মাঝসমুদ্রে জাহাজে জলদস্যু! আরও কত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, সত্যকাহিনী শোনাচ্ছেন দেবজ্যোতি সোম, চতুর্থ পর্ব

মাঝসমুদ্রে জাহাজে জলদস্যু! আরও কত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, সত্যকাহিনী শোনাচ্ছেন দেবজ্যোতি সোম, চতুর্থ পর্ব
31 Oct 2021, 12:15 PM

মাঝসমুদ্রে জাহাজে জলদস্যু! আরও কত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, সত্যকাহিনী শোনাচ্ছেন দেবজ্যোতি সোম, চতুর্থ পর্ব

দেবজ্যোতি সোম

 

আগে stowaways পেলে, জাহাজ দুনিয়া তাদের দিয়ে কঠিন কাজ করাতো। তারপর সুবিধামতো আলোচনার ভিত্তিতে কোনোও পোর্টে ক্যাপটেন তাঁদের নাবিয়ে দিতো। এখন দিনকাল ভীষন কড়া। এখন Stowaway কে কোনও কাজ দেওয়া যাবে না। তাদের যথোপযুক্ত জামাকাপড়, প্রয়োজনে গরম জামা কাপড়, কম্বল সব দিতে হবে। এবং ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া তো বটেই। এদেরকে ঠিক কতটা জামাই আদর দিতে হবে, সেই নির্দেশিকার international regulation এর বই থাকে জাহাজে। সেই বইকে আগাগোড়া অনুসরণ করতে হবে। অন‍্যথায় ক্যাপটেনকে আইনি সমস‍্যায় পড়তে হবে।

 

তাদের উপস্হিতি জানাজানি হবার পর ক্যাপটেন এর মাথার প্রতিটা চুল খাড়া হবার জোগাড়। কারণ, এদের জাহাজ থেকে নাবানো ইদানিং এক মহা সমস‍্যা, প্রায় অসম্ভব ব‍্যাপার। যেখানে সেখানে নাবানো যাবে না। অনেক আইনকানুন মেনে, সমস্ত আইনকানুনের বৈধতা মেনে, তাদের স্বদেশে প্রত‍্যাবর্তন করাতে হবে। এবং তাহলে তো সবার আগে, প্রমান সমেত জানতে হবে, ওদের country of origin. সবমিলিয়ে এক মহা কঠিন ব‍্যাপার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জাহাজের রাস্তা তো আর ওদের country of origins অনুযায়ী হবে না। জাহাজ তো cargo loading and unloading ports অনুযায়ী sail করবে।

 

আমাদের আনন্দেপূর্ণ মনগুলো দারুনভাবে আঘাত পেলো। খুশি যেনো কেমনভাবে ঘেটে গেলো।

 

Captain এর মাথায় বাজ। Head office এর থেকে প্রচুর কথা শুনতে হবে। কি করে ওরা জাহাজে উঠলো, কেন ঠিক করে Stowaway watch রাখা হয়নি? ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি।

ওরা তো এবারে জাহাজের ঘর জামাই। সঙ্গে ভয়ের কারন হোলো, ওদের অসুখ বিসুখ, ওদের মানসিক স্হিতি। যদি কোনো মানসিক কারনে জলে ঝাঁপ দেয়, তাহলেও Captain responsible। জলে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে প্রমাণ হলে, Captain কে জেল পর্যন্ত খাটতে হতে পারে। এককথায় জাহাজ আনন্দ নগরী থেকে nightmareএ পরিণত হল।

Captain ছিলো গাড়োয়ালী, Captain ছেত্রী, যেমন পরিশ্রমী, তেমনই aggressive, তেমনই শরীরের গঠন, ঠিক যেনো একটা পাহাড়ী ফুটবল প্লেয়ার। বাইচুং ভুটিয়া, সুনীল ছেত্রীদের মনে করিয়ে দেয়। সে ভালো মুডে থাকলে, খুব স্ফূর্তিবাজ, খারাপ মুডে থাকলে terror.

Captain এর ঘুম উড়ে গেলো, আর তাই আমার আর Chief Deck Officerএরও প্রায় তাই অবস্হা। আমরা দুজন তো Deck departmentএ Captain দুটো প্রধান হাত, ফলে ঐ চাপ থেকে খুব দূরে থাকতে পারছিনা।

নিয়ম অনুযায়ী তিনজন stowaways কে interview করে, যথাসম্ভব ওদের থেকে, ওদের details জেনে, লিখে রাখা হোলো, ওদের ছবি তুলে রাখা হোলো। আর ওদের interviewএর সমস্ত details ব‍্যাংককের হেড অফিসকে জানিয়ে দেওয়া হোলো।

 

জাহাজ এগিয়ে চলেছে আকাবার দিকে, দিন চারেকের পথ।ওদেরকে কিছু কাজ দিয়েছে Captain, প্রধানত cleaning jobs, জাহাজে সবসময় নানান cleaning job লেগেই আছে।

ওরা শান্তশিষ্ট ভাবে কাজ করে আর কায়দায় ঘুমায়। তবে ওদেরকে খুব চোখে চোখে রাখা হচ্ছিল, কখন কি করে বসে, কে জানে। আমরা সবাই কমবেশি চাপে চলে এসেছি। প্রাণখুলে হাসিমজা অনেকটাই বেসামাল হয়ে পড়েছে।

ওদের মধ‍্যে যার চৌত্রিশ বছর বয়স, তাকে দেখলে American sprinter Carl Lewis এর কথা মনে পড়ে যাবে, এত সুন্দর শরীরের গঠন আর উচ্চতাও তেমন। আমি তো এখনও ঐ সুন্দর শরীরের গঠনটা এখনও ভুলতে পারিনি। তার বয়স বেশি বলে, তার interview কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিলো, জানা গেলো, ওদের দেশ সুদান, আর ঐ ভদ্রলোক পেশায় শিক্ষক, সুদানের গৃহযুদ্ধে তীব্রভাবে বিপর্যস্ত, আর তাই দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে, stowaway হবার পথ ধরেছে। ভদ্রলোকের হাবভাব, কথাবার্তা সত‍্যিই ভদ্র এবং মার্জিত ছিলো, ভালোই ইংরেজিতে কথা বোলতে সক্ষম ছিলো।

ওরা সবাই অন‍্য একটা জাহাজে stowaway হয়ে, প্রথমে সুদান থেকে, Adenএ এসেছে, তারপর আমাদের জাহাজে।

ওদেরকে ওদের Agent বলেছে নাকি, আমাদের জাহাজটা ইওরোপের কোনো পোর্ট যাচ্ছে, তাই ওরা আমাদের জাহাজে লুকিয়ে উঠে পড়েছে।

আকাবা পৌছানোর পর সঙ্গে সঙ্গেই পোর্টে ঢুকতে পারলাম না, Anchorage এ wait করতে হোলো কয়েকদিন। তারপর port control Pilot পাঠালো জাহাজকে পোর্টে ঢোকানোর জন‍্যে। উৎকণ্ঠা বাড়ছে, পোর্ট থেকে বেরিয়ে যদি কোনোভাবে ওরা পালিয়ে যায়। ওদের spare কেবিনে লক করে রেখে দেওয়া হোলো।

জাহাজ পোর্টে ঢুকে berth এ alongside চলে এসেছে, Customs, immigration, port health ইত‍্যাদি inspection শেষ হবার পর, দেখলাম এক ভদ্রলোক জাহাজে উঠে Captain এর Office কোথায় জানতে চাইছে এবং পরিচয় জানতে চাওয়ায়, উনি বললেন আমি Protection and Indemnity Surveyor, আমি stowaways দের সঙ্গে কথা বোলতে এসেছি। বুঝলাম উনি International Maritime regulation অনুযায়ী আমাদের জাহাজের stowaways দের সঙ্গে কথা বোলতে এসেছেন। আমাদের হেড অফিসকেও নানান Concerned international authorities কে নিয়ম অনুযায়ী inform করতে হয়েছে। ফলস্বরূপ P & I surveyor আমাদের জাহাজে এসেছে stowaways দের সঙ্গে কথা বলার জন‍্যে।

Captain এর অফিসে ওনাকে নিয়ে গেলাম। উনি Captain এর কাছে ওনার পরিচয় দিলেন, এবং অতঃপর আমাদের Ship's common রুমে senior most stowaway যে ছিলো তার সঙ্গে উনি কথাবার্তা শুরু করলেন, সমস্ত কথার সত‍্যতা নানানভাবে cross check করে যাচাই করলেন।

শুরুতেই খুব অবাক হলাম, কারন যখন সুদানিস stowaway কে P & I surveyor ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোন ভাষায় কথা বোলতে চাও, তখন stowaway ইংরেজিতে উত্তর দিলো, আমি সুদানিস, আরবিয়ান ও ইংরেজি তিনটে ভাষাই বোলতে পারি। ভাবতে খুবই খারাপ লাগছিলো, এই ভেবে, যে, একটা শিক্ষিত মানুষের, দেশে গৃহযুদ্ধের কারনে, কি করুন দুর্দশা। এও শুনলাম, তার মুখে, যে, সে জানেনা, তার মা, ভাই, বোনেরা কোথায় আছে, কেমন আছে, মরে গেছে না বেঁচে আছে, দেশটার এমনই তুমুল তছনছ অবস্থা। সত‍্যিই, আমরা বাইরে থেকে কতটুকুই বা খবর পাই।

তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হোলো,

Where do you want to go?

সে উত্তরে বললো,

Where I can get peace.

সেই মূহুর্তে মনে হচ্ছিল, আমরা ভারতবর্ষে কত ভালো আছি আর গৃহযুদ্ধ কি অপরিসীম ভয়াবহ নৃশংসতার সাক্ষী বহন করে।

ছোটো ছেলেদুটোকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোলোনা, সবখবর যা নেবার, জানবার, ঐ একজনের থেকেই নিলেন এবং সবকিছু Surveyor লিখে নিলেন।

কিছু forms fill up করতেও surveyor কে দেখলাম।

অবশেষে উনি চলে গেলেন।

একটা কথা এখানে একটু বলি, আমরা যেখানে anchor করেছিলাম,  আকাবা পোর্টে ঢোকার আগে, সেটা Gulf of Aqabaর শেষ প্রান্ত এবং মাঝামাঝি জায়গায়, কারন বাকি অর্ধেক জায়গাটা Israel waterএর underএ। Anchorage থেকে Jordan এর Aqaba এবং ইসরাইলের port city "Eilat"ও ভালোই দেখা যাচ্ছিলো, Aqaba আর Eilat পাশাপাশি, border cities. তবে রাত্রিবেলায় আলো ঝলমলে অনেক বেশি ছিলো Eilat, আকাবার তুলনায়। বলা যায় কোনো তুলনাই চলে না।

বুঝতে পারছিলাম, ইসরাইরেল ঐ ছোট্ট বন্দর শহরটাও কতটা সমৃদ্ধ। তারপর তো প্লেনের আনাগোনাও লেগে ছিলো, সেটাও দেখলাম।

হ‍্যা, মূল কথায় ফিরে আসি,

এবার আকাবা থেকে বোম্বে যাবার পালা। কিন্তু আমাদের কাছে খবর এসে গেছে, stowaways দের ফেরার পথে Aden এ নাবিয়ে দেওয়া হবে, Yemen Government এর সহায়তায়। তারপর ওদের ভাগ‍্যে কি আছে, আমাদের কারুর জানা নেই। সেটা Yemen Government জানে।

 

কিন্তু সেটা তো stowaways দের বলা যাবেনা, তাহলে ওরা out at sea জলে ঝাপ দিতেও পারে। সেটা তো আমাদের অভিপ্রায় কখনোই হোতে পারে না।

আকাবা থেকে বোম্বে যেতে গেলে, ফেরত পথের Yemen এর পাশ দিয়েই যেতে হবে। Red sea cross করলে, Arabian sea পড়বে, Arabian sea cross করলে সমুদ্র বন্দর বোম্বে।

তবে speed এমনভাবে adjust করা হোলো আমরা কয়েকদিন বাদে off Aden port রাত্রি বারোটা নাগাদ পৌছালাম, Aden portএর  কিছু দূরে জাহাজের speed কমিয়ে, আস্তে আস্তে একদম শূন‍্য করে দিয়ে জাহাজ নোঙর করা হোলো।

রাত্রি তখন বারোটা বা তার কিছু বেশি, stowaways রা রোজকার মত খাওয়াদাওয়া সেরে কেবিনে ঘুমোচ্ছে, কেবিন অবশ‍্য under lock and key. আমরা সবাই ওদের সঙ্গে খুবই ভালো ব‍্যাবহার করেছি। খারাপ ব‍্যাবহার কেনোই বা কোরবো। ওরা নিশ্চিন্তেই ঘুমায়।

নোঙর করার আধঘণ্টা পরে, অন্ধকারের মধ‍্যে, দেখতে পেলাম, কোনো জলযান আমাদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসার Navigational lights. এই Navigational lights দেখেই রাত্রিরে বুঝে নিতে হয় জাহাজের movements.

আস্তে আস্তে একটা মাঝারি সাইজের launch বোট আমাদের জাহাজের গা ঘেষে দাড়ালো।

ততক্ষণে Captain এর সাথে রেডিও টেলিফোনিতে ওরা যা কথা বলার বোলে নিয়েছে।

 আমরা তখন যথেষ্ট excited.

আমাদের জাহাজ fully loaded ছিলো, তাই জলের ভেতর অনেকটাই ঢুকে গিয়েছিলো, তাই ওদের জাহাজে উঠতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি।

দেখলাম Launch টা থেকে জনা ছয়েক লোক, সাদার ওপর uniform পড়া, আমাদের জাহাজে উঠলো। প্রত‍্যেকের হাতে রাইফেল, দেখে মনে হোলো, বেশ আধুনিক রাইফেল।

ওরা খুব সন্তর্পণে, যথাসম্ভব কম আওয়াজ করে হেটে ঢুকল। এবং আমরা ওদের থাকার রুমের চাবি দেওয়াতে, ওরা চবি দিয়ে কেবিন খুলে ঢুকে গেলো, এবং ওরা ভেতর থেকে কেবিন বন্ধ করে দিলো। তারপর পর দেখলাম, প্রায় একঘন্টা  কেটে গেলো, কেবিনের দরজা যথারীতি বন্ধ। ভেতরে কথাবার্তা চলছে, বুঝতে পারা যাচ্ছিলো, তাই বলে এতক্ষণ?

অবশেষে আরো কিছুক্ষণ বাদে, প্রথমে অল্প বয়সী ছেলেদুটোকে Gun point এ নিয়ে দুজনকে বেড়োতে দেখলাম, এবং ঐ দুজনকে Gun point এ লঞ্চে তোলা হোলো, কিন্তু বছর চৌত্রিশ বয়সের শিক্ষক কে রাজি করা যাচ্ছিলোনা, সে কিছুতেই জাহাজ থেকে নাববেনা। তাকে একটা প্রথম বিশ্বের ইওরোপের দেশে যেতেই হবে। অবশেষে, যেটুকু শুনেছি, বা মনে পড়ছে, তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে হয়েছিলো, তখন সে আমাদের জাহাজ পরিত‍্যাগ করতে রাজি হয়।

অবশেষে দেখলাম সুদানিস শিক্ষক, যাকে দেখলে, USAর sprintet কালজয়ী কার্ল লুইসকে মনে পড়ে যায়, সে Gun point এ cabin থেকে বেরোচ্ছে। অবশেষে সেও লঞ্চটায় উঠে পড়ল।

অতঃপর আস্তে আস্তে লঞ্চটা আমাদের জাহাজের পাশ থেকে এডেনের পোর্টের দিকে এগোতে থাকলো।

আমরা সবাই আস্তে আস্তে দূরে চলে যাওয়া লঞ্চটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। বুঝতে পারছিলাম, অজান্তেই, ঐ তিনজন সুদানিসদের জন‍্যে আমাদের একটা sympathy তৈরী হয়ে গেছে, একটা দয়ার জায়গা, একটা মায়ার জায়গা তৈরী হয়ে গেছে। আমরা সবাইই তো মানুষ, তবে কোন দেশে জন্মেছি, সেটা কিভাবে একটা জীবনের পার্থক্য গড়ে দেয়, ভীষনভাবে তা উপলব্ধি করেছিলাম।

আবার আমাদের জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দে, জাহাজ বোম্বের বন্দরের দিকে এগোবার প্রস্তুতির জানান দিলো। রাতের অন্ধকারে আমরা এগোতে লাগলাম বোম্বে বন্দরের দিকে, Red sea অতিক্রম করে আরব সাগরের দিকে।

তিনটে মুখ ভীষন চোখের সামনে ভাসছিলো। আমরা তো কয়েকদিন বাদে বোম্বে দেখবো, দেশের মাটি ছোঁয়ার আনন্দে ভেসে যাবো।

ওরা কেমন দুর্গতিতে ভেসে গেলো,  আমাদের অনুমানের অন্ধকারে আজও রয়েছে।

ads

Mailing List