অন্তরিন / গল্প /পর্ব-বারো

অন্তরিন / গল্প /পর্ব-বারো
10 Apr 2022, 06:30 PM

অন্তরিন / পর্ব-বারো

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

ফোনটা বেজে যাচ্ছিল।

ফোনের রিংটোনটা কানে আসছিল বটে, কিন্তু সুন্দরের মনে হচ্ছিল: ওই শব্দটা ধ্বনিত হচ্ছে তার বুকের মধ্যে।

আসলে তার ভাবনার কারণ: দীর্ঘ এতগুলো বছর কোনো যোগাযোগ ছিলনা জবার সাথে; এখন ওর স্বামীর ব্যাপারে কোনো কিছু জানা নেই,  সন্তানাদির বিষয়ে কিছু জানা নেই  ----- কোথায় আছে এখন, কি করছে,  কিছুই জানে না।

এখন ফোনটা যদি ও নিজে ধরে, তবে কোনো অসুবিধা নেই,  কিন্তু যদি অন্য কেউ হয়, ----- জানতে চায়, আপনি কে বলছেন  ----  তখন ও কি পরিচয় দেবে নিজের।

একবার ভাবলো, ফোনটা কেটে দেয়,  কিন্তু কি এক অদ্ভুত অদৃশ্য টানে রিসিভারটা নাবিয়ে রাখতে পারল না। 

--- হ্যালো,  কে বলছেন  ---

একটি খুব সম্ভব কিশোরের কন্ঠ।

ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় টান টান হয়ে গেল সুন্দরের; যথাসম্ভব পুরুষালি ব্যক্তিত্ত্ব ফুটিয়ে প্রত্যুত্তর দিল,

--- এটা কি ইন্দ্রাণীর নাম্বার?

--- কে, ইন্দ্রাণী? নানা, এখানে ইন্দ্রাণী বলে কেউ থাকে না।  রং নাম্বার।

ঠিক এই সময়ে একটা মহিলা-কন্ঠে কেউ বলে উঠলো : কি নাম,  দাঁড়া,  আমি দেখছি।  ধরতে বল --- যাচ্ছি। 

--- আপনি ধরুন একটু, পিসি আসছে।

আবার সেই  অস্বস্তিটা শুরু হল: কে আবার আসছে রে বাবা  ----

--- হ্যালো,  কাকে খুঁজছেন?

এই তো,  জবার গলা!  জবা এখন পিসি!!

তা হবে না-ই বা কেন,  ও যদি দাদু হতে পারে,  তাহলে জবার পিসিমা হতে আপত্তি কোথায়?

--- যাকে খুঁজছিলাম,  তাকে পেয়ে গেছি।

--- ওঃ, তুমি,  --- আমি ভাবছিলাম কে না কে --- প্রথমে বুঝতেই পারিনি ।

--- হ্যাঁ। 

একটু থেমে,  পাশে থাকা কিশোরটিকে বলল ---- আমার ফোন, আমি ধরছি --- তুই যা বাবু।

আবার শুরু করল,

--- তা হঠাৎ করে আমাকে ফোন  --- নাম্বার পেলে কোত্থেকে?

গলায়  অনুযোগের রেশ --- উত্তরে সুন্দর বলে ওঠে,

--- বারে, কাল ফোন করতে করতে লাইনটা ডিসকানেক্ট হয়ে গেল,  কলার লিস্ট থেকেই  তো তোমার নাম্বার সেভ করা ছিল ----- তারপর আর তুমি ফোন করলে না?

কথাটা নিজের কানেই কেমন বেসুরো  শোনালো।  কেমন হ্যাংলা , বেহায়াদের মত শোনালো। ঐ এখনকার ছেলে-ছোকরাদের মতন আর কি।

--- তা  সুন্দরবাবুর  কি আমার ব্যাপারে চিন্তা হচ্ছিল?

--- স্বাভাবিক।  যেভাবে তুমি কথা বলতে বলতে ফোনটা রেখে দিলে, আমি তারপর কত "হ্যালো হ্যালো"  বললাম,  তোমার কোনো সাড়া না পেয়ে  শেষে রাখতে বাধ্য হলাম।

--- আমি তো অনেকক্ষণ তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম,  শরীর খারাপ করছে কিনা,  তারপরও বেশ

কিছুক্ষণ লাইনে থাকলাম,  তারপর আর কোনো সাড়া না পেয়ে লাইনটা কেটে দিলাম।

 একটু থেমে , সুন্দর বলে উঠলো :

--- হ্যাঁ,  অনেক দিন পরে তো, পুরোনো দিনের সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল---- আর তাতেই বুকে হালকা কেমন যেন একটু চিন চিন করে উঠলো; আমি সরবিট্রেটের শিশিটা আনতে গেলাম, আর তুমি  না বুঝতে পেরে লাইন ছেড়ে দিলে।

--- ওমা,  আমি তা বুঝব কেমন করে? তা বুকের দোষও ধরা পরেছে ডাক্তার সাহেবের! কবে হল এসব?

  বেশ কথা বলছিল, শেষের দিকে গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা লাগল সুন্দরের কানে।

--- ঐ যবে ছোট ছেলেকে  বাড়ি থেকে বার করে দিলাম।  তুমি ভাবতে পারো , আমার ছেলে , আমার নার্সিংহোমে বসে, বড়লোক পার্টির কাছ থেকে পয়সার লোভে ভ্রূণের লিঙ্গনির্ধারণ করতে যাচ্ছিল!!

 How dare he!!! আমি না গিয়ে পরলে বিরাট বড়সড় ঘটনা ঘটে যেতে পারত।

অনেক দিন পর আবার ওই পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গিয়ে বেশ উত্তেজিত ভাবেই কথাগুলো একদমে বলে যেন একটু হাঁপিয়ে উঠলো।  জবার নজর এড়ালো না । সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠলো,

--- আস্তে,  সুন্দর,  অত উত্তেজিত নয়, --- বাড়িতে তুমি এখন একা, --- sorry  to say,  ----- ভগবান না করুন,  হঠাৎ কিছু হয়ে গেলে মুসকিল। তাছাড়া করোণার সময়ে  হাসপাতালে এখন ভর্তি হওয়ারও সুযোগ নেই।  সাধারণ পেশেন্টকে ভর্তি খুব সম্ভব নিচ্ছে না।  বৌদি থাকলেও  হত।

বাধ্য হয়েই এ ধরনের কথা বলতে হল, কারণ খুব কম দিন ধরে তো সে সুন্দরকে সে চেনে না, রেগে গেলে আর তার জ্ঞান থাকে না। 

--- তা, ডাক্তারবাবু,  আপনি বুঝি আর চেম্বার করেন না?  ----- মানে আমার যদি শরীর খারাপ হয়ে যায়,  আপনার ট্রিটমেন্ট পাব তো?

যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে ওর রাগ থামিয়ে দেবার চেষ্টা করল।

--- না, আমি তারপর থেকেই চেম্বার করি না।

--- আমার কিছু  হলে তাহলে তোমাকে পাব না তো?

--- কেন,  তোমার আবার  কি হয়েছে?

এখনও ওর গলায় রাগের লেশ।

--- কি হয়নি, তাই বল। হার্টে দুটো অ্যাটাক হয়ে গেছে,  হাই সুগার  --- ইনসুলিন নিতে হয়।

--- তাই,  তুমি এখন আছো কোথায়? ঢাকুরিয়ায়?

--- নাঃ, কবে ছেড়ে দিয়েছি ও বাড়ি।

--- সেকি, তোমরা এখন আর ওই বাড়িতে থাকো না?

--- সে এক লম্বা কাহিনী  ----

 

  (ক্রমশঃ)

Mailing List