প্রেম পদাবলী

প্রেম পদাবলী
31 Jan 2021, 11:00 PM

প্রেম পদাবলী

 

অজয় ঘোষ

 

      ( ১)

যে ভিতরে ভিতরে কথা বলে

শব্দ হীন স্বরে

আমি তার সাথে কথা বলি

অনন্ত আশ্রয় খুঁজি

হাটে বাজারে ট্রামে বাসে ট্যাক্সিতে

বড় রাস্তায় অলিতেগলিতে

এমন কী ঘরের ভিতরেও

সে আমার সাথে থাকে

নিঃশব্দে

তার কোনো ছায়া দেখিনি এ যাবৎ

স্পর্শ বা গন্ধও পাই না

শুধু অনুভব করি

সে আছে

 

সত্ত্বাহীন

অবয়বহীন

ত্রিলোক জুড়ে সে ডাক দেয় কখনও

সেই শব্দহীন স্বরে

যে  ভাষা বোঝার জন্য কেউ কেউ জাগে

এবার ফেরার পথে তোমাকে একদিন

পরিচয় করাবো তার সাথে

 

খুব নিচু হয়ে থাকি আজকাল

মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় ঝড়

তুমুল রোদ্দুর আর বৃষ্টি আদরের

তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসবে জেনে গেছি

এখন অজানা যেটুকু আছে

রহস্যের মত সে তোমার মন

সে সব আর জেনেছে ক'জন

জ্বলে উঠি মাঝে মাঝে

নিভে যাই আবার

বস্তুত তোমার পায়ের ছাপ রয়ে গেছে

বালিয়াড়ি জুড়ে

যেমন হাতের ছাপ রেখে যায় খুনি

এ জীবনে মৃত্যু তো একবারই আসে

সারাটা শরীর জুড়ে চুম্বনের দাগ

মুছবো কী ভাবে ?

 

 

 (২)

পুড়ে যাবার আগে শেষরাতে গিয়েছিলাম একবার

আমার জন্য সাজানো ছিল ঘর

আমার তখন জীবনকে দরকার

মাঘী পূর্ণিমার সেই রাত

পর্দাগুলো কথা বলছিল ফিসফিস

এ পাড়ায় জেগে ছিল না কেউ

রাস্তার মাতাল বা কুকুর

যদি বাঁচার হতো বেঁচে যেতাম

মরণোত্তর দেহ দান এসব হ্যাপা

কে সামলাবে বলো

 

সেদিনটা ঠিক এইদিন ছিল

পরিস্কার আকাশ বৃষ্টির পর

আর চাঁদ নেমে এসেছিল ছাদে

ওলোটপালট হয়ে পড়েছিল মন

সাপেদের শঙ্খ লাগার আগে যেমন হয়

বালিয়াড়ি জুড়ে শরীরের মাখামাখি

ভেবেছিলাম এই রাত শেষ হলে

অন্য কোনো পৃথিবীতে জেগে উঠবো ভোর রাতে

চেতনায় মখমল ঘাস মাঠ

সমতল তারপর উপত্যকা তারপর পাহাড়

নদী তো ছিল সর্বক্ষন

না হলে অসমাপিকা ক্রিয়ার মত মনে হবে

 

ঠিকানা পাল্টাতে পাল্টাতে

কালো রাস্তার শেষে একা শুয়ে আছি আমি

এ শরীর পুড়ে গেছে সত্তর শতাংশ

বাঁচার আশা কম

এর ই নাম প্রেম ?

 

 

(৩)

 

কখন বুঝিনি তুমি এ্যাতো দূরে থাকো

মাঠ ঘাট ছবিঘর নদী ও পাহাড়

জীবন গড়িয়ে যায় অতলে কোথাও

এক একটা দিন যায়

এক একটা রাত যায়

বিষাদের চোখ

 

এইভাবেই চলতে থাকে নৌকা জীবন

বাতাসের নির্জন হাতের আঙুল

কখনও খুব কাছে অলৌকিক মনে হয়

মনে হয় এইসব রক্তপাতে

পুরানো ক্ষতের মধ্যে বাজে বাঁশি

সারারাত

 

ফুলডুংরি টিলা থেকে নেমে এসে দেখি

এখনও আগের মত পাথরেরা ভেসে আছে

সুবর্ণরেখার জলে ও গহীনে

এখনও আগের মত ডাকে নিশি

"মহুয়া" "মহুয়া"

তাকাতে পারি না আমি সেই সব রাতে

 

ভাবি এখনও সময় আছে

ভিনদেশি মানুষের হা‌‌তে

তরণী ভাসিয়ে দিয়ে ফিরে যদি আসি

পত্রলেখা তোমাকেই ডাকি

তুমুল রোদ্দুর আর গোপন ছায়াতে

ডুবে যাবার আগে  নিরাসক্ত শেষবার উপকূলে শোবো ।

 

 

 (৪)

 

অসুখে আছো খুব?

জ্বরটা বেড়েছে খুব?

 

অসঙ্গত প্রশ্ন করতে দ্বিধা হয় বড়

আমার তো দুর্বলতা ছিল তুমি জানো

বৃষ্টি নামার আগে অথবা পরে

সব সময় আমি স্থির হয়ে থাকি

বসতি ভাঙতে থাকে ভিতরে ভিতরে

কোন ঘরে যাব আমি

কোনোটারই দেয়াল নেই

উড়ে গেছে চালা

যে চালায় বৃষ্টির শব্দে

এক এক দিন জেগে সারারাত বাজনা শুনেছো,

মনে পড়ে?

ভোরবেলা আহির ভৈঁরোতে

আলোর প্রথম প্রকাশ

ঠোঁটে নিয়ে শিশিরের জল

আশ্লেষে ঘুমিয়ে পড়েছো পাশ ফিরে

 

আজ তোমার মন নেই কুসুম

আজ তোমার মন নেই

 

বারান্দারা গড়িয়ে পড়ছে দ্যাখো

জলের অধিক

বাতাস আঙুলের মৃদু ইশারাতে

সব ডুবে যাচ্ছে ক্রমাগত

সচিত্র মাটি আর পাহাড়

তোমার গোড়ালি ছুঁয়ে নরম আলোর বিকেল

পিছলে পড়ছে নাবাল জমিতে

আর উদ্ধত গ্রীবাতে ভোর

মরালের মত ভেসে যাচ্ছে

আশৈশব ছন্দ ভাঙার এই খেলা

তোমার অতি প্রিয় ছিল জানি

এখন তো বড় হয়েছো

এবার একটু ভাবো

 

ভালবাসা থেকে কতটা বা দূরে যেতে পারো

যখন তোমার হাতের মুঠো খুললেই ছায়াপথ ,

ভেবে দেখো ।

 

# বুদ্ধদেব বসুর কাছে ঋণ স্বীকার এই কবিতার জন্য ।

 

 

 (৫)

 

 

জানার জন্য অপেক্ষায় থাকি

শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকি

বক্রগতি রেখার জন্যেও অপেক্ষায় থাকি

কারন না হলে ছবি হয় না

না হলে গান হয় না

না হলে কবিতা হয় না

চশমা পরতে পরতে প্রায়শ ঝাপসা হয় কাঁচ

অলঙ্কার আর রূপকল্প

তোমাদের বাঁ হাতের খেলা

 

আমি শুধু প্রতীক্ষায় থাকি অনাদি কাল

এক টুকরো মেঘের জন্য

অলকাপুরী থেকে আসবে সে মেঘ

জড়িয়ে ধরে ভালবাসবে

তুমুল বৃষ্টির মধ্যে

অন্ধকারের মধ্যে

ঝাপসা হয়ে যাব আমরা

প্রিন্সেপ থেকে জোড়া গির্জা

বিরজিতলা থেকে ময়দান

ভিক্টোরিয়া থেকে সূতানটি

কেউ খুঁজে পাবে না আমাদের

আমাদের সব শব্দ ডুবে যাবে

বৃষ্টির শব্দে

 

চাপ নিও না তোমরা

প্রেমের জন্য

ভালবাসার জন্য

অমৃত ও ছাড়তে পারি আমরা

শুধু একটা নির্জন ঘর চাই

যার কোনো দরজা থাকবে না

জানলা থাকবে না

কোনো দেয়াল ও থাকবে না

এমন কি ছাদ ও থাকবে না।

 

 

 (৬)

 

টান মেরে খুলে দাও বুকের কপাট

দেখে নাও কে আছে ভিতরে

শরীরের অন্ধিসন্ধি কে আর জানবে বলো, তুমি ছাড়া

শীত এসে পড়বে দু দশদিন পরে

এখন ঝেড়ে মুছে রোদ্দুরে দাও সবটা তোমার

পশমের ওম জমা করে রাখো সব

সযতনে কোটরে কোটরে

এরপর আকাশের নীল কিছু মেখে নিও

 

আমি এই ঠিক সন্ধ্যার মুখোমুখি

স্থির হয়ে বসে আছি উপকূলে তোমার

দূরে বন্দরে জাহাজের আলো

নিভে আসা শরীরের কালো

বৈজয়ন্তীর প্রতীক্ষা শুধু

দুর্নিবার ডেকেছিল আমাকে একদিন

আজ বয়সের ঘাটে ঘাটে জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

হাজামজা পুকুরের মতো কুকুরকুণ্ডলী,

তবু ধ্যানে বসি, গান শুনি অনন্তের অপার

অভ্যাস পুরানো শরীরে কিছু রেখে গেছে দাগ

ঈশ্বরী আপন পিঠ থেকে অনুদানে অভয় মুদ্রায়

যদি আরো একবার জাগান এ শরীর

কত কিছু অলৌকিক আজো ঘটে যেতে পারে

যদি বেজে ওঠে জলতরঙ্গ আবার

যদি বেজে ওঠে মৃদঙ্গ তুমুল

আমি প্রতীক্ষায় থাকব আরও কিছুদিন!

.....................................................

অলঙ্করণ সঙ্ঘমিত্রা সাহা

Mailing List