পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা, ‘আমিই সে’/ তৃতীয় পর্ব

পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা, ‘আমিই সে’/ তৃতীয় পর্ব
06 Jun 2021, 11:06 AM

আমিই সে’

(একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

তৃতীয় পর্ব

 

 আমিই পুরুষোত্তম। 

আমার কোনো ক্ষয় নেই, কোনো সৃষ্টি নেই--- আবার সেই অর্থে, আমি অক্ষর।

"যদক্ষরং ন ক্ষরতে কথন্চিত " ----- আমিই পরহম অক্ষয়-বস্তু, যাকে জানা গেলে, আর কোনো কিছুই অজ্ঞাত থাকে না। জীবকূলের সকল অভিলাষ পূর্ণ হয়।

 

তবে, এই অক্ষর হলো অচল, নীরব ও প্রকৃতই নিষ্ক্রিয়। এই রূপে যখন থাকি, তখন আমি প্রকৃতির কোনো রকমে কাজ থেকে মুক্ত---- নিরাসক্ত।

মায়া-বাদীরা আমাকেই "ব্রহ্ম " বলে জানে, ঐ অবস্থায় আমি মূলতঃ--- নীরব, অক্ষর ও নিষ্ক্রিয়।

সাংখ্যের বিচারে তাদের পুরুষ-ও নিষ্ক্রিয়।

 

কিন্তু যদি আমি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকি, তবে এ জগৎ --- এ বিশ্ব- সংসার সৃষ্টি হলো কিভাবে?

আমিই আমার চালিকা শক্তি দ্বারা সরব, গতিশীল ও সক্রিয় হয়ে এই বিশাল সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করি। আমার শক্তির বিরাট ক্রিয়ার ফলে, আমার-ই ইচ্ছা ও প্রভাবের  বশেই আমি নিজেকে এই সংসারে সর্বদিকে ব্যপ্ত করে রেখেছি।

 

আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা করি, আবার ব্রহ্মভাব লাভ করলে মানুষের আমাতে ভক্তি জন্মে এবং সেই ভক্তির ফলে তত্তজ্ঞান লাভ করে, আমার  অন্তরে পাবে প্রবেশ করে।

 

" মমৈবাংশো জীবভূতঃ"

অর্থাৎ, আমা হতেই জীবকূলের বংশসৃষ্টপ্রাপ্ত হয়েছে। আমারই ইচ্ছায় নারী, অপরা প্রকৃতি---- আর পুরুষ আমার পরা প্রকৃতি। আমিই ক্ষেত্রজ্ঞ। আমিই নিরাকার ব্রহ্ম-স্বরূপ; আমিই  জ্ঞান, জ্ঞেয়, এবং জ্ঞান-গম্য। আমিই সবার অন্তরে অধিষ্ঠিত।

 

আমাকেই জীব যোগমার্গে ধ্যান-ধারণা-সমাধি দ্বারা আত্মদর্শন করে, কেউ কেউ জ্ঞানমার্গে আত্মা-অনাত্ম বিচারে আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভ করে, কেউ আবার কর্মযোগ-মার্গ অনুসরণ করে নিষ্কাম বুদ্ধিতে পরমেশ্বরকে সর্ব কর্মফল অর্পণ করে, কর্মের দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ করে----- আবার কেউবা, ভক্তি মার্গে আমার আপ্তবাক্য বিশ্বাস করতে করতে আমার উপাসনা করে, আমায় লাভ করে।

 

যা পিন্ডে--- তাই-ই ব্রহ্মাণ্ডে।

সৃষ্টি যা কিছু ঘটিয়েছি আমি, তা সবই পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগে।

এই সংসার অশ্বত্থ বৃক্ষের মতো; এর প্রধান মূল ঊর্ধ্বদিকে, অর্থাৎ, পরব্রহ্ম, আর এর শাখা প্রশাখাসমূহ অধোদিকে (নীচের দিকে) বিস্তৃত, যেখানে দেবাদিযোনি আর পশুআদি যোনিতে জীবজন্ম হয়। এর পাতাগুলি বেদাদি ধর্মগ্রন্থ; তরুণ পল্লবগুলি শব্দ-স্পর্শাদি; আর এর মূলসকল বাসনারূপ যা ধর্ম-অধর্মের পরিচায়ক।

 

জীবকূল আমাকেই সনাতন অংশ; কর্মফলে, নানা যোনিতে ভ্রমণ করে সুখ-দুঃখ ভোগ করে থাকে, এবং দেহত্যাগের পর সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করে আমার কাছে আসে।

অনন্তর, আবার স্বকর্মানুযায়ী নব স্থূল দেহ ধারণ আবার বিষয়সমূহ ভোগ করতে করতে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে পাক খেতে খেতে জন্মক্ষয় করে, অবশেষে আমাতেই মিলিত হয়।

অজ্ঞরা, তাদের অজ্ঞতায় এ তথ্য জানতে বা বুঝতে পারে না; কিন্তু জ্ঞানীরা তা জ্ঞান-নেত্রে সব অনুধাবন করতে পারে।

 

চন্দ্র-সূর্য আমার দুই চক্ষু; আমার শক্তিতেই শক্তিমান। আমিই পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে ভূতগণকে ধারণ করে আছি। আমার শক্তিতেই ঔষধিগুলি পরিপুষ্ট হয়ে জীবকূলকে সুস্থ রাখে। আমিই জঠরাগ্নিরূপে দেহরক্ষা করি; আমিই অন্তর্যামীরূপে সকল জীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছি।

 

তাই-ই আমি পুরুষোত্তম।

আমাকে জানলে, আর কিছুই জানবার থাকে না।

যখন জীব বুঝতে পারে --- আমিই নির্গুণ, আমিই সগুণ, আমিই বিশ্বরূপ, আমিই অবতার,  আমিই আত্মা  --- তখন সে মুক্ত হয়ে আমাতেই মিলিত হয়।

 

যতক্ষণ সে সেটুকু উপলব্ধি না করতে পারে, ততক্ষণ-ই সে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে বিরাজ করে।

 

(চলবে..)

ads

Mailing List