জনসংখ্যায় চিনকে টপকাতে আর বেশি দেরি নেই ভারতের, জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি ও কিছু কথা

জনসংখ্যায় চিনকে টপকাতে আর বেশি দেরি নেই ভারতের, জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি ও কিছু কথা
23 Aug 2022, 12:15 PM

জনসংখ্যায় চিনকে টপকাতে আর বেশি দেরি নেই ভারতের, জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি ও কিছু কথা

 

প্রভাতকুমার শীট

 

রাষ্ট্রপুঞ্জের পূর্বাভাস (২০২২) অনুসারে চিনকে টপকে সব থেকে বেশি জনসংখ্যার দেশ হতে চলেছে ভারত। চলতি বছরে ভারত ও চিনের জনসংখ্যা যথাক্রমে ১৪১.২ কোটি এবং ১৪২.৬ কোটি পৌঁছবে। এই ব্যবধান মুছে যাবে কয়েক বছরের মধ্যেই। ২০৫০ সালে চিনের সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে প্রায় ১৩১ কোটিরও বেশি। আর এই সময়ে অনেকটাই এগিয়ে যাবে ভারত সম্ভাব্য জনসংখ্যা ১৬৬ কোটির বেশি হবে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নতুন করে মাথা চাড়া দিচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। বিতর্কের দানা বাঁধছে। ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে মেরুকরণের রাজনীতি দেখছে অনেকে। কিন্তু জনসংখ্যা কমে গেলে বয়স্কদের খেয়াল রাখবে কে? এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে সকলের মনে!

 

২০০০ সালে এম এস স্বামীনাথনের নেতৃত্বে ভারতের জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করা হয়। জোর দেওয়া হয় পরিবার পরিকল্পনায় ও জনস্বাস্থ্যে। তার ফলেই ২০২০ সালের মধ্যে ভারতে জনসংখ্যা স্থিতাবস্থা পেয়েছে। মহিলাদের গড়ে জন্মহার কমে ২.০ দাঁড়িয়েছে। এই হার চলতে থাকলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ২১০০ সালে জনসংখ্যা কমে দাঁড়াবে ১১০ কোটি। চিন দেশের মতো এক-দুই-তিন সন্তান নীতি না নিয়েও ভারতের জনবিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। জনসংখ্যার হারও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ২১০০ সালের মধ্যে। প্রকৃত কারণ খুঁজেলে দেখা যাবে ভারতের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হয় সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা, জীবনযাপনের রীতিনীতি ও নিজস্ব সংস্কৃতির উপর।

লক্ষনীয় যে, গ্রামাঞ্চলে ও শহরাঞ্চলের মধ্যেই জন্মহারের পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামের মহিলাদের গড় জন্মহার ২.৪ ও শহরে ১.৮। সেই কারণে শহরের লোকেরা গ্রামের একান্নবর্তী পরিবার দেখে ভ্রু কুঁচকায়। শিক্ষিতরা অশিক্ষিতদের দিকে আঙুল তুলে অধিক সন্তান উৎপাদনের জন্য। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, মুসলিমদের জন্ম হার অত্যধিক। কিন্তু তা খুব বেশি পাথর্ক্য নেই হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে। হিন্দু মহিলাদের গড় টোটাল ফার্টিলিটি রেট ২.১৩ ও মুসলিম মহিলাদের ২.৬২। এই বিভাজন দূর হবে মানুষ শিক্ষিত ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হলে। পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (২০১৯-২০) রিপোর্টও বলছে, এ দেশের প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই জন্মদানের হার ক্রমশ কমে আসছে। 

কখনো স্কুলে যায়নি এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে গড় জন্মহার ৩.১, আর অল্প শিক্ষিতদের ১.৭। আবার দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মহিলাদের ৩.২ এবং স্বচ্ছল পরিবার ও শিক্ষিত মহিলাদের জন্মহার ১.৫। তপশিলি জাতিদের ক্ষেত্রে এই হার ২.৩। সুতরাং পরিবারের স্বচ্ছলতা ও উন্নত জীবনযাপন নিম্ন জন্মহারের অন্যতম কারণ। উচ্চ শিক্ষিত সমাজের নারী-পুরুষেরা কখনো অধিক সন্তান জন্ম দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তাঁরা প্রাধান্য দেন নিজের ব্যক্তিগত কাজে, বিজ্ঞানে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে। এর ফলে তাঁদের সন্তানেরা একাকিত্বে ও মানসিক অবসাদে ভুগে। বেশি আত্মকেন্দ্রীক হয়ে ওঠে। তাই পরিবারের বয়স্কদের দেখাশোনার খেয়াল রাখতে পাঠাতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। অনেক সময় সচেতন ও শিক্ষিত সমাজে সন্তানের উপযুক্ত উপার্জনের ক্ষমতা না থাকলেই বিবাহ পিছিয়ে দেয়। অথচ নিম্নবিত্ত পরিবার, যাঁরা দরিদ্র, যাঁদের অল্প শিক্ষা, অজ্ঞতা, যুক্তিবোধের অভাব, উপার্জনের সুযোগ কম, তাঁরাই অধিক সন্তান উৎপানে জোর দেন। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বিপদে-আপদে ছোটদের লালন-পালনে, বৃদ্ধ বয়স্কদের যত্নের পাকাপোক্ত দায়িত্ব নেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, দেশের সীমান্ত রক্ষীতে এরাই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এটা ঠিক যে পরিবার পরিকল্পনা দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। আগামীতেও জনসংখ্যা কমে প্রগ্রেসিভ পপুলেশনের পিরামিড থেকে রিগ্রেসিভ পপুলেশনের পিরামিডের দিকে সরবে। ফলে জনসংখ্যার আকার, বয়স ভিত্তিক কাঠামো, জনসংখ্যার গঠন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভাবে প্রভাব ফেলবে। আমরা দেখেছি দারিদ্র্য সূচক ও নারীদের উন্নয়নের সূচক নির্ধারণে র্দীর্ঘ- সুস্থজীবন, শিক্ষা, আয়ের ক্ষমতা, ও জীবনযাত্রার (জিডিপি) মান ধরা হয়। তাই জোর দিতে হবে জনগনের স্বাস্থ্যে, শিক্ষা ব্যবস্থায়, কারিগরি শিক্ষা প্রসারে ও সম্পদ বন্টনে। শুধু রাজ্য ভিত্তিক জনসংখ্যা নীতি প্রয়োগ করলে জনসংখ্যার সমস্যা সমাধান হবে না, বরং উল্টে ভোটব্যাঙ্কের কথা ভেবে রাজনীতিবিদরা সমস্যা বাড়িয়ে তুলবে। পরিকল্পনা করতে হবে বিভিন্ন জনজাতির শিক্ষা প্রসারে, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে, তাঁদের অর্থ উপার্জন ক্ষমতা বাড়াতে, বেকারত্বের কাজের সুযোগ করে, তবেই মানুষ ও সম্পদের সুষম বন্টন হবে। তাতেই ঘটবে উন্নয়ন, বাড়বে সচেতনতা। তখনই কমবে অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ।  

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়।

Mailing List