অন্তরিন / গল্প (শেষ পর্ব)

 অন্তরিন / গল্প (শেষ পর্ব)
26 Jun 2022, 03:30 PM

 অন্তরিন / গল্প (শেষ পর্ব)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

অবাক হয়ে সুন্দর জিজ্ঞাসা করল জবাকে, কেন, তোমরা তোমাদের নিজেদের বাড়িতে নিজেরা কি কারণে থাকতে পারো না?  অসুবিধাটা কোথায়?

ভায়ের বৌ ওই বাড়িতে আমাদের কারোরই আর প্রবেশাধিকার দেয়নি। 

তাই! কিন্তু ওটা তো তোমার মা'র বাড়ি। আর তোমরা যখন সহোদর-সহোদরা তবে ওনার তো কোনো রাইট নেই তোমাদের ঐ বাড়িতে ঢুকতে না দেবার।

আসলে ভাইয়ের বিয়ের পরেই যখন মা ওখানে গিয়ে ক'দিন ছিলেন, তখনই কায়দা করে মাকে দিয়ে কাগজে ওরা লিখিয়ে নিয়েছিল, ঢাকুরিয়ার ওই বাড়িতে ও আর ওর বৌ ছাড়া আর কারও অধিকার নেই।

সেই জন্যই তারপর থেকেই ওই বাড়িতে আর তোমরা যেতে পার না!

না, ওদের রাগ... মা যেহেতু আমার জন্য বাবার দূর সম্পর্কের ভাইকে দিয়ে ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, তাই ওই বাড়িটার ভাগ ওর প্রাপ্য। একদিন তো ওরা বলেই দিল, না বেলঘরিয়ার বাড়ি, না দেশের বাড়ি...  কোনো কিছুই পায়নি ওরা; তাই ওটা ওদের।

ভাবতেও অবাক লাগে, মানুষ এতো নোংরা জঘন্য মনের হয়! তুমি ওকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য জলাঞ্জলি দিলে, অথচ এই তার প্রতিদান দিল ও!

এখন আর ওসব ভাবি না জানো, বয়স তো হয়েছে, চেনা-জানা সবাইকেই হারিয়েছি; খালি তোমার সাথেই একটু কথা বলার ইচ্ছেটুকু ছিল, সেটাই মিটিয়ে নিয়ে হালকা হলাম। জানি... আর তোমার সাথে দেখা হবার নয়...।

কি যা তা বলছ জবা? তুমি আছো কোথায় এখন?

তোমার শহর থেকে অনেক দূরে ....। জলপাইগুড়িতে।

একটু হেসে বলে, চাইলেও এখন আসতে পারবে না। এখন কিন্তু লক ডাউন ---- সারা বিশ্বে -----

অতদূরে তুমি কি করে গেলে?

এখানেই শেষ করেছি আমার কর্মজীবন। ট্রান্সফারের চাকরি; রিটায়ার করার পর যা টাকা-পয়সা পেয়েছিলাম, তা দিয়ে এখানেই একটা অরফানেজ খুলেছি; ওদের নিয়েই সময়টা কাটিয়ে দিই।

তাহলে যে ফোনটা ধরল,  সেও কি ....

হ্যাঁ, আমার এখানকার বোনঝি, আমাকে পিসি বলে ডাকে। নিজের ভাইপো - ভাইঝিরা তো কোনো সম্পর্ক রাখে না, তার চেয়ে এরাই আমার অনেক কাছের, ভীষণ আপনার। আমি সংসার না করেও আজ কতজনের মা, পিসি, মাসী ...  সম্পর্কের প্রকৃত মানে আমি আজ খুঁজে পেয়েছি সুন্দর।

আমি আজ সত্যিই .... খুবই ভালো আছি।

আর কোনো কথা মুখ দিয়ে বার হল না, কল্পনার জাল বুনে ষাট/ একষট্টির জবা'র সেই চেহারাটা মনে করতে করতে এখনকার বার্ধক্যের জবার চেহারা মেলানোর চেষ্টা করল।

হঠাৎ করে মুখ ফসকে তার বেরিয়ে গেল:

আচ্ছা জবা, আজও হাঁসলে বাঁ গালে এখনও তোমার টোল-টা পড়ে?

কি জানি, বুড়ো তোবড়ানো গালে আর টোল পড়ে কিনা....  দেখার সময়ও নেই, আর তা দেখার লোকও কেউ নেই। 

দুচোখে এবার বাঁধভাঙা জলের ধারা....  সুন্দরের দুগাল বেয়ে নীচের দিকে নামতে লাগল।

ডাক্তার বাবু, আপনার কি ব্ল্যাক কফি খাওয়া হয়ে গেছে? যান, বানিয়ে আনুন, নাহলে যে আপনার মাথা ধরে যাবে।

তুমি রাখো, আবার পরে ফোন করব তোমাকে ....

বাধ্য হল জবাকে ও কথা বলতে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না।

আজ এতগুলো বছর ধরে নিজের জীবনটাকে সে মালগাড়ির ইঞ্জিনের মত টেনে টেনে নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্যখানে নিয়ে চলেছে, কিন্তু পেছনের বগিগুলোর দিকে কখনও তাকানোর সময় হয়নি, সেগুলো ঠিক মত পিছু পিছু আসছে কিনা ।

 

ইলেকট্রিক কেটলির ফুটন্ত সাদা ধোঁয়াতে ভর করে তার উদাসীমন তখন কল্পনার এক জলপাইগুড়ি-গামী  রেলগাড়ির সওয়ারি হয়ে অন্তরিন জবা-র পানে ধাবমান ---- দুপাশে ঝোপঝাড়, ঘরবাড়ি, মাঠ-বন, পুকুর-নদী ফেলে ইঞ্জিনের রাশি রাশি সাদা ধোঁয়া ওপর দিকে উঠে আকাশে মেঘের সাথে গিয়ে মিলিত হতে চায়।

(সমাপ্ত)

ads

Mailing List