পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / দশম পর্ব

পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / দশম পর্ব
29 Aug 2021, 12:46 PM

আমিই সে’ / দশম পর্ব

(একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

দশম পর্ব

 

আকাশের সেই মেঘের ঘনঘটা এবং ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানি এবং বিধ্বংসী কর্ণভেদী অহরহ বজ্রপাতের শব্দে মার্কন্ডেয়কে তার পূর্ব-জীবনের ধ্যান-কল্পনা থেকে বাস্তবতার জগতে ফিরিয়ে আনল।

 

অবাক বিস্ময়ে তিনি চতুর্দিকে অবলোকন করে বুঝতে পারলেন যে, সমগ্র মেদিনী এহেন মেঘজটাজ্বালে আবৃত। মার্কন্ডেয় তাঁর সকল ধীশক্তি একত্রিত করে এই মহাজাগতিক তত্ত্ব ও তথ্য থেকে নিজেকে সঙ্কুচিত করে, শ্রীবিষ্ণুভগবানের পুরুষোত্তম মূর্তির ধ্যানে মগ্ন হলেন। 

 

অল্প সময়ের মধ্যেই তুমুল বর্ষণ শুরু হলো। যে সংবর্ত অগ্নি পৃথিবীতে বিধ্বংসী অগ্নি-জ্বালায় দগ্ধ করেছিল, সেই আগুন এই প্রচন্ড বৃষ্টি-পাতের ফলে নিভে যেতে লাগল বটে, কিন্তু বৃষ্টিপাতের জোর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল; এবং তা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সারা বিশ্বের সর্বস্থানে সমান ভাবে নিক্ষেপিত হতে লাগল। 

 

সে এক অকল্পনীয় অবস্থা! পাহাড়, নদী সাগর, যতেক জলাশয়... সব প্লাবিত হয়ে যেতে লাগল। আর এই মহা-বৃষ্টিপাত চলতে লাগল সুদীর্ঘ বারো বছর ধরে।

বিকট, প্রলঙ্কয়র মহাশব্দে পৃথিবী তার সমগ্র প্রান্তে ধ্বংসোন্মূখ হয়ে কালেস্রাতে ভেসে যেতে লাগল।

সমুদ্র, অনেক আগেই তার বেলাভূমি অতিক্রম করেছিল, এবার পর্বতসমূহ মারাত্মক শব্দ করে বিদীর্ণ হতে লাগল।

 

পশু-পক্ষী, জীড-জন্তু, রক্ষ-যক্ষ, দানব-অসূর --- এমনকি দেবতাদের কারোর কোনো- রূপ অস্তিত্ব আর রইলো না।

 

বৃষ্টি যখন তার ধ্বংস-লীলা সমাপ্ত করে স্তব্ধ হলো, তখন সমগ্র পৃথিবী জলমগ্ন, অন্ধকার--- কারণ,  বহু আগেই, ধ্বংস হয়েছে সূর্য-চন্দ্র নক্ষত্ররাজি।

 

যে ভীষণ বাতাস বইতে লাগছিল বিশ্ব-চরাচরে, তা পান করে শ্রীভগবান একার্ণবে, অর্থাৎ, তাঁর অনন্ত নাগশয্যায় শায়িত হলেন। 

অর্থাৎ, শিব, শব হলেন। ওদিকে, এই বারো বছর ধরে ঋষি মার্কন্ডেয় জলে ভেসে ভেসে বেড়াতে লাগলেন; অন্তে শ্রীভগবানের নাম জপ। সারা পৃথিবীতে এমন কোনো স্থান তিনি দেখতে পেলেন না,  যেখানে কিছুক্ষণ তিনি বিশ্রাম নিতে পারেন।

 

তবুও, তিনি সেই অনন্ত- বারিরাশির মধ্যে থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য আরো এদিক-ওদিকে আর্তভাবে তাঁকে স্মরণ করতে করতে ভ্রমণ করতে লাগলেন। 

এভাবে আরো কিছুকাল ভ্রমণ করার পর একদিন ওই ঘোর তমসার মধ্যে শুনতে পেলেন কে যেন গম্ভীর কন্ঠে তার নাম উচ্চারণ করে ডাকলো। বললে, "হে মার্কন্ডেয়! তুমি আমার পরম ভক্ত। তুমি পরিশ্রান্ত; তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি আমার-ই কাছে এসেছ। তুমি নিতান্তই বালক, আমি তোমার রক্ষার ব্যবস্থা করছি।"

 

মার্কন্ডেয় বেশ কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল।

প্রথমতঃ সে তো বুঝতেই পারলো না, এই জনাকীর্ণ পৃথিবীতে কে তাকে নাম ধরে আবাহন করতে পারে --- তাও আবার তার মতো পন্ডিত, পরম ভক্ত জনার্দন শ্রীবিষ্ণুর; এরকম অবজ্ঞার সুরে কে বলতে পারে 'তুমি নিতান্তই বালক'!!

 

বস্তুতঃ, মার্কন্ডেয় তৎকালীন সমাজের এক প্রতিষ্ঠিত, প্রথিতযশা প্রাজ্ঞ ও ত্রিকালদর্শী সাধক, সজ্জন ব্যক্তি। অতি নিষ্ঠাবান, পন্ডিত ও যোগী পুরুষ। তার মতো এমন ক্ষমতাসম্পন্ন সাধককে এরকম ভাবে কে ডেকে কথা বলতে পারে!!!

 

খুবই স্বাভাবিক, ঐরকম ব্যাক্তিত্ত্ব-সুলভ সত্ত্বাকে "বালক" বলায় মার্কন্ডেয় খুবই রেগে গেলেন; মনে মনে ভাবলেন সে যেই হোক না কেন, তাকে ওই ভাবে অবজ্ঞার সুরে কথা বলে তার-ই নিজের মৃত্যুর কারণ ডেকে এনেছে।

 

এরকম ভাবতে ভাবতে আবার সে পরমপুরুষ পরমাত্মার স্মরণ নিল, বলতে লাগল: হে পরমেশ্বর পরম ও আদি-পিতা, তুমি আমাকে ঐ ব্যক্তির সম্মুখে হাজির করো; আমাকে চরমতম সত্যের সম্মুখে উপস্থিত কর।

 

কিছুক্ষণ পরেই মার্কন্ডেয় সেই বটগাছের দেখা পেল, যে গাছের নীচে তৃষ্ণার্ত ও ভীত হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ওভাবে হঠাৎ ঐ নিরুদ্দিষ্ট বটগাছের সন্ধান পেয়ে খুব খুশি হল। গাছটি সম্পূর্ণভাবে ঐ বিশাল জলরাশির ওপরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।

 

তবে তাকে আরো বেশি অবাক হল, যখন সে দেখতে পেল ঐ সুবিশাল বটগাছের শাখায় এক বিভিন্ন মহামূল্যবান মনি-মুক্ত-খচিত সোনার পালঙ্ক।

 

(চলবে)

ads

Mailing List