যত আধুনিক বাদ্যযন্ত্রই আসুক না কেন ঢাক ছাড়া পুজো হয় না, ঢাকের উৎস কোথায় জানা আছে?

যত আধুনিক বাদ্যযন্ত্রই আসুক না কেন ঢাক ছাড়া পুজো হয় না, ঢাকের উৎস কোথায় জানা আছে?
30 Sep 2022, 10:00 AM

যত আধুনিক বাদ্যযন্ত্রই আসুক না কেন ঢাক ছাড়া পুজো হয় না, ঢাকের উৎস কোথায় জানা আছে?

 

ড. সুবীর মন্ডল

 

বাঙালির জমজমাট জনপ্রিয় লোকবাদ্যযন্ত্র ঢাক। পহেলা বৈশাখ হোক, শারদীয় দুর্গোৎসব হোক কিংবা চৈত্রের গাজনের পরবে, বাঙালির উৎসব অনুষ্ঠানকে জমিয়ে- মাতিয়ে রাখে ঢাক। এটি একটি জনপ্রিয় লোকবাদ্যযন্ত্র। বাংলার অন্যান্য জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রের মতো এই বাদ্যযন্ত্রটিও  সুপ্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক কালে শুধুমাত্র পুজোর অনুষ্ঠান ও উৎসবকে ছাড়িয়ে অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়েছে। সময়ের হাত ধরেই বহু লোকবাদ্য হারিয়ে গেলেও ঢাক তার শৌর্য গাম্ভীর্যে উত্তোরত্তর যেন আসনটি পাকা করে নিচ্ছে। লোকজীবনের সঙ্গে ঢাকের একটা অবিচ্ছেদ্য মধুর সম্পর্ক আজও অটুট।

বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার আমাদের সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে অতি প্রাচীনকাল থেকে জড়িয়ে আছে। হিন্দুদের দেবদেবীর প্রতিমার হাতে শোভিত উপকরণ হিসেবে নানান বাদ্যযন্ত্রকে দেখা যায়। যেমন বিষ্ণুর হাতে শঙ্খ, শিবের হাতে ডমরু, শ্রীকৃষ্ণের হাতে মুরলি বা বাঁশি এবং সরস্বতীর হাতে বীণা। এছাড়া দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য আরো কয়েকজন দেবদেবীর হাতে বাদ্যযন্ত্র শোভা পায়৷ মহাদেবের হাতে যে ডমরু শোভা পায় তাই বৃহদাকার ঢাক বা ঢোলের ক্ষুদ্র সংস্করণ। প্রাচীনকালে যুদ্ধ শুরু হতো ডমরুধ্বনির মধ্য দিয়ে এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটত ঢাকের মঙ্গল আওয়াজে।

মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তার ধারাবাহিক ক্রমবিকাশের মধ্যে ঐতিহ্যমন্ডিত লোকজ বাদ্যযন্ত্রের ধারাবাহিকতা রয়েছে। যুগে যুগে সভ্যতার যে ক্রমোন্নয়ন ঘটে তারই প্রভাবে লৌকিক বাদ্যযন্ত্রসমূহ কালক্রমে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের ব্যবহারে এসেছে। আদিম মানুষ লৌকিক বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে যেমন আনন্দোল্লাস প্রকাশ করত তেমনি গগনবিদারী আওয়াজসম্পন্ন বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে হিংস্র বন্য পশুদের তাড়ানো এবং বিপক্ষীয় গোষ্ঠীর আক্রমন প্রতিহত করার লক্ষ্যে ঢাক, দুন্দুভিজাতীয় লোকবাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করত। সেই থেকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিশাল ও গম্ভীর আওয়াজ সৃষ্টিকারী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত হয়।

 

উৎস সন্ধানে: 

 লৌকিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে বাঙালি জাতির বহু প্রাচীনকাল থেকেই পরিচয় ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। সমুদ্রগুপ্তের আমলে খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে (375-417খ্রি.) চৈনিক পরিব্রাজক ফা- হিয়েন বাংলাদেশ পরিভ্রমণ আসেন। এখানকার প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র দেখে তিনি তার ভ্রমণকাহিনিতে এই দেশকে সঙ্গীত ও নৃত্যের দেশ বলে প্রশংসা করেন। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রীধর্মপালদেব (781-881)খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকের শেষ দিকে তৈরি করেন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার। এই বিহার ধ্বংসাবশেষ এবং প্রাচীনভারতের বৌদ্ধ শাস্ত্র ও সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র ময়নামতি (600-100 খ্রি.)র ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শন প্রস্তর ফলক এবং পোড়ামাটির ফলকে নৃত্যরত ও বাদ্যরত মানুষের মূর্তি পাওয়া গেছে। এই চিত্র গুলোতে কাঁসর, করতাল, ডমরু, ডঙ্কা প্রভৃতি আনদ্ধ এবং শিঙা, বাঁশি, তুবড়ি প্রভৃতি শুষির বাদ্যযন্ত্র লক্ষ্য করা যায়৷ বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে জড়িত এইসব বাদ্যযন্ত্র দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর প্রভাবে স্থান করে নিয়েছে বলে মনে করা হয়। খ্রিস্টিয় নবম একাদশ শতকে রচিত বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন গীত, নট, নৃত্য বাদ্যের বর্ণনা রয়েছে। চর্যাপদের তিনটি পদ মোট সাতটি বাদ্যযন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। এগুলি হল বীণা, পটহ, মাদল, করন্ড, কসালা, দুন্দুভি ও ডমরু।

 

গঠন শৈলী      

বাঙালিদের অতি প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ঢাকের নির্মাণশৈলী সমন্ধে জানা যায় যে, একটি বৃহদাকার কাঠের দুপাশে চামড়া ছাউনি দিয়ে ঢেকে ঢাক তৈরি করা হয়। এর দুদিকে দুটি মুখ থাকে। এক একটি মুখের ব্যাস দেড় হাত পরিমান। একদিকের মুখ পুরু চামড়া এবং অন্য মুখ অপেক্ষাকৃত পাতলা চামড়া দিয়ে ছাওয়া হয়ে থাকে। পুরু চামড়া ছাওয়ার মুখটিতে বাঁশের চটি বা কাঠি দিয়ে ঢাক বাজাতে হয়।

শ্রেণী বিভাগ:

  বাংলার ঢাকের ও নানা নাম রয়েছে। ঢাক, জয়ঢাক, বীরঢাক ইত্যাদি৷ আওয়াজ ও আকৃতির তারতম্য অনুসারে এই নামকরণ হয়ে থাকে। ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে সুর ও ছন্দমূর্ছনা তৈরি করার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই ঢোল ও কাঁশি বাজানোর প্রচলন রয়েছে। ঢাককে প্রাচীনকালে 'ডঙ্কা' বলা হত। কিন্তু সে সময় ডঙ্কা জালা আকৃতির মাটির পাত্র দিয়ে তৈরি করা হত। সাধারণত পাঁঠা বা ছাগলের চামড়া দিয়ে ঢাক, ঢোল, একতারা, তবলা-বাঁয়া ইত্যাদি বানানো হয়। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে তাতে বেশ পরিমান লবণ ছিটিয়ে সাত আটদিন ভিজিয়ে রাখা হয়। চামড়া থেকে লোম উঠে গেলে ভালো করে পরিষ্কার করে বাঁশের খুঁটি দিয়ে টান টান করে রোদে শুকানোর পর সেই শুকনো চামড়াকে সাইজ মতো কেটে এই বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হয়।

 

ঢাকের শব্দ ও ছন্দ:

ঢাকের 'বোল' অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল। কিন্তু তার তাল ও আওয়াজ প্রাণকে ছুঁয়ে যায় এবং এক অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টি করে৷ বিভিন্ন উৎসব ও তার বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ তালে ঢাক বাজানো হয়। দুর্গোৎসবে যে ঢাক বাজানো হয় সে ক্ষেত্রে দেবীর বোধনে,দেবীর ঘুম ভাঙাতে, দেবীর পূজাকালীন, দেবীর আরতিতে এবং সর্বশেষ দেবীর বিসর্জনে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢাকের বাজনার ভিন্নতা রয়েছে। ইদানিংকালে সেই বাজনায় আর তেমন ভিন্নতা দেখা যায়। তার কারণ ঢাকের বাজনা বংশ পরম্পরা ক্রমে পাওয়া। অভ্যাসের  মাধ্যমে প্রচলিত৷ তার কোন সংরক্ষণ নেই। তাই কালস্রোতে তা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই ঢাকের 'বোল' মহাদেবের সৃষ্টি বলে বিশ্বাস করেন ঢাক বাজানোর সঙ্গে বংশ পরম্পরাক্রমে যুক্ত শিল্পীরা । কথিত আছে, বেদোত্তর যুগে পাণিনি তাঁর সমসাময়িক বৈদিক ও সংস্কৃতিক ভাষাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে অষ্ঠাধ্যায়ী ব্যাকরণ রচনা করেন৷ এই নিয়ে প্রচলিত কথা রয়েছে যে, পাণিনি হিমালয়ে গিয়ে আঠারো দিন গভীর তপস্যা করে শিবকে সন্তুষ্ট করেন। এর ফলে সন্তুষ্ট হয়ে শিব নৃত্যের ভঙ্গিতে চোদ্দোবার ঢক্কা বা ঢাক বাজান ।প্রতিবার ঢাক বাজানোর সাথে সাথে এক একটি নতুন শব্দ সৃষ্টি হল। প্রতিটি শব্দ বিভিন্ন বর্ণের সমষ্টি।

 এখানে উল্লেখ্য যে শিবের নৃত্য ভঙ্গিমার যে মূর্তি তা নটরাজ নামে পরিচিত। এই নটরাজ মূর্তি ছন্দ ও তালের প্রতীক। ঢাকের শব্দ ও ছন্দ তালের প্রতীক। শিবের নৃত্যের ফলে বিভিন্ন বর্ণ দিয়ে সৃষ্ট শব্দগুলোকে পাণিনি চৌদ্দটি সূত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এই চৌদ্দটি সূত্র 'শিব সূত্র' বা 'মহেশ্বর সূত্র' নামে পরিচিত। এই সূত্রগুলো এই পাণিনি ব্যাকরণের মূল তত্ত্ব। বলা হয় শিবের নৃত্যের মাধ্যমে সৃষ্ট শব্দগুলোই ঢাকের 'বোল'।

   

লোকবাদ্য ঢাকের নামকরণের উৎস অন্বেষণে:

 

বাঙালির কাছে ঢাক এতটাই জনপ্রিয় যে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের নামকরণের সাথে অনেকে ঢাকের সাদৃশ্য খুঁজে পান। ঢাকার নামকরণ নিয়ে একটি কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। জানা যায় যে, 1608 খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে বজরা নিয়ে এবং রাজপুরুষদের সঙ্গে নিয়ে নদীপথে ভ্রমণে বেরিয়ে ছিলেন সেই সময়ে শাসক সুবাদার ইসলাম খান। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার রাজধানী স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন করা। জাহাঙ্গীরের কুশলী সুবাদার জঙ্গলাকীর্ণ জায়গাকে পছন্দ করে সেখানে নৌকা ভিড়ালেন। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে বিশাল খালি জায়গা দেখে তিনি এখানেই রাজধানী পত্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু সঙ্গে অন্যান্য রাজপুরুষও পাইক পেয়াদারা জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ার এই স্থানটি নির্বাচনে গররাজি হল। কিন্তু সুবাদার সিদ্ধান্তে অনড়। জঙ্গল কোনো সমস্যা নয় তার কাছে। তিনি দেখলেন নদীর পাড়ে কয়েকজন ঢাকী ঢাক বাজিয়ে পূজো করছে। তিনি তাদের ডেকে পাঠালেন। তাদের বাজনা বাজাতে নির্দেশ দিলেন। এদিকে তিনি সম্রাটের সৈন্যদের নির্দেশ দিয়ে চারদিকে পাঠিয়ে দিলেন  ৷ যতদূর পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ পৌঁছায় ততদূর পর্যন্ত যাওয়ার নির্দেশ দেন সৈন্যদের। যেখান পর্যন্ত গেলে ঢাকের আওয়াজ আর শোনা যাবে না সেখানে নিয়ে সম্রাটের নিশান পুঁততে হবে। এভাবেই মুগল বাদশাহর রাজধানীর সীমা নির্ধারিত হয়েছিল । বুড়িগঙ্গা নদীর যে স্থানটিতে ইসলাম খাঁ বজরা ভিজিয়েছিলেন ,তাঁর নামানুসারে সেই জায়গার নাম হয় ইসলামপুর। আর ঢাকের শব্দে যে শহরের নাম নির্ধারিত হয়েছিল তার নাম রাখা হয় ঢাকা।

 

 ঢাক ও বাংলা সংস্কৃতি:

ঢাক বাঙালির সংস্কৃতির এতটাই গভীরে পৌঁছে গিয়েছে যে , ঢাককে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি প্রবাদও বাংলা লোকসাহিত্যে প্রচলিত আছে। যেমন:-

1.ধর্মের ঢাক বাতাসে বাজে।

  1. ঢাকি সহ বিসর্জন ।

3.নিজের ঢাক নিজে পেটানো/ ঢাক পেটানো ৷

  1. ঢাক থুয়ে চন্ডীপাঠ।
  2. ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি ।
  3. গাজনের নাই ঠিকানা/ ডাক দিয়ে কয় ঢাক বাজা না।
  4. ঢাক ঢাক,গুড়গুড়।
  5. ঢাকে কাঠি দেওয়া ৷
  6. ঢাকের বাঁয়া— ইত্যাদি

 

ঢাকের আওয়াজের তীব্রতার কিঞ্চিৎ সমালোচনাও রয়েছে বাংলা প্রবাদে। এই অর্থবাহী একটি সংস্কৃত শব্দবন্ধ পাওয়া যায় 'ঢক্কানিনাদ' ৷ বাংলায় রয়েছে—

  1. ঢাকের বাদ্যি থামলে ভালো লাগে।

ঢাকের আওয়াজ তীব্র হলেও তার মধ্যে যে প্রাণ আছে তার সাথে একাত্ম হয়ে যায় মানুষ । আপাতত কঠিন হলেও ঢাকের বোলকে মানুষ বিভিন্ন শব্দ গুচ্ছের মাধ্যমে সহজ করে নিয়েছে । ঢাকের 'বোল'কে শব্দসাজুয্যে বাঙালি ঘরে যেভাবে উচ্চারিত হয় তার দু একটি চমৎকার নমুনা নিচে তুলে ধরা হয়েছে যেমন:-

  1. ঢেমকুড়া কুড় কুড়
  2. চড়াম চড়াম

এছাড়া ছড়ার ঢং এ ঢাকের বোলের অনুরূপ শব্দবন্ধ।

  1. টেট্টে না টেং ,টেট্টে না টেং।

2 ল্যাংটা পটাং, ল্যাংটা  পটাং ইত্যাদি ৷ লোকজীবনের বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের  সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ৷ তার মধ্যে দুর্গাপুজো এবং চৈত্রসংক্রান্তিতে ঢাক বাজানো ছাড়া উৎসব অপূর্ণই থেকে যায় ৷ বিশেষ করে চৈত্রের গাজনে তো ঢাক অপরিহার্য ৷

             

বাঙালির এক বিশেষ লোকউৎসব চৈত্রের গাজন ৷ এই গাজন অনুষ্ঠানের মূল পর্বে যাওয়ার আগে কতকগুলো পর্যায় অতিক্রম করে যেতে হয় ৷ গাজন উৎসবের বেশ কয়েকদিন আগে একদল ভক্ত বিশেষ একটি স্থানে জড়ো হয়ে অত্যন্ত সাত্ত্বিক জীবনযাপন করে ৷ পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চৈত্র সংক্রান্তির পূর্বের কয়েকদিন গাজনের সন্ন্যাসী ও ভক্তরা একসঙ্গে অবস্থান করে ৷ নিরামিষ ভোজন, রক্তাম্বর পরিধান, ভূমিশয্যা এবং গাজনের গান গেয়ে গৃহস্থবাড়ি থেকে সংগৃহীত ভিক্ষান্নে কৃচ্ছ্রতার জীবনযাপন করতে হয় তাদের ৷ এই গাজনের দল যখন বাড়ি বাড়ি গাজন গান করে ফিরে তখন তাদের সঙ্গের বাদ্যযন্ত্রের প্রধান উপকরণ থাকে ঢাক ৷ ঢাকের এক বিশেষ ধরণের বাজনার তালে গাজনের গানগুলো গাওয়া হয় ৷ এই গাজনের গানের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা, শঙ্খের জন্মকথা, সিঁদুরের জন্মকথা, ইত্যাদিও বারোমাসি গান গাওয়া হয় ৷ এই জাতীয় সঙ্গীতের লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো যে সবগুলো গানের শুরু ‘শুন শুন ইন্দ্রসভা শুন দিয়া মন’ পদ গেয়েই শুরু হয় ৷ প্রাজ্ঞ গৃহকর্তা প্রশ্ন করেন—

                                       ঢাকি ঢাকি ভাই একটু বইয়া যাও

                                       ঢাকেরঅ জর্মকথা খানিক কইয়া যাও ৷

    আবার অন্যরকম পদও শোনা যায়—

                                        ঢাকি ভাই কিয়ের ঢাক বাজাও

                                        ঢাকেরঅ জর্মকথা একটু বলি যাও ৷৷

    তখন ঢাকির দল উপরের গানটি গেয়ে গৃহকর্তার প্রশ্নের জবাব দেয় ৷ এ ধরনের প্রশ্নোত্তরের ঢংয়ে গাওয়া বেশ কিছু লৌকিক ধাঁধা গাজনের গানে পাওয়া যায় ৷ ধাঁধা লোকসংস্কৃতির বিশেষ উপাদান ৷ গাজনের গান ছাড়াও ঢাককে নিয়ে দু একটি লৌকিক ধাঁধারও সন্ধান পাওয়া যায় ৷ যেমন—

                                     এমন সুন্দর পক্ষী দুধে ভাতে খায় ৷

                                     ছিটকি দিয়া বাড়ি দিলে রাজ্যের দূরে যায় ৷

         সরু কাঠির আঘাতে ঢাকের যে আওয়াজ হয় তা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ায় ৷

 

          গাজনের ঢাক বাজানোর মধ্যে কিছু লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে ৷ সেইরকম দুএকটি লোকবিশ্বাসের উদাহরণ এখানে তুলেধরা হল ৷

চৈত্রমাসে গাজনের ঢাকে কাঠি পড়লে শিমূল তুলোর সুপক্ব ফলগুলো পাকে এবং সংগ্রহের উপযুক্ত হয় ৷

চৈত্রমাসে গাজনের গানে ঢাক বাজালে  নতুন বছরে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে ৷

ঝড়-তুফানের সময় ঢাক বাজালে ঝড়ের তান্ডব কমে ৷

 

      ঢাকের মতো জনপ্রিয় লোকবাদ্যের সঙ্গে এভাবেই বাংলার বহু লোকসাংস্কৃতিক উপাদান গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে ৷ দেখা যায় যে সমস্ত উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত সেগুলো লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে ৷ লোকবাদ্য ঢাক তার বিশিষ্ট উদাহরণ ৷

কিন্তু কথায় বলে -ঢাকের বোল মুখে বলা সহজ কিন্তু হাতে আনা কঠিন । কঠিন হলেও বাঙালির ঘরের একান্ত আপন ঢাক সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে । আগামী দিনে 'ঢাকের তালে কোমর দুলে, খুশিতে ভরে মন' এর মাধ্যমে বাঙালির লোকসংস্কৃতি বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে ৷ এই বিশ্বাসেই আমরা বাঁচি ৷

শেষ কথা:

ঢাকের বোলেও পুরুষদের টেক্কা নারীদের। করোনা পর্ব কাটার পরে কার্যত সদর্পে উড়ছে মহিলা ঢাকিদের ধ্বজা। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা তো বটেই, ভিন রাজ্য থেকে বায়না আসছে। আসছে ভিন দেশ থেকেও। আর তাই নাওয়া-খাওয়া ভুলছে রাজ্যের  বিভিন্ন জেলার মহিলা ঢাকিপাড়া। সকাল বিকাল কান পাতলেই সেখানে শুধু প্রস্তুতির বাজনা। আদিবাসী নৃত্য সহযোগে ঢাকের বোল তুলে চলছে শরৎ বাদ্যির বন্দনা।

 

এই সেদিন পর্যন্ত ঢাকি বলতে মানুষ বুঝতো একদল পুরুষ। কিন্তু ধারনা বদলাচ্ছে সমাজের। বৃত্ত ছেড়ে এগিয়ে আসছেন নারীরা। দেবী দুর্গার আরাধনায় ঢাক এখন বাগ মানছে

তাদের হাতেও। বলা ভাল, চাহিদায় রীতিমতো টেক্কা দিচ্ছে নারীরা। স্বনির্ভর হওয়ার প্রশ্নে বিকল্প পেশা হিসেবে উঠে এসেছে ঢাক। বিগত কয়েক বছর বিভিন্ন রাজ্য থেকে বায়না পাচ্ছিলেন মহিলা ঢাকিরা। করোনার ভয়াবহ আবহে সেই      ধারা কিছুটা ভাটা  পড়়েছিল।তবে নানান ধরনের  তথ্যসূত্র  থেকে জানা যাচ্ছে    এবছর মহিলা ঢাকিদের চাহিদা বাড়ছে ভিন রাজ্যেও, এমনকী দেশের বাইরে থেকেও। করোনার প্রভাবে দু বছর জৌলুস কমলেও এ বছর ফের আলোর দিশা দেখেছেন নারীরা। বিভিন্ন মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে অশোকনগরের মহিলা ঢাকি পাড়ায়। শতাধিক মহিলা ঢাকি দুবেলা প্রস্তুতি নিচ্ছেন কড়া অনুশীলনে। আকর্ষণ বেড়েছে, ঢাকের সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী নৃত্যের মেলবন্ধন। তালে তালে নাচছেন সারিবদ্ধ মহিলা ঢাকিরা। ইতিমধ্যেই দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে উদ্যোক্তাদের বায়না এসেছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন পাড়ায়।

 

শুরু থেকে শেষ, সেই পুজোর মণ্ডপ মাতবে নারীদের হাতে তোলা তালে। এ- যেন অগ্নিপরীক্ষা তাদের কাছে। এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে নাকি? একদমই না। তাই ঘুমটাও যেন ঐচ্ছিক তালিকায় রাখছেন মহিলা ঢাকিরা। ঢাকি অ্যাসোসিয়েসনের এক কর্তা বলেন, ‘রাজ্যের বুকে প্রচুর মহিলা ঢাকি তৈরি হয়েছে।জি,বাংলার  মঞ্চে মহিলা ঢাকিদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। আজ শুধুই  ইতিহাস।

নারী পুরুষের চিরাচরিত দ্বন্দ্বে আবারও এগিয়ে গেলেন এদেশের বছরের পুজোয় মহিলারা। ঢাকের তালে কোমর দুলিয়ে, তাঁদের চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশী।পাড়া পাড়ায় পুজো, জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, কিংম্বা রাজনৈতিক দলের প্রচার অথবা সরকারি প্রকল্পে সচেতনতা মূলক প্রচার... সর্বত্র এখন মহিলা ঢাকি দলের চাহিদা তুঙ্গে। সেই কথা খুব সহজভাবেই জানাচ্ছেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মহিলা ঢাকি দলের সদস্যারা। আর হার মানা হার গলায় একপ্রকার পরে নিয়েই পুরুষ ঢাকিরা সেই কথা স্বীকারও করে নিচ্ছেন।

লোকশিল্পের পীঠস্থান বলে খ্যাত কল্যাণগড়ের নট্টপাড়ার শিল্পীরা। দিল্লি এশিয়াডে যোগদানকারী এই পাড়ার অধিবাসী একই পরিবারের তিনজন। এও এক নজিরই বলা যায়। এই পরিবারেরই  উচ্চ শিক্ষিত সজল নন্দী। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তাঁর পিতা স্বর্গীয় অমূল্য চন্দ্র নন্দীর নামে তৈরি করেছেন লোকশল্পীদের নানারকম তালিম দেওয়ার জন্য একটি সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল-সহ অন্যান্য শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গেই ঢাক তৈরীরও প্রশিক্ষণ দেন সজল নন্দী। হাবড়া, অশোকনগর সহ ‌দূর দূরান্তের বহু পুরুষ ও মহিলারা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তালিম নিয়ে আজ প্রতিষ্ঠিত। সময়ের হাত ধরেই  লোকবাদ্য ঢাক বাঙালির সংস্কৃতির  সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।

লেখক: শিক্ষক, খাতড়া হাইস্কুল, বাঁকুড়া।

Mailing List