কুলডিহা দুই: ঝিল, বন্যপ্রাণী আর অরণ্যের শোভায় নির্বিঘ্নে কাটানো যায় জোড়াচুয়ায়

কুলডিহা দুই: ঝিল, বন্যপ্রাণী আর অরণ্যের শোভায় নির্বিঘ্নে কাটানো যায় জোড়াচুয়ায়
22 Sep 2022, 09:15 AM

কুলডিহা দুই: ঝিল, বন্যপ্রাণী আর অরণ্যের শোভায় নির্বিঘ্নে কাটানো যায় জোড়াচুয়ায়

 

ড: গৌতম সরকার

 

 কুলডিহায় নির্দিষ্ট দুটো দিন শেষ হল। আজ আমরা যাবো এখান থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে জোড়াচুয়ায়। কি আছে জানিনা, তবে জায়গাটির নামে আমরা আকৃষ্ট হয়েছি। পরিবেশ-প্রকৃতি একই হবে সন্দেহ নেই তবে জঙ্গলের মধ্যে আরেকটা নতুন জায়গায় কয়েকটা দিন থাকা আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরো কিন্তু মনিমুক্তোর সন্ধান দেবে আশা করি। আর আমরা এবার ছটি ছেলে এসেছি, ফলে জায়গা, থাকা-খাওয়া ইত্যাদির ব্যাপারে খুব কিছু ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন ঘটেনি। জলখাবার সেরে আমরা এগিয়ে চললাম জোড়াচুয়ার দিকে। গতকাল থেকে একটি অল্পবয়সী ছেলে গাড়ি চালিয়ে আমাদের আশপাশ ঘোরাচ্ছে। ছেলেটির নাম তপন, চাঁদিপুরে বাড়ি, বনদপ্তরের অস্থায়ী কর্মী। অদূর ভবিষ্যতে চাকরি পাকা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবু এখানে পড়ে আছে যদি কিছু হয় সেই আশায়। বাড়িতে অসুস্থ বাবা, অবিবাহিত বোন, তাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরই পড়া ছেড়ে রোজগারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তপনকে পেয়ে আমাদের খুব সুবিধা হয়েছে, ও বেশ কিছুদিন এই জঙ্গলে গাড়ি চালাচ্ছে, তাই এই জঙ্গলকে নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। নতুন ড্রাইভারের পক্ষে রাস্তা চিনে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছনো মুশকিল, অনেকক্ষেত্রেই রাস্তার গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়াতে হয়। তপন বেশ সকালসকালই আমাদের জোড়াচুয়াতে পৌঁছে দিলো। শাল-সেগুনের বনের মাঝে এখানে একটা বিট অফিস আছে এবং সংলগ্ন বনবাংলো। বাংলোর চৌকিদারই ট্যুরিষ্টদের পরিচর্যা করে। এখানে ঘরের ব্যবস্থা থাকলেও সার্বিক পরিচালনা কুলডিহার থেকেও খারাপ। এখানে হাতে গোনা ট্যুরিষ্ট আসে ফলে ইচ্ছে থাকলেও সরকারের পক্ষে যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয় না। ওখানে পৌঁছে চৌকিদারকে রেশন বুঝিয়ে দিয়ে এককাপ করে চা খেয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চললাম এখানের এক বিশাল ঝিল দর্শনে। যেখানে দিনেদুপুরে জল খেতে এবং ঝিলের সল্টলিকে বন্যপ্রাণীদের অবাধ ঘুরতে দেখা যায়। কিন্তু ছটি ছেলের যেখানে সমাহার ঘটেছে, সেখানে কথাবার্তা, হাসি-ফাজলামি বন্ধ রেখে মুখ বুজে বন্যপ্রাণীর জন্যে অপেক্ষা করা বেশ কষ্টের ব্যাপার। ফলতঃ একঘন্টা অপেক্ষা করার পরও একটা শেয়ালও দর্শন দিলো না। অবশেষে এই আত্মলোপলব্ধি সকলের মধ্যে এলো যে জঙ্গলে কিছু পেতে গেলে অনেক নাগরিক বদভ্যাস ছাড়তে হবে। পনেরো মিনিটের মধ্যে হাতে হাতে ফল মিলল। আমাদের ঠিক উল্টোপাড়ে এক হস্তীপরিবার জল খেতে এলো-বাবা-মা আর দুটো বাচ্চা। হঠাৎ বাবা-মাকে চমকে দিয়ে বাচ্চাদুটো জলে নেমে হুড়োহুড়ি, শুঁড়ে করে একে অপরের গায়ে জলছিটানো শুরু করে দিলো। বাবা-মা অনেক বকেটকে তবে তাদের জল থেকে তুলতে পারলো। সবাই নির্বাক হয়ে মুগ্ধ চোখে সেই মনোরম দৃশ্য দেখতে লাগলাম, মানুষের সন্তানদের থেকে কোনো কিছু আলাদা পেলাম না। জল ঘেঁটে মনের আনন্দে বাচ্চা দুটো মা-বাবার পিছুপিছু গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেল। আমরা এখানে আসার সময় বাংলোর চৌকিদার সাবধান করে দিয়েছিলো যে এখানে বাঘের দর্শন পাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। তাই দিনের বেলা হলেও সমস্ত চরাচর জুড়ে একটা থমথমে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিলো। আমাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্রশস্ত্র এমনকি একটা লাঠিগাছাও নেই। একটাই ভরসা আমরা ছয়জন একসাথে আছ।; আর এটাতো সত্যি মানুষ যত বনের পশুকে ভয় পায়, বনের পশু তার থেকে বেশি মানুষকে ভয় পায়। তাই আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কয়েকটি বার্কিং ডিয়ার ছাড়া আর কিছুর দর্শন মিললো না। আর কে বলতে পারে, আমরা তাদের দেখতে না পেলেও তারা হয়তো ঘন জঙ্গলের ফাঁকফোকরের মধ্যে দিয়ে আমাদের দেখেছে। কতগুলো অর্বাচীনকে জঙ্গলে হুল্লোড় করতে দেখে লজ্জা বা ভয়ে সাময়িকভাবে জল বা লবন খাওয়া থেকে নিজেদের বিরত রেখে আরো গহীন জঙ্গলে ফিরে গেছে! পেটের খিদে জানান দিচ্ছে এবার ফিরতে হবে, আর অপেক্ষা না করে বাংলোয় ফেরার রাস্তা ধরলাম।

জোড়াচুয়ায় বিশেষ কিছু দেখার নেই। অন্যান্য ট্যুরিষ্ট স্পটের মতো সকাল-বিকাল সাইট-সিয়িংয়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি নেই। এখানে অরণ্যপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে কোলাহলহীন বন্য পরিবেশে অপার শান্তি উপভোগ করতে করতে দুয়েকটা দিন কাটাতে ভালোই লাগবে। কপাল ভালো থাকলে বন্যপ্রাণীর সাথে সাক্ষাৎ হবে, নাহলেও অসুবিধা নেই। অজস্র পাখির ডাক আর তাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা দেখতে দেখতে খুব সুন্দর কেটে যায়। খাওয়ার পর বাংলোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছপালায় সাজানো চত্বরে বসে হাওয়ার ফিসফিসানি আর পাতার মর্মর শুনতে শুনতে দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকালবেলায় আমরা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লামগড় শিমুলিয়ার উদ্দেশ্যে। এখানেও একটা জলাশয় আর ওয়াচটাওয়ার আছে। কিন্তু ওয়াচটাওয়ারের অবস্থা খুব খারাপ, তাই ওপরে উঠতে ভরসা হলোনা। কিছুটা এগিয়ে ঘোলাপানি, এখানের জলাশয়টি হাতিদের খুব প্রিয় জায়গা। হাতিরা সদলবলে এই জলাশয়ে পিপাসা মেটাতে এবং স্নান করতে আসে। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন সূর্যদেব অস্ত যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও হাতির দেখা পেলামনা। পাখিরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে, অন্ধকার হবার সাথে সাথেই জঙ্গল ফিসফিস করে সতর্ক করে, “এবার তোমরা ফিরে যাও, এখন এই জঙ্গল সম্পূর্ণভাবে আমাদের।“ মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গলের শব্দ, ভাষা বদলাতে থাকে, সারা জঙ্গল জুড়ে বিজাতীয় শব্দের ওঠাপড়া চলতে থাকে। আমরা আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার সাহস পেলামনা। ঘন অন্ধকার পুরোপুরিভাবে আমাদের ফেরার পথ ঢেকে ফেলার আগে ঘরে ফিরে এলাম।

আজ আমাদের ট্যুরের শেষ দিন। আজ আমরা প্রাতঃরাশ সেরে একটা ঝর্ণা দেখতে যাবো। এখান থেকে কাঞ্জিপানি দু-কিলোমিটারের হাঁটা পথ। কাঞ্জিপানি মূলতঃ একটা জলাশয়কে ঘিরে ঘন জঙ্গলে ভরা বিট। এই জঙ্গলে পায়ে হাঁটা পথ ধরে ঘুরে বেড়ালে জঙ্গলের সত্যিকারের ফ্লেভারটা পাওয়া যায়। এই কাঞ্জিপানি যাওয়ার পথেই পথের ধারে ঝর্ণাটি পড়বে। ছোট, কিন্তু খুব সুন্দর। বিশেষতঃ এই অরণ্য প্রকৃতির ক্যানভাসে ঝর্ণাটির অবস্থান অনবদ্য। কাঞ্জিপানি দেখে এগিয়ে গেলাম পূর্ণাপানির উদ্দেশ্যে। এই পূর্ণাপানিতে ফরেস্ট গার্ডদের থাকার ছোট ছোট কটেজ আছে। সংলগ্ন ওয়াচটাওয়ার থেকে আশপাশের পাহাড়-জঙ্গলের সিল্যুয়েট খুব উপভোগ্য সন্দেহ নেই। তবে এখানকার ঝিলটি প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। এটি জন্তু-জানোয়ারদের ব্যবহারের জন্য খনন করা হয়েছে ২০০৪ সালে। চৌকিদারদের সাথে গল্প করে, তাদের আন্তরিক আতিথেয়তায় ঘন দুধের চা খেয়ে যখন ফিরলাম তখন তিনটে বেজে গেছে।

আমরা কাল ফিরে যাবো। আজ আর বিকেলে কোথাও বেরোবোনা। তাই বিকেলবেলা বাংলোর সামনের রাস্তায় পায়চারি করে, বাংলোর চত্বরে বসে চা খেতে খেতে সন্ধ্যা নেমে এল। জঙ্গলে সন্ধ্যা আসে আচম্বিতে। আপনাকে চমকে দিয়ে পাখির ঘরে ফেরার আওয়াজের মধ্যে দিয়ে ঝুপ করে চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যাবে। এত গাছপালার কারণেই সন্ধ্যে হলেই এই অক্টোবর মাসেও একটা ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে, গায়ে হালকা করে কিছু চাপাতে হয়। কুলডিহা অভয়ারণ্য ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময় হলো শীতকাল। গরমের সময় দিনের বেলা একটু গরম হয়, কিন্তু এত গাছপালা ঘেরা জঙ্গলে গরম কখনোই অসহনীয় হয়ে ওঠেনা। তাই বর্ষার সময়টা বাদ দিলে বছরের বাকি সময়টা এখানে ট্যুরিষ্ট আসতে পারে। তবে এখানে আসার আগে কতকগুলো ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে-এক, থাকার ব্যবস্থা খুব সাধারণ, সবক্ষেত্রে সংলগ্ন বাথরুম নাও পেতে পারেন; দুই, খাবার আপনি যেমন রেশন আনবেন সেই অনুযায়ী করতে হবে, মুরগি ছাড়া আলাদা কিছু পাবেননা; তিন, বিদ্যুতের একমাত্র সোর্স হলো ‘সোলার এনার্জি’, তাই ইচ্ছেমতো আলো-পাখার সুবিধা পাওয়া যায়না; চার, নিজেদের গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়িতে এলে ড্রাইভারের সমগ্র জঙ্গল এবং জঙ্গলের সব রাস্তা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান থাকা অবশ্যই দরকার; শেষ আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জঙ্গলের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে, জঙ্গল এবং জন্তুজানোয়ারের স্বার্থে সেই নিয়ম মেনে চলা অবশ্যই দরকার। পরিশেষে বলি, এই আপাত অজানা, কম পর্যটকপ্রিয় জায়গায় কয়েকটা দিন কাটিয়ে আমরা খুব উপভোগ করেছি। প্রকৃতি আমাদের উজাড় করে দিয়েছে, জলজঙ্গলের সাথে মিশতে মিশতে ওই কটাদিন আমরা কখন যেন ভূমিসন্তান হয়ে পড়েছিলাম। খুব বেশি বন্যপ্রাণী হয়তো দেখিনি, কিন্তু তাদের উপস্থিতি প্রতি মুহুর্তে অনুভব করেছি, বাতাসে তাদের গন্ধ পেয়েছি, রাত্রির অন্ধকারে আমাদের চমকে দিয়ে জ্বলজ্বলে দুটি চোখ চকিতে সরে গেছে আরো গহীন অরণ্যে, শব্দহীন রাত্রে কোনো নাম-না-জানা পশুর আচম্বিত চিৎকারে চমকে জেগে উঠেছি। সবকিছুকে ধরলে সবচেয়ে কম খরচার এই ট্যুর থেকে আমরা মনি-মুক্তা নিয়ে ফিরছি।

আরেকটি কথা, আমি এই ট্যুরটি করেছি বেশ কয়েক বছর হলো। আপনারা লেখাটি পড়ে যারা এই অভয়ারণ্য ঘুরতে যেতে মনস্থ করবেন তাঁরা অবশ্যই বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে সবকিছু জেনে তবেই প্ল্যান করবেন। যেমন আমি, কদিন আগেই কোথায় একটা পড়লাম, কুলডিহা অভয়ারণ্যে ঢোকার চেকপোস্ট টেন্ডার পরিবর্তে অন্য কোথাও একটা শিফট করে গেছে, ইত্যাদি। তবে কিছু ত্রুটি মেনে নিয়ে জঙ্গলকে ভালোবেসে এখানে গেলে বিন্দুমাত্র ঠকবেননা সেটা আমি হলফ করে বলতে পারি।

 

                                          ………….X………….

Mailing List