পুরুলিয়ার 'হাঁসের পরব' এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!

 পুরুলিয়ার 'হাঁসের পরব' এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!
18 Aug 2022, 06:59 PM

 পুরুলিয়ার 'হাঁসের পরব' এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!

 

 ড. সমরেন্দ্র নাথ খাঁড়া

      

শ্রাবণের শেষ দিনে 'সর্প-দেবী মনসা' সমগ্র বরেন্দ্রভূমে প্রধানতঃ পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম; দুই চব্বিশ পরগণা ও অন্যান্য জেলার লৌকিক দেবী রূপে নানা উপাচারে পূজিতা হন। কিন্তু সাবেক মানভূমের তথা জঙ্গলমহল, পুরুলিয়ার অন্যতম বড় উৎসব মনসা পূজা। ধুমধাম সহকারে রাঙামাটির প্রতিটি প্রান্তে মনসা পূজা হয়।

এই মনসা পূজায় পাঁঠা, ভেড়ার পাশপাশি হাঁসের বলি দেওয়া হয়। পাঁঠা বা ভেড়া কেনার সামর্থ্য না থাকলে সাধারণ মানুষ মা মনসার কাছে একটি হাঁস কিনে বলি দেবেই, এটাই নিয়ম। আর এই নিয়ম রক্ষায় জেলার প্রতিটি হাটে পাঁঠা,ভেড়া কেনার পাশাপাশি হাঁস কেনার ভিড় ও হিড়িক দেখা যায়। এই সময়টায় হাঁসের বাজার দর থাকে অনেক বেশি। নিয়ম রক্ষার করতে অগ্নিমূল্য হলেও হাঁস কিনবেই। একটি হাঁসের দাম হয় ৩৫০-৪০০ টাকা। মনসা পূজাকে তাই পুরুলিয়ার মানুষ 'হাঁসের পরব' বলে থাকে। ঘরে ঘরে ছয় মাস আগে থেকে হাঁস পালন করতে থাকে।তাছাড়া ট্রাকে ট্রাকে ভর্তি করে বাইরের ঝাড়খণ্ড,বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের অন্য জেলা থেকে হাজার হাজার হাঁসের আমদানি হয়। হাঁস কেনার সে কি হিড়িক।

    ডিম দেয় না এমন হাঁসকে 'কাটুল' বলে। পুরুষ হাঁসকে নর/হাঁসা বলে। এদের পুজোয় ব্যবহার করা হয়। ডিম পাড়া হাঁসকে সচরাচর ব্যবহার করা হয় না।

     পূজোয় ভুট্টা, ঝিঙ্গা (লজ ঝিঙ্গা বা শির ঝিঙ্গা), দুধ, বাতাসা, মিষ্টি, খৈ, অন্যান্য ফল দেওয়া হয়। জেলার মানুষ মনসা পুজো করে তারপর ভুট্টা খায়।আমাদের যেমন সরস্বতী পূজো হলে কুল খাওয়ার চল আছে।

        মানভূমের বাড়ি বাড়ি এই পূজা হয়।বেশিরভাগ মানুষ একদিনের উপোস থেকে পরের দিন পান্নাতে শেষ করে পূজা।ভোর রাতে মা মনসার কাছে হাঁস বলি দিয়ে পরের দিন হয় ভুরিভোজ।এই দিনটাকে বলা হয় পান্না।সারা দিন উপবাস থেকে মা মনসার পুজা সম্পন্ন করে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে শাগু-দুধ-কলা ইত্যাদি উপকরণ খেয়ে উপবাস ভাঙ্গেন মহিলা, পুরুষ সবাই। অনেকে মানত করে ডন্ডি কাটে। আট থেকে আশি এই দুদিন মানভূমের পাড়া গুলি হয়ে উঠে জমজমাট।

    ২০২২ সালের ১৭ আগষ্ট বুধবার, ৩১ সে শ্রাবণ ১৪২৯ ঘরে ঘরে শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিত হয় দেবী মনসা। 

      আবেগের মনসা পুজো পুরুলিয়া না গেলে বোঝা যাবে না! আর যদি যান তাহলে হাড়ে হাড়ে টের পাবেন পুরুলিয়ার মনসা পূজা কি জিনিস! আর কতটা আবেগের! এই মনসা পুজাতে পুরুলিয়া শহরে  অলিখিত বনধ চলে! বন্ধ থাকে দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার সব কিছুই। গাড়ি-ঘোড়াও খুব একটা পাওয়া যায় না।ওই দিন জেলার হাট বাজার বন্ধ থাকে।চা খেতে চাইলে তাও পাওয়া কঠিন।যানবাহন চলাচল তুলনামূলক কম থাকে।মনসা পূজার পরের দিন তাই জঙ্গলমহল পুরুলিয়া বনধের চেহারা নেয়।রাস্তাঘাটে ভিড় থাকে না। হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ।সকাল সকাল সব্জি ও মাছ বিক্রেতারাও বিকিকিনি শেষ করে বাড়ি ফিরে যায়।শহরে কাজের জন্য যাঁরা থাকে বা আসে পুজোর জন্য তাঁদের বেশিরভাগই ছুটি নিয়ে গ্রামে চলে যায়।পুরুলিয়া শহরের হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়। রান্নাবান্না বা সাফাইয়ের অধিকাংশ কর্মীই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যায়।রাস্তায় হাতে গোনা কয়েকটি বাসের দেখা মিললেও তাতে যাত্রী থাকে না।জেলার বাসের বেশিরভাগ চালক এবং কর্মী ছুটি নেওয়ায় কলকাতাগামী ডে এবং নাইট সার্ভিসের বাসগুলি চালানোই দায় হয়।

পুরুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, মনসা পুজোর চল দিন দিন বেড়ে চলেছে। অলিতে গলিতেও শুরু হয়েছে পুজো। আপাতত জেলায় পুজোর সংখ্যাটা হাজারের বেশী।তবে তার মধ্যে অধিকাংশই পারিবারিক পুজো।

    মনসা পুজোর জনপ্রিয়তার কারণ হলো মনসা লৌকিক দেবী।গ্রামাঞ্চলেই তাঁর পুজোর প্রচলন বেশি জল,  জঙ্গলে, জমি নিয়ে যাঁরা দিন কাটায়, সাপের ভয় যাঁদের কাজের অঙ্গ- সেই সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষজনই এই পুজো করেন।সাবেক মানভূম জেলাই হোক বা আজকের পুরুলিয়া, এই অঞ্চলে মূলত কৃষিজীবী মানুষজন বাস করে।আজকাল অনেকে চাকরি বা ব্যবসা করলেও সেই সংখ্যাটা তুলনায় অনেক কম।দুর্গাপুজো জমিদার বা উচ্চবিত্ত বনেদি পরিবারে পুজো হয়।গ্রামের গরিব মানুষরা দুর্গাপুজোকে এখনও বড়লোকদের পুজো মনে করে। তাঁদের জীবনযাপনের অনেক কাছাকাছি মনসাপুজো। মনসাপুজোতেই অনেক পরিবারে ছোটদের গায়ে নতুন জামা ওঠে। ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া হয়। এই দু দিন আনন্দে ভেসে ওঠে।

   পুরুলিয়ার মাঙ্গুড়িয়া বস্তি চাটানিপাড়ার পারিবারিক মনসাপুজো দেড়শো বছরের পুরনো।কুলদাপ্রসাদ লেনের পুজোটি পুরুলিয়ার অন্যতম প্রাচীন বারোয়ারি মনসা পুজো। পোকাবাঁধ পাড়া সর্ষে বাড়ির পুজো শতবর্ষ ছাড়িয়েছে হুচুক পাড়া আদি ষোলো আনা মনসা পুজো কমিটির পুজো পঞ্চাশ বছরে পড়লো।মানবাজারের ধীবর সমিতি বা মুচাইকুলি মনসা পুজো বহু পুরনো।অষ্ট মঙ্গলার দিন বিসর্জন হয়। বিসর্জনের আগের দিন মনসামঙ্গল অনুষ্ঠান হয়। বিসর্জনের বাদ্যিতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই চলে। দুর্গাপূজার মতোই জেলা জুড়ে জাঁকজমক লাইট থিমের পূজা হয়। এর জন্যে সারা বৎসর অপেক্ষা করে থাকেন জেলাবাসী।

 মহা সমারোহে জেলা মনসা পূজায় মেতে ওঠে। এ এক নতুন ও অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!

Mailing List