অজস্র ধারায় শঙ্খধ্বনি ছড়িয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ

অজস্র ধারায় শঙ্খধ্বনি ছড়িয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ
21 Apr 2021, 02:36 PM

অজস্র ধারায় শঙ্খধ্বনি ছড়িয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ

 

ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

 

বাংলার বুকে এক নক্ষত্র পতন হলো। চলে গেলেন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, গদ্যকার একালের শ্রেষ্ঠ মনীষী শঙ্খ ঘোষ। একজন বাঙালি ভারতীয় কবি, সাহিত্য সমালোচক ও একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমরা শঙ্খ ঘোষকে মনে রাখব আজীবন।

 

 

প্রকৃতপক্ষে শঙ্খ ঘোষ রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের একজন যোগ্য উত্তরসূরী। শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। জন্মগ্রহণ করেন বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুরে ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। পিতা মনীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং মাতা, অমলা ঘোষ। বাংলাদেশের পাবনা জেলার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

কর্মজীবন শুরু বিভিন্ন কলেজে বাংলা বিষয়ে অধ্যাপনা করার মধ্য দিয়ে। অনেকগুলো কলেজেই তিনি বাংলা পড়িয়েছেন। যেমন বঙ্গবাসী কলেজ, জঙ্গিপুর কলেজ, বহরমপুর গার্লস কলেজ, সিটি কলেজ প্রভৃতি। অবশেষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হয়ে কাজ করেছেন। এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর অগণিত ছাত্র দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

 

শঙ্খ ঘোষ-এর সাহিত্য জীবন শুরু ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তাঁর লেখা ‘দিনগুলি রাতগুলি’ কবিতাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। এবং এই শিরোনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এরপর তাঁর লেখনি আর থেমে থাকেনি। কবিতা, প্রবন্ধ, সাহিত্য, সমালোচনামূলক গ্রন্থ, উপন্যাস যেখানে তিনি স্পর্শ করেছেন তাঁর অসামান্য সৃজন প্রতিভায় বিকশিত হয়েছে তাঁর লেখা সাহিত্য। এযাবৎ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩৪।

 

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ গুলো হলঃ

নিহিত পাতাল ছায়া (১৯৬৭), আদিম লতাগুল্মময় (১৯৭২), মুর্খবড় সামাজিক নয় (১৯৭৪), বাবরের প্রার্থনা (১৯৭৬), তুমি তো তেমন গৌরী নও (১৯৭৮), প্রহর জোড়া ত্রিতাল (১৯৮২), বন্ধুরা মাতি তরজায় (১৯৮৪), মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে (১৯৮৪), ধুম লেগেছে হৃৎ কমলে (১৯৮৭), গন্ধর্বকবিতাগুচ্ছ (১৯৯৪), শবের উপর শামিয়ানা (১৯৯৭), ছন্দের ভিতর এত অন্ধকার (১৯৯৯), জলই পাষাণ হয়ে আছে (২০০৪), সমস্ত ক্ষতের মুখে পলি (২০০৭), প্রতি প্রশ্নে জেগে ওঠে ভিটে (২০১২), বহুস্বর স্তব্ধ পড়ে আছে (২০১৪), প্রেমের কবিতা (২০১৪), এও এক ব্যথা উপশম (২০১৭)।

 

তাঁর প্রকাশিত গদ্য গ্রন্থের সংখ্যা ৪৮। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল:

 

কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক (১৯৬৯), এ আমির আবরণ (১৯৮০), শব্দ আর সত্য (১৯৮২), নির্মাণ আর সৃষ্টি (১৯৮২), ঐতিহ্যের বিস্তার (১৯৮৯), বইয়ের ঘর (১৯৯৬), সামান্য অসামান্য (২০০৬), প্রেম পদাবলী (২০০৬), হে মহাজীবন : রবীন্দ্র প্রসঙ্গ (২০১৬), পরম বন্ধু প্রদ্যুমন (২০১৯), সন্ধ্যানদীর জলে : সংকলন (২০১৯)।

 

 

ছোট ও কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন অনেক রচনা। উল্লেখযোগ্য হলঃ

 

বিদ্যাসাগর (১৯৫৬), সকালবেলার আলো (১৯৭২), সেরা ছড়া (১৯৯৪), ছোট্ট একটা স্কুল (১৯৯৮), বল তো দেখি কেমন হত (২০০৫), আমায় তুমি লক্ষ্মী বল (২০০৭), ইচ্ছে প্রদীপ (২০১৪), ছোটদের গদ্য (২০১৭)।

 

 

তাঁর বক্তৃতা এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিছু সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

অন্ধের স্পর্শের মতো (২০০৭), এক বক্তার বৈঠক : শম্ভু মিত্র (২০০৮), কথার পিঠে কথা (২০১১), জানার বোধ (২০১৩), হওয়ার দুঃখ (২০১৪)।

 

উপন্যাসও লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ। উল্লেখযোগ্য হল, সকাল বেলার আলো (১৯৭২) সুপারি বনের সারি (১৯৯০)।

পুরস্কার পেয়েছেন অসংখ্য। উল্লেখযোগ্য পুরস্কার গুলি হলঃ

সাহিত্য একাডেমী–(১৯৭৭)–‘বাবরের প্রার্থনা’, মুর্খ বড় সামাজিক নয়-নর সিংহ দাস পুরস্কার (১৯৭৭), ধুমলেগেছে হৃৎকমলে-রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৮৯),

অনুবাদঃ রক্তকল্যান-সাহিত্য একাদেমী (১৯৯৯), বিশ্বভারতী থেকে দেশিকোত্তম (১৯৯৯), পদ্মভূষণ (২০১১), মধ্যপ্রদেশ সরকার কবীর সম্মান (১৯৯৮), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০১৬)।

 

শঙ্খ ঘোষের কবিতায় সমকালীন সমাজ ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিত্রিত হয়েছে তাঁর অসাধারণ সৃজনশৈলীতে। মনুষ্যত্বহীন মানুষদের দ্বারা সাধারন মানুষ কিভাবে লাঞ্ছিত হয় তাও তুলে ধরেছেন তিনি তাঁর লেখায়। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন অত্যাচারিত মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ ক্ষমতাই অত্যাচারীকে ধ্বংস করবে। তাঁর কবিতায় চিত্রকল্প ব্যবহারের দক্ষতা এবং নব নব ছন্দের বিন্যাস কবিতাগুলোকে অনন্য বিশিষ্টতা দান করেছে।

 

 

শঙ্খ ঘোষের সাহিত্যের নিজস্ব কিছু রীতি আছে। এককালে বাংলা কবিতায় বিষ্ণু দে-র অনুগামীদের ‘বৈষ্ণব’ বলা হতো। অনেকেই শঙ্খ বাবুর নিজস্ব রীতিকে ‘শঙ্খীয়’ বলে থাকেন। তাঁর সম্পর্কে এই ধরনের বিশেষণে তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতেন। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা স্বল্পভাষী নিয়মানুবর্তী এই মানুষটি সম্পূর্ণত সাহিত্য সাধক। এই সাধনায় ছিলো শুদ্ধতা, নিরহংকারতা। বাংলা সাহিত্য জগতের এমন একজন প্রতিভাবান মানুষের মৃত্যু ব্যথিত করে, শোকাহত করে আমাদের। আমরা হারালাম প্রকৃতপক্ষে একজন হৃদয়বান ও স্নেহশীল অভিভাবককে।

 

 

 

 

লেখক পরিচিতি: ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক।

 

 

Mailing List