নেতাজীর জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকেও নিমেষে খুন করতে দ্বিধা করেননি! ‘নাগিনী’ নীরার দেশপ্রেম

নেতাজীর জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকেও নিমেষে খুন করতে দ্বিধা করেননি! ‘নাগিনী’ নীরার দেশপ্রেম
27 Jun 2022, 10:54 AM

নেতাজীর জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকেও নিমেষে খুন করতে দ্বিধা করেননি! ‘নাগিনী’ নীরার দেশপ্রেম,

 

বাসবী ভাওয়াল

 

আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসির রাণী রেজিমেন্টের সদস্যরা নীরা আর্য যাকে নেতাজি 'নাগিনী' নামে অভিহিত করেছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচরের দায়িত্ব নেতাজি তাঁকে দিয়েছিলেন।এই কাজের দায়িত্ব বন্টন করার সময় স্পষ্ট ভাবে বলে দেওয়া হয়েছিল ধরা পড়লে নিজেরাই নিজেদের গুলি করতে। একটি মেয়ে তা করতে মিস করে এবং তাকে ইংরেজরা জীবন্ত গ্রেপ্তার করে। নপুংসক নর্তকীর পোশাক পরে অফিসারদের মাদক খাইয়ে সঙ্গী দুর্গাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার পথে বর্মার সরস্বতী রাজামণির ডান পা গুলিবিদ্ধ হয়। কিন্তু তবুও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দুর্গা ও নীরা তিন দিন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়। কারণ, নীচে অনুসন্ধান অব্যাহত ছিল। তিন দিন পর সুকৌশলে সঙ্গীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘাঁটিতে ফিরে আসে। রাজামণির সাহসিকতায় খুশী হয়ে নেতাজি তাঁকে ঝাঁসির রাণী ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট এবং নীরাকে অধিনায়ক করেছিলেন।

 

নীরা আর্য ১৯০২ সালের ৫ মার্চ উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাগপাট জেলার খেকড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শেঠ ছজুমল ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। পিতার ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল কলকাতায়। তিনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দির পাশাপাশি আরও অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তাঁর বিয়ে হয় সিআইডি ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসের সঙ্গে।

স্বামীর সঙ্গে মতাদর্শগত কোনো মিল ছিল না নীরার। ব্রিটিশ সরকার তাঁর স্বামীকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পেছনে নজরদারির দায়িত্ব দিয়েছিল। সুযোগ পেলে নেতাজিকে হত্যা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু শ্রীকান্তর চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন তাঁর স্ত্রী। শ্রীকান্ত নেতাজি কে হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত সেই গুলি নেতাজির গাড়ির চালককে বিদ্ধ করে। সেই মূহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন নীরা আর্য। জয়রঞ্জনকে তিনি দ্বিতীয় সুযোগ দেননি। চোখের পলকে শ্রীকান্তের পেটে বেয়নেট চালিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। নেতাজি এবং স্বদেশের প্রতি এতটাই নিষ্ঠা ছিল যে, তিনি ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বনকারী নিজের স্বামীকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করেননি।

 

আজাদ হিন্দ ফৌজের আত্মসমর্পণের পর সমস্ত বন্দী সৈন্যকে দিল্লির লালকেল্লায় বিচারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নীরাকে স্বামী হত্যার কারণে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়। জেলে বন্দিদশায় তাঁকে অকথ্য শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। হাতের শেকল কাটতে গিয়ে ছোট চামড়াও কেটেছিল। পায়ের শেকল কাটতে গিয়ে দুতিন বার পায়ে চোট লাগাতে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, অন্ধ নাকি যে পায়ে মারছিলেন! বন্দিকে প্রাণেও মেরে ফেলতে পারেন তারা -একথা  শুনে তাদের উপর থুথু ফেলে মহিলাদের সম্মান করতে শিখুন বলেছিলেন।

"নেতাজি আমার হৃদয়ে বেঁচে আছেন" একথা শুনে কামারের দিকে ইশারা করে বুকের দিকটা ছিঁড়ে ফেলতে বলেন। কামার ডান দিকের স্তন কাটার চেষ্টা করেন। কিন্তু যন্ত্রটিতে ধার না থাকায় ও ভাঙ্গা থাকায় কাটতে পারেনি। তারপর জেলার বলেন, আবার যদি মুখের ওপর কথা বলে নীরা তাহলে ওর দুই স্তন আলাদা করে দেবে।

নীরা আর্য জীবনের শেষ দিন গুলোতে ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। হায়দ্রাবাদের ফলকনামার একটি কুঁড়েঘরে বাস করতেন। বার্ধক্য জর্জর অবস্থায় চারমিনারের কাছে ওসমানিয়া হাসপাতালে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই তিনি প্রয়াত হন।

তাঁর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। তাঁর নামে একটি জাতীয় পুরস্কার চালু করা হয়েছে। যতটা প্রচার বা সম্মান প্রাপ্য ততটা পাননি ভারতের এই বীরাঙ্গনা।

আজ প্রচারসর্বস্ব স্বঘোষিত কান্ডারীবর্গ নিজেদের নিয়ে বালখিল্য আচরণ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই অসমসাহসী কন্যাদের আত্মত্যাগ। আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে শত অত্যাচার সহ্য করে যে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন, মনে যে অগ্নিশিখা  প্রজ্বলিত করে রেখে আমাদের দেশবাসীর সুখের কথা ভেবেছেন তাঁরাই থেকেছেন প্রদীপ শিখার নিচের প্রগাঢ় অন্ধকারে। ইতিহাসের পাতায় এঁদের আত্মত্যাগ প্রাধান্য পেলে সকলেই জানতে পারতো কতো মূল্যে এই স্বাধীনতা! ইতিহাস রচিত হয়েছে। কিন্তু ক’জন জানেন নাগিনী স্বামীর হত্যার আসামী নীরাকে। এ যে কতো গভীর দেশপ্রেম -সেকথা ভাবলেই দেহ কন্টকিত হয়।

লেখক: প্রধান শিক্ষিকা, শালবনি নিচুমঞ্জরী বালিকা বিদ্যালয়।

ads

Mailing List