মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে.../ গল্প, লিখছেন মৌমিতা বিশ্বাস

মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে.../ গল্প, লিখছেন মৌমিতা বিশ্বাস
22 May 2022, 01:00 PM

মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে...

 

মৌমিতা বিশ্বাস

 

 

বৃষ্টিটা থেমে গিয়ে এখন খুব সুন্দর একটা সন্ধ্যা নেমেছে শহর জুড়ে। গাছ পালা গুলো দীর্ঘ দহন বেলা কাটিয়ে স্নান সেরে উঠে এখন খুশী মনে মাথা দোলাচ্ছে। আর সেই খুশির রেশ মৃদু মন্দ বাতাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহরের আনাচে কানাচে।

 অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িটা নেবে বলে বেসমেন্টের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেলো সন্দীপ। আকাশের দিকে তাকালো একবার। একটা অদ্ভুত ভিজে সন্ধ্যা নামছে। জুঁইফুল ফুটেছে কি কোথাও? তার প্রিয় ফুল। ঝিমলিরও। জোরে শ্বাস নিলো সে একবার। না! মনের ভুল বোধ হয়। ধীরে ধীরে বেসমেন্টে নেমে গাড়িতে বসে স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলো সে। অ্যাক্সেলেটরে পা রেখে গাড়ি চালাতে শুরু করলো তার একলা জীবনের ঠিকানার দিকে।

আজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে তার এই একলা জীবন। ঝিমলির সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে তা প্রায় একমাস ঘুরতে চললো। এক বছরের কিছু বেশী সময় সেপারেশনে ছিলো তারা। ঝিমলি চলে গেছিলো এই শহরেরই আরেক প্রান্তে তার বাবা মায়ের কাছে। আর সাজানো গোছানো তাদের বিশাল দৃষ্টিনন্দন ফ্ল্যাটটিতে সন্দীপ রয়ে গেছিলো একা। তার বাবা মা থাকেন উত্তরবঙ্গে। বাবা ওখানেই এক কলেজের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। মা স্কুল শিক্ষিকা। এখনও বছর দুয়েক বাকি আছে তার অবসর নিতে। ভাই পড়তে গেছে দেশের বাইরে। আর সে সরকারি কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। উচ্চপদে। দেশের বাইরে যাওয়ার অনেক সুযোগ তারও ছিলো। কিন্তু উত্তরবঙ্গ থেকে পড়তে এসে কখন যেনো এই শহরটার অলীক মায়ায় জড়িয়ে গেলো সে। জড়িয়ে গেছিলো ঝিমলির টানেও। আপাদমস্তক। মাঝে বছর দুয়েক দেশের মধ্যেই দূরের এক শহরে চাকরিসূত্রে গেছিলো বছর দুয়েকের জন্য। কিন্তু তার পরে হঠাৎ এই চাকরির অফারটা পেয়ে ফিরে এসেছিলো আবার। পে প্যাকেজটাও ঠিকঠাকই লেগেছিলো তার। ঝিমলিরও খুব একটা ইচ্ছে ছিলোনা বিয়ের পরে বাইরে গিয়ে থাকার। বাবা মা আর ছোটবেলার শহর ছেড়ে দূরে যেতে চায়নি সেও। এই চাকরিটা নেওয়ার পরেই বিয়ে করে নিয়েছিলো তারা। সেটাও এমনই এক বৃষ্টিমাখা প্রাক বর্ষার গোধূলী ছিলো।

 

ঠিকঠাকই চলছিলো সবকিছু। ভাড়ার ফ্ল্যাট ছেড়ে নিজের ফ্ল্যাট কিনেছিলো সন্দীপ। মনের মতো করে সে ফ্ল্যাট সাজিয়েছিলো ঝিমলি। ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং নিয়েই পড়াশোনা তার। সবে টুকটাক কাজ করতে শুরু করেছিলো। নিজেদের ফ্ল্যাটটাকে সে যেনো নিজের মন প্রাণ ঢেলে সাজিয়েছিলো। স্বপ্নের মতো কাটছিলো দিন রাত গুলো।

এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটলো। ঝিমলির মাসতুতো দিদি রূপসা ছিলো সন্দীপের কলেজের বন্ধু। পিঠোপিঠি দুই বোনের বন্ধুত্ত্ব ছিলো খুব। রূপসার সাথে ওদের কলেজ সোশ্যালে এসেই সন্দীপের সাথে আলাপ আর বন্ধুত্ব ঝিমলির। কিছুদিনের মধ্যেই খুব সাবলীল ভাবেই সেই বন্ধুত্ব পথ খুঁজে নেয় ভালোবাসায়। অপূর্ব মিষ্টি গানের গলা, সৌন্দর্যবোধ, বড় বড় গভীর চোখ আর মায়াবী মুখ নিয়ে মেয়েটা কখন যেনো মিশে গেলো সন্দীপের মন, প্রাণ, অস্তিত্বে।

তা ঘটনাটা হলো সেই রূপসার বিয়ে ঠিক হলো আমেরিকা প্রবাসী এক ছেলের সাথে। খুব খুশীই ছিলো এই খবরে সন্দীপ আর ঝিমলি। অনেক আনন্দও করলো তারা রূপসার বিয়েতে। তার বর রুদ্রজিতও ভারী মিশুকে। কয়েকদিনেই খুব বন্ধুত্ত্ব হয়ে গেলো তার আর সন্দীপের মধ্যে। বিয়ের সপ্তাহখানেক পরেই সে রুপসাকে নিয়ে পাড়ি দিলো বিদেশে। সমস্যাটা শুরু হলো এর পর থেকেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে যথারীতি ওই দেশে গিয়ে রূপসা অনেক ছবি দেওয়া শুরু করলো। ঝিমলিকে ফোন করে বিদেশের নানা গল্পও শোনাতে লাগলো সে। যার অনেকখানি জুড়েই থাকতো ওখানকার জীবন যাত্রার নানারকম প্রশংসা আর সন্দীপের কেরিয়ার নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে আক্ষেপ।

সন্দীপ যে অকারণে এই দেশে পড়ে আছে আর নিজেকে তার সাথে ঝিমলিকেও জীবনের নানারকম প্রাচুর্য্য আর আরাম থেকে বঞ্চিত করছে এরকম একটা ধারণা ঝিমলির মাথায় মোটামুটি গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছিলো সে। এর পর পরই ঝিমলি আর সন্দীপের আরও কিছু বন্ধু বান্ধব কেউ কর্মসূত্রে কেউ বা বিবাহসুত্রে প্রবাসে পাড়ি জমালো। এবং তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল জুড়ে বিজ্ঞাপিত হতে লাগলো প্রবাসের স্বপ্ন স্বপ্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য আর তাদের সুখী সুখী আলোমাখা মুখ। তার কিছুদিন পর থেকেই যে ঝিমলি কোনোদিনই এই দেশ কেনো এই শহর ছেড়েই বাইরে যেতে চায়নি সেই কিনা বিদেশে গিয়ে সেটেল করার জন্য পাগল হয়ে উঠলো। সন্দীপকে রীতিমত তাড়না করতে লাগলো বাইরে যাওয়ার জন্য। ঠিক এই সময়েই সন্দীপের ভাই রাজদীপ ইউ কে-র এক নাম করা ইউনিভার্সিটি তে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলো। বাইরে চলে গেলো সেও। আর ঠিক তার পর পরই একটা ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো তার বাবা। ইতি মধ্যেই ঝিমলির জেদে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলো সন্দীপও কিন্তু এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সে সব বানচাল হয়ে গেলো। ভাই নেই। সেও তার বাবা মায়ের থেকে বেশ খানিকটা দূরের শহরে থাকলেও একই রাজ্যে তো থাকে। এই অবস্থায় তাদের ফেলে বাইরে চলে যাওয়াটা ঠিক মনে হলোনা তার। উত্তর আর দক্ষিণ বঙ্গে প্রায় নিত্য যাত্রী হয়ে উঠতে হলো তাকে।

এদিকে উত্তরোত্তর ঝিমলির তাড়না বাড়তেই লাগলো। নিমরাজী সে চাপে পড়ে দু একটা কোম্পানিতে তার সি ভি পাঠাতে শুরু করলো। কিন্তু সে দায়সারা সি ভি কোথাও গৃহীত হবেনা সেটাও সে জানতো। অশান্তি চরমে উঠলো আস্তে আস্তে। যে আনন্দ যে ভালোবাসা স্বপ্নের মতো ঘিরে থাকতো তাদের তাতে কোথায় যেনো ফাটল ধরলো ধীরে ধীরে। দুজনের কোনো কিছুই যেনো দুজনের ভালো লাগতো না আর। এই রকমই একদিন সারা সকাল চূড়ান্ত অশান্তি হওয়ার পরে অফিসে বেরিয়ে গেছিলো দুজনেই। সারাদিন কেউ কারো সাথে একবারও ফোনে কথা বলেনি। ইচ্ছাও হয়নি। একটু রাত করে সেদিন বাড়ি ফিরেছিলো সন্দীপ, একা। ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেখলো তালা ঝুলছে। ঝিমলি এখনও ফেরেনি!!!!!

ফোনটা পকেট থেকে বের করে সবে বউয়ের নম্বরটা ডায়াল করতে যাবে হঠাৎ একটা মেসেজ ঢুকলো। ঝিমলিই পাঠিয়েছে। পড়লো সন্দীপ। লিখেছে সে আর ফিরবেনা। তিক্ত সম্পর্কটা আর বহন করতে চাইছেনা সে। বিয়ের ঠিক এগারো মাস একুশ দিনের মাথায় বাড়ি ছেড়ে গেলো ঝিমলি। সন্দীপ সেই রাতেই ছুটেছিলো ওদের বাড়ি। অনেক বুঝিয়েছিলো। কিন্তু বুঝতে চায়নি ঝিমলি। কেউ বোঝাতে পারেনি ওকে। ওর বাবা মা, সন্দীপের বাবা মা, আত্মীয় স্বজন। কেউ না। বছর দেড়েকের মাথায় যৌথ সম্মতিতে বিচ্ছেদ হয়ে গেলো তাদের।

সামনে একটা সিগনাল। গাড়িটা আস্তে করে দাঁড় করালো সন্দীপ। এতো কথা আজ হঠাৎ মনে পড়লো কারণ ঝিমলি চলে যাওয়ার ঠিক আগে যে দু একটা দায়সারা সি ভি পাঠিয়েছিলো সন্দীপ বাইরের দু একটা কোম্পানিতে তারই একটা থেকে অফার লেটার এসেছে আজ। বেশ ভালো অফার। ভালো পে প্যাকেজ। অন্যান্য অনেক সুযোগ সুবিধাও আছে। ওই চিঠিটা মেইলে পাওয়ার পর থেকেই কি জানি কেনো একবার ঝিমলিকে দেখতে বড় ইচ্ছে করছে তার। মনে হচ্ছে যেনো কত না বলা কথা যুগ যুগ ধরে তৈরী হওয়া বরফের প্রাচীরের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে। যেনো একবার সব বাঁধা সব জড়তা ভেঙে ঝিমলির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার দুটো হাত হাতের মধ্যে টেনে নিলেই সে সব না বলা বরফ শীতল কথাগুলো পাহাড়ি ঝর্না হয়ে ভাসিয়ে নেবে তাদের। আবার নতুন করে ভোর হবে। নতুন করে সাজিয়ে নেওয়া যাবে সব। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে দেখলো যেনো চুম্বকের মতোই সে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যাওয়ার রাস্তা পিছনে ফেলে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে শহরের অন্যপ্রান্তে ঝিমলিদের বাড়ির দিকে।

প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সে। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে যেনো মনে একটা দ্বিধার মেঘ ভেসে এলো তার। যাবে কি? যাওয়াটা কি ঠিক হবে? বিচ্ছেদ হওয়ার একমাস পরে কোনো যোগাযোগ না করে হঠাৎ এইভাবে বাড়িতে চলে আসাটা কিভাবে নেবে ঝিমলি? কিভাবেই বা নেবে তার বাড়ির লোকজন। এর মধ্যে তার অন্য কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে কিনা কারও সাথে সেটাও তো জানেনা সন্দীপ। অফার লেটারটা দেখিয়ে কি বলবে যে তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে ফিরে চলো। কিন্তু তা কি এখন আর বলা যায়? নিজেরই কেমন যেনো অর্থহীন মনে হলো কথাগুলো তার।

প্রায় পৌঁছেই গেছে। হাত কুড়ি দূরে ঝিমলিদের ছোটোখাটো দোতলা বাড়িটা চোখে পড়ছে। ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। বাহারী পর্দা গুলো দুলছে বৃষ্টি ভেজা হাওয়ায়। নতুন রং করানো হয়েছে বোধ হয়। অনেকদিন পরে এলো সে। বেশ ঝলমল করছে। কতদিন পরে এলো সে? তার নিজের মনে হচ্ছে শত সহস্র যুগ যেনো। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখে তার মনে হলো কোথাও তো কিছু কম পড়েনি এখানে তাকে ছাড়া। আলোগুলো তো একটুও কম উজ্জ্বল হয়ে যায়নি। কোথাও কোনো মালিন্য কোনো একাকীত্ব তো নেই। গাড়ির এ সি বন্ধ করে জানলার কাঁচগুলো নামিয়ে দিলো সে। বড্ড দমবন্ধ লাগছিলো। হঠাৎ কোথা থেকে বৃষ্টিভেজা একটা দমকা হাওয়া ছুটে এলো আর তাকে জড়িয়ে ধরে গাড়ির ভিতরে যেনো ঝাঁপিয়ে পড়লো একরাশ জুঁই ফুলের মিষ্টি গন্ধ। এদিক ওদিক তাকালো সে। চোখে পড়লো পাশেই একটা বাড়ির পাঁচিলের গা বেয়ে উঠেছে জুঁই গাছটা। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে লতানে শরীর। খুব প্রিয় ফুল তার। ঝিমলিরও। গাড়িটা ঘুরিয়ে নিলো সন্দীপ। একটু ক্লান্ত লাগছে তার এখন। ওই আদিগন্ত বিস্তৃত বরফের পাঁচিল ডিঙিয়ে ঝিমলির হাত ধরার শক্তি নেই তার আর এই মুহূর্তে। তার চেয়ে থাক না। এই শহরের আনাচে কানাচে এরকম কতো কথাই তো না বলা থেকে যায় চিরকাল।

.........

লেখিকা- অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, রেভিনিউ

Mailing List