'রথ'... এক ঐতিহাসিক পটভূমি

'রথ'... এক ঐতিহাসিক পটভূমি
01 Jul 2022, 09:45 AM

'রথ'... এক ঐতিহাসিক পটভূমি

  

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

   কবির কথা দিয়েই শুরু করি:---

 

 " রথ ভাবে আমি দেব,

   পথ ভাবে 'আমি' ,

   মূর্তি ভাবে 'আমি দেব' ..

   হাসে অন্তর্যামী "

 

রাস্তায় রথ চললে আমরা প্রণাম করি--- সেটাই স্বাভাবিক। রথটা প্রতীক, মূর্তিটাও প্রতীকী চিহ্নমাত্র।

প্রণাম বা সম্মান যা কিছু, সব গিয়ে অর্পিত হয় পরমাত্মার শ্রীচরণে। 

আজ সেই বিশেষ দিন... রথযাত্রা। 

আজকের এই বিশেষ দিনটিতে উড়িষ্যার পুরীধামে শ্রীজগন্নাথস্বামী তাঁর ভাই বলভদ্র বা বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রাদেবীকে নিয়ে তাঁর মাসীর বাড়িতে রওনা দেন।

 

প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে অতি প্রাচীন কাল থেকেই। ব্রহ্মান্ডপুরাণ, পদ্মপুরাণ, এমনকি নানা প্রাচীন পুঁথিতেও এই রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। 

 

আমাদের এই হিন্দুধর্মের কিছু কিছু উৎসব-পাব্বনের সাথে বৌদ্ধধর্মের কিন্চিৎ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক কিছু কিছু পুঁথি থেকে জানা যায় যে, আমাদের তন্ত্রসাধনার কিছু কিছু আচার-আচরণে বৌদ্ধদের সাথে একটু সাদৃশ্য মেলে। তেমনি,  এটাও জানা গেছে যে, বৌদ্ধদের সামাজিক উৎসবে রথে করে গৌতম বুদ্ধের মূর্তি নিয়ে পথ-পরিক্রমা করা হতো।

 

অনেকে হয়তো ভাবছেন, আমাদের হিন্দুধর্মের রথযাত্রার সাথে বৌদ্ধধর্মের রথের ঘটনার অবতারণা করা কেন?

 

অযৌক্তিক নয় তো...।

 

বৌদ্ধ ধর্মের অনুশাসন অনুযায়ী: অষ্টাঙ্গিক মার্গ-ই ঈশ্বরের কাছে যাবার প্রকৃষ্ট পথ।

আর বৈষ্ণব বা গৌড়ীয় ধর্মে ত্যাগ,  সহিষ্ণুতা, তিতিক্ষা আর আত্ম-সংযম-ই হলো পরম ধর্ম। 

 

অষ্টাঙ্গিক মার্গ গৌতম বুদ্ধের বর্ণনা করা মানুষের দুঃখ নিবারণের এই উপায়। সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রযত্ন, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি --- এই আটটিই হলো এই সত্য পথের দিশা।

সহজ কথায়: "সম্যক" শব্দটির অর্থ হলো সৎ। অর্থাৎ সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা, সৎ জীবন--- ইত্যাদিই মানুষকে সত্যেরদিকে নিয়ে যায়। 

 

আর বৈষ্ণব দর্শনেরমূল কথা হলো: আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন; তার জন্য কেবলমাত্র প্রেম ও অহিংসা প্রয়োজন। আর প্রয়োজন নিজেকে তাঁর কাছে উজাড় করে দেওয়া। 

তবে, ওই আটটি পথ ধরেই আমরা পরমাত্মার সাথে মিলিত হতে পারি। পরমাত্মার কাছে আত্মার কোনোরকম বাছবিচার হয়না, তাঁর কাছে সবাই সমান। এই রথযাত্রায় রথ একবার থেমে গিয়েছিল---

ভারি চমৎকার ও চমকপ্রদ সে কাহিনী। 

 

রথ চলছে উচ্চ-ধর্মীয় ও উচ্চ-বর্ণের মানুষের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে। পথের দুপাশে অচ্ছুত, নিম্নবর্গীয় এবং গরিব মানুষের ভীড়। অবাক বিস্ময়ে ওআর দেখে চলছে জাঁকজমক, বৈভব, অর্থের আধিক্য আর চোব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়-র অবাধ অবিমৃশ্যকারিতা। 

উচ্চ-বর্ণ আর নিম্ন-বর্গের মানুষদের মধ্যে একটা মোটা দাগের পৃথকীকরণের প্রক্রিয়া সর্বত্র ফুটে উঠছে। 

 

হঠাৎ-ই জগৎপতির রথ গেল থেমে। 

শত-সহস্র চেষ্টা বৃথা,  তবুও রথ আর নড়ে না। ঔড্রদেশের রাজা প্রতাপরুদ্র স্বয়ং সপারিষদ এগিয়ে এসে রথের দড়ি ধরে সজোরে টান দিলেন, তা-ও রথের চাকা আর নড়ে না।

সবার চিন্তার আর শেষ নেই। মনে ভয়: কি ত্রুটি ঘটলো, এই উৎসবে... এমন সময়ে ভাবগম্ভীর কন্ঠে এক দৈব-বাণী উচ্চারিত হলো:

 

"রে মূঢ় পামর! ওরে অর্বাচীনের দল ...!!

যে নিম্ন বর্ণের মানুষদের অচ্ছুত, অন্ত্যজ বলে অপাংক্তেয় করে রেখে ব্রাত্য রেখেছ, তাদের ওই স্পর্শ বিনা এ রথের চাকা ঘুর্ণায়মান হবে না। ওরা যদি স্পর্শ করে রথের রশি, তবেই রথ তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।"

 

ঘটনার আতিশয্যে বিমোহিত উচ্চ বর্ণ। তারা যখন দ্বিধান্বিত, চিন্তিত--- তখন রাজা হঠাৎ-ই ইঙ্গিত করলেন পথের দুধারে অপেক্ষমান নিম্ন বর্গের মানুষদের এসে হাত দিতে ওই রথের রশিতে।

 

দীর্ঘদিনের ব্রাত্য থাকার দুঃখ, অপমান, ক্ষোভ সবকিছু ভুলে হাত লাগাল তারা রথের রশিতে; রথ আবার আগের গতিতে গতিময় হয়ে উঠলো।

 

পরমাত্মার অন্তরের সদিচ্ছায় সবাই বুঝতে পারল--- সমাজের উচ্চ-বর্ণের শক্তির সাথে তথাকথিত আন্ত্যজদের শক্তি সম্মিলিত না হলে, দেবতার রথ, তথা সভ্যতার অগ্রগতির রথযাত্রা এগিয়ে চলতে পারে না।

 

কাজেই, এই রথযাত্রা এক মিলনোৎসব--- এক সামাজিক যোগসূত্রের অনুষ্ঠান,  যেখানে সমাজের গরিব-বড়লোক, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ, নারী-পুরুষ,  জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাকার এক পবিত্র মিলনের অঙ্গন।

 

আসুন বন্ধুরা, আজ সবাই আমরা সমস্বরে বলে উঠি:

জয় শ্রীজগন্নাথ মহাপ্রভু।।

জয় শ্রীকৃষ্ণমুরারী ।।

জয় শ্রী গোপালগোবিন্দ।।

……

ads

Mailing List