‘কুরকুট’ মানে পিঁপড়ের ডিম, এখন আর অনাহারে নয়, আহারেও উপাদেয়, রয়েছে ভেষজ গুণ

‘কুরকুট’ মানে পিঁপড়ের ডিম, এখন আর অনাহারে নয়, আহারেও উপাদেয়, রয়েছে ভেষজ গুণ
23 Sep 2022, 09:30 AM

‘কুরকুট’ মানে পিঁপড়ের ডিম, এখন আর অনাহারে নয়, আহারেও উপাদেয়, রয়েছে ভেষজ গুণ

 

রমেশ মাহাত

 

‘‘কুরকুট" নামটি বোধহয় অনেকের প্রথম শোনা। কিন্তু জঙ্গলমহলে এটি অতি পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম - Oecophylla Saradina।

 'কুরকুট' হল - এক ধরনের বড়ো লাল পিঁপড়ে। এদের গায়ের রং ঈষৎ লাল বর্ণের। এরা অত্যন্ত দ্রুতগামী। খুব তাড়াতাড়ি স্থান পরিবর্তন করতে পারে। কেউ বিরক্ত করলে এরা এক জোট বেঁধে ছুটে এসে আক্রমণ করে। এদের কামড় প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক। যেখানে কামড় দেয়, সেই অংশটি লাল হয়ে ফুলে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ জ্বালা করতে থাকে। সুতরাং 'কুরকুট' এর আদর থেকে সাবধান।

জঙ্গল মহলের বনাঞ্চলে দেখা যায় কুরকুট। সাধারণত, শাল গাছের মগডালে এদের বসবাস। চ‌ওড়া পাতাবহুল গাছের ডালে মুখের লালা দিয়ে তিন-চারটে পাতা মুড়ে চমৎকার থলির মত মজবুত বাসা বাঁধে। শীত এবং বর্ষার শুরুতে সাদা চালের মত অসংখ্য ডিম পাড়ে বাসায়। পাকা ফল, ফুলের রস, মৃত উইপোকা-কীটপতঙ্গের শারীরিক রস খায় এরা।

অনেকের কাছেই নামটি প্রথম শোনা হলেও,  নামে-এ কি আসে যায়। স্বাদ নিতে দোষ কোথায়? শাল পাতার মোড়কে, কুরকুটের সঙ্গে পুদিনা পাতার রস মিশিয়ে আগুনে পুড়িয়ে, কাঁচা লঙ্কার সাথে কাঁচা সরষের তেলের মিশ্রণে- চাটনি। আহা! জিভে জল আসে। প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় প্রয়োজন মতো নুন মিশিয়ে এক চামচ মন্দ নয়। আর এর ঔষধি গুনাগুন দারুণ কার্যকরী। জঙ্গলমহলে এর জনপ্রিয়তা দারুণ। চলে আসুন, কোন এক শীতের সকালে জঙ্গলমহলে। কুরকুটের চাটনির স্বাদ নিতে। কিন্তু স্বাদ যেমন অতুলনীয়, তেমনই দেখা পাওয়া মূলত দুর্লভ।

অন্যান্য পিঁপড়ের মতো‌ই কুরকুট স্বাদে অত্যন্ত টক। জঙ্গলমহলে শীতে কুরকুট চাটনি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভিটামিন সি এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কুরকুট শীতের সর্দি কাশি, নাকে জল পড়া (Acute coryza) শিশুদের হুপিং কাশিতে বহুল ব্যবহৃত হয়। শবর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, শীতে নিয়মিত কুরকুটের ঝোল খেলে শীতকে জয় করা যায়।

শীতকালে জঙ্গলমহলের প্রায় সমস্ত হাটেই কুরকুট কিনতে পাওয়া যায়। স্থানীয় দাম প্রতি কেজি ২০০ -২৫০ টাকা। দুর্গাপুর, আসানসোল, রানীগঞ্জ, বারাসত আড়তে পাঠানো হয়। ওখানে প্রতি কেজি ৪৫০-৬০০ টাকার মধ্যে বেচাকেনা হয়। মূলত মাছ ও পাখির খাদ্য হিসেবে চাহিদা ব্যাপক রয়েছে।

জঙ্গলমহলের আদিম আদিবাসীরা জঙ্গল থেকে "কুরকুট " সংগ্রহ করে হাটে বেচে অর্থ উর্পাজন করে। বেশিরভাগ আদিবাসীরা  কুরকুট খায় বলে শহরের বাবুরা হাসিঠাট্টা করেন। কেউ কেউ আবার জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের দারিদ্র্যতার সুযোগে "জঙ্গলমহলের মানুষ পিঁপড়ের ডিম খেয়ে জীবন যাপন করে" বলে বিস্ময় প্রকাশ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু জঙ্গলমহলে কুরকুটের অর্থকরী দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন‌ও পুঁজি নয়, বনজসম্পদ হিসেবে অতি সহজে জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে হাট বা বাজারে বিক্রি করা যায়। রাজনীতি অথবা ব্যঙ্গ বিদ্রুপের গণ্ডি ছাড়িয়ে "কুরকুট" এখন জঙ্গল মহলে অতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রশাসন একটু নজর দিলে হয়তো বাণিজ্যিক ভাবে হুল ফোটাতে পারে 'কুরকুট' এর কামড়।

লেখক: শিক্ষক।

Mailing List