জবাব / ছোটগল্প

জবাব / ছোটগল্প
20 Dec 2020, 04:00 PM

জবাব

অলিভা দে

একটা চড় খেয়েই যে অমৃতা সত্যিটা সবার সামনে বলে দেবে, অভিজিৎ আশা করেনি।

তেত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের একান্ত ব‍্যক্তিগত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এলো তাদের বিবাহবার্ষিকীর রাজকীয় আয়োজনের অনুষ্ঠানে, উপস্থিত সকল গণ‍্যমান‍্য ব‍্যক্তিদের উপস্থিতিতে এবং অমৃতার অকপট স্বীকারোক্তিতে।

অভিজিৎ সেনগুপ্ত ভরা আসরে ঘোষণা করেন আজ সে তার বিবাহিতা স্ত্রীকে মুক্তি দিয়ে তাকে জীবনের সব থেকে বড়ো উপহারটি দিতে চান। কারণ, আজ থেকে ঊনিশ বছর আগে তার কর্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়া যাওয়া, সেই সময় তার বাবার হার্ট অ্যাটাকে হসপিটালে ভর্তি থাকা ও বাড়িতে বয়স্কা মা একা থাকার সুযোগ নিয়ে অমৃতা পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে যে অবৈধ সন্তানের জন্ম দেয় তা বুঝতে পারা সত্ত্বেও সে এতদিন চুপ করে থেকেছে শুধু তার বাবা-মায়ের মুখ চেয়ে। কিন্তু আজকেও যদি সে সবার সামনে সত্যিটা না বলে তবে তার বাবার বেঁচে থাকা অবস্থায় করে যাওয়া উইল অনুযায়ী আজ অমৃতার ওই অবৈধ সন্তান ওরফে অমৃতাংশু, সেনগুপ্ত অ্যান্ড কম্পানির অর্দ্ধেক মালিকানা পেয়ে যাবে। স্বামীর সাথে প্রতারণা করার সব থেকে বড়ো প্রমাণ অমৃতাংশুর ডি.এন.এ টেস্টের রিপোর্ট ।

অমৃতা তো অমৃতাংশুর মা! তাই স্বামীকে বোঝাতে এগিয়ে যেতেই জোটে তেত্রিশ বছর ধরে এক‌ই ছাদের নীচে বাস করা  বিছানায় চেনা কিন্তু অন্তরে অচেনা মানুষটির থেকে নারী হিসেবে বড়ো সম্মান, হলভর্তি লোকের সামনে সপাটে একটা থাপ্পড়।

অমৃতা অভিজিতকে ঠকিয়েছে। তার এই প্রবঞ্চনা সমগ্র পৃথিবীর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিশ্বাসের ভিতকে টলিয়ে দিয়েছে।

অমৃতা অভিজিতের কথাগুলো মাথা নীচু করে শুনে যায়, তারপরে খুব ধীরে অভিজিতের হাত থেকে মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিয়ে বলে, "হ‍্যাঁ, আজ আমি স্বীকার করছি; অমৃতাংশু অভিজিৎ সেনগুপ্তের ঔরসজাত সন্তান নয়। বন্ধুরা, আজ কিন্তু শুধু আমাদের বিবাহবার্ষিকীই নয়, আজ আমার ছেলে অমৃতাংশুর আঠারোতম জন্মদিন, যাকে আপনারা এতোদিন জানতেন অভিজিৎ সেনগুপ্তের ছেলে হিসেবে। তবে মি. অভিজিৎ সেনগুপ্ত; আজকে যখন সত্যিটা সামনে এসেই গেছে তখন তো এর পাশাপাশি সমান্তরাল যে  সত‍্যিগুলো রয়েছে সেগুলো না বললে যে সত‍্যের জয় জয়কার হবে না !"

অভিজিৎ উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, অমৃতা তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে "না, অভিজিৎ সেনগুপ্ত ! আমি বলছি আপনি শুধু শুনুন, যদি কোনো ভুল বলি আমায় ধরিয়ে দেবেন।"

"আমার আর অভিজিতের বিয়ের পনেরো বছর পরে আমার এই সন্তান। পনেরো বছর ধরে কন্সিভ না করার জন‍্য আমার বা অভিজিতের কারো‌র‌ই কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আপনারা আগেই শুনলেন আমি কোন অবস্থায় কন্সিভ করি। শ্বশুর মশাইয়ের কিছু কাগজ হসপিটালে জমা করার জন্য আমায় তখন কিছু ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছিলো আর তখনই আমার হাতে আসে অভিজিৎ সেনগুপ্তের জীবনের সব থেকে গুপ্ত একটি জিনিস। অভিজিতের স্পার্ম কাউন্টিং টেস্টের রিপোর্ট। যেখানে পরিষ্কার লেখা ছিলো, অভিজিৎ সেনগুপ্ত সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম।

কিন্তু সে কথা আমায় বা তার বাড়ির কাউকেই ঘুণাক্ষরেও সে জানতে দেয়নি। উপরন্তু দিনের পর দিন তার‌ই বাড়ির লোকেদের কাছে আমায় অপমানিত হতে দেখেও চুপ করে থেকেছে। আমি দিনের পর দিন চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছি শুধু এই ভেবে যে, আমার জন‍্য আমার ভালোবাসার পুরুষটি পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অভিজিৎ সেনগুপ্ত চেঁচিয়ে বলে ওঠেন "বাস্টার্ড!"

হসপিটালের লনে বসে পনেরো বছর আগের স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলো অমৃতা । সম্বিৎ ফেরে, ইন্ডিয়ার বিখ‍্যাত মনোবিদ, ডাক্তার অমৃতাংশুর "মা" ডাক শুনে।

"বাবাকে বাড়ি নিয়ে চলো মা। তাহলেই বাবা তাড়াতাড়ি চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে ভালো হয়ে উঠবেন।"

অভিজিতের চোখের তারার চঞ্চলতাতেও সম্মতি বুঝতে পারে অমৃতা।

চৌত্রিশ বছর আগে অসুস্থ শ্বশুর মশাইকে একটু সুস্থ করে বাড়িতে আনার পরে, অমৃতা যোগাযোগ করে স্পার্ম ব‍্যাঙ্কে। ডা. খাস্তগীরের সহায়তায় অমৃতা স্পার্ম ব‍্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম নিয়ে কন্সিভ করে। অভিজিৎ পনেরো বছর আগে যে সত‍্যি জানতে পেরে। অনুতপ্ত থেকে এখন নার্ভের পেসেন্ট হয়ে হসপিটালে।

                                                         ###

Mailing List