এক আকাশ-দুই নক্ষত্র: বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্র, অজস্র মিলের পাহাড় এই দুই মহাচরিত্রের, অমিলও কম নয়

এক আকাশ-দুই নক্ষত্র: বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্র, অজস্র মিলের পাহাড় এই দুই মহাচরিত্রের, অমিলও কম নয়
26 Sep 2022, 12:12 PM

এক আকাশ-দুই নক্ষত্র: বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্র, অজস্র মিলের পাহাড় এই দুই মহাচরিত্রের, অমিলও কম নয়

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল

 

বিদ্যাসাগর শ্রদ্ধাঞ্জলি : ...: তোমার উজ্জ্বল দৃষ্টির সরণিতে দাঁড়িয়ে জীবনসত্যের 'বর্ণপরিচয়ে' আজ আমরা সকলেই নতজানু-

" তুমি এলে/ এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল /তোমার আসার পথ চেয়ে ছিল কারা?/ কতদিন-- কতকাল? তুমি আছ--/ তাই খুলে যায়, আজ ও শিশুর দিগন্ত।।"  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০৩ তম জন্মবার্ষিকী। দু'শো দুই বছর আগে 'আবির্ভূত'হয়েছিলেন তিনি। বিদ্যার সাগর, করুণার মহাসমুদ্র তিনি। ঈশ্বর ছিল তাঁর মানবজগৎ, ঈশ্বর ছিল তাঁর কর্ম, কর্মেই তিনি'সিদ্ধপুরুষ' চিরন্তন প্রণম্য তিনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬শে সেপ্টেম্বর,১৮২০ – ২৯শে জুলাই, ১৮৯১) মানবতা ও সত্যসদ্ধ পৌরুষের অধিকারী ঈশ্বর চন্দ্র কোন এক ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়, একটা সমস্ত জাতির নাম। তাঁর তেজস্বীতা নির্ভিকতা,লোকহিতৈষিতা সহস্রকোটি জনারণ্যে আজ ও হিমালয়ের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জাতির অনুভবে, জীবনের স্পন্দনে। ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ-সংস্কার প্রভৃতি এই অমিতবীর্য পুরুষের পূণ্য স্পর্শে লাভ করল সঞ্জীবনী শক্তি। সমাজ গঠনে এ-এক অনন্ত নজির। উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালী শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। তাঁর প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই লাভ করেন বিদ্যাসাগর উপাধি। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি ছিল তাঁর। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও সহজবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বাংলা গদ্যের তিনি জনক,তিনি যথার্থ শিল্পী। বাক্যমধ্যে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন প্রভৃতি প্রয়োগ করে বাংলা গদ্যকে সাবলীল ও শিল্পসৌন্দর্য করে তোলার কাজে তাঁর কৃতিত্ব অপরিসীম। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গদ্যরীতির প্রশংশা করে বলেছেন-- "বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর ---তাঁহার পূর্বে কেহই এরুপ সুমধুর বাংলা গদ্য লিখিতে পারেন নাই এবং তাহার পরেও কেহ পারে না"। রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

 

অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তাঁর অক্লান্ত সংগ্রাম আজও স্মরিত হয় যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে। আধুনিক কবির ভাষায় " গ্যাসবাতির সেই রাত আর নেই/ নেই নারীর চোখে কালো পর্দার স্পর্ধিত অহংকার/ জীবনসত্যের বর্ণপরিচয়ে আজ আমরা সকলেই নতজানু--"। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তাঁর দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। তাঁর পিতামাতার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালী মায়ের হৃদয়বৃত্তি। তাঁর ত্যাগ, তিতিক্ষা আজো আমাদের কাছে স্পর্ধিত এক আকাশ অহংকার। কালের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী, তিনি শাশ্বত।মধ্যাহ্নের সূর্য ই তাঁর একমাত্র প্রতীক।

 

তিন জন কালজয়ী, মহান ব্যক্তিত্বের জন্ম ও মৃত্যু দিবস এই রকম। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুকাল ১৮৯১। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১। শরৎচন্দ্রের জন্ম ১৮৭৬। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুকালে রবীন্দ্রনাথের বয়স ৩০, শরৎচন্দ্রের ১৫। বিদ্যাসাগর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতৃবন্ধু। ফলে অতি শৈশব কাল থেকেই বিদ্যাসাগরের স্নেহ স্পর্শে অতি ঘনিষ্ঠ। শরৎচন্দ্রের সে সুযোগ হয়নি। তদোপরি বয়সও তেমন নয়। তবে বয়স অল্প হলেও ‘কাশীনাথ’ তখনই বহুপঠিত। অর্থাৎ সামান্য বয়সে অসামান্য অভিজ্ঞ। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের মিল অমিলের মধ্যে মিলের পরিমাণ যেন দেখবার মত। দুজনেই গ্রামের মানুষ। দুজনেই ব্রাহ্মণ সন্তান। একই গ্রামে না হলেও একই জেলায়। শরৎচন্দ্রের জন্ম হুগলী জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে। বিদ্যাসাগরের জন্মও হুগলী জেলার বীরসিংহ গ্রামে। পরে অবশ্য ঘাটাল মহকুমার বীরসিংহ গ্রাম মেদিনীপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়। একই জেলার দুই মুক্ত পুরুষ। মুক্ত বিবেক।

আবার দুজনেরই জন্ম অতি দরিদ্র পরিবারে। বিদ্যাসাগরের পিতৃদেব ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শরৎচন্দ্রের পিতৃদেব মতিলাল চট্টোপাধ্যায় অভাব অনটনে জর্জরিত। কিন্তু কর্তব্যে সতর্ক। আপোষহীন, মুক্তমনা ব্যক্তিত্ব। প্রচণ্ড অভাবেও প্রতিবাদী মানসিকতার অভাব দেখা যায়নি। শত বাধাতেও ধীর-স্থির, অটল। তেমনি দু’জনের মাতৃদেবী। বিদ্যাসাগরের মাতা ভগবতীদেবী, শরৎচন্দ্রের মাতা ভুবন মোহিনী দেবী। দারিদ্র্য কবলিত দুই ব্রাহ্মণ পত্নী। সন্তানকে সুসন্তান করার অশ্বমেধ প্রতিজ্ঞা। এই হচ্ছে বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্রের পিতৃ-মাতৃকূলের বিশেষ দিক। আবার বিদ্যাসাগর শরৎচন্দ্রের বেশভূষায় মিলটাও উল্লেখযোগ্য। একজনের পরিধানে থানকাপড়, পায়ে চটি-জুতো, গায়ে ফ্লানেলের জামা, গলায় উপবীত। অন্যজনের পরনে ধুতি, গায়ে ফতুয়া, পৈতেটা মালার আকারে গলায়, হাতে একটা ছড়ি। সাধারণ বেশভূষাতেও ব্যক্তিত্ব দীপ্তমান। যেন দুই যমজ ব্রাহ্মণ সন্তান। আবার আচরণে, দু’জনেই অব্রাহ্মণ। টিকিতে, দাড়িতে, ধুতিতে বা লুঙ্গিতে কোন সংকীর্ণতা নেই। আছে অকৃত্রিম আন্তরিকতা। ধর্মতত্ব নয়, শিক্ষাতত্ব নয়, আধ্যাত্মিকতা নয়, নৈতিকতায় বেশি শ্রদ্ধাশীল। খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত, মদ্যপানে আসক্ত, ফরাসী মহিলার আশ্রিত বিপদগ্রস্থ মাইকেলের পাশে সামাজিক সঙ্কীর্ণতাকে অস্বীকার করে নির্ভরতা দান এ-এক অপার বিস্ময়। স্থিতধী, কর্তব্যকর্মে অটল বিদ্যাসাগরের একান্ত আপনজন মধুসূদন। ভিন্নধর্মী মাইকেলকে বুকে টেনে নিতে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। আবার কোনো গ্রামের দরিদ্রচাষীর বা সহায়সম্বলহীনার শীতের কষ্ট দেখে নিজের কম্বলখানাও চলে যায় মায়ের অনুরোধে। তেমনি শরৎচন্দ্র। যারা কিছুই পেলেনা, সারা জীবন শুধু দিয়েই গেল, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত, যাদের চোখের জলের হিসাব কেউ নিলেনা শরৎচন্দ্র তাদের হয়ে নালিশ জানালেন ভগবানের দরবারে। তাঁর সাহিত্যে উচ্চারিত হয় “আল্লা আমাকে যত খুশী সাজা দিও কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চরে খাবার এতটুকু জমিও কেউ রাখেনি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর যেন কখনো মাপ করোনা।“

খ্রীষ্টান মধুসূদন, মুসলমান গফুরের আর্তনাদে দুই ব্রাহ্মণের এমন অন্তর বেদনা তাঁদের মানবিকতার দিক স্পর্শ করে। তাঁদের মহত্বকে প্রকাশ করে।

এমনই অজস্র মিলের পাহাড় এই দুই মহাচরিত্রের। তবে পাশাপাশি অমিলও কম নয়। বিদ্যাসাগরকে পূর্ণ সমর্থন করা যেন কারও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এমন কি স্বামী বিবেকানন্দেরও নয়। ‘ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্য স্বরূপ’ বিদ্যাসাগরের এরকম মন্তব্যে স্বামীজি ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। আবার স্বামী বিবেকানন্দই মন্তব্য করেন, ‘মানুষের প্রতি যাঁর এত ভালবাসা, যিনি দীন আর্তের বন্ধু, তিনি যদি ধার্মিক না হন তবে ধার্মিক কে?”

বিদ্যাসাগরের প্রতিবাদে তেমনি শরৎচন্দ্রকে পাই। বিধবা বিবাহের জন্য বিদ্যাসাগরের ভাবনা, নিরলস সংগ্রাম নারীমুক্তি আন্দোলনে এক নতুন দিগন্ত সূচনা করে। শরৎচন্দ্র কিন্তু আন্তরিক ভাবে সমর্থন করেননি বিধবা বিবাহকে। “নারীর মূল্য” প্রবন্ধে বরং তিনি প্রতিবাদ করেছেন। লিখেছেন – “যাহারা ইতিহাস পড়িয়াছেন তাহারা জানেন, বিধবা বিবাহ জগতের কোনো দেশে কোনদিন সমাদর পায় নাই। কম বেশী সকলেই ইহাকে অশ্রদ্ধার চোখে দেখিয়াছে।“ আবার কখনো তিনি বলেছেন, “বিধবা বিবাহে বিদ্যাসাগর মহাশয় শাস্ত্রীয় বিচার করলেও হিন্দুর মনের বিচার করেন নি।“

তবে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলন করে অবিচার করেছেন এটাও কিন্তু শরৎচন্দ্র জোর দিয়ে বলেন নি। একবার প্রেসিডেন্সী কলেজে একদল ছাত্র যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন ‘পল্লী সমাজে’ রমা এবং রমেশ – একজন চলে গেল কাশী অন্যজন জেলে। দু’জনের ভালবাসা কোনো আশ্রয় পেল না। শরৎচন্দ্র তার উত্তরে বলেছিলেন, “আমি বিধবা বিবাহ দিতে বসিনি। ওটা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাজ।“ বিদ্যাসাগরের কাজ কর্মের প্রতি পূর্ণ সমর্থন না থাকলেও অবহেলা ছিল না, শ্রদ্ধার অভাবও নয়। বিদ্যাসাগরকে তিনি দেখেছেন ভগবানের নিজের হাতের গড়া সিংহ-পুরুষ রূপে। “দুর্গা পূজার মহাষ্টমী দুই দণ্ড আগে বসিবে কি পরে বসিবে, বিড়াল মারার প্রায়শ্চিত্ত এক কাহন কিংবা পাঁচকাহন কড়ি প্রশস্ত তার বিচার ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা করুন, কিন্তু সমাজের ভালো মন্দের বিচারের দায়িত্ব তাদের নয়। তাহার জন্য আছেন স্বর্গীয় বিদ্যাসাগরের মত যাহাদিগকে ভগবান নিজ হাতে গড়িয়া পাঠাইয়াছেন।“ শরৎচন্দ্রের এই কথার মধ্যেই নিহিত রয়েছে  বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মানবতা ও সত্যসিদ্ধ পৌরুষের অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্র ও শরৎচন্দ্র কোনো ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়, একটা সমস্ত মানবজাতির প্রতিনিধি। তাঁদের তেজস্বীতা, নির্ভীকতা, লোকহিতৈষিতা সহস্রকোটি জনারণ্যে আজও হিমালয়ের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জাতির অনুভবে, জীবনের স্পন্দনে।

দুই মুক্তপুরুষের আবির্ভাব এমন একটি লগ্নে যে সময় মানসিক দৈন্য ও পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ এই সমাজ। ঘুণপোকারা কুড়েকুড়ে খাচ্ছে আমাদের বিবেক, আমাদের মনুষ্যত্ব। চেতনার আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। অন্ধকার, বন্ধুর পথে চলতে চলতে আমরা দিগভ্রান্ত, ক্লান্ত। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন, দিগভ্রান্ত, অবক্ষয়পীড়িত সমাজের কাছে বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্র উজ্জ্বল নক্ষত্রদ্বয়। দু’জনই গ্রাম্য, দরিদ্র পরিবারের সন্তান যাঁরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সমাজের সীমাহীন দায়িত্ব। ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ-সংস্কার প্রভৃতি এই অমিতবীর্য পুরুষদ্বয়ের পুণ্য স্পর্শে লাভ করল সঞ্জীবনী শক্তি। সমাজ গঠনে এ এক অনন্য নজির। তাঁদের ত্যাগ, তিতিক্ষা আজও আমাদের কাছে স্পর্ধিত অহংকার।

তবুও তাঁরা নিন্দিত হয়েছেন স্ব-কালের তথাকথিত পণ্ডিত সমাজের কাছে, সমালোচিত হয়েছেন উত্তরকালেও। বাকসর্বস্ব পণ্ডিতস্মন্যেরা কেবলমাত্র সমালোচনার শর নিক্ষেপেই নিষ্ক্রান্ত হননি, এই সমস্ত বিড়াল তপস্বীদের হাতে লাঞ্ছিত, ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন এই অতুল্য মানব প্রেমিকদ্বয়ের প্রস্তর মূর্তিও। এসব সত্বেও কালের বাধা অতিক্রম করে তাঁরা উভয়ই মৃত্যুঞ্জয়ী, শাশ্বত। মধ্যাহ্নের সূর্যই তাঁদের প্রতীক।

আজকের এই মিথ্যার যুগে বিদ্যাসাগর কতটা প্রাসঙ্গিক? বর্ণপরিচয়ে তাঁর ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ উপদেশ কি আজকের ছেলেমেয়েদের মনে দাগ কাটবে? তাঁর নীতির পাঠের থেকে হয়তো কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে। হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা তাঁকে চিনবে না, তাঁর সাদা চাদর পরিহিত দীপ্ত আবক্ষ মূর্তি ধুলায় লুণ্ঠিত হওয়াই আজকের রীতি। অথচ বাংলার আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা আজ বিশেষ প্রয়োজন। বাংলার শিক্ষা ও সমাজের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র উন্মুক্ত ও উদার মননের প্রতীক। তাঁর বিদ্যা ও দয়া, কোনওটাই ভুলবার নয়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছিলেন বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সর্বপ্রধান গুণের কথা বলে— “যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালীজীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া— হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে— করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।” বিদ্যাসাগরের জন্মদ্বিশতবর্ষে যদি আমরা উগ্র হিন্দুত্ব ও সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করে বাঙালি জীবনকে আবার অপার মনুষ্যত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারি, তবে সেটাই হবে এই অনন্য ব্যক্তিত্বের প্রতি জন্মদিনে প্রকৃত শ্রদ্ধা অর্পণ।

লেখক: শিক্ষক, খাতড়া হাইস্কুল, বাঁকুড়া (লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, অণু ও ছোট গল্প এবং ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা)

তথ্যঋণ: পশ্চিমবঙ্গ, বিদ্যাসাগর সংখ্যা। শরৎ-সাহিত্য

Mailing List