লাকি বাম্বু / গল্প- লিখেছেন সুদীপ সরকার

লাকি বাম্বু / গল্প- লিখেছেন সুদীপ সরকার
15 May 2022, 10:00 AM

লাকি বাম্বু / গল্প

 

সুদীপ সরকার

 

অনেকদিন পর আবার সেই স্বপ্নটা দেখলাম। মাঝ আকাশে দাপিয়ে উড়ছে আমার ঘুড়ি। আধাআধি লাল কালো রঙের, লম্বা লেজ ঝোলানো হাড়িকাঠ। সুতোর টানে একবার ওপরে উঠছে আবার চরকি পাক মেরে গোঁত্তা খেয়ে নেমে আসছে নিচের দিকে।

মাতাল হাওয়ায় আরও কত রঙ বেরঙের ঘুরি উড়ছে আকাশ জুড়ে। একটা ঘুড়ি খুব রেলায় উড়ছে ফরফর করে। মাথার ওপর দিয়ে, কার সঙ্গে যেন প্যাঁচ খেলে কেটে গেল। কোন একটা ছাদ থেকে আওয়াজ উঠল “ভো কাট্টা…”; তাকিয়ে দেখলাম আমার হাতের নাগালের মধ্যে দিয়েই উড়ে যাচ্ছে ঘুড়িটা। অমনি ছুট লাগালাম সেটাকে ধরতে, কেটে যাওয়া ঘুড়িটা হাতের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি ধরেও ধরতে পারছি না। হাতে সুতোর টান পর্যন্ত অনুভব করতে পারছি কিন্তু নাগালের মধ্যে পাচ্ছি না কিছুতেই…।

ঘুমটা ভেঙে গেল চট করে। কি একটা দারুণ মুক্তির স্বাদে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ছোটবেলার দিন গুলো কি সুন্দর ভেসে ওঠে ঘুমের ভিতর।একদম যেন সিনেমার মতো। ছবির পর ছবি পাল্টে পাল্টে যায়। সিনের পর সিন আসে আর আমি মুখ্য ভূমিকায় মধ্যমণি। মাঝে মাঝে মনে হয়, ঘুমিয়ে থাকলে মনের চোখ গুলো বেশি করে খুলে যায়। কি পরিস্কার দেখলাম আমাদের পুরনো বাড়ির ছাদটা। সরু লোহার তারে ঝুলে আছে ভিজে জামাকাপড়। আমাদের বাড়ির পাশে টুলুদের বাড়ি, ওদের পুকুর আমাদের ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। পুকুর পাড়ের বড় গাছটার ডালে কত পাখির কিচিরমিচির। একটা মাছরাঙা ঝুপ করে জলে ঝাঁপ দিয়ে দারুণ কায়দায় একটা ছোট মাছকে ঠোঁটে নিয়ে উড়ে গিয়ে বসল গাছের ডালে। সব কিছুই এক লহমায় যেন চোখের সামনে দেখলাম। চেতন অবচেতন সব একাকার হয়ে গেল।

দুপুরে ভাত ঘুম দিলে আমার মাথা ধরে যায়। তবু ছুটির দিনে কখনো সখনো সেই বিলাসিতায় গা-ভাসিয়ে ফেলি। এখন যদিও আমার গড়িয়ে কাটানো ছাড়া কোনও গত্যন্তর নেই। দিন তিনেক আগেই জ্বর এসেছিল। সঙ্গে গলা ব্যথা। উপসর্গ দেখে সরকারি হাসপাতালের ল্যাবে স্যাম্পেল দিয়েছিলাম। রিপোর্ট পজিটিভ হবে ধরেই নিয়েছিলাম, হলও তাই। নিজেকে একটা ঘরে বন্দি করেছি সেদিন থেকেই। চন্দ্রা এই ব্যাপারে ভীষণ সাবধানী। ওর সব চিন্তা মুন কে নিয়ে।

“এই টুকু মেয়ের যদি কোভিড হয়, তাহলে আর দেখতে হবে না’’, এমনিতেই আমার অফিস যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ওর বিরক্তির শেষ নেই।

গজগজ করে বলেই ফেলল কথা গুলো, “সরকারি অফিসে যদি ফিফটি পারসেন্ট হাজিরার নির্দেশ থাকে, তোমাকে তাহলে রোজ কেন বেরোতে হয়? এই যে বাধিয়ে বসলে, এখন তো ভুগতে হবে আমাকেই। তাছাড়া, এত দিনের পরিকল্পনা, সব ভেস্তে গেল, এত গুলো টাকা জলে গেল।“

চন্দ্রাকে বোঝানো মুশকিল যে সরকারি অফিসে কাজের চাপ অন্যান্য কর্পোরেট অফিসের থেকে কোনও অংশে কম নয়। আমাদেরও নিয়ম মেনে অফিস করতে হয়। প্রচলিত ধারণার মতো ‘বারোটায় অফিস আসি, দুটোয় টিফিন…’এর দিন এখন পাল্টে গেছে।

তবে এটা সত্যি যে দু-বছর কোথাও বেড়াতে যেতে পারিনি। বন্দি দশায় থেকে থেকে হাফিয়ে উঠেছে চন্দ্রা। মাস ছয়েক আগে দার্জিলিং যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ায় ভেস্তে গেছে সব। এবার একেবারে টিকিট কেটে প্রস্তুত ছিলাম। ছ-দিনে গোয়া দিব্য ঘোরা হয়ে যেত। কিন্তু সময় খারাপ হলে যা হয়; আগামী কাল বেরোনোর কথা ছিল আমাদের আর এদিকে সব কিছু নেগেটিভ করে আমি পজিটিভ হয়ে বসলাম। হোটেল বুকিং এর কিছু টাকা অবশ্য ফেরত পাব। কিন্তু এয়ারলাইন্সের অবস্থা আমার থেকেও করুণ। টিকিট পিছু হাজার খানেক ফেরত দিয়েই হাত ধুয়ে ফেলল। ভাগ্য বা নিয়তি তে আমার খুব কিছু বিশ্বাস নেই কিন্তু কোথাও বোধহয় কিছু একটা চলছে এই সপ্তাহ জুড়ে যা আমার মানসিক শক্তির ভিত কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে। একটা বিষয় নিয়ে তো বেশ চিন্তায় আছি, চন্দ্রার সঙ্গেও আলোচনা করিনি। দেখি কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় শেষ অবধি।

চন্দ্রার গাছপালার খুব সখ। বাড়ির সামনের একফালি জমিতে নানান রকমের বাহারি ফুলের গাছে ফুল ফুটিয়েছে একার কৃতিত্বে। ডায়ান্থাস, গ্ল্যাডিওলাস, কসমস, ক্যালেন্ডুলা, চন্দ্রমল্লিকা, ইনকা থেকে ডালিয়া কি নেই সেই সখের বাগানে। আমার যদিও গাছের পিছনে শ্রম দেওয়ার মত ধৈর্য বা উৎসাহ কোনটাই নেই। তবে ফরমায়েশ মতো গাছ এনে দেওয়ার কাজটা করে দিই বিপুল নার্সারি থেকে। সপ্তাহ দুয়েক আগে যখন কিছু গাছের চারা আনতে গিয়েছিলাম। বিপুল একটা ছোট্ট বাহারি বাম্বু প্ল্যান্ট দিয়ে বলেছিল, “স্যার, বৌদি কে বলবেন, এটা আমি গিফট দিলাম। একে বলে লাকি বাম্বু, ঘরে রাখা ভালো।“

ইতস্তত করে বললাম, “আরে ভাই, এর তো নয় নয় করেও শ-দুয়েক দাম হবে, তুমি না হয় কিছু নাও।“

বলা বাহুল্য, বিপুল পয়সা নিতে রাজি হল না। “গিফটের আবার দাম নেওয়া যায় নাকি?” জিভ কেটে বলেছিল বিপুল।

ওর থেকে সব সময় গাছ নেয় চন্দ্রা। অনেক দিনের পরিচিতি। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ এখনো ছোট ছোট সম্পর্কের দাম দিতে ভোলেনি দেখে ভালো লাগল। চন্দ্রার আবার এসব ব্যাপারে একটু দুর্বলতা আছে। শুধুই দৃষ্টিনন্দন তো নয়, সঙ্গে লাক জড়িয়ে আছে। ও ছোট্ট কাচের টবে অল্প জলে বসানো গাছটা যত্ন করে বসার ঘরের শো- কেসের ওপর সাজিয়ে রেখেছে। সে যাই হোক, লাকি গাছের কোনও দায় পড়েনি আমার ভাগ্য দেবীকে প্রসন্ন করার। সোমবার হোলি মেরি স্কুলের যে লটারির ফল বেরিয়েছে, তাতে মুনের নাম ওঠে নি। এই আশঙ্কা ছিলই, তাই ঝুঁকি না নিয়ে আরও দুটো স্কুলে ফর্ম জমা করে রেখেছি। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ যে নানাবিধ আশঙ্কা নিয়ে বাঁচে, আমি তার ব্যতিক্রম হই কি করে। দ্বিতীয় স্কুলেও যদি শিকে না ছেড়ে তো তৃতীয় তে হবেই হবে, এই ভরসায় আছি আপাতত। সোম- মঙ্গল দুটো দিন বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে আনচান করতে করতেই বুধবার তেরে জ্বর এলো। শুক্রবার গোয়ার ফ্লাইট ছিল কোলকাতা থেকে। মাঠে মারা গেল সব পরিকল্পনা।

সেই দিক থেকে দেখলে, লাকি বাম্বু ঘরে আসার পর থেকে কিছুই ভালো হয়নি আমার সাথে। যেটুকু জানি, বাস্তুশাস্ত্র মতে এই গাছ নাকি সৌভাগ্য নিয়ে আসে। ফেংসুই মতেও একই বিশ্বাস প্রচলিত। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে চন্দ্রা বেশ মুষড়ে পড়েছে। সকালের দিকে দুজনে দুই ঘরে বসে চা খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। লাকি বাম্বুর কথা উঠতেই বলল, “তোমার পাথর চাপা কপাল থেকে ভারি পাথর সরায়, সেই সাধ্যি কার! বেচারা বাম্বু প্ল্যান্টের আর কি দোষ।“ মুনকে অনেক করে বোঝানো হয়েছে আমার কাছে না আসতে, দুই ঘরের মাঝের দরজা খোলাই রাখা আছে, কথা বললে দিব্যি শোনা যায়। কটা দিন এই ভাবে চালিয়ে নিতে পারলেই হয়।

গত কাল রাত থেকে এক নতুন সমস্যায় পড়েছি। আমার ঘরের টিভি টা চলতে চলতে হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সাউন্ড আসছে কিন্তু ছবি আসছে না। নিজেকে বোঝালাম, এটা হতেই পারে, একটা চিপ গেছে নিশ্চিত। সমস্যা এই যে ঘরে বসে থাকতে হবে কিন্তু টিভি দেখতে পারব না। চন্দ্রা বলল, “খুব অসুবিধা হলে সার্ভিস সেন্টারে কল বুক করে দাও।“

ইতস্তত করে বললাম, “কল বুক তো করতেই হবে। কিন্তু আমি নিজে যেখানে করোনা পজিটিভ, সেখানে একজন বাইরের মানুষ কাজ করতে এলে তিনিও আক্রান্ত হবেন। আইসোলেশান এর সময়টা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিভি বন্ধ থাক।“

ভাবলাম, এই তো কটা দিন, বই-ঠই নাড়াচাড়া করতে করতেই কেটে যাবে। কিন্তু টিভি খারাপ হওয়ার পর থেকে আমার মাথায় আরও বেশি করে চেপে বসেছে ওই লাকি প্ল্যান্টের ব্যাপারটা। বারবার মনে হচ্ছে, ওই গাছটি আনার পর থেকেই যত সব গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। পর পর সাজালে, স্কুলের লটারিতে মুনের নাম না ওঠা, আমার কোভিড আক্রান্ত হওয়া আর তার ফল স্বরূপ ভেস্তে যাওয়া ভ্রমণ সূচি, সঙ্গে গচ্চা যাওয়া হার্ড আরন্ড মানি, সব শেষে টিভি খারাপ। সত্যি কথা বলতে কি, আমার ভাগ্য চক্র বা রাশি-লগ্ন নিয়ে কোনদিনই তেমন বিশ্বাস ছিল না। আমার বাবা বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন, আমিও খানিকটা তাই। বিয়ের সময় চন্দ্রাদের বাড়ি থেকে চাইলেও, আমার মা বাবা কোন মতেই জন্ম ছক মেলাতে রাজি হননি। চন্দ্রা আবার কিছুটা হলেও মেনে চলে গ্রহ নক্ষত্র, আচার বিচার তবে এই নিয়ে আমার সাথে ওর কোন সংঘাত নেই। কিন্তু এই লাকি প্ল্যান্টের ব্যাপারে আমার ভাবনাটা চন্দ্রার সঙ্গে শেয়ার করব ঠিক করেছি, যদিও যুক্তির বিচারে এই সব ভাবনা ধোপে টেকে না জানি।

লটারিতে নাম না উঠতেই পারে। এত লোকের করোনা হয়েছে, আমার হওয়াটাও বিচিত্র কিছু নয়। পজিটিভ হলে বাইরে যাওয়া যাবে না সেটাও স্বাভাবিক। আর টিভি খারাপ হওয়ার মধ্যেও অস্বাভাবিক কিছু নেই। ইলেক্ট্রনিক্স জিনিস যে কোন সময় বিগড়ে যেতে পারে। সব জানি, বুঝি কিন্তু মন থেকে কিছুতেই যেন ঝেড়ে ফেলতে পারছি না ব্যাপারটা। রাতের দিকে চন্দ্রাকে বলেই ফেললাম কথাটা, “ওই লাকি ট্রি না কি, ওটা কে ঘর থেকে বের করে বাগানে রেখে দিতে হবে। কিছু না হলে, বারান্দায়।“

চন্দ্রা রে রে করে উঠল, “ব্যাক ডেটেড লোকের মতো শোনাচ্ছে কথা গুলো। এই সব হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। তুমি তো এসব বিশ্বাস করতে না, আসলে আইডেল ব্রেন ইস ডেভিল’স ওয়ার্কশপ।“

যারপরনাই রেগে গিয়ে দু চার কথা শুনিয়ে দিলাম আমিও। এক প্রস্থ কথা কাটাকাটি হয়ে গেল দুজনের। খেয়াল করলাম, একটানা বেশি কথা বললে, একটু হলেও হাফ ধরছে। বুঝলাম, ভাইরাল লোড নয় নয় করেও আছে কিছুটা। জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম, আইসোলেশান শেষ করে যেদিন বেরবো, সেদিনই ওই গাছ ঘর থেকে বের করে বারান্দায় চালান করব। আর মাত্র তিনটে দিনের ব্যাপার, দেখি আর কি কি খারাপ হয় এই তিন দিনে।  

আইসোলেশান কাটিয়ে আজ দুদিন হল অফিস করছি। ঘরে চুপচাপ বসে সময় কাটানো যে কি বিষম ব্যাপার সেটা বুঝেছি ভালো করে। না, যেমন আশঙ্কা করেছিলাম তেমন খারাপ কিছু আর হয়নি তিন দিনের মধ্যে। উল্টে যা কিছু হয়েছে সেটাকে ভালো না বলে পারি না।

গত কাল দ্বিতীয় স্কুলের লটারিতে মুনের নাম টা এসেছে। নিশ্চিন্ত হয়েছি বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিকে ভালোই হয়েছে হোলি মেরিতে না হয়ে, বাড়ি থেকে অনেকটাই দূর হত সেই স্কুল। আর দুদিন আগে অফিসে যে ট্রান্সফার অর্ডার বেরিয়েছে তাতে আমার নাম নেই দেখলাম। অর্ডার বেরোনোর সাথে সাথেই খবরটা পেয়ে গিয়েছি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। আসলে এটা নিয়ে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলাম। শুনেছিলাম আমার ট্রান্সফার হতে পারে জলপাইগুড়ি বা কুচবিহারে। ওদিকে বড় দু-একটা প্রকল্পে অফিসারের ঘাটতি আছে। ভয় ছিল, গোয়া থেকে ফিরেই হয়তো ছুটতে হবে নতুন জায়গায়। সেক্ষেত্রে চন্দ্রা খুব সমস্যায় পড়ত। সম্ভাব্য ট্র্যান্সফার নিয়ে ওকে কিছু বলিওনি আগে থেকে। হেড অফিসে যে সব অফিসারদের নাম নিয়ে চর্চা চলছিল, তাতে আমার নাম ছিল বলেই আমি জানতাম। নিজের মধ্যেই রেখেছিলাম ব্যাপারটা। অযথা চন্দ্রাকে টেনশনে রাখা ঠিক হবে না ভেবেই কিছু বলিনি ওকে। শেষ পর্যন্ত যে অত দূরে অর্ডার হয়নি সেটাই আমার কাছে বিরাট পাওনা। আর হ্যাঁ, লাকি বাম্বু কে আর ঘর থেকে বের করা হয়নি। সকালে বেরোনোর সময় পুরনো জল পাল্টে আধ গ্লাস জল ঢেলে এসেছি কাচের টবে। ঝিরিঝিরি পাতা গুলো ডালপালা সমেত বেশ পুরুষ্টু হয়ে উঠেছে দেখলাম। 

 

লেখক: অতিরিক্ত জেলাশাসক, পশ্চিম মেদিনীপুর।                                                                                                                       

Mailing List