অন্তরিন / চতুর্থ পর্ব (বড় গল্প)

অন্তরিন / চতুর্থ পর্ব (বড় গল্প)
30 Jan 2022, 05:45 PM

অন্তরিন / চতুর্থ পর্ব

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

ইন্দ্রাণীর বাড়ির সামনে হাজির হল।

ঠিকানা খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধাই হবার কথা নয়। একেবারে বেলঘরিয়া রেল স্টেশনের কাছেই।

দরজায় মৃদু করাঘাত করল সে।

এটা তার মা প্রভাময়ীর অন্যান্য শিক্ষার অন্যতম। 

বাবা প্রতাপনারায়ণ, তাঁর পৈতৃক ব্যবসা ও আনুষঙ্গিক নানান কারণে বাড়ির বাইরে থাকতেন; কাজেই সুন্দর-এর আজ যা কিছু--- তার অধিকাংশই তার গর্ভধারিণীর অবদান।

জ্ঞান হবার পর থেকে ও দেখে এসেছে: চওড়া লালপাড় কাপড়, বড় হাতা ব্লাউজ,  মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়ানো চুলের সামনে চওড়া লাল সিঁথি আর কপালের ঠিক মাঝখানে লাল সিঁদুরের টিপ।

খাওয়ার সময় মুখে শব্দ করা, সশদ্ধে জুতো পড়ে হাঁটা,  শব্দ করে দরজা-জানলা বন্ধ করা -- এইরকম নানান দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় তার মা'র কাছ থেকেই শেখা।

 

---কাকে চাই?

বয়স্ক এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা দুহাতে করে দরজা খুলে, জিজ্ঞাসু নয়নে সুন্দরের সামনে দাঁড়িয়ে।

দুহাত জোড় করে সবিনয়ে বলল সুন্দর,

--- আজ্ঞে, আমি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র --- সুন্দরমোহন রায়চৌধুরী --- ইন্দ্রাণী--- মানে, আমরা একসঙ্গে পড়াশুনা করি।

একটু থেমে বলে উঠলো,

--- মাফ করবেন, ইন্দ্রাণী কি এই বাড়িতে থাকে?

আপাদমস্তক ভালো করে দেখে ধীরে, অথচ চাঁচাছোলা ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন মহিলা:

--- এক ক্লাসেই তোমরা পড়াশোনা করো বুঝি?

--- আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার বন্ধু ও।

এবার চোখে চোখ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করলেন ভদ্রমহিলা:

--- শুধুই বন্ধু, নাকি আরো কিছু?

 

হঠাৎ এ ধরনের প্রশ্নে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল সুন্দর। 

সেই ইস্কুল জীবন থেকে আজ অবধি যেসব বন্ধুরা সঙ্গী হিসেবে একসাথে পড়াশুনা করেছে, তাদের মধ্যে অনেকেই মেয়ে বন্ধু ছিল। কতজনের বাড়িতে ও যেত, একসঙ্গে পড়াশুনা নিয়ে কত আলোচনা করত, তাদের বাবা-মার সাথে একসঙ্গে বসে গল্প-গুজব করত --- কত হাসি-মজার কথা হতো --- কিন্তু কৈ, কোনো মেয়ের বাড়িতে তাদের বাবা-মা এভাবে তো তাকে এই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেনি।

তার মা তাকে একটা কথা খুবই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন: "সুন্দর, আমি হয়তো চিরদিন তো তোমাকে শিক্ষা দিতে বেঁচে থাকব না, একটা কথা খুব ভালো করে মনে রেখে দেবে --- তোমার ব্যবহার যেন কখনও কাউকে বুঝতে সাহায্য না করে, তুমি কোন বংশের সন্তান। মিশবে সবাই সাথে সমান ভাবে, প্রত্যেকটি মানুষকে তার যোগ্য প্রাপ্য সম্মান দিয়ে কথা বলবে। তোমার ব্যবহার সবার জন্য সমান হবে, কিন্তু নিজের বংশের গরিমা, শিক্ষা আর আভিজাত্য কখনও ভুলে যাবে না। তোমার আচরণে কখনও অহঙ্কার, উপেক্ষা আর ঔদ্ধত্য না থাকে। জানবে, তুমি তোমার পূর্বজন্মের কর্ম-ফলে এই এত বড় বাড়ির সদস্য হতে পেরেছ।"

--- কি হলো, এই সহজ প্রশ্নর উত্তর দিতে এত সময় লাগে?

চমকে গিয়েও, সপ্রতিভ হয়ে প্রত্যুত্তরে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ মাসিমা, ইন্দ্রাণী আমার খুব ভালো বন্ধু। আসলে -- ও তো এখন ক'দিন ক্লাস করতে পারছে না, তাই কলেজ থেকেই বলল --- ওর পড়াশোনার খবর নিতে। 

একটু মিথ্যার আশ্রয় সুন্দরকে নিতেই হলো। ওনার যা অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, বেশিক্ষণ টিকে থাকা দায়। এটুকু মিথ্যে বললে বোধ হয় পাপ হবে না। স্বয়ং যুধিষ্ঠিরই বলেছিলেন,  'অশ্বত্থামা হত,(ইতি গজ)'।

 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ নামিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন,

--- কিন্তু ঐ কলেজ থেকেই তো ওকে ক্লাস করতে দিল না, আজ তারাই আবার তোমাকে পাঠালেন জবার পড়াশোনা খবর নিতে! আশ্চর্য!!

জবা! জবা কে?

--- কি হলো পিসিমা, কে এসেছে? কার সঙ্গে কথা বলছ তুমি?

ইন্দ্রাণীর গলা। খুবই কাছ থেকে।

একেবারে সাদামাটা পোশাকে কথা বলতে বলতে ঐ ভদ্রমহিলার পাশে এসে দাঁড়ায় ইন্দ্রাণী।

সবুজ আর হলুদ রঙের ডুরে শাড়ি, সবুজ রঙের ঘটিহাতা ব্লাউজ আর সামনে করা, লম্বা মোটা জোড়া বিনুনি করা এ কোন ইন্দ্রাণীকে দেখছে সুন্দর!!

 

(ক্রমশঃ)                            

Mailing List