এটাই কি ইমরানের সেই নতুন পাকিস্তান?

এটাই কি ইমরানের সেই নতুন পাকিস্তান?
25 Oct 2021, 12:00 PM

এটাই কি ইমরানের সেই নতুন পাকিস্তান?

 

ড. গৌতম সরকার

 

খেলার মাঠে জয়টা যতটা সহজ ছিল, রাজনীতির খেলায় জিতে আসা যে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন সেটা দীর্ঘ দুই দশক ধরে নিরন্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভালোভাবেই টের পেয়েছিলেন ইমরান খান। বহু প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিহিংসা পেরিয়ে শেষমেষ তিনি ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হন। সেই সময়ে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পূর্বসূরিদের ছেড়ে যাওয়া ভারসাম্যহীন পঙ্গু অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। নির্বাচনী ইস্তাহারে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল, পাকিস্তানের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। সেইমত ক্ষমতায় আসার আট মাসের মধ্যেই বন্ধু দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, চিন সফর করে নশো কোটি টাকার ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা করে ফেললেন। কিন্তু সংকট তাতে কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বাড়তেই থেকেছে। ২০১৮ সাল থেকেই দেশের প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। বিদেশি মুদ্রার বাজারে রুপির মূল্য কমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দশ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ২০১৩ সালের পর সেই প্রথমবার মুদ্রাস্ফীতি দুই অংকে পৌঁছায়। দিন দিন বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি থেকে 'ইউ টার্ন' নিতে বাধ্য হন ইমরান খান।

  

পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আর্থিক সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের (আইএমএফ) কাছে হাত পাতবেন না। দেশের সার্বিক অবস্থা তাঁকে সেই প্রতিশ্রুতি থেকেও সরে আসতে বাধ্য করেছে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আইএমএফ-এর সাথে ৬০০ কোটি ডলার প্যাকেজের একটি চুক্তি হয়। সেটি ছিল ১৯৮০-র দশক থেকে শুরু করে আইএমএফ-এর ১৩ তম অর্থ সহায়তার প্যাকেজ।

 

দেশের বেহাল অবস্থা ইমরান উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন জনসভায় তাঁর বক্তৃতার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকত পূর্বসূরীদের উদ্দেশ্যে বিষোদ্গার। দুর্নীতির অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, তাঁদের কারণেই দেশ এইরকম বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাঁর আমলে ১৩ জন প্রথমসারির রাজনীতিবিদ দুর্নীতির অভিযোগে জেল খাটছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, তাঁর কন্যা মরিয়ম নওয়াজ এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আসিফ জারদারি। ইমরানের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির মূল অভিযোগ, তাঁর শাসনে পাকিস্তানে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারবিরোধী মত পোষণ রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

   

২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে বার্ষিক রিপোর্টে 'এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক' পাকিস্তান সম্বন্ধে বলতে গিয়ে 'অন্ধকারাচ্ছন্ন' শব্দটি ব্যবহার করেছিল এবং তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এই দেশে বিনিয়োগের উৎসাহ হারিয়েছিল, এবং তার ফলশ্রুতিতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাসের মধ্যে শেয়ার বাজারের সূচক ৬২০০ পয়েন্ট হ্রাস পায়। বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়তে বাড়তে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। বাধ্য হয়ে পিটিআই সরকারকে অর্থ সাহায্যের জন্য আইএমএফ-এর দ্বারস্থ হতে হয়।

  

মসনদে বসার পর পাকিস্তান অর্থনীতির সম্যক কাঠামোটা ধরতে পেরেছিলেন ইমরান খান। বুঝতে পেরেছিলেন ঘুণ ধরে যাওয়া কাঠামোটিকে ঠিকঠাক করতে গেলে একসাথে অনেক কিছু করা দরকার আর সেগুলো করার মত আর্থিক জোর দেশটির নেই। ফলে নির্বাচনের আগে দেশবাসীকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেললেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার অধিকাংশই রক্ষা করতে পারেননি। তাছাড়া শুধু তো অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, তাঁকে একসাথে অনেকগুলো ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছিল। রাজনৈতিক ভাবে একদিকে পাঞ্জাবের শরিফ আর অন্যদিকে সিন্ধের ভুট্টো পরিবারকে মাথা তুলতে না দেওয়া, আন্তর্জাতিকভাবে ভারতবর্ষকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করা, এবং একই সাথে আফগানিস্তান এবং ইরান সীমান্তে সতর্ক দৃষ্টি রাখা তাঁর কাজকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছিল।

  

এই মুহূর্তে পাকিস্তান অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে। উপরিউক্ত সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারীর দাপট। সাংঘাতিক আর্থিক সংকটে ভুগছে দেশটি, এর মধ্যে সৌদি আরবকে শোধ দেওয়ার জন্য যে তিন বিলিয়ন ঋণের আশ্বাস চিন দিয়েছিল সেটি এখন তারা অস্বীকার করছে। মে মাসের শেষে পাকিস্তান বেইজিংকে জ্বালানি সংক্রান্ত ঋণগুলি দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানায়। ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে ৪৬ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি হয়। এরই সাথে আরেকটি ২৮ বিলিয়ন ডলারের 'আর্লি হারভেস্ট' প্রকল্পের চুক্তি হয়েছিল, যেটি সিপিইসি নামে অধিক পরিচিত।

   

 

ইমরান সরকারের পূর্বসূরীরা ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে একদিকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সরাসরি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অন্যদিকে স্বল্পকালীন ঋণের জন্য পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং চিনের পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মধ্যে 'কারেন্সি সোয়াপ এগ্রিমেন্ট' চালু করে৷ ২০১৪ সালে চুক্তিটির তিনবছরের জন্য পুনর্নবীকরণ ঘটে। সেই সময় আর্থিক সহায়তার সর্বোচ্চ পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছিল দশ বিলিয়ন ইউয়ান বা দেড় বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালে এই চুক্তির সীমা পুনরায় তিন বছরের জন্য বাড়ানো হয় এবং আর্থিক সহায়তার সর্বোচ্চ পরিমান বাড়িয়ে ২০ বিলিয়ন ইউয়ান বা তিন বিলিয়ন ডলার করা হয়। হিসেব অনুযায়ী এবছরের মে মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে চিনের কাছে আরও তিন বছরের জন্য এই আর্থিক সহায়তার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

  

'দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএমএফ-এর অনেক কাটছাঁটের পরেও পাকিস্তানের বাহ্যিক অর্থ চাহিদা ২০২১-২২ আর্থিক বছরে ধার্য হয়েছে ২৩.৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে ২৮ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব ব্যাংকের একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তান বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে আছে। 'ইন্টারন্যাশনাল ডেট স্ট্যাটিস্টিকস'-এর রিপোর্ট অনুযায়ী পাকিস্তান এই মুহূর্তে 'ডেবিট সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ' (ডিএসএসআই)-এর আওতায় এসে গেছে। এর অর্থ হল, দেশটির মাথায় এত বেশি বৈদেশিক ঋণের বোঝা রয়েছে যে আর তাকে নতুন করে ঋণ দেওয়া যাবে না। রিপোর্টে এটাও বলা হয়েছে, ইদানিং পাকিস্তান বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় আট শতাংশ বাড়িয়েছে। এই বছরের জুন মাসে অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইমরান সরকার বিশ্ব ব্যাংকের কাছে থেকেও ৪৪২ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে ফেলেছে। অত্যধিক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক আগামী দিনে পাকিস্তানকে নতুন করে কোনো ঋণ দেবে না বলে ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের চিন্তা আভ্যন্তরীণ সম্পদের কাম্য ব্যবহারে অক্ষম সরকারের বিদেশী ঋণের স্রোত বন্ধ হয়ে গেলে দেশটি কার্যত অকেজো হয়ে পড়বে। সেই কারণে পাকিস্তানের কাছে যেকোনো ভাবেই হোক চিনের সাথে কারেন্সি সোয়াপ এগ্রিমেন্টের নবীকরণ ঘটিয়ে ছয় মিলিয়ন ডলার ঋণের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকও পাকিস্তানকে ঋণ সাহায্য দিয়ে থাকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার দেয় ঋণেই সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। এইভাবে চলতে থাকলে ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলির কাছে দিনে দিনে পাকিস্তানের রেটিং আরও কমতে থাকবে।

  

 

এই মুহূর্তে পাকিস্তান অর্থনীতি ভয়ানক সংকটের সম্মুখীন। একদিকে করোনাকালীন সময়ে দেশে খাদ্যাভাব প্রকট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে বেকারত্ম সমস্যা একটা নতুন রেকর্ড সৃষ্টির দিকে এগোচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের মদতদার পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী সমস্ত প্রতিশ্রুতি ভুলে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেশে দেশে ছুটে বেড়াচ্ছেন। তবে তাদের আসল লক্ষ্য হল চিন। ইতিমধ্যেই ইমরান খান চিনকে সরকারি তরফে বিশেষ সুবিধাদানের কথা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে শিল্পায়ন মজবুত করতে এবং সার্বিক বেকারত্ম সমস্যা সমাধানে বিনিয়োগের গুরুত্বের কথা ঘোষণা করেছেন এবং তাদের ভরসার এক নম্বরে আছে চিন। অন্যদিকে চিনের উপর উত্তরোত্তর নির্ভরশীলতা আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে চিনের খবরদারি বাড়াতে সাহায্য করছে। তাই দেশে বিরোধী আবহ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ইমরান খান চিনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিবর্তনে আগ্রহী নন। চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর অনুযায়ী তৈরি করা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) চিনের বিনিয়োগ বাড়াতে তিনি জমি আর বিজনেস ট্যাক্সের উপর বিশেষ ছাড়ের কথা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'পাকিস্তানে শিল্পায়ন মজবুত করার জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন। আমাদের বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য বেশি করে কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে।' তিনি সঙ্গে এও বলেন, 'পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মানুষই ৩৫ বছর বা তার কম বয়সী। তাঁদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি'। ইমরান খান জানিয়েছেন, 'অধিক সংখ্যক চিনা কোম্পানিকে বিনিয়োগে উৎসাহী করতে এবং এসইজেড করিডোরে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ, এবং করের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত।'

  

সাম্প্রতিক সংকটের কেন্দ্রে আছে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি। ইমরান খানের দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ১২.৬৬ শতাংশ। এই দামবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে নাজোহাল হয়ে পড়ছে। পেট্রোল-ডিজেল দুইয়েরই দাম বেশ কিছুদিন আগে সেঞ্চুরি পার করেছে। শেষ খবর অনুযায়ী লিটার প্রতি পেট্রোলের দাম ১৩৭ টাকা ৭৯ পয়সা আর ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৪৮ পয়সা ছুঁয়েছে। দুদিন আগে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে বৃদ্ধি পেয়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। সরকারি তরফ থেকে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'পাকিস্তান সরকার বর্তমানে আর্থিক চাপে রয়েছে, তবুও তারা জনগণকে স্বস্তি দিতে আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে'। মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে পাকিস্তানে এখন এক কাপ চা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। চায়ের দোকানদারেরা স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন, এর চেয়ে কমে বিক্রি করলে তাদের দু-টাকা লাভও থাকবে না। কথাটি একদম মিথ্যে নয় কারণ জ্বালানি তেলের সাথে সাথে রান্নার গ্যাসের দামও আকাশ ছোঁয়া। কয়েকদিনের মধ্যেই মানুষকে দ্বিগুন দামে (পনেরশ থেকে বেড়ে হয়েছে তিন হাজার) রান্নার গ্যাস কিনতে হচ্ছে। ওদিকে খোলা বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা প্রতি কেজি। এই পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত, গরিব মানুষ আর ছোট ছোট ব্যবসাদারদের নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করেছে। এদিকে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করার পলিসি নিয়ে আরও বিপাকে পড়েছে দেশটি। চিনির ক্ষেত্রে ভারত থেকে সস্তায় চিনি আমদানির পথ খোলা ছিল, কিন্তু এই বছরের এপ্রিল মাস থেকে তারা ভারত থেকে চিনি আমদানি বন্ধ করে দেয়। সরকারি তরফ থেকে ভারতকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা তুলে নিলে ভারত থেকে অন্যান্য জরুরি সামগ্রী আমদানিও বন্ধ করবে পাকিস্তান। এই রাজনৈতিক জেদাজেদির কারণে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

  

পেট্রোল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সোচ্চার হয়েছে বিরোধী দলগুলো। তাঁরা বর্তমান সরকারকে অপদার্থ ঘোষণা করে অবিলম্বে বর্ধিত মূল্যের ঘোষণা ফেরত নেওয়ার দাবি পেশ করেছে। ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’-র নেতা মিঞা রাজা রব্বানি বলেছেন, 'গত সেপ্টেম্বর মাসেই সরকার পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৯ টাকা বাড়িয়েছিল, তারপর একমাসের মধ্যেই আবার দামবৃদ্ধি। সমস্ত দ্রব্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে'। তিনি আরও বলেন, 'পেট্রোল ডিজেলের দাম এতটা বেড়েছে যে, সেগুলো এখন গরীবদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পাশাপাশি ভোজ্য তেলের দাম ৪০০ টাকা প্রতি লিটার হয়ে দাঁড়িয়েছে।'

  

পাকিস্তানের মিডিয়াগুলি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে স্বপ্ন বিক্রির সওদাগর আখ্যা দিয়েছে। নতুন পাকিস্তানের স্বপ্ন ফেরি করা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হামেশাই দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন, 'একদম ঘাবড়াবেন না।' এখন সত্যি কথাটি হল, প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে এক সার্বিক সংকট ডেকে এনেছেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টি-র চেয়ারম্যান বিলওয়াল ভুট্টো জানিয়েছেন, 'দেশের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছেন, এই ঋণ দেশের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতাকে বন্ধক রাখার সমতুল।' তাঁর কথায়, 'বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশকে ভিখিরি করে ছেড়েছেন, সর্বনাশ করে দিয়েছেন দেশটার। এই ভয়ংকর সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করার দায় পরবর্তী সরকারকে নিতে হবে'। তিনি জানিয়েছেন, 'শুধু ২০২১ সালেই পাকিস্তানের বিদেশি ঋণের পরিমাণ হল ১০০০ কোটি ডলার, যেটি আগের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। এই অযোগ্য প্রধানমন্ত্রী যে পরিমান অর্থ ঋণ নিয়েছেন তা পরিশোধ করতে দেশের সমস্ত সম্পদ বন্ধক দিলেও যথেষ্ট হবে না। এখনও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না, কিন্তু বাস্তবটা হল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ঋণের মূল্য চোকাতে হবে'৷

 

পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যে দেশের মূল লক্ষ্য হল অন্যায় ভাবে, জোর করে, পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে অন্যের সাথে বিবাদ করা। ভারতের সাথে শুধু কাশ্মীর বিবাদে তাঁরা যে অর্থ ব্যয় করে, সন্ত্রাসবাদীদের মদত দিতে যে অফুরান ব্যয় হয় সেই অর্থগুলি উৎপাদনমূলক কাজে বিনিয়োগ করলে, মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজে লাগালে আজ তাদের অর্থনীতির এই অবস্থা হতনা। দেশটিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মান খুব খারাপ, উপদ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশীয় কিংবা বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহ পায়না। জনসংখ্যার প্রাবল্যের কারণে বেকার সমস্যা প্রবল আকার ধারণ করেছে। আভ্যন্তরীণ সম্পদ যথেষ্ট না থাকায় এবং সেগুলির সঠিক ব্যবহারের অভাবে মূলধন সৃষ্টি হচ্ছেনা, বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকারকে আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হাত পাততে হচ্ছে। ইতিমধ্যে 'ডেবিট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ'-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি পাকিস্তানকে ঋণ দিতে অস্বীকার করছে। একমাত্র আইএমএফ ঋণ দেবে বলছে, কিন্তু তার আগে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হল, পাকিস্তানের কারেন্সি সিস্টেমকে 'ফিক্সড' থেকে 'ফ্লেক্সিবল' করতে হবে, অর্থাৎ রুপি-ডলার বিনিময় হারকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপকে বন্ধ করতে চায় আইএমএফ। এর ফলে ভবিষ্যতে রুপির দর আরও কমবে এবং আমদানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি সরকারকে সঙ্কোচনমূলক রাজস্ব নীতি গ্রহণ করতে হবে যেখানে প্রত্যক্ষ কর বাড়বে, আর সরকারি ব্যয় বরাদ্দ কমবে। ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক উপদেষ্টা দেশবাসীকে আগামী বাজেটে কর বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই সবকিছু বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গঠন করছে। তাই আগামী নির্বাচনের ইস্তাহারে দেশবাসীকে নতুন পাকিস্তানের স্বপ্ন ফেরি এই সরকার করবে না সেটা এখন থেকেই।হলফ করে বলা যায়।

                                     ……….xxxx…………

লেখক: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক

ads

Mailing List