বারবার ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে, সৃষ্টির কারণ কী?

বারবার ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে, সৃষ্টির কারণ কী?
30 Sep 2022, 01:10 PM

বারবার ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে, সৃষ্টির কারণ কী?

প্রণব সাহু

 

'Cyclone' শব্দটি একটি গ্রীক শব্দ 'Cyclose' বা 'Kyclose' (কাইক্লজ) থেকে  এসেছে। যার অর্থ হল coil of snake অর্থাৎ 'সাপের কুন্ডলী'। ক্রান্তীয় সামুদ্রিক অংশে সৃষ্টি হওয়া সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়কে 'সাইক্লোন' বলা হয়। ভারত মহাসাগরে গঠিত যে কোনও সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় সাইক্লোন নামে পরিচিত। আবার এই ঝড় আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে বেশি দেখা যায়। প্রধানত: বঙ্গোপসাগরে অধিক সংখ্যায় সাইক্লোন সৃষ্টি হয়। যার প্রভাব উপকূলীয় দেশ মূলত ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি ভৌগোলিক অংশে অধিক মাত্রায় দেখা যায়।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই দেখা যায় আরব সাগরে বছরে প্রায় ৫ টি থেকে ৬ টি ছোট-বড় নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি নিম্নচাপ ও প্রবল ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে অধিক সংখ্যায় নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় দেখা দেয়। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রয়োজনীয় শর্ত বা পরিবেশ গুলি আলোচনা করা যাক-

 

প্রথমত: ক্রান্তীয় উষ্ণ মন্ডলে ২২ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান।

দ্বিতীয়ত: সমুদ্র পৃষ্ঠের গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডের কাছাকাছি।

তৃতীয়ত: অগভীর জলভাগ (গড় গভীরতা ১৬০০মিটার)

চতুর্থত: জলের লবণতা (২৬ পি পি টি) ও ঘনত্ব বেশি।

পঞ্চমত: জলের  উলম্ব সংমিশ্রণ অপেক্ষাকৃত কম। ষষ্ঠ: ভারতীয় এল নিনো (IOD-Indian Ocean Dipole) প্রভাব।

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় গুলি যে সময়ে সংঘটিত হয়ে থাকে তা মূলত এপ্রিল থেকে এবং অক্টোবরের মধ্যে। এই সময়কালে প্রায় সাত মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে প্রধানত গ্রীষ্মকালীন (Pre-Monsoon), বর্ষা কালীন (During Monsoon) এবং শরৎকালীন (Early-Post Monsoon) সময়ে উৎপত্তি হয়ে থাকে।

'ইয়াস' ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টির আবহাওয়াগত ও ভৌগোলিক কারণ:

'ইয়াস' ঘূর্ণিঝড় ২০২১ সালে বঙ্গোপসাগরে গঠিত প্রথম ঘূর্ণিঝড়। এই ঝড়টির নামকরণ করেছে ওমান দেশ। যার অর্থ হল 'হতাশা'।

উৎপত্তির কারণ-

প্রথম পর্যায়: মার্চ মাসের শেষ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি দীর্ঘ ৫০ দিন ৮ ডিগ্রী উত্তর থেকে ২০ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশে মধ্যে প্রায় উলম্ব সূর্যালোকের উপস্থিতি।

দ্বিতীয় পর্যায়:  মে মাসে র দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তৃতীয় সপ্তাহ মাঝামাঝি ১৪ ডিগ্রী থেকে ১৮ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি পৌঁছায়। ইহাই 'ইয়াস' ঝড়ের উৎপত্তি স্থল।

তৃতীয় পর্যায়: নিম্নচাপের (Low pressure)সৃষ্টি।

চতুর্থ পর্যায়: পাশ্ববর্তী সমুদ্র ভাগ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে উষ্ণ ও জলীয় বাষ্পের জোগান।

৫ পর্যায়: নিম্নচাপকে কেন্দ্র করে উলম্ব উষ্ণ- আদ্র বায়ু স্তরের শীতলীকরণ।

৬পর্যায়: লীনতাপ ত্যাগ এবং ক্রমশ তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

৭পর্যায়: নিম্নচাপ কেন্দ্র ঘূর্ণাবাতের চক্ষুতে পরিনত (Eye of Cyclone🌀)।

৮পর্যায়: পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্পের যোগান এবং গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি।

৯ পর্যায়: কোরিওলিস বল ও  ভারতীয় এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত শক্তির সঞ্চয়।

১০পর্যায়: বৃহৎ মেঘপুঞ্জ,  উষ্ণ বায়ুপুঞ্জের বামাবর্তঘূর্ণণ এবং 'ইয়াস' সাইক্লোনের জন্ম।

 

সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা:

ঘূর্ণিঝড় থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে তার সতর্কতা মূলক ব্যবস্থার পদক্ষেপ হল, পূর্বাভাস দেওয়া, মানুষকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সামগ্রী মজুত রাখা, সচেতনতা ও সংবাদ প্রচার।

পূর্বাভাস:

প্রথমত:  স্যাটেলাইট, রেডার, হ্যালিকপ্টার এবং আবহাওয়া যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মাধ্যমে ৭২ ঘন্টা ধরে পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান।

দ্বিতীয়ত: গভীর নিম্নচাপ বা সাইক্লোন তৈরী হলে ৪৮ ঘন্টা আগে তথ্য পরিবেশন এবং সর্তকতা জারি করা। একে বলা হয় হলুদ সংকেত (Yellow alarming)

তৃতীয়ত:  স্থলভাগে আছড়ে পড়ার  প্রায় ২৪ঘন্টা আগে ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান নির্ণয় করে বার্তা দেওয়া। অবশ্য তা সমুদ্র উপকূল থেকে ৬০০ কিমি দূরে অবস্থান। একে বলা হয় কমলা সংকেত (Orange alarming) ।

চতুর্থত: উপকূল থেকে ২০০ কিমি দূরে ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান। গতিপথ ও  গতিবেগ ওপর পর্যবেক্ষণ করে বার্তা দেওয়া। একে বলা হয় লাল সংকেত (Red alarming)।

ঘূর্ণিঝড়ের আশ্রয় কেন্দ্র:

৭২ ঘন্টার আগে পূর্বাভাস পাওয়া মাত্রই উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের সতর্ক করা। উপকূল থেকে ৩কিমি ভূমি ভাগের অভ্যন্তরে স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি হল, হোটেল এবং সাইক্লোন আশ্রয় কেন্দ্র গুলি কে নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে বাছাই করা। এবং ধীরে ধীরে কাঁচা বাড়ি, অস্থায়ী বাড়ি এবং ভগ্ন বাড়ি তে থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা-মহিলা-শিশুদের স্থানান্তরিত করতে হবে। মূল্যবান সম্পদ গুলি নিরাপদ জায়গায় ব্যবস্থা নেওয়া। গৃহপালিত পশু ও পাখিদের নিরাপদ স্হান নির্বাচন করা। এই ভাবে সমগ্র সম্ভাব্য প্রভাবিত এলাকায়  ২৪ ঘন্টা আগে নিরাপদ স্হানে আশ্রয় দেওয়া র ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্য ও স্বাস্থ্য সামগ্রী মজুত রাখা:

আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ শিবিরে থাকা জনসংখ্যা অনুপাতে আপাতত এক সপ্তাহের জন্য খাদ্য, পানীয় ও প্রাথমিক ঔষধ পত্র বন্দোবস্ত করা। প্রয়োজনে পোশাক পরিচ্ছদ, ত্রিপল ও বর্ষাতি ব্যবস্থা করে রাখা।

সচেতনতা:

উপকূলীয় অঞ্চলে এবং সম্ভাব্য প্রভাবিত এলাকায় সরকারি প্রশাসন , স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি, প্রভাব, এবং নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে সজাগ, সতর্ক ও সচেতনতা গড়ে তোলা। শহর এলাকার বাসিন্দা দের জন্য  সতর্কতা হলো জল, খাদ্য, ঔষধ পত্র,আলোর ব্যবস্থা এবং বাতি স্তম্ভ হাত না দেওয়া ও বড়ো বড়ো গাছ থেকে দূরে থাকা। এই সকল বিষয় গুলি মেনে চলা। আবার গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ সতর্কতা হলো মাঠে না যাওয়া, গাছের তলায় না দাঁড়ানো, নদী-সমুদ্রে মাছ না ধরতে যাওয়া, খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা, উৎপাদিত ফসল সংগ্রহ করে সঠিক জায়গায় মজুত রাখা এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তারে হাত না দেওয়া।

সংবাদ ও তথ্য সম্প্রচার:

আবহাওয়া অফিস ও সাইক্লোন আ্যলার্মিং কেন্দ্র গুলি র সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিক সংবাদ ও তথ্য পরিবেশন করা। সরকারি-বেসরকারি বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে সময় ভিত্তিক যথাযথ সাম্প্রতিক সংবাদ তুলে ধরা।সামাজিক মাধ্যম ও স্হানীয় সংবাদ মাধ্যম সঠিক তথ্য পরিবেশনের দায়িত্ব নিতে হবে।

কোনও আতঙ্ক নয়, কোনও অবাঞ্ছিত খবর নয়। সতর্কতা ও সচেতনতা ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে অনেক খানি রক্ষা করে। তাই এই সকল সতর্কতা ও শর্তাবলী গুলি মেনে চললে জীবনহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

লেখক: অধ্যাপক প্রণব সাহু, বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল বিভাগ, সেবা ভারতী মহাবিদ্যালয়, কাপগাড়ি, ঝাড়গ্রাম। সম্পাদক, ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অফ আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ(TIEER)

Mailing List