একই মন্দিরে রাম-রহিম, একই সঙ্গে জীব বলি আর জবাই পুরুলিয়ার গ্রামীণ মন্দিরে

একই মন্দিরে রাম-রহিম, একই সঙ্গে জীব বলি আর জবাই পুরুলিয়ার গ্রামীণ মন্দিরে
16 Jan 2021, 09:48 PM

একই মন্দিরে রাম রহিম, একই সঙ্গে জীব বলি আর জবাই পুরুলিয়ার গ্রামীণ মন্দিরে

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়,পুরুলিয়া

বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম তার কবিতায় লিখেছিলেন "মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান" । কবির সেই বিখ্যাত উক্তিটি যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে পুরুলিয়া মফস্বল থানার প্রত্যন্ত হিড়বহাল গ্রামের এক দেবস্থলের পুজো ও আরাধনায়। এই মন্দিরে একই ছাদের তলায় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ইষ্ট দেবতাদের পাশাপাশি পুজো হয়ে থাকে। যা এক বিরলতম ঘটনা।

পুরুলিয়া শহর থেকে বরাকর রোড ধরে প্রায় ১৫ কিমি রাস্তা পেরিয়ে দূর থেকে গাছ গাছালি ঘেরা হিড়বহাল গ্রামটিকে  দেখতে পাওয়া যাবে। একসময় জেলার পিছিয়েপড়া ৯৯৬ টি গ্রামের তালিকায় পুরুলিয়া ২ নং ব্লকের ছোট্ট এই জনপদের নাম ছিল প্রথম সারিতে। সে সময় পুরুলিয়ার পিছিয়ে পড়া গ্রাম পরিদর্শনে বেরিয়ে প্রত্যন্ত এই গ্রামে পা রেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী। তখন রাতারাতি অখ্যাত এ গ্রামের নাম স্থান পেয়েছিল সংবাদমাধ্যমের পাতায় ও দূরদর্শনের পর্দায় । তারপর আর কেউ খোঁজ রাখেনি এই গ্রামটির।

কিন্তু আজও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে আছে হিড়বহাল গ্রামটি। গ্রামের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে বাঁশবাগানের মধ্যে বিরাজ করছে প্রাচীন দৃষ্টান্ত বহনকারী ছোট্ট এক দেবস্থল । তার ইতিকথা শোনাতে গিয়ে মন্দিরের বর্তমান সেবাইত তপন বাউরী জানালেন, প্রায় ২০০ বছর থেকেও আগে তাঁর পূর্বপুরুষেরা এখানে ছোট্ট একটি মাটির ঘরে মা ভদ্রকালীর পূজাপাঠ শুরু করেন। পরে কোন এক দৈববলে সেই মন্দিরে স্থান পান মুসলিমদের ইষ্টদেবতা বাবা সত্যপীর । তখন নিত্য পূজার দায়িত্ব ছিল  তপন বাউরির পূর্বসূরিদের উপর।

সারাবছর প্রতিমাসের নির্দিষ্ট তিথিতে আচারবিধি মেনে পুজো হয়ে থাকলেও বছরের একটা দিন অর্থাৎ পয়লা মাঘ বেশ ঘটা করে মা ভদ্রকালী রামচন্দ্র এবং বাবা সত্যপীরের পূজা হয়ে থাকে এখানে। যা আজও চলে আসছে। উত্তরসূরী হিসেবে বর্তমানে দাসুদেব বাউরীদের উপর পুজো পরিচালনার ভার অর্পিত রয়েছে। আবার এখানকার পূজার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, যে এই মন্দিরে দেবদেবীর পূজা আরাধনার জন্য কোন ব্রাহ্মণ পুরোহিত কিংবা পূজারী থাকেনা।

এতদিন দাসুদেববাবু নিজে পুজো করে এলেও গত কয়েকবছর ধরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই পূজার্চনার দায়িত্ব তিনি তার বড় ছেলে তপনের হাতে তুলে দিয়েছেন। সেই পূজা প্রক্রিয়ায় যথারীতি আগের মতোই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন বংশের অন্যান্যরা। তপন বাউরী বললেন, ফি বছর পয়লা মাঘ ঘটা করে পুজো দেওয়া হয় এই মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবদেবীকে। মা ভদ্রকালী নিমিত্তে ছাগ বলি ছাড়াও হাঁস ও পায়রা বলি যেমন দেওয়া হয় তেমনি মানত পূরণ করতে সত্যপীরের নিমিত্তে মোরগ জবাই দেওয়া হয়। ভিন্নধর্মী দুটি সম্প্রদায়ের মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে জীব বলি এবং জবাই দিয়ে থাকেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই। বাবা সত্যপীরের নিমিত্তে হিন্দুরাও মোরগ জবাইয়ের মানত করে থাকেন। পুজোর রাতে জবাই দেওয়া মোরগ ও ছাগের মাংস সহ নরনারায়ন সেবায় পাত পেড়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই পরম তৃপ্তি ভরে ভোজন করে থাকেন।

এখানকার দেবদেবী খুবই জাগ্রত বলে নামডাক থাকায় শুধু পুরুলিয়া জেলা বা অন্য জেলার মানুষই নয় পুজো দিতে ছুটে আসেন ভিন রাজ্যের ভক্তরাও। পূজা উপলক্ষে কয়েকদিন ধরে মন্দির প্রাঙ্গণে সান্ধ্যকালীন নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন উদ্যোক্তারা। প্রতিবছরের মতো এবার করোনা বিধি ও রীতি মেনে এবছরও শুক্রবার সেই পূজাপর্ব সম্পন্ন হয়ে গেল। আর সম্প্রীতির এই পূজাকে ঘিরে সকলের মেলবন্ধনে মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে উঠল মিলন ক্ষেত্র।

Mailing List