শুধু শহর নয়, মধ্যবিত্তের ঘরও বায়ু দূষনে জেরবার

শুধু শহর নয়, মধ্যবিত্তের ঘরও বায়ু দূষনে জেরবার
11 Sep 2022, 04:00 PM

শুধু শহর নয়, মধ্যবিত্তের ঘরও বায়ু দূষনে জেরবার

 

ড. প্রভাতকুমার শীট

 

বায়ু দূষণের বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমরা। কোভিড-১৯ লকডাউন এর সময় যানবাহনের চলাচল ও কলকারখানা প্রায় বন্ধ ছিল। লকডাউন সময়কে পরিবেশের সুস্বাস্থ্যের স্বাভাবিক পরিমাপক ধরে বিচার করলে তফাৎটা সহজে বোঝা যায়। লকডাউনের সময় বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, ওজন, পিএম-১০ ও পিএম-২.৫ এর মাত্রা তাৎপর্য ভাবে কমেছিল। গবেষকরা দাবী করেছে। শুধু কলকাতা বা দিল্লি নয় সমগ্র বিশ্বের বড় শহরে বাতাসের দূষকের পরিমাণ বেশ কমে ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে। সত্যি কি তাই, না আমরা দিনের পর দিন বাতাসে ধূলিকনা, পিএম-২.৫, কার্বন প্রভৃতি দূষণ বাড়িয়ে চলেছি? কোভিড লকডাউন সময়টা ছিল ঠিক যেন দাঁড়ি পাল্লার মতো। পরিবেশের সুস্বাস্থ্য, বাতাসে ধূলিকনা, গুণগত মান, বিশ্লেষণ করার সময়।

 

শুধু লকডাউন এর সময় একটুকু নয়। অন্তত চার থেকে পাঁচ বছরের তথ্য পর্যবেক্ষণ করলে বায়ুমণ্ডলের দূষক এর মাত্রা পরিবর্তনশীলতার হার সহজে চেখে পড়বে। কলকাতা শহরে পিএম-২.৫ পরিমাণ ২০১৮ সালের মার্চ মসে ছিল ৪৪.৮, ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৭৬.৬২ প্রতি ঘনমিটারে (মাইক্রোমিটার)। ২০২০ সালে লকডাউনের সময় কিছুটা কমে স্বাভাবিক হয় ৪২.৮২। তার পর থেকে ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ২০২১ সালে মার্চ মাসে ৫৬.৪ এবং ২০২২ সালে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪।

দিন দিন বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ছে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। শুধু গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়, কার্বন মনো অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড প্রায় কুড়ি শতাংশ হ্রাস পেয়েছে লকডাউনের সময়। এছাড়াও কলকারখানার ধোঁয়া, বর্জ্য পদার্থ, গৃহস্থলীর আবর্জনা, জ্বালানি থেকে বায়ু দূষিত হয়। লকডাউনের জেরে গ্রিন হাউস গ্যাস কমে যাওয়ার ফলে বাতাসে তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হ্রাস পেয়েছিল। বায়ু দূষণের কারণে কলকাতা শহরে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা বোধ করে। এটা ঠিক যে দিল্লি, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু পেছনে ফেলে কলকাতা পিএম-২.৫ মাত্রা লকডাউন এরপর থেকে দ্রুত হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে মার্চ মাসে কলকাতার বাতাসে পিএম-২.৫ ছিল ৪৬.৬ থেকে বেড়ে ৮৪ হয়েছে। প্রায় ১৮০ শতাংশ বেড়েছে পিএম-২.৫ বিভিন্ন কারনে।

 

শুধু শহরে অথবা গাড়ি থেকে নির্গত বায়ু দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় তা নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে কাঠ পুড়িয়ে বা ঘুঁটে রান্না করার সময় পিএম-২.৫ মাত্রা সহনশীলতার থেকে অনেক বেশি হয়। বিশেষ করে ভেজা কাঠে, ঘুঁটে বা গুলে অথবা কাঠ কয়লার উনুন ধরানোর সময় সবচেয়ে বেশি নিঃসরন হয় পিএম-২.৫। কোলে শিশুরা রান্না করার সময় মায়ের কলেই থাকে। তাদেরও সবথেকে বেশি ক্ষতি হয়।  সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে বাড়ির মেয়েদের দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা রান্নাঘরে কাটাতে হয়। আর আগুনের পাশে বসে রান্না করতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এক কেজি কাঠ পোড়ালে কার্বন-মনোক্সাইড উৎপন্ন হয় ৩০-৪৫ পিপিএম। কিন্তু এক কেজি গ্যাস থেকে  মাত্র ৬-৭ পিপিএম নিঃসরণ হয়। যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া মান এর থেকে অনেক বেশি  উনুনের জ্বালানিতে। আবার খড়কুটো বা ঝাঁটি জ্বালানিতে কার্বন ডাই অক্সাইড বেশি উৎপন্ন হয় গ্যাস জ্বালানির থেকে। কাঠে বা ঘুঁটে উনুনের জ্বালানিতে রান্নার সময় উৎপন্ন কার্বন মানুষের সহনশীলতা থেকে দ্বিগুণ বেশি হয়।

উনুন জ্বালানোর সময় বাতাসের সুক্ষ কনা পদার্থ প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫ (মাইক্রোমিটার) অনেক বেশি হয়। যদি কাঠ ভেজা থাকে পিএম ২.৫ পরিমাপ ৫০০ এর কাছাকাছি হয়। রান্নায় গ্যাস বা কয়লা ব্যবহারে চেয়ে অনেক বেশি পিএম ২.৫ উৎপন্ন হয় জ্বালানি কাঠে। যা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় পিএম ২.৫ সহনশীলতা মান ৩৫। সেখানে কাঠ জ্বালানিতে ১৫০-৩৫০ পিপিএম  উৎপন্ন হয় পিএম ২.৫। আমরা সমীক্ষা করে দেখেছি জঙ্গলমহলে প্রায় ৯৫ শতাংশ বাড়িতে কাঠে রান্না করার সময় বায়ুতে কার্বন বেশি থাকে ও বায়ুতে ভাসমান কনা পিএম ২.৫ এর মাত্রা সহনশীলতা থেকে অনেক বেশি। ফলে চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের প্রদাহ, স্নায়ুবিক দৌর্বল্য ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়।

Mailing List