আপনার বাড়ির পাশের আগাছা থেকেই মিলতে পারে ওষুধ- পুরুলিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ

আপনার বাড়ির পাশের আগাছা থেকেই মিলতে পারে ওষুধ- পুরুলিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
04 Oct 2020, 03:05 PM

আপনার বাড়ির পাশের আগাছা থেকেই মিলতে পারে ওষুধ- পুরুলিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ

 

পুরুলিয়া ছোটনাগপুর মাল ভূমির অংশ বিশেষ। শুধু ঝুমুর, ছৌ-নৃত্য, আর পলাশ-মহুয়ার গন্ধ-সৌন্দর্য্যই শুধু নয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রয়েছে নানা রকমের ওষধি গুনে ভরপুর গাছগাছলার সমাহার। প্রকৃতির টানে মানুষ ছুটে আসে এই সুন্দর অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ে। এই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সু-প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা ওষধি গাছের ব্যবহার, তার উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ অমল কুমার মন্ডল এবং পুরুলিয়া নিস্তারিনি মহাবিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক নন্দদুলাল ষন্নিগ্রাহী

ডঃ অমল কুমার মন্ডল

নন্দদুলাল ষন্নিগ্রাহী

নিম নিশিন্দে থানকুনি

মুথো গুলঞ্চ শালপানি

শিউলি বকুল চাকুলে

গাঁদাল চেন সকলে

নইলে বদ্যি পস্তাবে

ঘরের কড়ি হারাবে-

প্রচলিত আদ্দিকালের বদ্দি বুড়ির চেনা ছন্দ কমবেশি সবার জানা। কিন্তু বিশ্বায়নের ও নগরায়নের হাতে চেনা ছন্দে আজ ধুলো জমতে  বসেছে। কিন্তু ভারতের এক বিরাট জনগোষ্ঠী সংগোপনে জ্ঞান ও সংস্কারের পরম্পরার হাত ধরে যেমন তাদের আসন পেতে রেখেছে অন্যদিকে জীববৈচিত্রের আরাধনা ও সংরক্ষণে কাজ করে চলেছে। জিন ব্যাংক বা ক্রায়ো ব্যাংক বা জৈব প্রযুক্তির ব্যয় বহুল পরিবেশ ভাবনা থেকে দূরে থেকেও রোগ মুক্তির নিত্যনতুন উপকরণের সন্ধানে এরা রত। চলুন সেই সমস্ত মানুষগুলির সুখদুঃখের সন্ধানে পৌঁছে যাওয়া বাংলার এক প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ায়। শাল, পলাশ, মহুয়া ঘেরা ডুংরীতে। মানুষ সংস্কার, উৎসব আর প্রকৃতি বন্দনার নামে আবাহন করে চলেছে এই জৈববৈচিত্রকেও। নীরবে, নিঃশব্দে। প্রান্তিক পুরুলিয়া জেলা সাবেক মানভূম তথা বর্তমান জঙ্গলমহল। পিছিয়ে পড়ার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয়। কিন্তু জৈব বৈচিত্র্য্ ও প্রকৃতির আধারে অভিনবত্বের দাবি করে। প্রায় ৬৫২৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তন নিয়ে এই জেলা জনসংখ্যার ৩০ লাখেরও বেশি। প্রায় ২১ টি ব্লকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জনবিন্যাস এর দিক থেকে উপজাতির সংখ্যা ৮ লক্ষ ৮০ হাজার ৬৫২ জন। যা সামগ্রিক জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশের কাছাকাছি। জনজাতির মধ্যে প্রায় উপজাতির সংখ্য ২০। সাঁওতাল, মুন্ডা, শবর, বীরহোড়, পাহাড়িয়ার মতো ভিন্ন ভিন্ন উপজাতির মানুষেরা পরম্পরা নিয়ে ডুংরি ঝর্ণার ধারার মতো কুলকুল সুরে না হলেও একটি গতিশীল পরম্পরার প্রতীক। একদিকে এরা বহন করে চলেছে আবহমানকাল ধরে চিরায়ত লোকগাথা ও কথার বহুমূল্য রত্ন রাজি। জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে তাদের আশেপাশে বেড়ে ওঠা গাছগাছালি ও জীবজন্তুকে লোকচক্ষুর অন্তরালে আপন করে নিয়েছে চিরায়ত পরম্পরার হাত ধরে। খাদ্যের প্রয়োজনে আর কখনও রোগ প্রতিরোধ বা রোগ উপশমের অংশ হিসাবে এই জীববৈচিত্র্যর অবাধ যাতায়াত। এই জনগোষ্ঠী কখনও সংস্কৃতি পরম্পরার হাত ধরে এইসকল উদ্ভিদ ও প্রাণী গোষ্ঠীকে আপন করে নিয়েছে এবং সংরক্ষণ করে চলেছে সরকারি বদান্যতার মুখাপেক্ষী না হয়েও।

এবার দেখা যাক সেই সমস্ত অপরিচিত বা অল্প পরিচিত লতাগুল্মদের কথা। যাদের আমরা আগাছা বলেই দূরে সরিয়ে রেখেছি বা কখনও উৎপাদিত শস্যের গুণগত এবং পরিমাণগত মানের সাবেকি প্রয়োজনে সমূলে উৎপাটিত করছি নিরন্তর। অথচ সমাজের এই জনগোষ্ঠী তাদের জন্য আবেগ তাড়িত। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক রোগমুক্তি যদি সুস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা হয় তবে জীবন থাকলে রোগ জ্বালা যন্ত্রণা আসবে না, তা বলাই বাহুল্য। অথচ রোগমুক্তির নিদান যদি পরিবেশের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তারা যেমন কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় বন্ধ করে তেমনই পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত হয়ে অনাবিল আনন্দ লাভ করা যায়। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের এই বিশাল জনগোষ্ঠী কখনও অর্থের স্বল্পতায় আবার কখনও সরকারী উদাসীনতায় তাদের রোগমুক্তির প্রয়োজনে প্রকৃতিকে আপন করে নিয়েছে সে কথা আজ আর অজানা নয়। উদ্ভিদ বিজ্ঞানে এই বিজ্ঞান ইথনোবটানি নামে পরিচিত। আজ বৈজ্ঞানিক পরিভাষা হিসেবে শুধু নয়, রোগমুক্তির নিদানে তাদের ব্যবহার বিশ্বজোড়া স্বীকৃতও।

এই প্রবন্ধের দুই গবেষণাকারী পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত অযোধ্যা মাঠা, গড় পঞ্চকোট, মানবাজা্র, আড়সা, বাঘমুন্ডির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল পরিভ্রমণ করে সেই সমস্ত আগাছাদের গোত্র ও পরিচয় তুলে ধরে। এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর এই আগাছাদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক তুলে ধরতেও প্রয়াসী। এবার দেখা যাক, সেই সমস্ত আগাছাদের ব্যবহার এবং লোকায়ত চিকিৎসায় তার গুরুত্ব। উদারাময় ও আমাশয়- খুব পরিচিত। এই ধরনের সংক্রমণে প্রধানত বাক্টেরিয়া ভাইরাস ও আদি পরজীবী যুক্ত। প্রধানত অপরিশ্রুত পানীয় জল এই রোগের উৎস। বেথুয়া, চিকনি শাক, নুনিয়া শাক্, খুদি নোটে্, বন লবঙ্গ, কালকাসুন্দা, বেগনা, বননীল, জটা তুলসী, বেনা হিংচা, বদনানী প্রভৄতির মতো অসংখ্য তথাকথিত আগাছারা বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শ্বাসনালীর প্রদাহজনিত রোগ সাধারণ সংক্রমণ হলেও COVID 19-র অতিমারিতে আজ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আদিম জনজাতির এই সমস্ত মানুষেরা শ্বাসনালীর প্রদাহ নিরাময়ে শনিলতা, হালকুশা, বেগনা, ঝান্টির সাথে সাথে বহুল ব্যবহৃত বাসক, তুলসী দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে চলেছে। মধুমেহ বা ডায়াবেটিস অতিমারীরর মতোই ভয়ঙ্কর। এই রোগের নিরাময়ে স্বর্ণলতা (Cuscuta reflexa), তেলাকুচা (Coccinia sp.), কালি মুসলি (Curculigo orchinoides), ব্যবহৃত হয়। ত্বকের সুরক্ষায় বাজার চলতি তথাকথিত ফেয়ারনেস ক্রিমকে দূরে সরিয়ে রেখে কেশুত, নুনিয়া শাক, শিয়ালকাঁটার চল দীর্ঘদিনের। ক্ষত নিরাময়ে শিয়াল মূত্র (Blumea lacera), দূর্বা ঘাস (Cynodon dactylon), ছোট নয়নতারার (Catharanthus sp) ব্যবহার সুবিদিত। মূত্রনালীর প্রদাহ জনিত রোগের ক্ষেত্রে আপাং (Acyranthus aspera), সয়ালতা (Ichnocarpus frutescens) ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনিয়মিত ঋতুস্রাবে লাল নোটে (Amaranthus sp), থানকুনি (Centella asiatica) পাতার রস, মুথা ঘাস (Cyperus rotundus), লাল শালুকের সাথে এদের যোগ অতীব মধুর। কৃমিজনিত রোগে দেখা যায়  বেতো শাক(Chenopodium sp), গুলঞ্চ(Tinospora cordifolia), শিউলি পাতার ব্যবহার।  ক্ষুধামন্দা নিরাময়ে আমরুল (Oxalis sp), ঘৃত কুমারী (Aloe vera), চিকনি শাক (Polygonum plabecium), নুনিয়া (Portulaca oleraca), কামরাজ, হিংচা, বদনালীর (Lobelia alsinoides) মতো অসংখ্য গুল্ম ব্যবহৃত হয়। চক্ষু রোগ একটি বহু চর্চিত বিষয় এবং সেখানে বিভিন্ন প্রকার লতাগুল্ম, যেমন দূর্বাঘাস, গিমাশাক, হাতিশুঁড়, শতমূল, লাউ পাতার রস ব্যবহারের চল দেখা যায়। চর্মরোগ, বিশেষ করে কুষ্ঠ ছিল একদা এই অঞ্চলের অভিশাপ।  লজ্জাবতী, বাঁদরলাঠি এই রোগের নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। বাতের রোগ, বিশেষ করে মহিলাদের একটি বয়সের পরে আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। গুলঞ্চ, ধুতরা, ভেরেন্ডা, ভেরন এই রোগের রোগের প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। উচ্চ রক্তচাপ বা মধুমেহ একটি নীরব ঘাতক।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে দূর্বাঘাস, শুশনি শাক, সজনে পাতার রস এবং সর্পগন্ধার ব্যবহার চলে আসছে। জন্ডিস বা পান্ডুর রোগে স্বর্ণলতা, গুলঞ্চ, কুলেখাড়া ও ভুই আমলা ব্যবহৃত হয়। দেখা গেছে অপরিচিত এরকম অসংখ্য আগাছা যেমন কানশিরা, ঘেটু (Clerodendrum viscosum), দুধিয়া, চাচি, দোচণটী, ভেরেন্ডা, বেরেলা (Sida cordifolia), শালপানি, বুড়াশ্যম. মোরগঝুটির মতো অসংখ্য গাছ রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া অসংখ্য লতাগুল্ম যেমন মঞ্জিরা, বন করলা (Mormordica diocia), বন ওল (Amorphophallus bulbifera), বনপিঁয়াজ (Drimia indica) বড়পাড় (Clerodendrum indicum), ভেরেন্ডা (Jatropha curcas)‌, চাকুন্দা ছোটঝুটি, দুধিলতা, ঈশ্বর মূল (Aristolochia indica), ঝুনঝুনি (Crotalaria prostrate), কান্ত (Solanum inidicum), মোরগঝুঁটি (Celosia cargentea), বন্ডিংলা, তালমুলির (Curculigo orchinoides) মতো অসংখ্য উদ্ভিদের এই অনুসন্ধানে উঠে আসে যেগুলি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বা ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চিরায়তকাল ধরে লোক পরম্পরা ও লোকসংস্কৃতির হাত ধরে কখনও কখনও এই সমস্ত উদ্ভিদ ভেষজ বাগান কে অন্য পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। করোনার অতি মারিতে সমগ্র বিশ্ব আজ মৃত্যু মিছিলের মুখোমুখি। তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় আমরা সবাই। বহু আকাঙ্খিত ভ্যাকসিনের জন্য। অথচ ভাইরাস নামক এই জীব ও জড় জগতের এক প্রোটিন অনু আমাদের ধ্বংস করতে উদ্যত। মানুষের অনাক্রমতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চতুর্দিকে শীতল গণকবরের বার্তা দিচ্ছে। ঠিক এই সময় এই সমস্ত লতাগুল্মের রাসায়নিক প্রকৃতি উদঘাটন হয়তো বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অনাক্রমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে আমেরিকায় থাকা প্রবাসী এক বাঙালি সন্তানের হাত ধরে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটারের প্রয়োগে বিভিন্ন প্রকার লতাগুল্ম থেকে প্রায় শতাধিক জৈব অণু গোষ্ঠীবদ্ধ করার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। কে বলতে পারে প্রান্তীয় মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ইতিহাস আমাদের COVID 19 বা অন্য রোগ-জীবাণুর হাত থেকে রক্ষার পথ দেখাবে না।

কালের মদিরায় কবিগুরুর সেই সাবধানবাণী আমাদের ভরসা –প্রকৃতির নিয়ম সীমায় যে স্বাস্থ্য ও আরোগ্য তাকে উপেক্ষা করে কি মানুষের স্বরচিত প্রকান্ড জটিলতার মধ্যে কৃত্রিম প্রণালীতে জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য করতে পারে। এই হয়েছে আধুনিক সভ্যতার দুরহ সমস্যা। আসুন না প্রকৃতির নিয়ম সীমার সেই আরোগ্য তত্ত্বের ভাবনার সলতেকে উসকে দিই। যা হয়তো আমাদের এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছুটা আলোর পথ দেখাতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক নন্দদুলাল ষন্নিগ্রাহী। পুরুলিয়া নিস্তারিনি মহাবিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে পুরুলিয়ার জীব-বৈচিত্র ও এথনো-বটানি এবং তার প্রয়োগবিধির উপর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ অমল কুমার মন্ডলের অধীনে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।  

Mailing List