লাভজনক মাগুর মাছ চাষের সহজ পদ্ধতি জেনে নিন, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

লাভজনক মাগুর মাছ চাষের সহজ পদ্ধতি জেনে নিন, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
20 Nov 2022, 02:30 PM

লাভজনক মাগুর মাছ চাষের সহজ পদ্ধতি জেনে নিন, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

 

অভিষেক গিরি

 

দেশি মাগুর মাছ চাষ ও রেণু পোনা উৎপাদন পদ্ধতি মৎস্য চাষী ভাইদের কাছে এবং মৎস্য বিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণারত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে একটি খুব আগ্রহের বিষয়। এই মাগুর মাছ খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টি সমৃদ্ধ মাছ। এই মাছের চাষ ও পোনা উৎপাদন বর্তমান সময়ে খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং এই মাছের চাহিদাও খুব বেশী। আধুনিকতা ও দূষণের এই বর্তমান সময় থেকে যদি আমরা কয়েকবছর আগেকার কথা ভাবি তখন কিন্তু এই মাছ খুব সহজেই খালে বিলে জলাশয়ে পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমান সময়ে এই মাছ পরপর বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আশার দিক হল এখন এই দেশি মাগুর মাছটিকে প্রনদিত প্রজনের মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এবং এটাও বাস্তব যে অন্যান্য মাছের তুলনায় এই দেশি মাগুর মাছের দামও অনেক বেশী। তাই এই মাছের চাষ ও প্রজনন সঠিক ভাবে করিয়ে একজন মাছ চাষি যে লাভের মুখ দেখবেন এ বলাই যায়।

দেশি মাগুর মাছ চেনার উপায়

পুরুষ

স্ত্রী

হালকা বাদামী রঙের হয়।

একটু কালচে রঙের হয়।

প্রজননের সময় এদের পেট স্বাভাবিক থাকে।

প্রজননের সময় এদের পেটে ডিম ভর্তি থাকে এবং ফোলা ভাব থাকে।

পেটে চাপ দিলে শুক্র রস বেরোয় না।

পেটে চাপ দিলে ডিম বেরিএ আসে।

জনন অঙ্গ লম্বাটে ও সুচালো প্রকৃতির হয়।

জনন অঙ্গ ডিম্বাকৃতি বা গোলাকার হয়।

 

দেশি বিদেশী বা হাইব্রিড মাগুর মাছ চেনার উপায়

দেশি মাগুর মাছের গায়ের রঙ কালচে বা হলুদাভ হয় এবং শরীরের পুরো অংশে রঙের কোন পার্থক্য দেখা যায় না। মাথার ওপরে একটি “ভি” আকৃতি দেখা যায়।

হাইব্রিড মাগুর মাছের গায়ে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায় ও মাথার ওপর দুপাশে দুটি ও মাঝখানে একটি “ভি” আকৃতি দেখা যায়।

এই হাইব্রিড মাগুর মাছ খুবই হিংস্র প্রকৃতির হয়, এমনকি মানুষের মাংস পর্যন্ত খেয়ে ফেলে এবং এই মাছ চাষে পরিবেশ দূষণও হয়। তাই সরকারের থেকে এই বিদেশী মাগুর মাছ চাষে প্রতিবন্ধকতা আনা হয়েছে। তাই আমরা আজকের আলচনায় দেশী মাগুর নিয়েই কথা বলবো।   

দেশী মাগুর মাছের রেনু উৎপাদন পদ্ধতি

প্রজননের জন্য উপযোগী  দেশি জাতের মাগুর মাছ সংগ্রহ  করতে হবে মার্চ মাসের দিকে, সংগ্রহ করার পর মাছ গুলিকে একটি ট্যাঙ্কে রাখা হয় এবং ট্যাঙ্কের তলায় ৭-১০ সেমিঃ এর একটি মাটির আস্তরন ও লোকানোর জন্য প্লাস্টিকের পাইপ বা মাটির হাঁড়ি রেখে দিলে ভালো হয়। এই সময় মাছকে প্রোটিন যুক্ত আমিষ খাবার যেমন ফিস মিল, কেঁচো, ঝিনুকের মাংস, গুগলি খাওয়াতে হবে। এছাড়াও বাইরে থেকে প্রোটিন সমৃদ্ধ সম্পুরক খাবারও দেওয়া যেতে পারে। মাছের ওজনের ৮% হারে খাইয়ে প্রজনন যোগ্য করে তুলতে হবে। সাধারণত দেশি জাতের মাগুর এক বছরেই প্রজননক্ষম হয়ে থাকে। কৃত্রিম প্রজননের জন্য সুস্থ সবল ও পেট ভর্তি ডিম দেখে স্ত্রী মাছ নির্বাচন করতে হবে। উন্নত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকেই মাগুর মাছ প্রজনন করানো যায়।

হরমোন প্রয়োগ পদ্ধতি

মাগুর মাছকে ইনজেকশন দিয়ে হরমোন প্রয়োগ করলেও এদের স্বাভাবিক প্রজনন হয় না, তাই কৃত্রিম উপায়ে ডিম নিষিক্তকরন করতে হয়। দেশি মাগুর মাছ চাষ পদ্ধতিতে সাধারণত মাগুর মাছকে “Pituitay hormone” বা “Sinthetic Hormone” দেওয়া হয়। পি জি হরমোন হলে ২ টি ডোজ আর সিন্থেটিক হরমোন হলে ১টি ডোজ দিতে হয়।কয়েকটি অতিপরিচিত সিন্থেটিক হরমোন হল – Ovaprim, Ovataid, Gono Pro, Spawn Pro, Ova FH ইত্যাদি। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে মাগুরের ডিম সংগ্রহের ক্ষেত্রে হরমোন ইঞ্জেকশনের চেয়ে মাছের পরিপক্কতার উপর বেশি নজর দেয়া উচিৎ।

ইঞ্জেকশনের মাত্রা

সিন্থেটিক হরমোন স্ত্রী মাছকে ২ এম এল প্রতি কেজি হিসেবে এবং পুরুষ মাছকে ০.৫ এম এল প্রতি কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হয়।

এই ইনজেকশন মাছের শরীরের ৩টি জায়গায় দেওয়া যায়। সেগুলি হল –

. INTRA-MASCULAR: এই পদ্ধতিতে পৃষ্ঠ পাখনা ও পার্শ্ব রেখার মাঝে শরীরের মাঝ বরাবর দেওয়া হয়।

. SUB-CUTANEOUS: এই পদ্ধতিতে পায়ু পাখনার নীচে ও জনন অঙ্গের দুপাশে ইনজেকশন দেওয়া হয়।

. INTRA-PERITONIAL: এই পদ্ধতিতে বক্ষ পাখনার নীচে মাংসল জায়গায় ইনজেকশন দেওয়া হয়।

মাগুর মাছের ডিম সংগ্রহ পদ্ধতি

সাধারণত হাত দিয়ে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মাগুর মাছের ডিম সংগ্রহ করতে হয়, যাকে স্ট্রিপিং পদ্ধতি বলে। ইনজেকশন দেওয়ার ১৬-২০ ঘণ্টা পরে স্ত্রী মাছের পেটে চাপ দিলে ডিম স্বাভাবিক ভাবে বেরিয়ে আসে। প্রাকৃতিক উপায়ের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত এই মাছের প্রজনন করানো সম্ভব হয়নি। অন্যান্য কার্প মাছ যেখানে ডিম পাড়ার সময় হলে আপনা আপনি ডিম বের হতে থাকে, সেখানে মাগুরের ডিম সহজে বের হতে চায় না। আর তাই মাগুর মাছের ডিম বের করার সময় কার্প জাতীয় মাছের চেয়ে এর পেটে একটু বেশি জোরে চাপ প্রয়োগ করতে হয়। বেশি জোরে চাপ প্রয়োগের ফলে ডিম যেন ফেটে না যায় সে দিকেও খেয়াল রাখতে হয় এবং চাপ দেওয়ার পর সমস্ত ডিম বেরিয়ে যাওয়ার পরে যদি রক্ত বের হয় তাহলে চাপ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তা না হলে তাতে সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে পারে।

মাগুর মাছের শুক্র থলি সংগ্রহ পদ্ধতি

এক্ষেত্রে পুরুষ মাগুর মাছটির পেট কেটে শুক্রথলি বের করতে হয়।

প্রথমে হরমোন দিয়ে স্ত্রী মাগুরের পেটে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ডিম সংগ্রহ করতে হবে এবং একই সময়ে পুরুষ মাছের অণ্ডকোষ কেটে স্পার্ম বের করতে হবে। কেননা আগে ডিম সংগ্রহ করে তারপর স্পার্ম সংগ্রহ করতে গেলে এতে সময় বেশি লাগে। পরে স্পার্ম মেশালে ডিমের উর্বতার হার কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি কোন কোন সময় দেখা যায় ডিম ফার্টিলাইজ হয় না।

শুক্র থলিকে ০.৯% লবন জলে সংরক্ষণ করতে হবে।

নিষিক্ত করনঃ

১. একই সাথে ডিম এবং শুক্রাণু বের করার পর ডিম গুলিকে একটি বাটিতে নিয়ে রাখতে হবে আর শুক্রথলিকে কাঁচি বা ধারালো ব্লেড দিয়ে ছোটো ছোটো টুকরো করে নিতে হবে।

২. তারপর সেই কুচানো শুক্রথলিগুলিকে একটি মিহি মশারির জালে রেখে ভালো ভাবে চটকে চটকে শুক্ররসকে ডিমের ওপর ফেলতে হবে।

৩. তারপর একটি জীবাণুমুক্ত পাখীর পালক বা নরম তুলি দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে এবং মেশানোর সময় একটু করে জল দিতে হবে যাতে শুক্রাণু সমস্ত ডিমের ওপর সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে ।

৪. ভালোভাবে শুক্রাণু ও ডিম মেশানোর পর সেই মিশ্রণকে পরিষ্কার জলে ধুয়ে নিতে হবে, যাতে করে অতিরিক্ত শুক্রাণু বেরিয়ে যায়, নাহলে সেই অতিরিক্ত শুক্রাণু ডিমের বাইরের গায়ে লেগে গিয়ে শক্ত হয়ে যাবে তার ফলে ডিম ফুটে চারা বেরতে অসুবিধে হবে। মনে রাখতে হবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ৩ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে হয়।

৫. ধুয়ে নেওয়ার পরে ডিমগুলিকে একটি ৩ ফুট x ২ ফুট x ৮ ইঞ্চি  মাপের ট্যাঙ্কে রাখা হয় (আকৃতি ভিন্ন হতে পারে)। এই ট্যাঙ্কটি ফাইবারের হতে পারে, কাঁচের অথবা থারমকলের হতে পারে। এই ট্যাঙ্কের ভেতরে মশা আটকানো জালের ওপরে ছড়িয়ে দিতে হবে যেন ডিমগুলি একে অপরের সাথে লেগে না থাকে। এই মশা আটকানোর জালটি একটি লোহার ফ্রেমের সাথে ভালো করে টানটান করে সেলাই করতে হবে যেন ভাঁজ না হয়ে থাকে।

৬. ট্যাঙ্কে ৫ ইঞ্চির বেশী জল দেওয়া যাবে না। জালের ওপরে ও নিচে যেন ২ ইঞ্চি করে জল থাকে। এই ৮ ইঞ্চি উচ্চতার দেওয়ালে ৬ ইঞ্চির কাছে একটি ছিদ্র রাখা হয়, যাতে ওখান দিয়ে জল সবসময় বেরোতে পারে।

৭. ২০-৩০ ঘণ্টার মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়, একে রেণু পোনা বা হ্যাচলিং বলে। এই র্দীঘ সময়ে মাছের ডিমে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে। সংগ্রীহিত এই ডিমে ফাঙ্গাস আক্রমণ করার সাথে সাথে ট্যাঙ্ক  থেকে সাইফনের মাধ্যমে বা ড্রপারের সাহায্যে ফেলে দিতে হবে। তাছাড়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই ফাঙ্গাস এক ডিম হতে অন্য ডিমে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ডিমকে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর তাই ডিমগুলোকে ট্যাঙ্কে ঘন করে দেওয়া যাবে না। যথাসম্ভব পাতলা করে বিছিয়ে দিতে হবে। এই সময়  ঠাণ্ডা জলের ঝর্ণার ব্যবস্থা রাখতে হবে। জলের তাপমাত্রা ২৭-২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট রাখতে হয়।

পোনা তার পরিচর্যা

১. ২০-৩০ ঘণ্টা পর যে বাচ্চাটি ডিম থেকে বেরোল তাকে বলে রেনুপোনা, এই রেনুপোনায় কুসুম্থলি থাকে, এই কুসুম্থলি থেকে রেনুপোনা গুলি পুষ্টি নিয়ে বেঁচে থাকে ৩-৪ দিন পর্যন্ত। তাই এই ৩-৪ দিন বাইরে থেকে কোন খাবার দেওয়া উচিৎ নয়।

২. ৩-৪ দিন বয়স হলে তাকে ডিম পোনা বা স্পন বলে। এই সময় খাবার হিসেবে সিদ্ধ ডিমের কুসুম বা গুঁড়ো পাউডার দুধ বা আটা ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে দেওয়া হয়। এই সময় প্রানীকনাও দেওয়া যেতে পারে। এই প্রানীকনা পুকুর থেকে প্ল্যাঙ্কটন জালের সাহায্যে ছেঁকে নিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এই ভাবে চারাকে ৭-৮ দিন খাওয়ানো হয়। তবে মনে রাখতে হবে ডিমের কুসুম ব্যাবহার করলে জলে গ্যাস হতে পারে, তাই কুসুম দেওয়ার ৩০-৪০ মিনিটের পর জল সাইফন করে বের করে দিয়ে পরিষ্কার জল দিতে হবে।

৩. মাছের বয়স যখন ১৫ দিন হয়ে যাবে তখন তাকে ধানীপোনা বা ফ্রাই বলে। এই সময় মাছকে প্রানীকনা, কেঁচো বা ঘরে বানানো খাবার দেওয়া যায়। এই বানানো খাবারে ফিস মিল, ঝিনুকের মাংস, ডিম সেদ্ধ, সয়াবিনের গুঁড়ো ভালো করে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এই বানানো খাবারে একটু ভিটামিন সি ও মিনারেল মেশালে ভালো হয়।

৪. খাবার দেওয়ার ৪৫ মিনিট পরে জল পরিবর্তন করা আবশ্যক। না হলে জল খারাপ হয়ে মাছ মারা যাবে।

দেশী মাগুর মাছের রেনু উৎপাদনের সময় যে সমস্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবেঃ

১. দেশি মাগুরের ব্রুড মাছ অবশ্যই পরিপক্ক হতে হবে। অন্যথায় সমস্ত কাজই বিফলে চলে যাবে।

২. চাপ প্রয়োগ করে ডিম সংগ্রহের সময় খুব বেশি জোরে চাপ দিয়ে ডিম বের করা উচিৎ নয়। তাতে ডিম ভেঙ্গে যাওয়ার ও রক্ত বেরনোর সম্ভাবনা থাকে।

৩. ট্যাঙ্কে সংগ্রিহীত ডিম যেন অধিক ঘনত্বে দেওয়া না হয় সেদিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। অর্থাৎ একটি ডিম আরেকটি ডিমের সাথে যেন লেগে থাকে।

৪. ট্যাঙ্কে ঠাণ্ডা জলের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। জলের তাপমাত্রা ২৭-২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেটের বেশি হলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলেও মারা যাওয়ার সম্ভবনা থাকবে।

৫. সাদা অনিসিক্ত ডিমগুলিকে সাইফন বা ড্রপারের সাহায্যে বের করে দিতে হবে, না হলে পাশের ভালো ডিমকেও সংক্রমণ করে দেবে।

এভাবে চাহিদা অনুযায়ী যে কেউ দেশি মাগুরের রেনু উৎপাদন করতে পারেন।

লেখক পরিচিতি:

১. অভিষেক গিরি ( লেকচারার, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, প্রভাত কুমার কলেজ, কাঁথি এবং প্রশিক্ষক ও পরীক্ষক, গ্রামীন স্বরোজগার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, RSETI’’s)

২. সুদীপ্ত মাইতি ( তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, প্রভাত কুমার কলেজ, কাঁথি)

৩. উদয়শঙ্কর ভূঞ্যা (তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, খেজুরী কলেজ, খেজুরী)

******

Mailing List