প্রীতিলতা এক ধূমকেতুর নাম, স্বাধীনতার পঁচাত্তরে কল্পনা দত্তকে মনে পড়ে! নাকি শুধুই ইতিহাসের পাতায়!

প্রীতিলতা এক ধূমকেতুর নাম, স্বাধীনতার পঁচাত্তরে কল্পনা দত্তকে মনে পড়ে! নাকি শুধুই ইতিহাসের পাতায়!
28 May 2022, 01:30 PM

প্রীতিলতা এক ধূমকেতুর নাম, স্বাধীনতার পঁচাত্তরে কল্পনা দত্তকে মনে পড়ে! নাকি শুধুই ইতিহাসের পাতায়!

 

বাসবী ভাওয়াল

 

নারীই পারে নারীর আত্মবিকাশ ঘটাতে। নারীই পারে নিজেকে মুক্ত করতে। সমস্ত শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে নিজেকে উন্মোচন করতে আত্মশক্তিতে ভরপুর হয়ে উঠতে। দিকে দিকে নারী স্বাধীনতা, কন্যা ভ্রুণ হত্যা, গার্হস্থ্য হিংসা প্রভৃতি নিয়ে যত আন্দোলন ও আইন পাশ হচ্ছে তত বেশি হিংসার বলি হচ্ছে নারী।

স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও নারীর আত্মমর্যাদা ভুলুন্ঠিত। তার কারণ হিসেবে শুধু পুরুষ শাসিত সমাজকে দায়ী করেই নব নব রূপে আইন পাশ করা হচ্ছে। নারী সুরক্ষিত হওয়ার থেকে দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছে তত। প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে এ ছবি নিয়মিত দেখতে পাচ্ছে আপামর জনসাধারণ। তার জন্য শুধু পুরুষকে দোষী করে ক্ষান্ত হলে চলবে না। নারীরাও এজন্য দায়ী। আসলে সমাজের ধারাবাহিক চিন্তা ভাবনার অগ্রগতি ঘটেনি। আমরা বাইরের আবরণে আধুনিক কিন্তু আমাদের অন্তরের আভরণে রিক্ততা প্রকট।

 

বিংশ শতকের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নারী কিন্তু শুধু নিজেকে পর্দার আড়ালে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বৃহত্তর সমাজের চিন্তা ভাবনা নারীকে পর্দার ভেতর থেকে, শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল বিবেকের তাড়না থেকে। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করতে ব্যক্তিসুখ বিসর্জন দিয়ে বিপ্লবের ভাবধারার উদ্বুদ্ধ হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালনও করেছে। আজ ইতিহাসের পাতায় মুখ লুকিয়ে রাখা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এমন দু’জন নারীর কথা  বিশেষভাবে অনুসরণ ও অনুকরণ করা প্রয়োজন। সৌন্দর্য, মেধা ও প্রতিভা সব থাকা সত্ত্বেও দেশমাতৃকার মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির শরিক হন। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এ কাজ শুধু অতি কঠিন বলা ভুল হবে, স্বপ্নের অতীত বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না।

 

স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী শহীদ নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা তাঁকে আদর করে 'রানী' বলে ডাকতেন। প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯২৮ সালে। আই এ পরীক্ষাতে মেয়েদের মধ্যে প্রথম। এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। ডিস্টিংশন নিয়ে বি এ উত্তীর্ণ হন। অথচ এত মেধাবী এই ছাত্রীর রোমে রোমে জ্বলছে বিপ্লবের আগুন। কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন লীলা নাগের দীপালি সংঘের সদস্য ছিলেন।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

 ইতিহাসের শিক্ষক ঊষা দি তাঁকে পুরুষের বেশে ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাঈয়ের ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত। ‘‘কখনো কখনো বড়ো বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন বুকে বাসা বাঁধতো। তখন ঝাঁসির রাণী তাঁদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করতো। নিজেদেরকে অকুতোভয় বিপ্লবী হিসেবে দেখতে শুরু করলাম আমরা"। একথা কল্পনা দত্ত লিখেছিলেন।

দশম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালীন বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই প্রীতিলতার কাছে রাখেন তাঁর আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার। লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি পড়েন, "দেশের কথা", "বাঘা যতীন", "ক্ষুদিরাম", আর "কানাইলাল"। এই সব গ্রন্থ তাঁকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে।

 

মাস্টার দা ১৯২৯ সালের মে মাসে ছাত্র যুব সম্মেলনে করেন কিন্তু নারী সম্মেলন করার পরিকল্পনা করেন পূর্ণেন্দু দস্তিদার এর বিপুল উৎসাহে। মহিলা কংগ্রেস নেত্রী লতিকা বোসের সভাপতিত্বে ঢাকা থেকে প্রীতিলতা এবং কলকাতা থেকে এসে যোগদান করেন সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত। তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টা চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলে যুক্ত হওয়ার কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়। দারুন বাঁশি বাজাতেন প্রীতিলতা। বিপ্লবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্খার কারণে দর্শনে অনার্স পরীক্ষা দেওয়া হয় নি তাঁর। অথচ দর্শন পরীক্ষাতে তিনি ক্লাসে সেরা হয়েছিলেন।

 

পূর্ণেন্দু দস্তিদার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে মনোরঞ্জন রায় নারী বিপ্লবীদের সংগঠিত করার কাজ করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপ্লবী কাজ করতে সক্ষম হবেন। মাস্টার দা প্রথমে নারীদের বিপ্লবের কাজে যুক্ত করতে রাজি হননি। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে মেয়েদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। মৃত্যু গ্রহণের প্রতীক্ষা রত বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে দেখা করতে অমিতা দাশ ছদ্মনামে প্রায় চল্লিশ বার দেখা করেছিলেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি তাঁর বিপ্লবী কর্মকান্ডের আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিল।

নির্মল সেনের উদ্যোগে মাস্টার দার সাথে দেখা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা মাস্টার দার সাথে কথা বলেছিলেন। মাস্টার দা তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন।

কল্পনা দত্ত

পাহাড়তলি ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করেন বিপ্লবীরা ১৯৩২ সালের ১০ই আগস্ট। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। মাস্টার দা সেপ্টেম্বর মাসে আবার আক্রমণের পরিকল্পনা করেন পুলিশের হাতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়ে গেলে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার ওপর। তিনি হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণের নির্দেশ দেন। একজন মিলিটারি অফিসারের রিভলভার এর গুলিতে তাঁর বাম পাশে আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় ধরা পড়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন কিন্তু তাঁর মা গর্ব করে বলতেন " আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে"।

এমন মা- ই তো পারে এমন সাহসী কন্যার জন্ম দিতে। প্রীতিলতা এক ধূমকেতুর নাম। মাত্র একুশ বছরের জীবনে তাঁর দেশপ্রেম, আদর্শ, আত্মত্যাগ মনে করিয়ে দেয় নারী ও পারে দুর্গম পথের পথিক হতে। যুগের চেয়ে অগ্রগামী, মরুপথের যাত্রী এই বিপ্লবী নারীজাতির বিপ্লবী চেতনা জাগরণের আলোকবর্তিকা।

..........

লেখক- প্রধান শিক্ষিকা, শালবনি নিচুমঞ্জরী বালিকা বিদ্যালয়।

ads

Mailing List