রাজকুমারীর সম্মান না রাখতে পেরে জলে বাস, ‘সমুদ্র মানব’ বাজাও সম্প্রদায় কেমন আছে?

রাজকুমারীর সম্মান না রাখতে পেরে জলে বাস, ‘সমুদ্র মানব’ বাজাও সম্প্রদায় কেমন আছে?
15 Aug 2021, 11:00 PM

রাজকুমারীর সম্মান না রাখতে পেরে জলে বাস, ‘সমুদ্র মানব’ বাজাও সম্প্রদায় কেমন আছে?

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, মানুষের কাজকর্ম, ভাস্কর্য রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

জলে জন্ম। জলে বেড়ে ওঠা। জলেই জীবন ধারণ। জলেই মৃত্যু। মালয় দ্বীপ পুঞ্জের "সমুদ্র মানব" হিসেবে খ্যাত  "বাজাও" গোত্রের মানুষের একমাত্র পেশা সমুদ্রে মাছ শিকার।

 

নৌকার ওপরে অথবা উপকূলের অগভীর অঞ্চলে মাচাঘর বানিয়ে থাকা মানুষগুলো আধুনিক জীবন সম্বন্ধে জানেই না। এখনো বর্তমান পৃথিবী থেকে হাজার বছর পিছিয়ে আছে এই জাতি। এরা লেখাপড়া তো দূরের কথা, নিজেদের বয়সের হিসাব বা দিন তারিখ সম্পর্কে জানাটাও অপ্রয়োজনীয় মনে করে।

 

ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন্স এবং বোর্নিওর মতো একাধিক দেশ রয়েছে।

      

এই দেশ গুলোর অধিকাংশই হয় কোনো একক দ্বীপ রাষ্ট্র নয়তো এক বা একাধিক দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত। স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলের মানুষ জীবন জীবিকার ব্যাপারে সমুদ্রের উপর বেশী মাত্রায় নির্ভরশীল। তবে সমুদ্রের উপর নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে অন্য যে কাউকে ছাপিয়ে যাবে "বাজাও"নামে একটি গোত্র।

সমুদ্রে থাকার কারণ হিসেবে প্রচলিত লোকগাথা:

          

এই গোত্রের প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী অনেক অনেক বছর আগে বর্তমান মালয়েশিয়ার অন্তর্ভুক্ত এক রাজ্যের রাজকুমারীর সাথে ইন্দোনেশীয় আজ যুবরাজের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সেই উদ্দেশ্যে এই রাজকুমারী তার দেহরক্ষী সহ বিশাল নৌবহরে করে যুবরাজের দেশে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বোর্নিও রাজা অপরূপ সেই সুন্দরী রাজকুমারী কে অপহরণ করে নিয়ে নিজ রাজ্যে যান। সেখানে  আইনি পদ্ধতিতে রাজকুমারী কে বিয়ে করে কার্যত তাকে বন্দি করে রাখেন।

        

রাজকুমারীর সম্মান রক্ষার ব্যর্থতার গ্লানি এবং রাজার ক্রোধের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে নৌবহরের বাকি আরোহীরা সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই মানুষগুলোর বংশধররাই বর্তমানে "বাজাও" নামে পরিচিত।

 

গবেষক, প্রত্নতাত্বিক ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান ফিলিপাইনের জাম্বুয়াঙ্গা উপদ্বীপের প্রাচীন বাসিন্দা ছিলো বাজাও-রা। ষষ্ঠ ও সপ্তম  শতকে বর্তমান মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়া ভারত শাসনের প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অষ্টম শতাব্দীতে ভারতীয় রাজাদের সেনারা এসব এলাকায় অভিযান চালালে জাম্বুয়াঙ্গা উপদ্বীপের বাসিন্দারা পালিয়ে গিয়ে খোলা সমুদ্রেই আশ্রয় খুঁজে নেয়।

মাছ শিকারের পদ্ধতি:

 

 আগেই বলেছি বাজাও সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় মাছ শিকার। তবে তাদের মাছ শিকার পদ্ধতি অভিনব।বাজাওরা জলে ডুব দিয়ে জলের নীচে হেঁটে হেঁটে মাছ শিকার করে। শুধু শুনতে অবাক লাগা নয়, জলের নীচে  হেঁটে বেড়ানো টাও সহজ ব্যাপার নয়। কারণ জল মানুষ কে কিছুটা ঠেলে উপরে তুলে দেয়।তাই জলের নীচে হাঁটার জন্য ডুবুরিরা রাবারের তৈরি ফ্লিপার ব্যবহার করেন। বাজাওরা কিন্তু কাঠের ফ্লিপার ব্যবহার করেন এবং এটি এরা নিজ হাতেই তৈরি করে।

 

মাছ শিকারের সময় এরা নৌকা থেকে বর্শা হাতে জলে ঝাঁপ দেয়।শিকারের উপযুক্ত মাছ পেলে সুনিপুন হাতে মাছকে বর্শায় গাঁথে এবং ভেসে উঠে নৌকায় ফিরে আসে।

প্রত্যেক শিশু শৈশব থেকেই তার পিতার কাছ থেকে এই দক্ষতা রপ্ত করতে থাকে।

অনন্য উচ্চতার ফ্রি ডাইভিং:

 

           

অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই গভীর জলে ডুব দেওয়া কে ফ্রি ডাইভিং বলে। কিন্তু বাজাওরা এই ফ্রি ডাইভিং কে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

 

সাধারণ মানুষ যেখানে জলের নীচে কয়েক সেকেন্ডের বেশী থাকতে পারে না। প্রশিক্ষিত ডুবুরিরা যেখানে ২ থেকে ৩ মিনিট জলের নীচে থাকতে পারেন, সেখানে বাজাও-রা থাকে গড়ে ৮ থেকে ১৩ মিনিট। অর্থাৎ অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই ৮ থেকে ১৩ মিনিট জলের নীচে ডুবে হেঁটে হেঁটে মাছ ধরে। বাজাও শিকারীরা ডুব দিয়ে অনায়াসে ৬৫ ফুট জলের গভীরে চলে যেতে পারেন। তবে এদের অনেকেরই ডুব দিয়ে ২৩০ ফুট জলের নীচে চলে যাওয়ারও রেকর্ড আছে।

 

বাজাওরা জোড় বেঁধে মাছ শিকার করতে ডুব দেয়। কারন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কেও কেও অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ ও অচেতন হয়ে পড়তে পারেন আবার জলজ প্রাণী আক্রমণ করলেও একে অপরকে সাহায্য করে।

 

দিনে একবার দুবার নয়, এভাবেই এরা সারাদিনে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা জলের নীচে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে কাটিয়ে দেয়। আর এভাবেই কেটে যায় সারাটা জীবন।

 

     

বিবর্তন:

         

বিবর্তনের সূত্র অনুযায়ী কোন এলাকার পরিবেশ সেখানকার শুধু মানুষ নয়, সমস্ত প্রানীজগতের উপরই নানান বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটায়।এবং তারা সেভাবেই পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হয়।গবেষক দের মতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফ্রি ডাইভিং এর মাধ্যমে মাছ শিকার করার কারণে বাজাও সম্প্রদায়ের মানুষদের প্লীহার আকৃতি সাধারণ মানুষের প্লীহার তুলনায় যথেষ্ট বড়ো হয়।মানবদেহের লসিকাতন্ত্র ও রক্ত সংবহন তন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হোলো প্লীহা, যা হিমোগ্লোবিন বহন করে।আর হিমোগ্লোবিনে থাকে অক্সিজেন। প্লীহার আকৃতি বড়ো হওয়ায় এদের হিমোগ্লোবিনে অক্সিজেনের পরিমান বেশী, ফলে অতিরিক্ত সময় জলের তলায় কাটাতে এদের কোনো সমস্যা হয় না। জলের নীচে দেখার জন্য চোখের ক্ষমতাও সাধারণ মানুষদের তুলনায় এদের অনেক বেশী।

 

ঘরবাড়ি :

 

       

পূর্বে নৌকায় বসবাস করলেও যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাজাও সম্প্রদায়ের মানুষরাও ধীরে ধীরে স্থলভাগের দিকে ফিরছে। তবে তারা পুরোপুরি স্থলবাসী না হয়ে উপকূলের কাছে জলের উপরেই বাঁশ বা কাঠের ভিত্তির উপর কুঁড়েঘর তৈরী করে বসবাস করছে।এভাবে ২০/২৫ টি কুঁড়েঘরের মাধ্যমে তৈরী হচ্ছে এক একটি গ্রাম। তবে এর সমতল ভূমির থেকে জলে থাকতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শুধুমাত্র খাবার জন্য মিষ্টি জল, নৌকা বানানোর কাজ, জ্বালানির প্রয়োজনে কাছাকাছি কোনও জনবসতিতে যাতায়াত করে, তাও খুব অল্প সময়ের জন্য।

       

এরা যে ঘর গুলিতে থাকে সেখানে বিদ্যুৎ বা আধুনিক সুযোগ সুবিধা কিছুই থাকে না।আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে নানান সুযোগ সুবিধার কথা না জানলেও সমুদ্র এবং সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে এদের জ্ঞান কিন্তু অনেক বেশী।

 

প্রযুক্তি ও আধুনিকতার আগ্রাসনে বাজাও দের জীবিকা আজ সংকটের মুখে। অন্যান্য মাছ শিকারীরা যন্ত্রচালিত ট্রলার ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করায় বাজাওরা তাদের নিজেদের পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারছে না। অবিলম্বে যদি বাজাওদের পুনর্বাসন করা না হয় আর বাজাও দের মাছ শিকার অঞ্চলে অন্যান্য দের বাণিজ্যিক ভাবে মাছ শিকার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে দেড় হাজার বছর ধরে টিকে থাকা 'সমুদ্র মানব' এই বাজাও সম্প্রদায়।

 

লেখক: ভূগোলের শিক্ষিকা

ads

Mailing List