বাজারের টাটকা সবজির মধ্যেও বিষ! বিশ্ব খাদ্য দিবসে নতুন শপথের কথা শোনাচ্ছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন ভৌমিক

বাজারের টাটকা সবজির মধ্যেও বিষ! বিশ্ব খাদ্য দিবসে নতুন শপথের কথা শোনাচ্ছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন ভৌমিক
07 Apr 2022, 12:45 PM

বাজারের টাটকা সবজির মধ্যেও বিষ! বিশ্ব খাদ্য দিবসে নতুন শপথের কথা শোনাচ্ছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন ভৌমিক

 

ড: কাঞ্চন ভৌমিক

 

সুদূর আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে একেবারে আটলাণ্টিক মহাসাগরের পাড়ের এক ভিলায় লিখতে বসেছি। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি আমাদের ভারতীয় সময় থেকে ৫ ঘন্টা ৩০ মিনিট পিছিয়ে।

আজ ৭ এপ্রিল। বিশ্ব খাদ্য দিবস। হ্যাঁ, এই দিনটিতে আবারো স্মরণ করতে পারি। কারণ, আমাদের স্বাস্থ্য সত্যিই কতটা সুরক্ষিত!! আমাদের খাবার কতটা সুরক্ষিত। আমাদের জল, মাটি, আকাশ, সর্বোপরি আমাদের পরিবারের ও চারপাশের মানসিকতা কতটা সুরক্ষিত!!

গত দুবছর ধরে সামান্য ভাইরাস কি কি খেলা দেখালো, কত প্রাণ কেড়ে নিল, কত নতুন নতুন মানসিকতার জন্ম দিল, তা আমরা সব্বাই জানি।

ধনীর নীতি বা "গ্রাহাম"( GRAHAM) নীতির চক্কর, রাসায়নিক লবি, অ্যালোপ্যাথিক লবি ইত্যাদি ইত্যাদি কত কিছু শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। বিজ্ঞান আজ নানাবিধ নিয়মের চক্করে দিশাহারা। এককথায় অভিশাপও বললে অত্যুক্তি হবে কী?

সম্প্রতি আমাদের পশ্চিমবঙ্গের রামপুরহাট, কামদুনি থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, ইউক্রেইন-রাশিয়া বা আমেরিকার সমঝোতা, হিরোসিমা, নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা ইত্যাদি ইত্যাদি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তেমনি শক, হুন, পাঠান, মোঘল, ইংরেজ শাসন সভ্যতার উত্থান পতন ইত্যাদির ইতিহাসে আমরা ভারাক্রান্ত।  

সংবাদপত্র রেডিও, টেলিভিশনে কয়েকদিন আগেও খুব শোনা যেত বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনোর প্রাদুর্ভাব। এবং সারা বিশ্বজুড়ে এই খাতে সেমিনার, আলোচনা ইত্যাদিতে কোটি কোটি ডলার খরচও হচ্ছে। প্রতিটি দেশ বিশ্ব সংস্থাগুলির নিয়ম মেনে নিজের মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

অবাক হওয়ার বিষয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'র রিপোর্টে ভারতের প্রতি বাড়িতে আজ সুগার, প্রেসার, ক্যানসারের মারণব্যধী আষ্ঠেপৃষ্টে ঘিরে ফেলেছে। আর এই নিয়ে কারও তাপ উত্তাপ ততটা দেখা যায় না। করোনার মতো নিজের ছেলে, বাবা, মা আত্মীয় পরিজনদের হারিয়ে আমাদের ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। যৌথ পরিবারের মায়ার বাঁধন আজ উধাও।

মানুষের ধৈর্য্য আজ তলানিতে। চটজলদি নেশায় সব্বাই ছুটছে। একদিকে টাকা রোজগার হচ্ছে, অন্যদিকে ডাক্তারী পথে সব টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।

কি খাচ্ছি, কেন খাচ্ছি, সত্যিই পুষ্টি পাচ্ছি কিনা এসব ভাবার সময়। আর সাধারণ মানুষের পক্ষে তো তা বোঝা একেবারেই কঠিন। তাঁরা বাজারে যা পান তাই কিনে খান। এছাড়া উপায়ই বা কী?  

কিন্তু সেই সমস্ত সব্জি কতটা শরীরের পক্ষে উপকারী না ক্ষতিকারক? এই প্রশ্নের মুলে রয়েছে অত্যধিক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। তার জেরে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটানোর কুফল। বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তরিতরকারী, ফলমুল, শাকসব্জি, তেল, নুন, মাছ, মাংস শুধুমাত্র যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে ফসল ফলানোতেই থেমে, তা কিন্তু নয়।

 

সেগুলিকে আবার টাটকা, চকচকে রাখার জন্য পুণরায় রাসায়নিক তেল প্রয়োগ। এখানেও শেষ নয়, আরও অনেক বাকি আছে। রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতেও আবার একই রকম দেখতে পলিমার বা প্লাস্টিকের তৈরি চাল, মাছ, মাংস, ডিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, রাসায়নিক দুধ, ভেজাল তেল, ভেজাল লবন, সাবান ইত্যাদি ইত্যাদি বানিয়ে একেবারে রান্নাঘরে চকচকে মোড়কে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে দেখে বোঝার কোনও উপায় নেই কোনটা আসল আর কোনটা নকল। সাধারণ মানুষ এক্সপায়ারি ডেট আইএসআই/ আই এসও/ ইএমও, গ্রীন ল্যাব বা ফ্যাসাই এর অনুমোদনের লোগো দেখে কিছুটা আসল নকল বোঝার বৃথা চেষ্টা করে থাকেন। কারণ সেখানেও সরকারের ব্যর্থতা লক্ষ্য করা যায়।  

আর এই সকল নিয়েই যত মাথা ব্যথা। আমি একজন ভারতীয় কৃষিবিজ্ঞানী। আদ্যিকালের মা ঠাকুমার গো-ময় পরিবেশের তত্ত্বে বিশ্বাসী।  বিশ্বাসী সারা বিশ্বকে পথ দেখানো চরক, মনু সংহিতার ভাবনায়। যোগী ঋষিদের সাধনায় বিশ্বাসী। আর তাইতো পাগলের মতো ছুটে বেড়ায় ভারতের বেশির ভাগ রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে। ঘুরে বেড়ায় বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা, বার্মা সহ রাশিয়ার বিভিন্ন দেশে। ইউরোপ ও আরব দেশের বিভিন্ন শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। হিমালয়ের আশ্রমিক সন্ন্যাসীদের সাথেও মিশেছি আবার গৃহী যোগীদের কথাও শুনেছি।  আমার উপলব্ধি, “আমাদের দৈনন্দিন খাবারের উৎস বিষমুক্ত করা গেলে আর বাকি সব সমস্যা আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।’’

আর সেজন্যই আমার লক্ষ্য বিষমুক্ত সমাজ তৈরি করা। আর তা করতে গেলে লাগামছাড়া রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করা জরুরি। কারণ, এসবের ফলে বেশ কিছু ক্ষতিকারক মৌল ফসলের মধ্যে বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। যা রান্না করে খেলেও নষ্ট হয় না, উল্টে রক্তে জমতে থাকে ও নানাবিধ মারণব্যধির জন্ম দেয়।

দেশের পলিসির ভুলের স্বীকার আমরা। সঠিক পুষ্টি, সত্যিকারের খাদ্য নিরাপত্তার নামে আরেক অনিশ্চয়তার পথে আমরা।  হাইব্রিডাইজেশন, জেনেটিক্যল মডিফিকেশন ইত্যাদি অনেক কিছু সংকরায়নে বিজ্ঞান বিভ্রান্ত। বিজ্ঞান আজ অভিশাপ। আর সেজন্যই এই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে, “বিষমুক্ত খাদ্য আর সত্যিকারের পুষ্টি”।

Mailing List