অন্তরিন / গল্প / নবম পর্ব

অন্তরিন / গল্প / নবম পর্ব
13 Mar 2022, 06:40 PM

অন্তরিন 

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

রাতে একটা গভীর নিদ্রা দিয়ে সকাল বেলায় বেশ সতেজ লাগছে।

এমনটা মাঝে মাঝে হয় না,  অনেক ধকল,  মানসিক চাপ,  উদ্বেগের পর মনে হয় একটা লম্বা ঘুম দরকার, আর ওই ঘুম থেকে উঠে  মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় --- সুন্দরের এখন ঠিক সেই রকম মনে হচ্ছে। 

আলসেমি করে পাশবালিশটা জড়িয়ে নিয়ে, পাশ ফিরে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে: দিই না,  শরীরটাকে আরেকটু বেশিক্ষণ বিশ্রাম। উঠেই তো আবার অনেক কাজ।

আসলে,  ও কখনও শরীরটাতে বাড়তি মেদ জমতে দেয় নি। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুবই নিয়ম-নিষ্ঠ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণ করে গেছে স্নেহজাতীয় খাবার,  ঘি, আর অধিক প্রোটিন খাওয়া তো কবে থেকে কমিয়ে দিয়েছে।

পার্টিতে যেতে হয় বটে, ফর্মালিটি মেনটেন তো করতেই হবে; তবে সত্যি বলতে কি,  নার্সিংহোম ছেড়ে দেবার পর পার্টি-টার্টি প্রায় কমে গেছে বললেই চলে।

সৌম্যজিৎ অবশ্য বলে: আবার মূলস্রাতে ফিরে আসতে,  কিন্তু আর ইচ্ছে করে না। নবনীতাও বলে আবার চেম্বার করতে --- । ও পরিস্কার জানিয়েছে,  আর তা সম্ভব নয়।  মনের ইচ্ছার-ও মৃত্যু হয় ---

আর ভালো লাগে না ঐ পুরোনো দিনে ফিরে যেতে।

আজ ও যদি চাকরি করত, এতদিনে তো রিটায়ার করে যেত!  আর যা একবার অভ্যাস থেকে চলে যায় ,তা আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস বৃথা।  এমন ভাবে অনেক পুরনো অভ্যাস সে ত্যাগ করেছে।

তবে অস্বীকার করার নেই,  নবনীতা কিন্তু তাকে এ বিষয়ে খুবই সাহায্যে করে। ও না থাকলে আজকের এই ডাক্তার রায়চৌধুরী বর্তমানে ছবি হয়ে ফ্রেমে ঝুলত।

অর্ককে যেদিন বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিল,  সেদিন মুখে যতই কাঠিন্য দেখাক,  ভেতরে ভেতরে  ভেঙে পরেছিল সে। ঐ দিনগুলোতে ভারি চমৎকার ভাবে ওকে ঐ অদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে বার করে এনেছিল নবু। তবে হ্যাঁ,  এটাও ঠিক, সে  দিন যদি ঐ সিদ্ধান্ত না নিতে পারত, তাহলে এই সুখশয্যা তাকে আর ভোগ করতে হোত না। জেলের ভাত খেতে হত আজ। মাণ-সম্মানটাও  হারাতে হত।

খুব সময় দিত নবনীতা। চেম্বারে বেড়ানোর সময়টা কাটানো খুব কষ্টকর হত। এত দিনের অভ্যাস--- অর্থনৈতিক দিক বন্ধ হয়ে গেল বলে নয়, তার কষ্টের কারণ ছিল অন্য।

যে নীতি দিয়ে ও অর্কজিত-কে তৈরী করেছিল,   তার মর্ম বুঝে চলতে পারল না।

অর্থ রোজগারের নেশায় হারিয়ে ফেলল নিজেকে।  ওভাবে  একটা চরমতম আঘাত  না করলে ওকে থামানো যেত না বোধহয়। আর সবচেয়ে বড় কথাটা--- যেটা ও বোঝার চেষ্টা করেনি --- সেটা হল : সামাজিক মূল্যবোধ।  বহু পরিবার এখনও আছে,  যারা  কন্যা-সন্তানকে  আজও বোঝা বলে মনে ভাবে। ভ্রূণ-নির্ধারিত  হবার পরই ঐ কন্যা সন্তানকে নষ্ট করে  ---- একটা সৃষ্টির সম্ভাবনাকে  চিরতরে নষ্ট করে দিতে চাইত।

অন্তত একটা প্রতিবাদ,  একটা অন্যায়ের তো যবনিকা-পতন করতে পেরেছে সে। আজ এই সব ভেবে খুবই হালকা লাগে নিজেকে।

না, আর নয় অলস-শয্যা,  উঠে পরে সে। আগের দিন হলে নবনীতা নিজেই এতক্ষণে এক পেয়ালা ধূমায়িত চা এনে হাজির করত। এখন তা আর হবার যো নেই,  ফ্রেস হ'য়ে নিয়ে নীচে নেমে চা বানিয়ে নিতে হবে।

বেড থেকে নেমে পায়ে স্লিপারটা পরতে যাবে, এমন সময় ঝনঝন শব্দে ফোনটা বেজে উঠল। লিভিং-স্পেসের দিকে এগিয়ে গেল। কে জানে,  এত সকালে কে ফোন করছে!!

(ক্রমশঃ)

Mailing List