শুধু প্রকৃতির উজাড় করা সৌন্দর্য নয়, মেদিনীপুর ও লালগড়ের বনাঞ্চল জুড়ে ছ‌ড়িয়ে অনেক টুকরো টুকরো ইতিহাস

শুধু প্রকৃতির উজাড় করা সৌন্দর্য নয়, মেদিনীপুর ও লালগড়ের বনাঞ্চল জুড়ে ছ‌ড়িয়ে অনেক টুকরো টুকরো ইতিহাস
28 Jul 2021, 09:26 PM

শুধু প্রকৃতির উজাড় করা সৌন্দর্য নয়, মেদিনীপুর ও লালগড়ের বনাঞ্চল জুড়ে ছ‌ড়িয়ে অনেক টুকরো টুকরো ইতিহাস

ডঃ শুভেন্দু ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভৌগলিক অবস্থান পর্যটনের বিকাশে অত্যন্ত অনুকূল। উত্তরে পর্বতকন্যা দার্জিলিং থেকে দক্ষিণে সৈকত শহর দিঘা এবং অপরদিকে জীববৈচিত্রে ভরপুর সুন্দরবন থেকে শুরু করে অরন্যসুন্দরী ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া, এই সমস্ত জায়গায় নিজ নিজ স্বতন্ত্রতায় পর্যটকদের আকর্ষন করে চলেছে।

 

রাজ্য সরকার বিভিন্ন সময়ে পর্যটন বিস্তারে ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সরকারি পর্যটন নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল। যেখানে পরিকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটক পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্য পর্যটন দপ্তর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহনে উদ্যোগী হয়। একইভাবে  সেই সময় থেকেই পশ্চিমবঙ্গ কে আন্তর্জাতিক পর্যটন  মানচিত্রে তুলে ধরারও চেষ্টা শুরু হয় এবং  ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের মত সরকারি ভাবে বিজ্ঞাপনের উপরও জোর দেওয়া হয়।


যদিও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র গুলিকে সেই সময় রাজ্যের তথা পার্শ্ববর্তী কয়েকটি রাজ্যের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার কোনও গঠনমূলক প্রয়াস  চোখে পড়েনি। যেটুকু শুরু হয়েছিল তা মূলত অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া অযোধ্যা পাহাড়কে কেন্দ্র করেই। অবশেষে ২০০৮-১০ সময়কালে জঙ্গলমহলের সেই  হতাশাজনক অধ্যায় কাটিয়ে ২০১১ সাল থেকে  জঙ্গলমহল তার নিজের কৌলিন্য ফিরে পায়। রাজ্য সরকার জঙ্গলমহলের সার্বিক মান- উন্নয়নে পরিকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে  প্রভূত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তার বহুলাংশে বাস্তবায়িতও হয়েছে। এছাড়াও সরকার জঙ্গলমহলের সমস্ত মানুষের দুবেলা খাবারও সুনিশ্চিত করেছে। পর্যটনের বিকাশে ঝাড়গ্রামে ২০১২ সালে জঙ্গলমহল উৎসব শুরু হয়, যেখানে এখানকার আদিবাসী মুলবাসী জনগন তাদের শিল্পকলার বিপনন ও সংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে শহুরে বাবুদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পায়। ঝাড়গ্রামের বিশিষ্ট মানুষজনের মতে পর্যটনের বিকাশে সরকারের এই প্রয়াসে জঙ্গলমহলে পর্যটকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান সময়ে করোনা সংক্রমণের আশংকায় ভ্রমন প্রিয় মানুষের কাছে অন্তঃরাজ্য বা নিকট -পর্যটন ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। আমাদের রাজ্যে পার্বত্য হিমালয় তরাই ডুয়ার্স অঞ্চল সহ সুন্দরবন, দিঘা ও দক্ষিণবঙ্গের ল্যাটেরাইট অধ্যুষিত  বনাঞ্চলগুলিতে পর্যটক এর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। এটা ঠিক যে কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের  মানুষের কাছে অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম ও লাগোয়া বনাঞ্চল সপ্তাহান্তে ভ্রমণের অন্যতম ঠিকানা। কিন্তু আজ আমি  মেদিনীপুর - শালবনি- লালগড় -রামগড়- গরবেতা - মেদিনীপুর এই পর্যটন বর্তনীটিকে ভ্রমনপিপাসু মানুষের কাছে অবতারণার চেষ্টা করব।

 

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে শিলাই ও কাঁসাই নদীর মধ্যবর্তী এই বিস্তৃর্ণ বনাঞ্চলটি সারা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১০% বনভূমি নিয়ে প্রকৃত অর্থেই দক্ষিণবঙ্গের ফুসফুস হিসেবে চিহ্নিত। প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত অবস্থা ও উদ্ভিদ বৈচিত্রের দিক দিয়ে এই অঞ্চলটিকে ঝাড়গাম বনাঞ্চলের থেকে কোনোভাবেই পৃথক করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই পর্যটন মানচিত্রে এই অঞ্চলটিকে অতি সহজেই উপস্থাপন করা যেতে পারে। এছাড়াও এই অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন রাজার গড় ও প্রাচীন মন্দিরগুলির ইতিহাস অন্বেষণ ভ্রমনকারিদের আকর্ষণ করবেই।


এই পর্যটনবর্তনীটি মেদিনীপুর থেকে শুরু হওয়ায়, জেলাশহর  দিয়েই যাত্রা শুরু করা যাক। কোলকাতা থেকে সরকারি বাসে বা ট্রেনে প্রায় ৩.৩০ ঘন্টার যাত্রাপথ মেদিনীপুর। মেদিনীপুরে পৌঁছে টিফিন সেরে দলগতভাবে গাড়ী ভাড়া করে শহরের কিছু জায়গা ঘুরে নিতেই পারেন। প্রথমেই চলে আসুন অ্যানিকেত বাঁধ ও সংলগ্ন ক্ষুদিরাম পার্ক। তারপর শহর লাগোয়া মন্দিরময় পাথরার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ভূচিত্র পর্যবেক্ষণ করে শহরে ফিরে মেদিনীপুর শহরের একমাত্র আন্তর্জাতিক ধর্মস্থান জোড়া মসজিদ,  যেখানে প্রতি  বছর  ঊরুষ উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সহ সমগ্র রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রান মুসলিম সম্প্রদায়ের  মানুষেরা ভিড় করে।

 

এরপর আপনাদের পছন্দ ও আর্থিক সক্ষমতা অনুসারে যেকোনো হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিন। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিতে নদীর পাড়ে 'সূর্যাস্তে' বট গাছের তলায় চলে আসুন। কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রথম দিনের সর্বশেষ গন্তব্য দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গোপগড়। এই ল্যাটেরাইট উচ্চভূমিটিতে একদিকে যেমন গড়ের ইতিহাস রোমন্থন এর সুযোগ, অপরদিকে ফুলের বাগান, অর্কিড,  প্রজাপতি উদ্যান, পাখিরালয়, প্রভৃতি অন্যতম আকর্ষণ। 

উল্লেখ্য, এখানে সুলভ পিকনিক স্পট এর সাথে সাথে পার্কের ভিতরে সুলভ ক্যান্টিনও আছে। এর কিছু দুরেই আছে গুড়গুড়িপাল বনভুমি ও ইকো টুরিজম কেন্দ্র, সুযোগ থাকলে সময় নিয়ে ওখানেও ঘুরে আসতে পারেন। গোপগড় বা গুড়গুড়িপালে অরন্য ঘেরা পরিবেশে প্রথমদিন রাত্রিযাপন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্য বনদপ্তরে অগ্রিম বুকিং করা আবস্যিক। পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন।


পরবর্তী ঠিকানা চুয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী রানি শিরোমণির স্মৃতি বিজড়িত কর্ণগড় মন্দির ও কুন্ডলীকার পারাং নদীর পরিখাযুক্ত বিদ্রোহী সেনাদের আবাসস্থল সহ রাজদরবার আবাসগড়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশদের জয়ের পর ১৭৬০ দালে ব্রিটিশরা জঙ্গলমহলে রাজস্ব আদায়ের অধিকার  পাওয়ায় পর পরই বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে, তা ১৭৬৬ সাল থেকে খাজনাহীন জমির থেকে রাজস্ব আদায় শুরু করার পর থেকে ভয়ংকর রূপ নেয়। এই অঞ্চলের খয়রা, মাঝি, লোধা, কোল, মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতির মানুষজন আরো ক্ষেপে উঠে এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে সারা ভারতবর্ষে  এখানকার জঙ্গলমহলে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। যা চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলে রানী শিরোমণি। ১৭৬০ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত এই বিদ্রোহ চলেছিল। পরবর্তী সময়ে রানিকে ইংরেজ সরকার আবাসগড়ে গৃহবন্দী করে এবং বন্দী দশাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে এই বিদ্রোহে ইতি পড়ে।

এছাড়াও কর্ণগড়ের মূল আকর্ষণ মন্দির কে ঘিরেই। উৎকল শিল্পকলায় নির্মিত তৎকালীণ মন্দির গুলির মধ্যে রাজকুলদেবী মহামায়ার মন্দিরটি অন্যতম। মন্দিরে প্রবেশের তিনটি ফটকের  মধ্যে পশ্চিম দিকের ফটকটি প্রায় ৭৫ ফিট উঁচু,দণ্ডেশ্বর মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট এবং বামদিকের দেবী মহামায়ার মন্দিরটি ৩৩ফুট উঁচু। পদ্মফুলের ওপর দেবীর অধিষ্ঠান। দেবীর সামনে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন যেখানে বসে সিদ্ধিলাভ করেন কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য এবং যশোবন্ত সিংহ।প্রচলিত আছে এখান বসেই নাকি কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য শিবায়ণ কাব্য রচনা করেন। এই সব কতো না ইতিহাসের সাক্ষী আছে ওখানকার চুনসুরকির কাঠামোগুলি।

এখানে টিফিন সেরে বেরিয়ে পড়ুন ভাদুতলা লালগড় রাজ্যসড়ক ধরে।  শাল পিয়ালের ম ম করা গন্ধে মন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ব হয়ে উঠবেই। সেলফি তুলুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য গায়ে মেখে। গাড়ি থেকে নেমে গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। ৩-৪ কিমি এগোলেই পাথরকুমকুমি ভুমি সংরক্ষণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র যা সঙ্গে থাকা ছাত্রছাত্রীদের কাছে একটি শিক্ষামূলক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। যেখানে রাজ্যসরকারের ভুমি সংরক্ষণে গৃহীত পদক্ষেপগুলি মডেল আকারে উপস্থাপিত করা আছে। এখানে কিছুক্ষন কাটানোর পর পরবর্তী গন্তব্য লালগড়।

 

লালগড় যাওয়ার পথে পিড়াকাটা ঠিক আগেই রাস্তার বামদিকে নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। যা কিছুদিন আগে পর্যন্ত অনেকটাই অক্ষত থাকলেও বর্তমানে  প্রায় বিলুপ্তির পথে। পিড়াকাটা থেকে ডানদিকে একটি রাস্তা সেই সিজুয়ার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গোয়ালতোড় অভিমুখে গেছে। একই রাস্তা ধরে লালগড়ের উদ্দেশ্যে যেতে যেতে লালগড়ের ঠিক আগেই পড়বে সেই অভিশপ্ত ঝিটকার জঙ্গল। যেখানে ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবাদীদের জঙ্গলপথে পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মীর মৃত্যু হয় এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়। তবে সেসব এখন অতীত। ঘন সাল জঙ্গলের মাঝ বরাবর ঝকঝকে রাস্তা আর ইতিউতি তাকালে দেখা মিলবে পেটের টানে আসা কাঠ কুড়োনির দল ও কেন্দু পাতা সংগ্রাহক আদিবাসী রমণীদের। কথা বললেই বুঝতে পারবেন অরন্যকে ঘিরেই তাঁদের জীবনের সবকিছু কিভাবে আবর্তিত হয়। অরন্য সম্পদের পরিবেশ বান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার সম্পর্কে এই তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষজনের কাছে অনেক কিছুই শেখার আছে বলে মনে হবে। তাদের সাথে দু’দন্ড গল্প করে তাদের দিন গুজরানের রোজনামচা জেনে নিতে পারেন। কিছুক্ষণ জঙ্গলের গভীরে কাটানোর অভীজ্ঞতাও অর্জন করতে পারেন। এই ঝিটকার জঙ্গলের পাশেই পারাং নদীর উৎস,  ছোটো গাড়ি থাকলে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঝর্ণাটিও পর্যবেক্ষণ করতেই পারেন।

এরপর লালগড় রাজবাড়ি দেখার পর লাঞ্চ সেরে খাসজঙ্গল এলাকায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর বিকেলের দিকে নদীর ধারে আমকলা সেতুর ওপর থেকে কংসাবতি নদীর মোহময়ী রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। পরে রামগড় রাজবাড়ি ও কালাচাঁদ মন্দির দর্শন করে সোজা বুলানপুরের মেটালার জঙ্গল হয়ে রূপারঘাগরা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এখানকার বৃহদাকার ঝিলে সারা বছর পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা লেগেই থাকা, চাইলে ক্যামেরা বন্দি করতেই পারেন। ওখানে ঘন্টা খানিক কাটানোর পর সোজা গোয়ালতোড় সনকা মাতার মন্দির। সময় থাকলে পুজোও দিতে পারেন। কিছু আগেই রাস্তার বামদিকে দূর্গা মন্দিরও দর্শন করে সোজা হুমগড়ের রাস্তা ধরে দূর্গাবাঁধ ফার্ম, যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ফলের বাগান। ওখানে কিছুক্ষন কাটিয়ে হুমগড়ের রামচন্দ্র মন্দির ও বগড়ির রাধাকৃষ্ণ মন্দির  দেখে সোজা গনগনি। যেখানে  ল্যাটেরাইট মৃত্তিকায় নালি ও প্রনালী ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট ক্যানিয়ন, যাকে ঘিরে রয়েছে এক বিরাট পৌরানিক ইতিহাস। এছাড়াও  এই অঞ্চলের আগুন রঙের মৃত্তিকার প্রতিটি খাঁজে লুকিয়ে রয়েছে অসীম ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব  যা এই অঞ্চলটিকে গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করেছে। গনগনির পর সর্বমঙ্গলা মন্দির ও পরে বাবা বসন্তরায় মন্দির দেখে সোজা চন্দ্রকোনা রোড পরিমল কানন, যা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে সুন্দর উদ্যান হিসেবে চিহ্নিত। ওখানে ঘন্টা দুয়েক কাটানোর পর পার্কের ভেতরের ক্যান্টিনে টিফিন সেরে নিন।

 

পরিমল কানন থেকে বেরিয়ে গোধুলির আলো মেখে ফেরার সময় আড়াবাড়ি সংরক্ষিত বনভুমিতে একটু সময় কাটিয়ে সোজা পূনরায় সন্ধে নাগাদ মেদিনীপুর শহরে ফিরে এলে সফর শেষ এবং পর্যটন-বর্তনীটিও সম্পুর্ন।


উল্লেখ্য, এই পর্যটন বর্তনীটিকে আরও বেশি আকর্ষনীয় করে তুলতে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষের সাথে কথা বলে এবং প্রকাশিত বিভিন্ন আর্টিকেলসগুলো পড়াশুনা করে, বেশ কিছু পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমার মনে হয়েছে।


প্রথমত: সরকারি ভাবে এই জায়গাগুলিকে রাজ্য পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরতে হবে।


দ্বিতীয়ত: পর্যটনস্থলগুলিতে পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তুলতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।


তৃতীয়ত: বিভিন্ন স্পটগুলির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিবরন সমন্বিত বোর্ড লাগাতে হবে।

চতুর্থত: বিভিন্ন রাজগড়গুলির প্রাচীন শিল্পকলার নিদর্শন গুলিকে যথাযথভাবে সংরক্ষিত করে সংস্কার করতে হবে।


পঞ্চমত: সরকারি ও বেসরকারিভাবে পর্যটকদের রিফ্রেশমেন্ট এর ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে।


ষষ্ঠত: যেহেতু অরন্য সাফারি তাই সরকারিভাবে অরন্যে রাত্রিবাসের ব্যাবস্থা করা দরকার, সেক্ষত্রে লালগড়ের খাসজঙ্গল গোয়ালতোড়ের জিরাপাড়া জঙ্গলে এলাকার অরন্যভুমিতে ট্রি-হাউস করা যেতে পারে। এছাড়া ছোটো ছোটো পরিবেশ বান্ধব কটেজ করা যেতে পারে।


সপ্তমত: গনগনি যাওয়ার পথে গড়বেতা হুমগড় রাস্তার ওপরে একটি তোরণ করলে পর্যটকদের সুবিধা হবে।


অষ্টমত: গনগনিতে ভূতাত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলি সাধারণ পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার জন্য উপযুক্ত গাইড রাখা যেতে পারে।


নবমত: আদিবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলটিতে আদিবাসীদের বিভিন্ন হস্তশিল্পের জিনিসের বিক্রয় কেন্দ্র করলে, শিল্প- সামগ্রী বিক্রির মাধ্যমে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব।


দশমত: পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়নে স্থানীয় মানুষদের নিয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে।


একাদশতম: এই অঞ্চটির পরিবহনে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। সর্বোপরি সমস্ত পর্যটনবর্তনীটির পরিবেশ বান্ধব অবস্থা বজায় রাখতে সামাজিক সচেতনতা সহ প্রয়োজনে কঠোর সরকারি আইনের সংস্থান রাখতে হবে।



উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন এই অঞ্চলে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে, ঠিক তেমনি তাদের পরিসেবা দানের মধ্য দিয়ে এই প্রান্তিক জঙ্গল মহল এলাকার মানুষজন বেঁচা থাকার নুতন রসদ খুঁজে পাবে। সার্বিকভাবে জঙ্গলমহলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে আসা করি।


লেখক: ডঃ শুভেন্দু ঘোষ। শিক্ষক ও গবেষক (ট্রপিক্যাল ইন্সটিটিউট অব আর্থ এণ্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ)।

 

ads

Mailing List