অন্তরিন / অষ্টম পর্ব (গল্প)  

অন্তরিন / অষ্টম পর্ব (গল্প)   
27 Feb 2022, 11:30 AM

অন্তরিন / অষ্টম পর্ব (গল্প)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

প্রথমে খুব একটা ইচ্ছে ছিল না অনুজদের বাড়ি থাকবার।

প্রথমতঃ,  ওদের আর্থিক পরিকাঠামোটা খুব একটা স্বচ্ছল নয়। শুধু শুধু ওদের অসুবিধায় ফেলা।

তিন বোন, আর অনুজরা দুই ভাই। বড়ো দিদি বিবাহ-যোগ্যা, মেজ বোন ও অনুজের ছোট ভাই দুজনেই হাই স্কুলে পড়াশুনা করছে  ---- আর ছোট বোন বৃত্তি পরীক্ষা দেবে।

সব বাধা কাটিয়ে দিল অনুজের বাবা,  মৃণাল কুমার মুখোপাধ্যায়ের ছোট্ট একটি উক্তি:

--- বাবা সুন্দর,  আমি গরিব,  কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা  ----- সব ঠিক; কিন্তু সরকারি চাকরি তো করি। আর এই সংসারে যদি সাতটি পেট চলে, তবে আরো একটি পেটও ঠিক চলে যাবে। তুমি ওদিকে চিন্তা করো না, তোমার মা'র সাথে কথা বলে তাড়াতাড়ি এখানে আসার ব্যবস্থা করে ফেল।

প্রকৃত অর্থে একটি শিক্ষিত পরিবার। মৃণালবাবুর বাবা রাধাশ্যাম মুখোপাধ্যায় ছিলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারির মতো একটি নামকরা স্কুলের ইংরাজি শিক্ষক।  অস্বীকার করার উপায় নেই,  এই স্কুলেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয়। কেবলমাত্র তিনিই নন, প্রখ্যাত নট-নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ,  উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় , স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়,  প্রখ্যাত কবি অক্ষয়কুমার দত্তের মত স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও ঐ স্কুল থেকে পাশ করেছেন।

 

কাজেই থেকে গেল সেখানে। মেডিকেল কলেজ থেকে হাঁটা পথেই আসা যায়,  তবে যেদিন শরীরটা একটু দূর্বল বোধ হত, সেদিন ট্রামে করে ফিরত। আর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত কলেজ-স্ট্রিটের বইপাড়া ঘুরতে আর হেদুয়ায় সাঁতার দেখতে। 

হেদুয়ার রেলিং-এর পাশ দিয়ে যেতে যেতে সুন্দরের মনে হত, আচ্ছা---- এই রেলিংয়ের কোনগুলিতে

মাথা ঠুকে ঠুকে নরেন্দ্রনাথ দত্ত বলতেন,  " বল না বল,  তোর মধ্যে কি ঈশ্বর আছেন? " মা'র কাছে কবেকার শোনা গল্প, সব নতুন বলে মনে হত। গায়ে রোমাঞ্চ হত।

আর একেকদিন একটু এগিয়ে শ্যামবাজার অবধি গিয়ে জবাকে বেলঘরিয়া যাবার বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসত। ততদিনে সে ইন্দ্রাণী থেকে জবা-তে পরিণত হয়েছে,  এসেছে মনের খুব কাছাকাছি,  রবিবারটা দেখা না হলে যে কি অবস্থা হয়, ---- 

 

আবার কলিং বেল।

ঘড়ির দিকে তাকায় সুন্দর। রাত সাড়ে আটটা বাজে। চন্দন বোধহয়। দোকান বন্ধ করার সময় ব্রেড-টা দিতে এসেছে। এখন তো আর বাইরে বেরোতে দিচ্ছে না পুলিশ। ধরলেই বেধড়ক মার; এই তো সেদিন টিভিতে দেখালো।

হ্যাঁ।  ঠিক যা ভেবেছে , তাই। চন্দন। আজ সকালে পুজোর ফুল আনতে গিয়ে বলে এসেছিল স্লাইজ ব্রেড আর দুধের একটা প্যাকেট দিয়ে যেতে। রাতে ঐ দিয়েই ডিনার করে নেবে।

যাবার সময়, টাকাটা পার্সে ভরতে ভরতে বলল:

--- আন্টির খবর পেয়েছেন?  ভালো আছেন তো?

--- হ্যাঁ,  ভালো,  এখন তো আর আসা যাবে না, লক ডাউনের পরেই আসবে।

--- এই ক'দিন আপনার অসুবিধা হবে একটু। একা একা  তো ---

--- বিলেতে তো একাই সব কাজ-কর্ম করতে হয়েছে ; অভ্যাসটা দেখছি এখনও আছে। আর তেমনি কিছু হলে তোমরা তো আছো, ডেকে নিতে আর কতক্ষণ?

--- সত্যি বলতে কি,  আপনাদের ব্যবহারের জন্যই ভালো লাগে,  নয়তো এখনকার  এই সময়ে অন্য কেউ বললে আমি আসতাম না। যাক,  চলি ডাক্তারবাবু।

সাইকেলে চেপে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে।

সুন্দর ফিরে কিচেনে গিয়ে মাইক্রো ওভেনে দুধটা চাপিয়ে দিল, আর টোষ্টারে ব্রেড সেট্ করে, সুইচটা অন করে দিল।

 

  (ক্রমশঃ)

Mailing List