কবি শঙ্খ ঘোষ ও দেশভাগের স্মৃতি, এক অনন্য কাহিনী

কবি শঙ্খ ঘোষ ও দেশভাগের স্মৃতি, এক অনন্য কাহিনী
21 Apr 2021, 06:27 PM

কবি শঙ্খ ঘোষ ও দেশভাগের স্মৃতি, এক অনন্য কাহিনী

 

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম

 

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত বিভাগের ফলে উপমহাদেশের জনগণ এক নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। দীর্ঘদিনের উপনিবেশ মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার নামে নতুন জাতীয়তাবাদের আড়ালে জড়িয়ে পড়ে দুই বাংলার জনগণ। র‍্যাডক্লিফ কমিশনের দৌলতে দুই বাংলার মধ্যকার যে সীমারেখা অঙ্কিত হয় তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়।

 

 

বাংলা বিভাগ ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগ (উভয় বাংলায় পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলা আবার পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম বাংলায়)- প্রিয় জন্মভূমি, চিরপরিচিত পরিবেশ যেমন পূর্ব পুরুষের বাস্তভিটা ত্যাগ এমনকি কর্মস্থল ত্যাগ করে রাতারাতি এক অজানা ভবিষ্যতের পানে ছুটে যাওয়া তা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে সংঘটিত হয়েছে কিনা সন্দেহ।

 

ইতিহাসের অমোঘ নিয়তিকে স্বীকার করে স্বাধীনতার আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং উচ্চাশায় জনগণ এর জোড়ালো বিরোধিতা করেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে এর দু:খ বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে জীবনের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি অধ্যায়ে। প্রতিফলিত হয়েছে পরবর্তী সময়ের স্মৃতিকথা, আর সাহিত্যে।

 

মহামারীর এই দু:সময়ে চলে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। থেমে গেল প্রতিবাদী কলম। শঙ্খ ঘোষের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ‘সুপুরিবনের সারি’ কিশোর উপন্যাসের পাঠের মধ্য দিয়ে। দারুণ এক  কিশোর উপন্যাস।

 

সুপুরিবনের সারি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে। যদিও ইতিহাস তখনো বুঝিনি। কিন্তু আমি কেমন করে যেন নীলু চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলাম। একজন কিশোর নীলুর মামাবাড়ি যাওয়ার কাহিনী। একজন কিশোর তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে কীভাবে অনেকে ছেড়ে আসতে চাইছে তাদের চিরদিনের দেশ। আর সেইসঙ্গে পিছনে পড়ে থাকছে হারিয়ে যাওয়া কত প্রিয়জন, কত প্রিয়ছবি!

কবি শঙ্খ ঘোষ এবং চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ, পাকশী, পাবনা (কবি যে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন)

অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া কবির সুপুরিবনের সারিতে দেখেছিলাম স্টীমার, নদী, আর ডেকের বর্ণনা। শুরুটাই যেন অন্যরকম:    

 “ঝগ্ ঝগ্ জল কাটতে কাটতে এগিয়ে চলেছে স্টিমার, দোতলায় ডেকের ওপর রেলিং ধরে তাকিয়ে আছে নীলু। নিচের তলায় মস্ত একটা ঢাকনা-দেওয়া চাকাটা যেখানে, নীলু দাঁড়িয়েছে তার ওপর দিকটায়। ঝুঁকে তাকালেই চোখে পড়ে অনেক কালোর মধ্যে শাদা শাদা ফেনায় ভরা জল, শাদাকালো ঢেউ তুলতে তুলতে মিলিয়ে যাচ্ছে পাড়ের অন্ধকারে। সেখানে ঝাপসা হয়ে দাঁড়িয়ে  আছে ঘন গাছের সারি।”

 

মামা বাড়ি থেকে নীলুর আর দেশে ফেরা হয়নি। একসময় নীলুর বাড়ি আর মামাবাড়ি একই দেশে ছিল কিন্তু আজ নাকি সেটা দুটো আলাদা দেশ।

 

কবি শঙ্খ ঘোষের প্রতি আমার আরো একটা টান অনুভব করেছিলাম। সেটা হলো কবির স্মৃতিতে পাবনা সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কবি শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। পিতার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং পাকশীর চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।

বাংলাদেশের প্রতি অন্তরের টান তিনি গভীরভাবে উপলদ্ধি করতেন। এ কারণে তাঁর কবিতাতেও ঘুরে ফিরে দেশভাগের কথা উঠে এসেছে।

দেশহীন কবিতায় কবি লিখলেন:

“আমার মুখে অন্তহীন আত্মলাঞ্ছনার ক্ষত

আমার বুকে পালানোর পালানোর আরো পালানোর দেশজোড়া স্মৃতি।”

 

কিংবা দেশান্তর কবিতায় যেমনটি তুলে ধরেছেন-

“ তারপর, সমস্ত পথ একটাও কোনো কথা না বলে

আমরা হাঁটতে থাকি, হেঁটে যেতে থাকি

এক দেশ থেকে অন্য দেশে

এক ধর্ষণের থেকে আরো এক ধষর্ণের দিকে।”

 

কবি শঙ্খ ঘোষ ছিলেন দেশ হারানো মানুষ। তিনি কি সত্যি সত্যি দেশের ঠিকানা পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্মৃতি তাঁকে আঁকড়ে রেখেছে সারা জীবন। যাঁর সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর বই ‘সন্ধ্যা নদীর জলে’।

তাঁর প্রয়াণে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

 

লেখক : বাংলাদেশের পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ উপাচার্য।

Mailing List