রাধাকৃষ্ণণের দর্শনচিন্তায় যুক্তিবাদ, সমাজবোধ ও অধ্যাত্মচেতনা, তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন ভারতীয় সভ্যতার নবজাগরণ

রাধাকৃষ্ণণের দর্শনচিন্তায় যুক্তিবাদ, সমাজবোধ ও অধ্যাত্মচেতনা, তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন ভারতীয় সভ্যতার নবজাগরণ
19 Oct 2022, 12:45 PM

রাধাকৃষ্ণণের দর্শনচিন্তায় যুক্তিবাদ, সমাজবোধ ও অধ্যাত্মচেতনা, তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন ভারতীয় সভ্যতার নবজাগরণ

সত্যব্রত দোলই

 

পৃথিবীতে এমন মনীষীর জন্ম খুব কম হয়ে থাকে, যিনি জীবনের প্রতিটি প্রহরকে সৃজনমূলক কাজে লাগিয়ে ছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক মহান শিক্ষক জ্ঞানতাপস ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন এমনই একজন মনীষী, মাকে বলা হয়, সুপ্রাচীন ভারতীয় প্রজ্ঞার এক সার্থক প্রতিনিধি। বিশ্বের পণ্ডিত মহলের মধ্যে তিনি ছিলেন সকল যুগের সকল স্তরের হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বাস্তব ব্যাখ্যাকার। এর পাশাপাশি ছিলেন সৎ, শোভন ও সুন্দর প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। দীর্ঘদিন তাঁকে আমরা ভারতের মতো এক সুমহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পেয়েছি। জগৎসভায় বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণের মাধ্যমে নিজের বৈদগ্ধ্যের পরিচয় দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি প্রকাশ করেছেন সীমাহীন ভালোবাসা। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতকে একটি আধুনিক উন্নত প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। তিনি সুপ্রাচীন ভারতীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তপোবন কেন্দ্রিক যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভারতীয় ঋষিরা গ্রহণ করেছিলেন, তাকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন তিনি।

 

দার্শনিক রাধাকৃষ্ণণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে কথাটি মাথায় রাখতে হবে তা হল, তিনি সেই অর্থে নতুন কোনো দার্শনিক অভীক্ষার জন্ম দেননি। কিশোর বয়স থেকে তিনি বহু পরিশ্রম করে প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য দর্শনের বিভিন্ন দিকগুলিকে আত্মস্থ করেছিলেন। যৌবনে তিনি এমন একটি দার্শনিক অভিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছিলেন, যা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছিল এবং তা হল প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের দার্শনিক চিন্তাধারার মধ্যে মেলবন্ধন। তাঁর সমসময়ে অনেকে মনে করতেন যে, প্রাচ্য দর্শন শুধুমাত্র ত্যাগের কথা বলে। আর প্রতীচ্যের দর্শন উৎকট ভোগবাদের জয়গান গায়। রাধাকৃষ্ণণ এই মতবাদকে খণ্ডন করে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রাচ্য দর্শনে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ঈশ্বর অনুভূতির কথা বলা হয়েছে। প্রতীচ্যের দর্শনে ব্যবহারিক দিকটিকে বেশি করে আলোকিত করা হয়েছে। কোনো একটি দর্শনকে তিনি নিরঙ্কুশ প্রাধান্য দিতে চাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমাদের উচিত প্রতিটি দর্শনের অন্তরালে যে শাশ্বত সত্য লুকিয়ে আছে তাকে খুঁজে বার করা, এভাবেই এমন একটি দর্শন চিন্তার জন্ম দেওয়া যা হবে সর্বজন স্বীকৃত। রাধাকৃষ্ণণের দার্শনিক বোধের মধ্যে ইতিহাস চেতনা আর সমাজবোধ সম্পৃক্ত ছিল। তিনি সমাজের অতি নিম্নস্তরের মানুষদের কথাও হৃদয় দিয়ে ভাবতেন। সমাজের সব স্তরের মানুষের উন্নতি কামনা করতেন। বিশেষ করে চাইতেন, মানুষের উন্নতি করার সময় দর্শন যেন একটি মজবুত ভিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঠিক এখানেই অন্যান্য দার্শনিকদের সঙ্গে রাধাকৃষ্ণণের পার্থক্য চোখে পড়ে। কেননা, বেশিরভাগ দার্শনিকই নিজেদের জীবনে কেমন করে উন্নতি করা যায়, সে-কথা চিন্তা করে গেছেন। নিজেদের দর্শন-চিন্তাকে তাঁরা জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। একটা কঠিন আবরণের মধ্যে সেটাকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু রাধাকৃষ্ণণ এ ব্যাপারে ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা । তিনি দর্শনকে মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “যদি আমরা নিজেরা সুখে আর স্বাচ্ছন্দে থাকি, আর আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ থাকেন যারা সীমাহীন দুঃখকষ্টের মধ্যে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছেন, তাহলে আমাদের প্রধান কর্তব্য হবে সেই সমস্ত নিপীড়িত অসহায় বঞ্চিত মানুষগুলোর প্রতি যথার্থ সহানুভূতি দেখানো এবং যথাসম্ভব তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করা।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি কতটা মানব দরদী ছিলেন। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি তাঁর সমান ভালোবাসা ছিল। একজন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক হয়েও তিনি সমাজ-বিজ্ঞানকে কখনও অস্বীকার করেননি। তিনি বারবার বলেছেন যে, দর্শন কোনওদিনই কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের অধ্যয়নের বিষয় নয়। সমাজের সব জায়গায় দর্শনকে প্রয়োগ করা উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, “কোনো অধঃপতিত মানুষকে আমাদের ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে রাখা উচিত নয়। সেই অধঃপতিত মানুষের অধঃপতনে যাওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সামাজিক বা পারিপার্শ্বিক কারণ থাকে। আমাদের উচিত সবার আগে সেই কারণ খুঁজে বের করা। আমরা যদি নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করি তাহলেই সেই মানুষটি আবার সঠিক পথে ফিরে আসবে। আবার সে ভালো মানুষ হবে। আর এটাই হল আমাদের সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমাদের সবাইকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।” 'অ্যান আইডিয়ালিস্টিক ভিউ অব লাইফ' গ্রন্থে রাধাকৃষ্ণণ বলেছেন, “উপলব্ধি, ধ্যান এবং অন্তর্দৃষ্টি হল দর্শন। যতক্ষণ না জগৎ, জীবন ও বস্তু সম্পর্কে এমন পূর্ণ জ্ঞান লাভ হয়, যার সাহায্যে দার্শনিক তাঁর অভিজ্ঞতাকে কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের বিকাশরূপে ব্যাখ্যা করতে পারেন, ততক্ষণ দার্শনিকের অবসর নেই।” এটি অত্যন্ত মূল্যবান কথা। দার্শনিক জীবনের শেষ চেতন প্রহর পর্যন্ত অধ্যায় চেতনা এবং ব্যবহারিক চেতনার সংমিশ্রণের জন্য আত্মনিবেদিত থাকবেন। রাধাকৃষ্ণণের ভাষায়, “আমরা যে জগতের মানুষ, সেই জগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাই হল দর্শন। আর এই ব্যাখ্যার সঙ্গে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে একীভূত করতে হবে, অর্থাৎ আমরা আত্মার সাহায্যে আত্মাকে জানর। " রাধাকৃষ্ণণের মতে, পৃথিবীর সব মানুষই যে দার্শনিক অভিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হবেন এমনটা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সকলের মনের ভেতর কিছুটা দার্শনিক অনুসন্ধিৎসা থাকা দরকার। না হলে মানুষের সৃজনশীলতা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। তখন মানুষ 'কর্মফল নীতি'র শিকার হয়। যদি সে বাহ্য বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে তার পতন অনিবার্য। এই পতন সবসময় বৈষয়িক পতন হয় না, মানসিক ক্ষেত্রেও তার পতন ঘটতে পারে। তাই সকলের মনে কিছু পরিমাণ দার্শনিক অনুসন্ধিৎসা থাকলে সে আর পতনের সামনে এসে দাঁড়াবে না। রাধাকৃষ্ণণের মতবাদ অনুসারে দৃশ্যমান বস্তু বা সত্তার অন্তরালে যে সত্য লুকিয়ে আছে তার অনুসন্ধান করাই হল দর্শনের প্রধান কর্মসূচী। দর্শন কে মেটাফিজিক্স বলা হয়, কারণ দর্শনের অবস্থান বাস্তব সত্তার পরে। দর্শনের এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে, দর্শনের মধ্যে নানা ধরণের অনুসন্ধানের কার্যক্রম আছে। বিজ্ঞান একটি বস্তুর বাহ্যরূপ নিয়েই ব্যস্ত, দর্শন বাস্তব সম্ভার প্রচ্ছন্ন রূপটিকে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করে। এরই পাশাপাশি দর্শনের আর একটি কাজ হল মূল সত্তা প্রসঙ্গে প্রধান প্রধান ধারণাগুলির উপর অন্বেষণ করা। শূন্যতার পরিবর্তে পূর্ণতা এবং বস্তু বিশেষে সৃষ্টি কেন হল, দার্শনিকরা নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে তা অনুসন্ধান করেন।

'দ্য রিলিজিওন অব দ্য স্পিরিট অ্যাণ্ড দ্য ওয়ার্ল্ড'স নিড' শিরোনামের একটি রচনায় রাধাকৃষ্ণণ লিখেছেন, “জগতের বর্তমান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপের উৎপত্তির সন্ধান করতে হলে আমরা অদ্বৈত সত্তার প্রতি নজর দেব। অদ্বৈত সত্তা ক্রিয়াশীল থেকে দ্বৈত সত্তার দিকে এগিয়ে গেছে। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই বর্তমান বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি, পারমাত্মিক সত্তার দুটি রূপ থাকে। এক রূপে তিনি জ্ঞানাতীত, তিনি মূল অতীন্দ্রিয় অদ্বৈত সত্তা, যাকে ব্রহ্ম বলা হয়। আবার অন্যদিকে তিনি হলেন সগুণ এবং স্বয়ংক্রিয় সত্তা, তাকে আমরা ঈশ্বর বলতে পারি।” আচার্য শঙ্কর বলেছিলেন, “ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা'। অনেকে এই উক্তির সমালোচনা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে রাধাকৃষ্ণণের ব্যক্তিগত মতবাদ এইরকম- “জগৎ অলীক বা মিথ্যে নয় বা শূন্যও নয়। কারণ জগৎ হল ঈশ্বরের ইচ্ছার এক বাস্তব প্রতিফলন। তবে জাগতের এই বাস্তবতা ঈশ্বরের সত্যতা থেকে আলাদা। ঈশ্বরই একমাত্র স্বাধীন বা নিত্যসত্তা। সব কিছুই ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং সবকিছুই অনিত্য। জগৎ মিথ্যা বা মায়া এই বাক্যে অন্য একটি অর্থ সূচিত হয় তা হল জগতের নিজস্ব কোনো স্বাধীন সত্তা নেই। জগতের কর্তৃত্ব ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। সেই অস্তিত্ব ভগবৎ-সত্তার বাইরের বস্তু নয়।” রাধাকৃষ্ণণ মনে করতেন যে, অদ্বৈত সত্তা ঈশ্বর কেবলমাত্র বিশ্বাতীতই নন, তিনি বিশ্বস্ত এবং সর্বভূতগত সত্তা। ঈশ্বর সর্বভূতগত, বর্তমান জগৎ ঈশ্বরের মনমধ্যস্থিত সৃষ্টির অনন্ত সম্ভাবনার একটি নিত্য রূপ। বিশ্বভূত হয়ে ঈশ্বর বিশ্বকে পরিচালনা করেন, কিন্তু তিনি জগৎ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র থাকতে চান। ঈশ্বরের ইচ্ছায় সৃষ্টির এক একটি পর্ব বাস্তবায়িত হয়। যখন ঈশ্বরের ইচ্ছা সম্পূর্ণ রূপায়িত হবে, তখনই অনিত্য জগতের পরিসমাপ্তি ঘটবে। 'দ্য রিলিজিওন অব দ্য স্পিরিট অ্যাণ্ড দ্য ওয়ার্ল্ড'স নিড' রচনায় রাধাকৃষ্ণণ আরও লিখেছেন, "বর্তমান জগৎ একদিন বিলুপ্ত হবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ জগতে লয়ের প্রয়োজন আছে। মানুষ মুক্তির সন্ধানে আত্মনিমগ্ন থাকে। সে যখন জগতের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণতা লাভ করবে, তখনই সে মূল সত্তার সঙ্গে মিলিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে। তখনই জগতের উপর যবনিকাপাত হবে। অবশ্য বর্তমান জগৎ লয়প্রাপ্ত হলে নতুন নতুন জগতের সৃষ্টি হবে। জগতের স্রষ্টা ঈশ্বর অনন্ত জগৎ সম্ভাবনার আধার নিয়ে বসে আছেন। ঈশ্বর এই জগতের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে আত্মস্থ করেছেন।" যেকোনো দার্শনিকের কাছে 'টাইম অ্যান্ড ইটারনিটি অর্থাৎ খণ্ডিত কাল ও অনন্ত কাল হল একটি বিশেষ সমস্যা। রাধাকৃষ্ণণও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন।

কোনো কোনো দার্শনিকের মতে, অসংখ্য খণ্ডিত কালের সমষ্টি হল মহাকাল। রাধাকৃষ্ণণ বলেছেন, "কালের আদি ও অন্ত আছে। কাল বা সময়কে অনন্ত বলার অর্থ কালের এই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং তা আমরা জানতে পারিনা । কালের আদি এবং অন্তের মধ্যে যা ঘটছে, তা আমাদের কাছে পরম সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। জগতের ইতিহাস অর্থাৎ ক্রমবিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে ঈশ্বর সংযুক্ত আছেন। তিনি মানুষের জীবনযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকেন।"

রাধাকৃষ্ণণ ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাহায্যে অধ্যাত্ম সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া সম্ভব। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে চিন্তা বা কল্পনার সাহায্যে আমরা এই নিশ্চয়তা লাভ করতে পারব না। এই আধ্যাত্মিক জ্ঞান তর্কশাস্ত্রসম্মত যৌক্তিকতা বিরোধী জ্ঞান নয়, এই জ্ঞান যুক্তি এবং বিচারলব্ধ জ্ঞানের থেকে অনেক উচ্চস্তরে অবস্থান করে । এই জ্ঞানকে আমরা স্বতঃলব্ধ জ্ঞান বলতে পারি। তিনি এই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন যে, আধুনিক যুগে মানুষের মনের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মানুষ প্রায়োগিক বিদ্যার উপর বেশি জোর দিচ্ছে। মানুষ ধীরে ধীরে আরও বেশি যুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠছে। সভ্যতার উন্নতি ঘটাচ্ছে। যুক্তি-নির্ভর মানুষ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। মানুষ দর্শন সত্তাকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে না। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ উপলব্ধি করছে জড়প্রকৃতিকে আয়ত্তে রেখে পরীক্ষালব্ধ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করা উচিত। এর মাধ্যমেই আদি বা পারমার্থিক সত্তার স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব। কিন্তু মানুষ কি গবেষণাগারে বসে এই রহস্য ভেদ করতে পারবে ? অতি সূক্ষ্ম ইলেকট্রন ও প্রোটন কণিকাগুলি ও আদি সত্তার রহস্য ভেদ করতে পারে না। পরমাত্মা বা জীবাত্মাকে গণিত শাস্ত্রের সমীকরণের আওতায় আনা সম্ভব নয়। আমাদের জীবনে যে সব গভীরতম প্রত্যয়ের জন্য আমরা মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করতে পারি, যুক্তিবাদী হিসেবের মধ্যে তা পড়ে না। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত অভিজ্ঞতাগুলিকেও আমরা গাণিতিক সূত্রের মধ্যে বন্দী করতে পারি না। রাধাকৃষ্ণণ দর্শনের নতুন নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। তিনি প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের বিভিন্ন দার্শনিকের বক্তব্য গুলোকে সম্মান সহকারে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য “দর্শন মানে কোনো বাইরের থেকে আরোপ করা সত্তা বা চেতনা নয়। আমরা জন্ম থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একটি বিশেষ বোধে উজ্জীবিত থাকি, সেটাই হল আমাদের দর্শন-বোধ। আমরা একে অনুভব করতে পারি না। কারণ

 

জন্মসূত্রে হিন্দু হওয়ায় রাধাকৃষ্ণণ সম্ভবত জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। হিন্দু বিশ্বাস মতে আত্মা হল চিৎকণা, যা সকল চৈতন্যময় জীবে পরিব্যাপ্ত। রাধাকৃষ্ণণের মতবাদ অনুসারে চৈতন্যের তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তর হল। সাধারণ জীবজগতের চৈতন্য, যাকে আমরা প্রত্যক্ষ দর্শন বলি এবং যার প্রকাশ কর্মপ্রেরণার ভেতর লুকিয়ে থাকে। দ্বিতীয় স্তরে আছে মানুষের আত্মচেতনা বৃদ্ধিবৃত্তি এবং ইচ্ছাশক্তি। এই তিনটির মিলনে দ্বিতীয় স্তরটিকে অনুধাবন করা যায়। তৃতীয় স্তরে আছে আধ্যাত্মিক চেতনা। এই স্তরটি সম্পর্কে রাধাকৃষ্ণণ বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। শ্রীঅরবিন্দ এই স্তরকে 'অতিমানস' বা 'সুপার মাইণ্ড' বলেছেন। আবার রাধাকৃষ্ণণ এই স্তরকে 'সুপার কনসাসনেস' বা 'পরাচৈতন্য' বলেছেন। পরাচৈতন্য বিষয়ে তিনি অনেক গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই স্তরে মানুষ আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। এই সচেতনতা বোধগম্য নয় এবং তাকে সহজে উপলব্ধি করা যায় না।

 

রাধাকৃষ্ণণ এমন একটি মানবতাবাদী ধর্মের কথা বলেছেন, যেখানে সব ধর্মের সার নিহিত থাকবে। তিনি কোনো ধর্মকে অবজ্ঞা করেননি। তিনি ছিলেন বিশ্বজনীন ধর্মের পুজারী। 'রিলিজিওন ইন এ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড" গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “ধর্মজীবনের প্রসারতা লাভ করতে না পারলে কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। ধর্মের তুলনামূলক ইতিহাস যদি জানা থাকে তাহলে কেউ আর শুধুমাত্র নিজের গোষ্ঠীধর্মের বিধানগুলিকেই সত্য বলে স্বীকার করতে পারে না। এই তুলনামূলক জ্ঞানই আমাদের ধর্মজীবনকে প্রসারিত করবে। ....... প্রত্যেক ধর্মের অনুগামী মানুষগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একটি পারমার্থিক ভ্রাতৃসঙ্ঘ গঠন করবে। বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলি যদি এইভাবে যুক্ত হতে পারে, তাহলে পৃথিবীর মানুষের নৈতিক জীবনের মান অনেক উন্নত হবে।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় রাধাকৃষ্ণণ কতখানি বাস্তববাদী দার্শনিক ছিলেন। দর্শনকে তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একীভূত করার চেষ্টা করে গেছেন। তাই এমন নির্মোহ মনের পরিচয় দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মমত সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। বেশিরভাগ সময় এই বোধ আমাদের মনের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। আর এই ঘুম একমাত্র ভাঙে কোনো যথার্থ গুরুর স্পর্শে। আর তখনই আমরা আমাদের আত্মার স্বরূপকে অনুভব করতে পারি।”

 

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জীবন আসলে এক বর্ণময় রূপকথা। আজও বিশ্বের নানা প্রান্তের দার্শনিকরা তাঁর দর্শন মতবাদের বিচার-বিশ্লেষণে মেতে উঠেন। রাধাকৃষ্ণণের দার্শনিক অভিচেতনা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। আর থাকাটাই স্বাভাবিক। কেননা কোনো মতবাদকেই আমরা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত বলতে পারি না। তা সত্ত্বেও রাধাকৃষ্ণণ আমাদের মনের মণিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। কারণ সর্বার্থে তিনি ছিলেন একজন মহান ভারতীয়। ভারতের সুপ্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতি তাঁর সীমাহীন অনুরাগ ছিল। তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন ভারতীয় সভ্যতার নবজাগরণ।

লেখক: অধ্যক্ষ, রয়্যাল অ্যাকামেডি, মেদিনীপুর।

Mailing List