লক্ষ্মীর ভান্ডার, জঙ্গলমহল ও আদিবাসী সমাজ

লক্ষ্মীর ভান্ডার, জঙ্গলমহল ও আদিবাসী সমাজ
24 Jul 2022, 02:30 PM

লক্ষ্মীর ভান্ডার, জঙ্গলমহল ও আদিবাসী সমাজ

প্রভাত কুমার শীট

 

রামগড়, লালগড়, নিতাই কিংবা ভীমপুর এর নাম শুনলে গোটাতল্লাট এক সময় ভয়ে চমকে উঠতো। পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার জঙ্গল ঘেরা গাঁ গুলি ছিল মাওবাদী অধ্যুষিত। কথায় কথায় বোমা-গুলি চলত। উত্তপ্ত হয়ে উঠত হঠাৎ করে। মানুষ দিন কাটত আতঙ্কে। কিন্তু সরকারের পরিবর্তনের কারণে সেই কর্মকাণ্ড স্থগিত হয়ে গিয়েছে। নির্ভয়ে গ্রামের মানুষ বসবাস করছে।

 

জঙ্গলের শুকনো কাঠ সংগ্রহ, চাষবাস ও দিনমজুরি মোটামুটিভাবে এখানকার সাধারণ মানুষের পেশা। বেলা গড়িয়ে দুটো ছুঁই ছুঁই।  ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম এর বাসিন্দা বছর তিপান্নর বালকি হেমব্রম। ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে বসে আছে চালের অভাবে। স্বামী শুকনো জ্বালানি কাঠ বেচে, চাল ও বাজার নিয়ে এলে তবেই  রান্না চড়়বে। শুধু বালকি হেমব্রম নয়, সমগ্র জঙ্গলমহলের দরিদ্রতা ও অর্থনৈতিক চিত্র ছিল একটা সময়। কিন্তু তা আজ আর নেই, কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে  সরকার তাদের ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি মেনে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প চালু করেছে। বিপন্ন দরিদ্র, মহিলা, ভূমিহীন, দলিত আদিবাসী সমাজের কাছে লক্ষীর ভান্ডার এর ব্যাপ্তি ও প্রভাবের দিক থেকে দেখলে প্রকল্পটির গুরুত্ব অপরিসীম।

 

করোনা অতিমারি ও লকডাউনের জেরে অধিকাংশ পরিবারের আয় সংকোচন হয়েছে। ভূমিহীন, দলিত আদিবাসীরা সরকারি অনুদান - বিনে পয়সায় রেশন ও ভাতা উপর ভরসা করে টিকে আছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার এর প্রকল্প সামাজিক উন্নয়নের একটি বড় পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে। তপশিলি জাতি ও আদিবাসী মহিলাদের নিজেদের  রোজগার নেই অথচ হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হয়। তাদের কাছেই ৫০০ বা ১০০০ টাকা মূল্য যে অসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটু ভালোভাবে অনুধাবন করলে সহজে বোঝা যাবে।

শতকের পর শতক জঙ্গলঘেরা গাঁ গুলির পরিবারের আয় ও জীবিকা বনের ওপর নির্ভর করে চলে এসেছে। কখনো কখনো সরকারি নিয়মের গেরোতে তা বন্ধ হচ্ছে। তাছাড়া লকডাউন এর জেরে শুকনো জ্বালানি কাঠ ও বনজ দ্রব্যের বিক্রিবাটা নেই বললেই চলে। এই শ্রেনীর মানুষের সংসার চালাতে খুব দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সরকারি অনুদান না থাকলে হয়তো অনেকে না খেতে খেয়ে পেয়ে মারা যেত!  লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে টাকা পেয়ে তারা সংসার চালাতে সক্ষম হয়েছে।

ঠিক কয়েক বছর আগের ঘটনা, রেশনের চালে ভাত ফুটিয়ে বসে ছিল সর্ম্বরী মুর্মু (বয়স ৫৫)। ঝাড়গ্রাম জেলার কলমাপুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। কাঠের উনুনে লোহার কড়াই এ শাক চাপিয়ে এক ছিপি সরসে তেল ধার করতে গিয়েছিল পাশের বাড়ির জা এর কাছে । এসে দেখে পুড়ে গেছে। কিন্তু এখন লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢোকায়, পাড়ার মুদি দোকানও সদা বাজার ধার দিতে সম্মত হয়েছে। শুধু সংসারের খরচ নয়, উন্নয়নশীল দেশে নারীদের হাতে টাকা কল্যাণমূলক কাজে খরচ করে ও নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ এই অনুদান নগদ টাকা দেওয়ার বিরোধিতা করছে ও করবে। যেখানে শিল্প এর বিকাশ নেই, পর্যাপ্ত পরিমাণে চাকরি নেই, পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। শুধু ফ্রিতে মাসে মাসে টাকা দিচ্ছে - এই যুক্তি দেখিয়ে তারা সরকারকে দোষারোপ করেই চলেছে। কিন্তু দরিদ্র, ভূমিহীন, দলিত আদিবাসী শ্রেণী মানুষেরা দিনের পর দিন পিছিয়ে থাকবে তা হতে পারে না। তাদের উন্নয়নেও সরকারের ভূমিকা আছে। এই মানুষগুলোকে শুধু উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করছে। যাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে, নুন্যতম চাহিদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলেছে, তাঁদের সাহায্য করা অন্যায় নয়। 

সমীক্ষা ও গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে। মহিলাদের হাতে খরচ করার ক্ষমতা থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর বাড়ে। নারীদেরও সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি গবেষণার কাজে জঙ্গলমহলের জেলাগুলির শতাধিক গ্রামে ৬০০ পরিবারের ওপর ক্ষেত্র সমীক্ষা করা হয়েছিল। তাতে উঠে এসেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। প্রায় ৪৩ শতাংশ  প্রান্তিক দরিদ্র ও অরণ্যবাসী পরিবার লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা কাজে লাগিয়ে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করছে। কেউ কৃষিকাজে বা লোন পরিশোধ করছে অথবা গ্যাস ভর্তিতে বা ছেলে মেয়েকে প্রাইভেট টিউশন দিচ্ছে ওই টাকায়। যেমন নমিতা মাঝি, বয়স ৫০, কঙ্কাবতীর বাসিন্দা (পশ্চিম মেদিনীপুর)। লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা মেয়ের নামে জমা দিচ্ছে স্থানীয় পোস্ট অফিসে। রিনা সিং, বয়স ৪৯, (শালডাঁগা, পশ্চিম মেদিনীপুর) লক্ষীর ভান্ডার এর টাকায় মেয়েকে প্রাইভেট টিউশন পড়াচ্ছে।  

আবার সোনিয়া টুডু, ৫৬ বছর বয়স, তালদি গ্রামের (ঝাড়গ্রাম জেলা) বাসিন্দা। লক্ষীর ভান্ডারের টাকা মুরগি পালনে খরচ করছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার সমাজের উন্নয়নের কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনে কিছুটা হলেও স্বচ্ছন্দ ফিরছে। প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবার বয়সের নিয়মে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে তপশিলি আদিবাসী মেয়েরা। যাঁদের  অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। তাঁরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যেমন- বাবলি শবর। বয়স ২২। ভূমিজ সম্প্রদায়।   ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর ১ ব্লকের ধানশোল গ্রামের বাসিন্দা অথবা আলপনা সিং, বয়স ২০, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনি ব্লকের বেতকুন্দ্রী গ্রামের বাসিন্দা। বয়স না হওয়ার লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছে না। ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোনও বয়সের উল্লেখ ছিল না। শুধু বাংলার প্রত্যেক পরিবারের ন্যূনতম মাসিক আয় সুনিশ্চিত করার জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প  ১.৬ কোটি যোগ্য পরিবারের কর্ত্রীকে মাসিক আর্থিক সহয়তা করার কথা উল্লেখ ছিল।

লক্ষ্মীর ভান্ডার একটি জন উন্নয়ন মূলক প্রকল্প যা সমাজের অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে তুলে আনতে সক্ষম হবে। প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি আয়োগ (২০২১) এর হিসেব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের বহুমাত্রিক দরিদ্রতা সূচক মান ২১.৪৩ শতাংশ। জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে দারিদ্র্যতার মান অনেক বেশী। সকলের  ঘরে লক্ষ্মীর ভান্ডার পৌঁছালে পরিবারের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই কারও। এর ফলে রাজ্যের বার্ষিক জিডিপি এর হারও বাড়বে যা রাজ্য দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই, এই লক্ষ্মী ভান্ডার যাতে দ্রুততার সহিত সকলের ঘরে ঘরে যাতে পৌঁছায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া উচিত। যে সমস্ত আদিবাসী মহিলাদের দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে তাদের সকলের লক্ষ্মী ভান্ডারের ব্যবস্থা করা। লক্ষ্মী ভান্ডার সকলকে না দিয়ে, যাদের প্রয়োজন আছে সেই ভাবে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করে বন্টন করা।  এটি  নারীদের স্বক্ষমতায়ন সুযোগ ও সামাজিক মানব উন্নয়ন মূলক গঠনে সহায়তা করবে ও দেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্নিত করবে অদূর ভবিষ্যতে।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহা বিদ্যালয়।

Mailing List