আমার নারায়ণ দেবনাথ

আমার নারায়ণ দেবনাথ
18 Jan 2022, 07:53 PM

আমার নারায়ণ দেবনাথ

 

সুমনদীপ পাণ্ডে

 

ভাবিনি সম্ভব হবে কোনওদিন। হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল, নন্টে ফন্টের মতো আরো কত শত চরিত্রের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই নারায়ণ দেবনাথকে একবার চাক্ষুষ দেখার।

 

তবে ইচ্ছেটা ছিল একদম ছোটবেলা থেকেই। একসময় ভাবতাম এই মানুষটির সাথে যদি কোনও দিন দেখা হয় তবে জানতে চাইবো, তিনি কী করে এত অদ্ভুত সুন্দর সব ছবি আঁকেন? এই ইচ্ছের বশেই সাহস করে একদিন ফোনও করে ফেললাম। দাবি বলব না আবদার, জানি না। কিন্তু জানালাম, দেখা করতে চাই। আর কী আশ্চর্য, সঙ্গে সঙ্গে অনুমতিও পেয়ে গেলাম!

তিরানব্বই পার হওয়া এই মানুষটি তাঁর অসুস্থ শরীর নিয়েও হাসি মুখে আমাদের অনেকক্ষণ সময় দিলেন। শোনালেন পুরনো দিনের নানা কথা। কিভাবে তিনি ছোটবেলায় টারজান সাজতেন, সাইকেল নিয়ে গোটা শিবপুর একসময় চষে বেড়াতেন। একবার বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে ব্রিজ থেকে নদীতে লাফও মেরেছিলেন। এমন আরো কত কি ঘটনার কথা বললেন। ওনার স্মৃতি শক্তি দেখে আমি স্তম্ভিত। এত বয়সেও এত পুরনো দিনের কথা কি করে এরকম গড়গড় করে বলে চলেছিলেন ভাবলে অবাক লাগে।

শুধু পুরনো কথা নয়, উনি দিব্যি খোঁজ খবর রাখতেন আজকালকার অ্যানিমেশন থেকে ইলাস্ট্রেশন সংক্রান্ত সবকিছু। আমি অ্যনিমেশন নিয়ে পড়াশোনা করি শুনে উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমি তখন 'আবার সাড়ে বত্রিশ ভাজা' নামে ছোটদের একটা পত্রিকা সম্পাদনা করি। আমার পত্রিকাটি উনি খুব যত্ন নিয়ে পড়েছিলেন। পত্রিকার জন্য উনি একটি আশীর্বাদবানীও লিখে দিয়েছিলেন। এর ঠিক পরের বছর পত্রিকার নতুন সংখ্যা নিয়ে ওনার সাথে দেখা করতে গেলাম। উনি পত্রিকার কাজ দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন "পত্রিকাটা চালিয়ে যেও"। কিন্তু নানা কারনে আমার পত্রিকাটি আর চালানো হয়নি। কিন্তু এই পত্রিকার সুবাদে কয়েক বার ওনার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

 

উনি গল্প করতে খুব ভালোবাসতেন। গল্প করার মতো মানুষ পেলে ছাড়তে চাইতেন না। আক্ষেপ করে বলতেন "এখন তো আর কেউ আসে না, সবাই আমাকে ভুলে গেছে।"

আমি বলেছিলাম, "আপনাকে  কি কখনো ভোলা সম্ভব। আপনি আমাদের গোটা ছোটবেলাটা জুড়ে রয়েছেন যে।"

উনি আমার কথা শুনে খুব হেসেছিলেন। খেতে আর খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। শেষ যেবার ওনার বাড়ি গিয়েছিলাম তখন এত্ত মিষ্টি দিয়েছিলেন যে একার পক্ষে খাওয়া অসম্ভব। তবে না খেয়ে আসার কোনো উপায় ছিলো না। সব মিষ্টি শেষ করে তবে ছুটি পেলাম। চলে আসার সময় বললেন, আবার এসো কিন্তু।

এরপর কোভিড মহামারীর জন্য দু’বছর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। গতবছর ওনার পদ্মশ্রী পাওয়ার খবর শুনে আমি আর আমার শিল্পী বন্ধু বিশ্বদীপ ওনার জন্য একটা শ্লেটে খোদাই করা স্মারক নিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই সময় উনি অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। তাই আর দেখা হয়নি। তারপর নানা রকম কাজের চাপে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আর আজ সকালে খবর পেলাম উনি আর নেই। 

 

 ওনার কাজের ঘরের পেছনে যে আলমারিটা আছে সেখানে দেখেছিলাম বহু রকম পুরস্কারে ঠাসা। তবে সদাহাস্যময়, শিশুর মতন সরল নিরহংকারী এই শিল্পী মনে করতেন সকলের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাই তাঁর জীবনে পাওয়া সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তাইতো তিনি কি অনায়াসে বলতেন— “কালের নিয়মে একদিন আমি থাকব না, কিন্তু আমার সৃষ্টিরা থাকবে।” সত্যিই তাই যতদিন বাঙালি জাতির অস্তিত্ব থাকবে ততদিন রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়ের মতো বাঙালির হৃদয়ের সিংহাসনে বিরাজ করবে নস্টালজিয়ায় ভরা আরেকটি নাম শ্রী নারায়ণ দেবনাথ।

ads

Mailing List