে। গাড়ি থেকে নামতেই, দিতি ছুটে এলো। “স্যার, আজকে মাত্র তিনটে জেসিবি আর দুটো ক্যাটারপিলার রিপোর্ট করেছে। কোথায় কোনটা লাগাবো বলে দিন।”  

“২ নম্বর জোনে বেশ কয়েকটা বড় পুকুর আছে, ওখানে তিনটে জেসিবি আর তিন নম্বর জোনে ক্যাটারপিলার দুটো পাঠিয়ে দাও” বললাম। দিতি মেয়েটি আমাদের প্রবেশনার অফিসার, সদ্য যোগ দিয়েছে জেলায়। বেশ চটপটে আর সপ্রতিভ। একজন অতিরিক্ত জেলাশাসক আমাদের টিম লিডার। জোন পিছু দুজন করে ডেপুটি ম্যজিস্ট্রেট রয়েছে গ্রুপে। আমার সঙ্গে রয়েছে মিহির, সমস্ত ব্যাপারটা দেখভাল করছি আমরা দুজন মিলে। অনেক বছর পর, আমি আর মিহির আবার এক সাথে এক জেলায়। সেই চাকরি জীবনের শুরুতে ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে ঘর ভাগাভাগি করে থাকা, ছোকরা বয়েসের ভাষায় বাথরুম মেট, তারপর বহুদিনের বিচ্ছেদ বলা যায়।  সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিক ছন্দেই পরিণত হয়েছি। মিহিরের মাথার অনাবৃত অংশ কাঠা থেকে বিঘায় বেড়েছে। নিয়মিত কিছু ওষুধের নাগপাশে আবদ্ধ হয়েছি আমিও। মিহির মহকুমা শাসকের পাট চুকিয়ে নতুন ভুমিকায়। আর আমি চুঁচুঁড়া মহকুমার মহকুমা শাসক হিসেবে জেলায় এসেছি বছর খানেক আগে। জেলার সমস্ত অফিসার এখন সিঙ্গুরে কাজ করছে। আমরা সকাল সকাল পৌঁছে যাই প্রজেক্ট সাইটে। আমি আগে, ঘণ্টা খানেক পরে মিহির। আমাদের ক্যাম্প অফিস টি বেশ, সবার এখানে অবারিত দ্বার। বিরাট বটের তলায়, কালী মন্দিরের সামনে ছোট শামিয়ানা। পিচ ঢালা রাস্তার গা ঘেঁষে পরিত্যক্ত শ্মশান ভূমি। বছর দশেক আগেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠত দিনে রাতে। অবিন্যস্ত ফাঁকা জমির এক কোনে পুরোহিতের জীর্ণ কুটির। জরাজীর্ণ মন্দিরের মতোই জীর্ণ ঠাকুর মশাই। একাকী মানুষ। জনমানবহীন প্রান্তরের একা প্রতিভূ যেন। সকাল থেকেই বিরাট বিরাট যন্ত্রগুলো কাজ শুরু করে দেয়। আর সেই সঙ্গেই তাদের পিঠে সওয়ারি মানুষ গুলোও, যন্ত্র মানব যেন, দিন রাত এক করে শুধু বিশাল বিশাল ইমারতের চুড়া গুলোকে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করে চলেছে। যেখানে সোনার ফসল ফলার কথা, সেখানে কোথাও উঠেছিল কংক্রিটের পিলার, কোথাও আবার ফেলা হয়েছিল ফ্লাই অ্যাশ কিংবা বালি। এত বালি যে ময় দানবের হাতে পড়লে খান কয়েক ইন্দ্রপ্রস্থ বানিয়ে ফেলত নিশ্চিত। ইমারতের শরীর থেকে নিঙড়ে বের করে আনা লোহা লক্কড় আর ইট পাথরের চাঁই বয়ে নিয়ে চলেছে ট্রাকের শাড়ি বদ্ধ মিছিল। ধুলোর ঝড় থেকে বাঁচতে আমাদের সবার মুখেই মাস্কের ঢাল। মিহির মাস্ক টা নাকের উপর তুলে দিয়ে ফুট কাটলো “এত ধুলো, যেন সাহারা তে বসে আছি। এক পশলা বৃষ্টি হলে একটু স্বস্তি পাওয়া যেত।” ADM  সাহেব জানালেন, “সন্ধে ছটায় মিটিং আছে, রাজ্য স্তরের আধিকারিক গন কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন। আমাদের জোনের কাজের খতিয়ান নিয়ে একটা রিপোর্ট করে দিতে হবে।“   

 

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামলো। এখানে সারাদিনই ধুলো ওড়ে, গোধূলি আর সন্ধ্যা সব একাকার। মিহির আর আমি অনেকটা এলাকা পায়ে হেঁটে ঘুরে এলাম। ম্যাপ দেখে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে পুরনো জমির আল বরাবর ঠিকমতো মাটি ফেলা চলছে কিনা। যা কিছু সব ফিরিয়ে দিতে হবে পুরনো অবস্থায়। জমির চরিত্র এবং অবস্থান। শুধু হারিয়ে যাওয়া সময় টা ফেরানো যাবে না জানি। আস্তে আস্তে গভীর অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। আমরা দুজন বটের তলায়। শ্মশানের নিস্তব্ধতা এখন যেন আরও বাঙময়। কালী মন্দিরে প্রদীপের আলো জ্বলে উঠেছে। মায়ের আরতির সময় হল। ঠাকুরমশাইয়ের এক হাতে পঞ্চপ্রদীপ, অন্য হাতে ঘণ্টা। মায়ের মুখে হাসির ঝিলিক। কিন্তু কেন জানি মনে হোল চোখ দুটি বড্ড ছলছলে। প্রদীপের টিমটিমে আলোয় মায়াময় হাতছানি। গাঢ় অন্ধকার আর নিস্তব্ধতাকে সঙ্গি করে বটের ঝুরি গুলো যেন হাত ধারাধরি করে ফিসফিসানিতে ব্যস্ত, কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষও বুঝি তাদের চির শান্তির আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসবে, ঘুরে ফিরে বেড়াবে এই গহিন ভুখন্ডের আনাচেকানাচে। মাথা ধরে আসছিল। মিহির কে ধাক্কা লাগালাম, “প্রায় আটটা বাজতে চলল, এবার গোটাই চল, এমনিতেই মেশিন গুলো বসে গেছে।” চুঁচুঁড়ার দিকে রওনা দিলাম আমরা, দুর্গাপূর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে, সিঙ্গুরকে ডান পাশে রেখে।

(চলবে...)

অঙ্কন- দেবার্ঘ্য ঘোষ

ads

Mailing List