সাইবেরিয়া কী সত্যিই ঘুমন্ত? তবু সীমাহীন রোমাঞ্চ লুকিয়ে রয়েছে রাশিয়ার  এই ভূখন্ডেই

সাইবেরিয়া কী সত্যিই ঘুমন্ত? তবু সীমাহীন রোমাঞ্চ লুকিয়ে রয়েছে রাশিয়ার  এই ভূখন্ডেই
29 Aug 2021, 11:00 AM

সাইবেরিয়া কী সত্যিই ঘুমন্ত? তবু সীমাহীন রোমাঞ্চ লুকিয়ে রয়েছে রাশিয়ার  এই ভূখন্ডেই

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, ভাস্কর্য রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

          

আয়তনের হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো দেশটির নাম রাশিয়া। আবার এই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক অঞ্চলটির নাম সাইবেরিয়া।

সাইবেরিয়া পূর্বে উরাল পর্বত থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তরে সুমেরু মহাসাগর থেকে দক্ষিণে কাজকিস্তান, মঙ্গোলিয়া-চিন সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

আয়তন: ১,৩১,০০,০০০ বর্গ কিমি বা ৫১,০০,০০০ বর্গমাইল।

জনসংখ্যা: ৩,৬০,০০,০০০ (২০১৭ সালের জনগণনা)।

জনঘনত্ব: ২.৭ জন/বর্গকিমি।

অবাক করার মতো তথ্য হল, পুরো সাইবেরিয়া অঞ্চলটি এশিয়া মহাদেশের অংশ হলেও এর অধিকারী রাশিয়া কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ইউরোপীয় দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাশিয়ার মোট স্থলভাগের ৮০%ই সাইবেরিয়ার অন্তর্গত।

এই অঞ্চলটি প্রকৃতির নানা তান্ডবের শিকার। একটি ঘটনার ফলে এখানকার ৯০ ভাগ প্রাণীই পৃথিবী থেকে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

সাইবেরিয়া নামটির উৎস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও অনেকের মতেই নামটি এসেছে তাতার ভাষা থেকে। ওই ভাষায় 'সাইবির' কথার অর্থ "ঘুমন্ত এলাকা"। সম্ভবতঃ সাইবেরিয়ার বরফে ঢাকা ভূপ্রকৃতি দেখে প্রাচীন তাতাররা এরূপ নাম দিয়েছিলেন।

মানব জাতির বিকাশে ভূমিকা:

 

প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে এই অঞ্চলটি মানব জাতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। এই অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন জীবাশ্ম এবং প্রত্নতত্ত্ব অনুযায়ী মাত্র ৪০,০০০ বছর আগেও এখানে কমপক্ষে ৩ প্রজাতির মানুষ বাস করতো। এবং তাদের বংশ বিস্তারেরও প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

  

আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার বছর এই সাইবেরিয়া থেকে আদি মানুষ প্রথম আমেরিকা ভূখণ্ডে পদার্পন করেছিলো।

প্রাণীজগতের প্রসারে ভূমিকা:

 

বিশ্বব্যাপী সাইবেরিয়া সুপরিচিত তার দীর্ঘ ও তীব্র ঠান্ডার জন্য। যেখানে জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা -২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

বরফ যুগে বর্তমান রাশিয়া ও আলাস্কার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালীর জল জমাটবদ্ধ হয়ে বরফের সেতুতে পরিণত হয়েছিল। তখনই মানুষ হাঁটা পথে রাশিয়া থেকে আমেরিকায় চলে যেতে পারত।

শুধু মানুষই নয় দাঁতালো বাঘ, গুহাবাসী সিংহ, লোমশ গন্ডার এবং ম্যামথ হাতির মতো বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীও এই পথে সাইবেরিয়া থেকে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলো।

প্রাণীজগতের প্রসারে এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি আবার সাইবেরিয়ার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল সংখ্যক প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

 

অগ্ন্যুৎপাত:

 

ভূবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী পৃথিবীর ইতিহাসে গত ৫০ কোটি বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনাও এই সাইবেরিয়াতে ঘটেছে।

 ২৫ কোটি বছর আগে শুরু হওয়া এই অগ্ন্যুৎপাত টানা প্রায় ২০ লক্ষ বছর ধরে অব্যাহত ছিল। এর ফলে ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা লাভায় কমপক্ষে ৭০ লক্ষ বর্গ কিমি এলাকা ঢেকে গিয়েছিল। এই সময়ে নির্গত হাইড্রোজেন সালফাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসে পুরো পৃথিবীর আকাশ ঢাকা পড়ে যায়। এবং পৃথিবীর জীবজগতের উপর মহাবিপর্যয় নেমে আসে।

        

বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, ওই সময় পৃথিবীতে বিদ্যমান জীবজগতের শতকরা ৯০ ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো। জীবজগতের সেই শূন্যতা পূরণ করেছিলো বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী, যাদের মধ্যে ডায়ানোসর উল্লেখযোগ্য।

 

উল্কাপাত ও দাবানল:

 

  ১৯০৮‌ সালের ৩০ শে জুন এখানে অবস্থিত তাইগা বনাঞ্চলে হঠাৎ করেই আকাশটা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।

 বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, সেদিন সাইবেরিয়ায় অন্তত ২০০ মিটার ব্যাসের উল্কাপিন্ড আঘাত হেনেছিলো। আর তাতেই ২০০০ বর্গমাইল এলাকার বনাঞ্চল আর সেখানের প্রায় ৮ কোটি গাছ ধূলিসাৎ হয়।

    

সৌভাগ্যবশত উল্কাপিন্ডটি ভূপৃষ্ঠের কয়েক কিমি উপরে বিস্ফোরণ ঘটায়। নইলে পৃথিবী বা এশিয়ার মানচিত্র থেকে যে কি পরিমান জীববৈচিত্র নিশ্চিহ্ন হত তার ইয়ত্তা নেই।

তাইগা:

 

 সাইবেরিয়ার পুরো উত্তরাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের বৃহত্তম বনাঞ্চলটির নাম তাইগা।

     

পৃথিবীতে সর্বশেষ বরফ যুগ চলাকালীন এই বনাঞ্চলের বিস্তৃতি ছিলো পুরো মেরুবৃত্ত জুড়ে। ফলে সাইবেরিয়ার পাশাপাশি কানাডা এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ গুলোতেও এই সময় এই বনাঞ্চলে ঢাকা ছিলো।

  বিশ্বের মোট স্থলভাগের ১২% এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বনাঞ্চলটির বর্তমান আয়তন প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ বর্গকিমি। এই বনাঞ্চল বছরের বেশিরভাগ সময়ই পুরো বরফের চাদরে ঢাকা থাকে। তাই এখানে শুধু conifer জাতীয় গাছই বেড়ে উঠতে দেখা যায়। এ জাতীয় গাছের পাতা খুব সরু হওয়ায় পৃষ্ঠদেশ থেকে বাস্পমোচনের হারও অনেক কম। বরফে আচ্ছাদিত হলেও তাইগা অঞ্চলের সার্বিক আর্দ্রতা বেশ কম। এই পরিস্থিতিতে জীবনধারণের জন্য গাছগুলি এভাবেই অভিযোজিত হয়েছে।

বৈকাল:

 

বিশ্বের বৃহত্তম বনাঞ্চলের পাশাপাশি বৃহত্তম সুপেয় জলের হ্রদটিরও অবস্থান এই সাইবেরিয়া অঞ্চলে।

বৃহত্তম সুপেয় জলের হ্রদ বৈকালের আয়তন উত্তর আমেরিকার ৫ টি হ্রদের (সুপিরিয়র, মিচিগান, হুরণ, ঈরি, ওন্টারিও) মিলিত আয়তনের চেয়েও বেশি।

   

শুধু তাই নয়, প্রায় ২.৫ কোটি বছর আগে সৃষ্ট এই হ্রদ টি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো হ্রদ।

এর সর্বোচ্চ গভীরতা ১.৬ কিমিরও বেশি হওয়ায় বৈকাল বিশ্বের গভীরতম হ্রদের খেতাব অর্জন করেছে।

উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এই হ্রদের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার আর সর্বোচ্চ প্রস্থ ৭৯ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে এই হ্রদে জলের পরিমান প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ঘনমাইলের বেশি।

      

অনন্য এই হ্রদকে ১৯৯৬ সালে World Heritage হিসেবে স্বীকৃতি দেয় UNESCO.

ইয়েনেসি নদী:

 

সাইবেরিয়ার উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ইয়েনেসি নদী অন্যতম।

সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার সীমান্ত এলাকায় উৎপন্ন এই নদীটি উত্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুমেরু সাগরে পড়েছে। এই সাগরে পতিত নদীগুলোর মধ্যে ইয়েনেসি একাধারে দীর্ঘতম ও বৃহত্তম।

এর দৈর্ঘ্য ৫৫৩৯ কিমি।

এর অববাহিকার আয়তন ২৬ লক্ষ বর্গকিমি।

আর প্রতি সেকেন্ডে এই নদীর মোহনায় প্রবাহিত জলের পরিমান প্রায় ২০,০০০ ঘনমিটার।

এই নদী সাইবেরিয়াকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুভাগে বিভক্ত করেছে।

প্রাণীবৈচিত্র্য:

 

ভৌগোলিক বৈচিত্রের পাশাপাশি সাইবেরিয়ার প্রাণীজগৎও বেশ বৈচিত্র্যময়। বিশ্বের টিকে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির বাঘের মধ্যে এই অঞ্চলে বসবাসকারী সাইবেরিয়ান টাইগার আকারে বেশ বড়। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এই প্রজাতির এক একটি পুরুষ বাঘের ওজন ৩০০ কেজি বা ৩ কুইন্টাল।

 

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ বাঘের বসবাসও এই অঞ্চলে। আমুল্ড লেপার্ড নামের চিতাবাঘ গুলি দেখতেও বেশ সুন্দর। তবে প্রকৃতিতে এদের সংখ্যা খুবই কম।

সাইবেরিয়ার অন্যান্য শিকারী প্রাণীর মধ্যে তুষার চিতা, ধূসর নেকড়ে এবং তন্দ্রা নেকড়ে অন্যতম।

এই অঞ্চলে তৃনভোজী প্রাণীদের মধ্যে মোষ, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ এবং ইউরোপীয়ান বাইসন অন্যতম।

   

পৃথিবীতে কেবলমাত্র এই অঞ্চলেই দুই কুঁজ বিশিষ্ট উঁট দেখা যায়। ব্যাক্ট্রিয়ান ক্যামেল নামক এই প্রজাতির উঁটের পিঠে চড়েই সিল্ক রুট ধরে যাতায়াত করতেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

         

সর্বোপরি, সাইবেরিয়ার বনাঞ্চলে কালো, বাদামী এবং মেরু ভাল্লুকেরও বসবাস রয়েছে।

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ:

 

আধুনিক যুগের বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্যও সাইবেরিয়া বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।

এর মধ্যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নির্মিত ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর সাথে ভ্লাডিভস্টককে যুক্ত করা এই রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৩০০ কিমি।দৈর্ঘ্যের বিচারে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম এই রেললাইন নির্মাণে সময় লেগেছিলো প্রায় ২৫ বছর।

ads

Mailing List