তেলের দামবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং ভারতীয় অর্থনীতি

তেলের দামবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং ভারতীয় অর্থনীতি
17 Jun 2022, 01:30 PM

তেলের দামবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং ভারতীয় অর্থনীতি

 

ড. গৌতম সরকার

    

 

একদিকে কোভিডের নিরলস ভ্রুকুটি, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। আর মধ্যিখানে মুদ্রাস্ফীতি। মানুষ কোনদিকে যাবে! বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত আর গরিব মানুষগুলো। কোভিড শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জনজীবন সম্পূর্নভাবে গতি হারিয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে ঋণাত্মক (মাইনাস ৪০ ডলার ব্যারেল প্রতি) হয়ে গিয়েছিল। তারপর কোভিডের প্রভাব কমতে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সাথে সাথে তেলের চাহিদা বাড়তে থাকে এবং পেট্রোলিয়ামজাত সমস্ত দ্রব্যের দাম বাড়তে শুরু করে। তবে দামের বৃদ্ধি লাগামছাড়া হয়ে ওঠে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরির সময় থেকে। পরিস্হিতি যে ভাবে এগোচ্ছে খুব শীঘ্রই জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

 

২০১৪ সালের পর তেলের দামে একটা অধোগতি শুরু হয়েছিল। তারপর ২০১৬-এর পর তেলের বাজার চড়া হতে শুরু করে। তবে ২০২২-এর বৃদ্ধি গত চোদ্দ বছরের সমস্ত হিসেবনিকেশকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতি শাস্ত্রে 'অ আ ক খ'-এর মত শেখানো হয় তেলের দাম বাড়লে সমস্ত জিনিসের দাম বাড়ে। সেই তত্ত্ব কথা অর্থনীতি না পড়া মানুষেরাও এখন হাড়ে মজ্জায় টের পাচ্ছে।

   

সারা বিশ্বের মোট জিডিপি-র প্রায় তিন শতাংশ অধিকার করে আছে খনিজ তেল। জ্বালানি তেলের ব্যবহার দেখা যায় অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। সার, সিমেন্ট, রাসায়নিক, বস্ত্র থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, তথ্য-প্রযুক্তি, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবেতেই তেলের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ঘটে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এই সমস্ত দ্রব্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় আর সেই বৃদ্ধির চাপ গিয়ে পড়ে চূড়ান্ত ক্রেতার ওপর।

    এই মুহূর্তে তেলের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পিছনে দুটো গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। এক, করোনাত্তীর্ণ সুস্থ-সবল অর্থনীতি এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলতে থাকা ভূ-রাজনৈতিক সংকট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির তেল রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা। প্রথম কারণটি বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মঙ্গলকর। কারণ কোভিড প্যান্ডেমিকে সামগ্রিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সবকিছুই কমে গিয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতো। কিন্তু পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে খনিজ তেলের দাম বৃদ্ধি বেশিরভাগটাই যোগান সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ঘটে চলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের 'ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটলুক' সূত্রের খবর এই মুহূর্তে তেলের দাম বৃদ্ধির ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী হল যোগান সংকট। এমনকি প্যান্ডেমিক শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী যখন তেলের চাহিদা বাড়ছিল তখনও যোগান চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ছিল না। 'ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি'-র একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সেইসময় দিনপ্রতি বিশ্বব্যাপী তেলের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ মিলিয়ন ব্যারেল। তাই তেলের দাম বৃদ্ধির একটা ঝোঁক আগে থেকেই ছিল। সাম্প্রতিক ঘটে চলা ভূ-রাজনৈতিক সংকট তাতে অগ্নিসংযোগ করেছে।

  

পৃথিবীতে সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করে রাশিয়া। বিশ্বে প্রতি দশ ব্যারেল তেলের মধ্যে এক ব্যারেল আসে রাশিয়া থেকে। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে রাশিয়া এবং ইউরো জোনের দেশগুলির মোট গ্যাসের চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করে এই দেশটি। যুদ্ধের কারণে এমনিতেই রাশিয়ায় তেল ও গ্যাস উত্তোলন এবং সরবরাহ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে, তার উপর আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপের উন্নত দেশগুলি রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের চরম সংকট তৈরি হয়েছে, যার নিট ফল হল পেট্রোলিয়াম তেল এবং অন্যান্য সমস্ত জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। সহনীয় মাত্রায় মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য কাম্য হলেও উচ্চ হারে মূল্যবৃদ্ধি কখনোই ভালো নয়। মুদ্রাস্ফীতি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলে মানুষ তাঁর অর্জিত অর্থের মূল্য সত্বর হারিয়ে ফেলে এবং ভবিষ্যতে আরও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস এই মুহূর্তে কিনতে চাইবে। ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতিকে আরও প্রকট করে তুলবে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদকদের চোখের সামনে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমে যাওয়ায় তারা উৎপাদন কমিয়ে দেবে। শুরু হবে কর্মী ছাঁটাই, দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকবে।

    উপরিউক্ত সমস্যার কোনও একটি থেকেও ভারতীয় অর্থনীতি মুক্ত নয়, উল্টে আনুষঙ্গিক আরও অনেক সমস্যায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের দেশ। খনিজ তেলের দামবৃদ্ধির সুদূরপ্রসারী প্রভাব অর্থনীতির বুনিয়াদকে নড়বড়ে করে দেয়। তাই সমস্যাগুলি সম্যকভাবে চিনে রাখা খুব দরকার।

 

এক, মুদ্রাস্ফীতিজনিত প্রভাব:

    

২০২২ সালের শুরুতে ‘ব্যাংক অব বরোদা’ প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, খনিজ তেলের দাম দশ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে ভারতে 'হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স' বৃদ্ধি পায় ০.৯ শতাংশ। এছাড়া রিপোর্টে এও বলা হয়েছে, তেলের দশ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি হবে পাঁচ শতাংশ।

   

 বিশ্বের মোট স্থূল উৎপাদনের ৩ শতাংশ আসে তেল থেকে। সেই তেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেলে তার প্রভাব সার্বিক মূল্যবৃদ্ধিতে পড়লেও সেটি মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ বলা যায় না। অর্থনীতিবিদদের বিশ্বাস মুদ্রাস্ফীতির জন্য অনেক বেশি দায়ী হল সরকারের 'শিথিল আর্থিক পদ্ধতি'। তবুও অর্থনীতিতে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। তার মূল কারণ হল জ্বালানি তেল প্রায় সমস্ত দ্রব্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার ( জ্বালানি, শক্তির উৎস, পরিবহনের মাধ্যম) করা হয়; তাই বিশ্বের বাজারে তেলের দাম বাড়লেই এই সমস্ত দ্রব্যের উৎপাদন মূল্য বেড়ে যায় এবং ফলস্বরূপ সার্বিক দামের বৃদ্ধি ঘটে। তাই পেট্রোল-ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়া মানে শুধুমাত্র পেট্রোল পাম্পে খরচ বৃদ্ধিই নয়, সেই গন্ডি ছাড়িয়ে জীবনে বেঁচে থাকাটাকেই ভীষণ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে৷ ভারত দৈনিক প্রায় তিন মিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেল আমদানি করে। হিসেব বলছে তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি দশ ডলার বেড়ে যায় তাহলে ভারত সরকারকে তেলবাবদ ২.৫ বিলিয়ন ডলার বা ১৭০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বেড়ে গেলে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ০.১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

 

দুই, ভারতীয় টাকার মূল্য হ্রাস বা অবমূল্যায়ন:

   

কোভিড-১৯ সংক্রমণের পর থেকেই জ্বালানি তেলের আমদানি কমতে শুরু করেছিল। ২০১৯ সালের হিসেবে দেশের মোট আমদানির ২৭ শতাংশ থেকে তেলের আমদানি ২০২১ সালে কমে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে। ২০২২ সালে আমদানির কিছুটা বৃদ্ধি ঘটলেও সেটা অতিমারির আগের মাত্রায় পৌঁছায়নি। একটি রিপোর্টে প্রকাশ, ১০ শতাংশ তেলের দাম বৃদ্ধি আমাদের চলতি খাতে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপি-র ০.৪ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এই ঘাটতি ভারতীয় মুদ্রার উপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। এর কারণ হল, ঘাটতি মেটানোর বিদেশি মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যায়, ফলে টাকার মূল্যে বিদেশি মুদ্রার (যেমন, ডলার) দাম বেড়ে যায়। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, তেলের দামের গড় বৃদ্ধি ১.২ শতাংশ হলে টাকার মূল্য ০.৯ শতাংশ কমে যাবে।

 

তিন, ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি:

 

 তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকারের পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই বাবদ কেন্দ্র সরকারের প্রাপ্য আয়ের পরিমাণ টাকার অঙ্কে ২০২০ আর্থিক বছরে ছিল ২.৮৭ ট্রিলিয়ন এবং ২০২১ আর্থিক বছরে সেই পরিমান বেড়ে হয় ৪.২ ট্রিলিয়ন। তবে আয়ের সাথে বর্ধিত ব্যয়ের কথাটি ভুললে চলবে না। খনিজ তেলের দাম বাড়লে রান্নার গ্যাস এবং কেরোসিনের উপর দেয় ভর্তুকির পরিমান সরকারকে বাড়াতে হয়। যদিও বর্তমান সময়ে দুটি দ্রব্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এই শর্তকে পুরোপুরি সমর্থন করছে না।

 

চার, রাজস্ব খাতে প্রভাব:

    

তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ সরকারকে কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ১৭,০০০ কোটি টাকা (জিডিপি-র ০.০৯ শতাংশ) খরচ করতে হয়। ২০১৯ সালের একটি হিসেব বলছে, তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলার ছিল তখন ভর্তুকি বাবদ খরচ হয়েছিল ৫৪,০০০ কোটি টাকা। তার ওপর ডিজেল এবং পেট্রোলের উপর এক্সাইজ ডিউটি যদি এক শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হত তাহলে সরকারের আরও ১২০০০-১৩০০০ কোটি থাকা খরচ বেড়ে যেত। সেখানে আজ ২০২২-এর মে মাসের মধ্যভাগে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

    ভারত প্রতিবছর ১.৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করে। দেশের মোট চাহিদার ৮৬ শতাংশ পূরণ করে এই আমদানিকৃত তেল। এই পরিপ্রেক্ষিতে তেলের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি  রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি একদিকে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলছে।

 

পাঁচ, চলতি খাতে ঘাটতির উপর প্রভাব:

     

অর্থনীতির হিসেবে তেলের দামের ১০ শতাংশ বৃদ্ধি চলতি খাতে ঘাটতির পরিমান জিডিপি-র ০.৪ শতাংশ বা ১০-১১ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেয়। এই দামবৃদ্ধি চলতি খাতের উপর দুটি বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলে। একদিকে দামবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি ঘটে, অন্যদিকে রপ্তানি দ্রব্যের দামবৃদ্ধির সাথে সাথে প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের মূল্য (রেমিট্যান্স) টাকার অঙ্কে বেড়ে যায়। অঙ্কের হিসেবে তেলের দাম দশ ডলার বৃদ্ধি পেলে ভারতের আমদানিবাবদ খরচ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়। চলতি খাতে পড়া এই ঋণাত্মক প্রভাব রপ্তানি বিল ৬ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স বাবদ ৩-৪ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধির কারণে কিছুটা প্রশমিত হয়।

 

ছয়, আমদানিকারী এবং রপ্তানিকারীর উপর প্রভাব:

  

তেলের ক্রমান্বয় দামবৃদ্ধি আমদানিকারী দেশের কাছে যেমন আপত্তিকর তেমনি রপ্তানিকারী দেশের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ ধরা দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে এটি একটি 'জিরো-সাম গেম'। যার অর্থ, এই দামবৃদ্ধির ফলে আমদানিকারী দেশসমূহের মোট ক্ষতির পরিমাণ রপ্তানিকারী দেশসমূহের মোট লাভের সমান সমান হয়।

সাত, সেনসেক্স এবং শেয়ার বাজারের উপর প্রভাব:

  

খনিজ তেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব ভারতীয় স্টকমার্কেটে ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভের’ সুদ বৃদ্ধির ঘোষণা। ফলস্বরূপ আমাদের দেশ থেকে বিদেশি মূলধনের নির্গমনের ঊর্ধ্বগতি চোখে পড়ছে। এই বছরে জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি এক মাসের মধ্যে প্রায় ৫১,৭০৩ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও হাত তুলে নিয়েছে। এই মুহূর্তে ফান্ড ম্যানেজাররা বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন।

    

 ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে। এব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলো হল, টায়ার, লুব্রিক্যান্ট, জুতো, রিফাইনিং এবং এয়ারলাইনস। উপাদান ব্যয় বাড়ার সাথে সাথে এই ক্ষেত্রগুলিতে মুনাফা কমতে থাকে, ফলে শেয়ার বাজারে একটা বিপরীতমুখী ধাক্কা পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে তেল উত্তোলনকারী দেশগুলি মুদ্রাস্ফীতির কারণে লাভবান হতে থাকে।

   

স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটা ওঠে আসে সেটি হল, তেলের দাম বৃদ্ধি ঘটে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়ে আরেকটি সংশয় দূর করা প্রয়োজন, এই দামবৃদ্ধি কতদিনের জন্য? স্বল্পস্থায়ী না দীর্ঘস্থায়ী! দামবৃদ্ধি যদি চাহিদা বৃদ্ধিজনিত কারণে হয় তাহলে অর্থনীতির উপর সেভাবে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কারণ, চাহিদা বৃদ্ধি একটি দেশের আর্থিক সুস্বাস্থ্যের পরিচায়ক, সেক্ষেত্রে রপ্তানিবাবদ আয়েরও বৃদ্ধি ঘটবে। সরকারের রাজস্ববাবদ আয় বৃদ্ধি ফিসক্যাল ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে। অন্যথায় সমস্যাটা প্রকট হয়ে ওঠে, যদি তেলের দামবৃদ্ধি যোগান হ্রাসজনিত কারণে ঘটে থাকে। বর্তমানে সারা বিশ্ব এই যোগানজনিত সমস্যাতেই ভুগছে। বিশেষজ্ঞদের মতে সাম্প্রতিক দামবৃদ্ধি ৮০ শতাংশ যোগান এবং ২০ শতাংশ চাহিদা সংক্রান্ত কারণে ঘটছে। যদিও এই বিষয়ে ভিন্নমতের অবকাশও আছে। তবুও যে কারণগুলো প্রকট রূপে প্রকাশমান সেগুলি হল-

 

এক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্রুত গতি তেলের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে:

  

দুবছর আগে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরুর পর পর অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার সাথে সাথে তেলের চাহিদার হ্রাস পরিলক্ষিত হয়েছিল। অতিমারির কবলে উৎপাদন, বন্টন, পরিবহন, সংবহন সবকিছুই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটা সময় কিছুদিনের জন্য পেট্রোলিয়াম তেলের দাম মাইনাস ৪০ ডলার ছুঁয়েছিল। কয়েকমাস যাবৎ সেই দ্রোহকাল কাটানোর পর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটা আকস্মিক প্রত্যাবর্তন ঘটে। এর ফলে সমস্ত জিনিসের সাথে তেলের চাহিদাও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। এমনকি কয়মাসের মধ্যেই তেলের চাহিদা প্রাক-অতিমারী চাহিদাকেও ছাপিয়ে যায়।

 

দুই, দীর্ঘ বিনিয়োগ চক্র এবং সচেতন মূলধন বন্টনের কারণে তেলের যোগান সংকট:

  

মোদ্দা কথা যোগান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। তেল এবং পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারী দেশগুলি তাদের তেলের উত্তোলন এবং উৎপাদন ধীর গতিতে করছে যাতে করে বিশ্ববাজারে করোনাকালের মত যোগানের প্রাবল্য ঘটে দাম কমে না যায়। এছাড়া তেল ব্যবসার বিকাশকাল (gestation period) দীর্ঘতর হয়। অনেকসময় প্রথম উৎপাদন পেতে পেতে দশক পেরিয়ে যায়। এটিও উৎপাদন এবং সরবরাহ ঘাটতির অন্যতম একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। অন্যদিকে তেল উৎপাদকরা তাদের মূলধন সংবদ্ধনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রথমত, তেলের দাম ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া থেকে তারা এই শিক্ষালাভ করেছে যে যোগানের ব্যাপারে তাদের আরও সতর্ক হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তেল উৎপাদকদের উপর একটা চাপ আছে যার ফলে তারা নতুন করে কোনও ইউনিটে বিনিয়োগ করতে পারছে না, এমনকি চলতি প্রজেক্টেও নিজেদের ইচ্ছেমতো বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না। উল্টে তাদের সঞ্চিত মূলধন 'গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট' বা 'সবুজ বিনিয়োগ' প্রকল্পে নিয়োগ করতে হচ্ছে।

 

তিন, ভূ-রাজনৈতিক সংকট:

 

সাম্প্রতিক চলতে থাকা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির অস্থিরতা তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

      

ভারতবর্ষ হল বিশ্বের মধ্যে সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। বৈশ্বিক অর্থনীতি বা রাজনীতির পালাবদল স্বাভাবিক ভাবেই এই দেশকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। খনিজ তেলের দামবৃদ্ধি দেশের রাজস্ব এবং চলতি খাতে ঘাটতির উপর বিরুদ্ধ প্রভাব ফেলে। এই প্রভাবের জের আস্তে আস্তে দেশের আর্থিক নীতি এবং ভোগ ও বিনিময় সম্পর্কের উপরও পড়তে থাকে। এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল, দামের এই বৃদ্ধি কতদিন ধরে চলবে? বিশেষজ্ঞদের মতে এই বৃদ্ধি বেশিদিন চলবে না, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলেই ধীরে ধীরে তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং যোগান আস্তে আস্তে চাহিদার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করতে সমর্থ হবে। এই ভবিষ্যৎবানীও শোনা যাচ্ছে , আগামী দিনে তেলের চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। যদিও এব্যাপারে দ্বিমতের যথেষ্ট অবকাশ আছে। কেউ কেউ বলছেন এই বৃদ্ধিকালের আয়ু কয়েকবছর মাত্র, আবার কারও কারও মতে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলবে।

    

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে তেলের দামবৃদ্ধি কখনোই সেভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়না৷ তবে সাম্প্রতিক সমস্যাটি অন্যদের তুলনায় একটু ভিন্ন গোত্রের। তাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ সবাই বেশ চিন্তিত। এটা শুধু বৃদ্ধি নয়, বৃদ্ধিজনিত এক বিপ্লব বা বৈপ্লবিক বৃদ্ধি। ২০১৬ সালে এক ব্যারেল পেট্রোলের দাম ছিল ২৯ ডলার, সেটি এইমুহূর্তে বিক্রি হচ্ছে ১১০ ডলারে। অর্থাৎ, আট বছরে দাম প্রায় চার গুন, অর্থাৎ ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশঙ্কাটা এখানেই।

   

আরও একটি তথ্য উল্লেখের অপেক্ষা রাখে, সেটি হল আমরা তেলবাবদ যে অর্থ পেট্রোল পাম্পে দিয়ে থাকি তার মধ্যে ৫০-৬০ শতাংশ হল ট্যাক্স। তাই তেলের দামবৃদ্ধি সমাজে যতই নেতিবাচক প্রভাব ফেলুক না কেন, এর ফলে সরকারের কোষাগারের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে সেকথা বলাই বাহুল্য। রাজনৈতিক মহলে এই দামবৃদ্ধি নিয়ে চাপানউতোর চলছে। কেন্দ্রের তরফে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে 'অপরিশোধিত তেলের' দামবৃদ্ধিই এর জন্য দায়ী, অন্যদিকে রাজ্যসরকারগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ফিসক্যাল পলিসিকে’ দোষারোপ করছে। তাদের বক্তব্য, তেলের ক্রমবর্ধমান দামবৃদ্ধির আপদকালে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ছিল তেলের উপর ধার্য শুল্কের হ্রাস ঘটানো। কিন্তু এই ব্যাপারে সরকার অপারগ। এমনিতেই করোনাকালে সরকারের কোষাগার প্রায় শূন্য, তার উপর শুল্ক কমালে সরকারকে 'ভাঁড়ের মা ভবানী' হয়ে দিন কাটাতে হবে। গত দুবছরে আয়কর এবং কোম্পানি কর আদায়ে ভাটা পড়েছে। যে মুহূর্তে করোনার প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং তৎসংলগ্ন মূল্যবৃদ্ধি উন্নয়নের পথে বড়সড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। সরকার যতই দাবি করুক আয়কর দাতার সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মোট রাজস্ব আদায়ের হিসেবে সেই বৃদ্ধির কোনও প্রভাব চোখে পড়ছে না। সবচেয়ে বড় কথা কিছুদিন পর অর্থনীতির সার্বিক ভরাডুবির কারণ হিসেবে এই তেলের দামবৃদ্ধির দিকেই আঙুল তুলে দেখানো হবে। তাছাড়া বিশ্বের বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমাদের দেশে তেলের দাম বাড়ে, কিন্তু দাম কমলে আমাদের দেশে তেলের দাম কমে না। দাম বাড়লে বাড়বে কিন্তু কমলে কমবে না এই নীতি অবলম্বনে ২০২০ সালে সারা বিশ্বে তেলের দাম কমতে কমতে যখন শূন্যর কাছাকাছি পৌছেছিল তখনও ভারতে তেলের দাম কমেনি। তাই রাজস্ব আদায়ের প্রশ্নে তালিকার একদম ওপরে থাকা উৎসটি নিয়ে সরকারের ইচ্ছে থাকলেও জনদরদী পলিসি গ্রহণ করা অন্তত এইমুহূর্তে সম্ভব নয়।

  

বিশেষজ্ঞদের অনুমান চলতি আর্থিক বছরে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭-৭.২ শতাংশ। এর আগে প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬ শতাংশ ভাবা হয়েছিল। 'ইন্ডিয়া রেটিংস' তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আগামী তিনমাস অপরিশোধিত তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে একইরকম থাকলে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭.২ শতাংশ, আর দামবৃদ্ধির ধারা যদি ছয়মাস ধরে চলে তাহলে বৃদ্ধি কমে ৭ শতাংশ হবে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নাজেহাল অবস্থা। সরকার হাত তুলে দিয়েছে। তাই অস্তিত্বের সংকটে মানুষকে নিজের লড়াইটা নিজেই করতে হচ্ছে আর তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে কবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শেষ হয় সেইদিকে।

………xxx……….

 

লেখক: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক। যোগমায়া দেবী কলেজ, কলকাতা।

ads

Mailing List